Author Archives: talukderbd

26marcher-por

২৬ মার্চের পর

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৭১ সনে আমি মাত্র ৫ম শ্রেণীতে পড়ি। আমাদের স্কুল ছিলো মরহুম আফসার খলিফা বাড়ির সাথে ঘোনার চালা সরকারি ফ্রি প্রাইমারি স্কুল । ২৬ বা ২৭ মার্চ হবে হয়তো। খালিফা বাড়ির পশ্চিম পাশে হালট ঘেষে পুকুরের পাড়ে আম গাছের নিচে একটা কাঠের বেঞ্চ ছিল বসে বিশ্রাম করার জন্য। সেই বেঞ্চে বসে আমিনুল ভাই ও কাদের চাচা রেডিও শুনছিলেল। আমিনুল ভাই হলেন মরহুম মোসলেম চাচার ছেলে। মরহুম কাদের চাচা ছিলেন মরহুম আফসার খলিফার ছেলে। এই দুইজন হয়তো সমবয়সি। আমি রেডিও শুনতে খুব পছন্দ করতাম। তাই রেডিওর কাছে গিয়ে দাড়ালাম। দুজনাই মনোযোগ দিয়ে একটি ঘোষণা বার বার শুনছিলেন। ঘোষণাটি খুব সম্ভব এ রকম ছিল – শেখ মুজিবুর রহমানকে রাস্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। মাঝে মাঝে বলা হচ্ছে “রেডিও পাকিস্তান ঢাকা।” দেশাত্মবোধক গান বাজাচ্ছে আর ঘোষণা চলছে। আমিনুল ভাইরা উদগ্রীব হয়ে শুনছেন।

কিছুক্ষণ পর ধলী পাড়া নিবাসী ইয়াকুব আলী চাচা এলেন ঢাকা থেকে। তিনি ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল (ইপিআর) -এ চাকরি করতেন ঢাকায়। আমিনুল ভাই জিজ্ঞেস করলেন

– চাচা, কোথা থেকে এলেন?

– আমি ঢাকা থেকে এলাম।

– ঢাকার খবর কী?

– পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গণহত্যা চালিয়েছে। ইপিআর বিদ্রোহ করেছে। তারা আমাদের ইপিআর বাহিনীর সদস্যদের ধরে লাইনে দাড় করিয়ে ব্রাস ফায়ার করে হত্যা করছে। ঢাকায় যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আমি নিরস্ত্র হয়ে ফিরে এসেছি। আমাদের মুক্তি যুদ্ধ করতে হবে।

তিনি বাড়িতে চলে যান। পরের দিন, বা তার পরের দিন দেখলাম ইয়াকুব আলী চাচা কিছু সংখ্যক যুবক নিয়ে খলিফা বাড়ির উত্তর পাশে গজারির বন বেষ্টিত খালি বাচ্রা ক্ষেতে সামরিক ট্রেনিং দিচ্ছেন। হাতে বাঁশ দিয়ে ডামি রাইফেল তৈরি করেছে। সবার হাতে ডামি রাইফেল। আমি গজাড়ি গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ উপভোগ করছিল। সেই খালি যায়গায় পরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আজকের কালিয়া বাজার।

পরবর্তীতে এই ট্রেনিং প্রাপ্ত যুবকরা কাদের সিদ্দিকী প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া বাহিনীতে যোগ দেন। খুব সম্ভব সেই সেক্টর কমান্ডার ছিলেন ইয়াকুব আলী চাচা। তাই তিনি ইয়াকুব কমান্ডার ওরফে অকু কমান্ডার নামে পরিচিতি পান।

২৬ মার্চ ২০২৬ খ্রি.

ময়মনসিংহ

ছবিটি এ আই দিয়ে তৈরি করেছি

#স্মৃতি#মুক্তিযুদ্ধ

Eadgar Imam

ছোট বেলার ঈদগাহর ইমাম

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমাদের ছোট বেলার ঈদের জামাত অনেক বড় হতো। বড় চওনা হাট সংলগ্ন পুকুরের পশ্চিম পাড়ের মাঠে আমাদের ঈদের নামাজ হতো।বড় চওনা গ্রামকে কেন্দ্র করে শ্রীপুর, বামমচালা, খুইংগারচালা, ভুয়াইদ, ছোট চওনা, পাইন্যারবাইদ, জিতাশ্বরি, ঢ্নডনিয়া, বড়বাইদপাড়া, সাড়াসিয়া, ধলিপাড়া, জামাল হাটকুরা, ইত্যাদি গ্রামের মুসুল্লি নিয়ে এই মাঠে ঈদের নামাজের মাধ্যমে মিলন মেলা হতো। এই জামাতের প্রভাবশালী সংগঠক ছিলেন বড় চওনার মরহুম মোকছেদ আলী পঞ্চায়েত। তিনি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা লাল মিয়া চেয়ারম্যানের পিতা। একেক গ্রাম বা এলাকায় একেকজন প্রভাবশালী ব্যাক্তি ছিলেন। তাদের সাথে মোকসেদ পঞ্চায়েতের ভালো সম্পর্ক ছিলো। তাতেই ঈদের জামাতের একতার সম্ভব হয়। যেমন ছোট চওনার মরহুম শমসের হাজী, জিতাশ্বরির মরহুম রশিদ হাজী, বড়বাইদ পাড়ার আমার মেজ দাদা মরহুম মেসের উদ্দিন তালুকদার -এদের জন্যই জামাতটা মজবুত ছিলো। শমসের হাজীও পঞ্চায়েত ছিলেন।

এসব মুরুব্বিগণ ইন্তেকাল করার পর এই বন্ধন দুর্বল হতে থাকে। আমরা দলবদ্ধ হয়ে ঈদগাহর দিকে তাকবীর দিতে দিতে অগ্রসর হতাম। দুল্যাকালে, আমার মনে আছে, ঈদ উপলক্ষে বড় চওনা হাট থেকে আমরা কাগজের তৈরি রঙিন গোল টুপি কিনতাম। সেগুলো মাথায় দিয়ে মুরুব্বিদের পিছনে পিছনে আনন্দ করতে করতে তাকবীর দিয়ে অগ্রসর হতাম। আমাদের কাফেলার সামনে থাকতেন বড় কাক্কু মরহুম সোলাইমান তালুকদার। কাফেলার মুরুব্বিকে পেছনে ফেলে কেউ সামনে যাবার সাহুস পেত না। জিতাশ্বরিদের কাফেলার সামনে থাকতেন মরহুম আব্দুর রশিদ হাজী। ছোট চওনাদের সামনে থাকতেন মরহুম শওকত আলী চেয়ারম্যান।

বিভিন্ন কারনে এই একতার বন্ধন ভেঙে গিয়ে গ্রামে গ্রামে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হতে থাকে। কেন এমন হয়, সেটা নিয়েই এখন লিখবো।

আমি বুঝমান হয়েই দেখেছি আমাদের বড় চওনা মাঠের ঈমাম প্রায় শতববর্ষী মাওলানা মরহুম হাতেম আলীকে। অত্যন্ত সুন্দর তার চেহারা ছিলো। তার বাড়ি ছিলো বাশাইল উপজেলায়। ঈদের আগের দিন এসে পঞ্চায়েত বাড়িতে অবস্থান করতেন। নামাজের আগে বাংলায় সুন্দর সুন্দর বয়ান করতেন। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স:) এর জীবনের ঘটনাগুলো এমন অংগ ভংগী করে বলতেন, আমার মনে হতো এই হুজুরের মতই হয়তো আমাদের মহানবী ছিলেন। নামাজ ও দোয়া শেষে ছাত্র ও যুবকরা হুজুরের কাছে গিয়ে দোয়া চাইতেন। হুজুর মাথায় হাত বুলিয়ে, পিঠে আদর করে কথা বলতেন, উপদেশ দিতেন, খুশী খুশী ভাব নিয়ে কথা বলতেন। ঈদের নামাজ শেষে আমার চাচারা হুজুরকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসতেন। এই রেওয়াজ বহু বছর আগে থেকেই চলে আসছিলো। দুপুরের খাবার খেয়ে তিনি বিশ্রাম নিতেন। রাতে তাকে ডিস্টার্ব করতাম না। সকালে ফজরের নামাজের পর আমরা সব বয়সী মানুষ কাচারি ঘরে হুজুরের কাছে গিয়ে বসতাম। হুজুর চায়ের চুমুক দিতে দিতে সুন্দর সুন্দর ইসলামি গল্প বলে শুনাতেন। আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম।

বয়সের ভাড়ে শেষ বয়সে প্রায়ই অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তার পরিবর্তে তার ছেলেকে পাঠাতেন। ছেলেও মাওলানা ছিলেন। আধুনিক মাওলানা। তিনি বাবার মতো অত নরম ছিলেন না। রাজনৈতিক নেতাদের মতো আংগুল নেড়ে নেড়ে রাগান্বিত হয়ে বয়ান করতেন। পর পর কয়েক বার প্রক্সি দিতে দিতে তিনিই বাবার পরিবর্তে স্থায়ী ইমাম হয়ে যান। আমরাও ধীরে ধীরে বড় চওনা যাবার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি।

একবার আমাদের বড়বাইদ পাড়ার কাফেলা বড় চওনা ঈদের নামাজ ধরতে পারি না। আমাদের রেখেই নামাজ পড়ে ফেলাতে আমাদের মুরুব্বিরা মনখুন্ন হয়। বড় চওনার ইদ্রিস মামারা দু:খ প্রকাশ করেন। আমরা ফিরে এসে আমাদের বাড়ির দক্ষিণে চালা, যেখানে জিন্নাহ ভাই বাড়ি করেছেন, সেই বাছ্রা ক্ষেতে ঈদের নামাজ পড়ি। পরের বছর ঘটে আরেক ঘটনা। যেদিন চাঁদ উঠার কথা, তার আগের দিনই রেডিওতে ঘোষণা দেয় যে পবিত্র শাওয়াল মাসের ঈদের চাঁদ দেখা গিয়েছে। গ্রামের আমরা কেউ চাঁদ খুজে পেলাম না। ছোট কাক্কু মরহুম আব্দুস সালাম তালুকদার বললেন, “আমরা রেডিওর কথা বিশ্বাস করি না। আমরা কেউ চাঁদ দেখি নাই। আমরা আজ ঈদ করবো না।” এদিকে বড় চওনারা রেডিওর কথায়ই ঈদের নামাজ পড়ে ফেললো। আমরা পড়লাম পরের দিন। এভাবে প্রতিছর আমরা আমাদের গ্রামেই ঈদের নামাজ পড়তে থাকলাম। বড়বাইদপাড়ায় হাফেজিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হবার পর থেকে মাদ্রাসা সংলগ্ন ঈদগাহ মাঠেই আমরা নিয়মিত ঈদের নামাজ পড়ি।

আহারে, আগের সেই দিন নেই। নেই আমাদের মুরুব্বিরা। নেই সেই মাওলানা হাতেম আলী। যার কাছ থেকে শিখেছি কিভাবে সবাইকে ভালোবেসে নরম আচরণ করে সবার ভালো বাসা পাওয়া যায়। আমার জীবনে মাওলানা হাতেম আলী প্রভাব প্রবাহিত হোক বাকী জীবন।

৮ মার্চ ২০২৬

ময়মনসিংহ

#স্মৃতি#স্মৃতিকথা#গল্প#বাংলাগল্প#সাদেকুল

ছবিটি কাল্পনিক।

এ আই দিয়ে তৈরি করেছি।

computer die rogidekha

কম্পিউটারে রোগী দেখা


(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ডাঃ আবুল মনসুর ভাই কমিউটার দিয়ে রোগী দেখেন এটা আমি শুনেছি। ১৯৯০ দশকের কথা। তখন আমার জানামতে মনসুর ভাইর কাছেই কম্পিউটার ছিলো। তিনি এটা দিয়ে রোগী দেখেন। এবং বেশীভাগ রোগীই নাকি মানসিক রোগী। তাই মনসুর ভাইগে রোগীর লোকেরা পাগলের ডাক্তার বলেই জানতেন। আসলে তিনি হচ্ছেন ফরেনসিক মেডিসিনের ডাক্তার। যারা অসাভাবিক মৃত্যু হলে কাটাছিড়া ও কেমিক্যাল টেস্ট করে মৃত্যুর কারন নির্ধারণ করে দেন। এই বিভাগের ডাক্তারগণ সাধারণত প্রাইভেট প্রাক্টিশ করেন না। কিন্তু আমাদের মনসুর প্রচুর রোগী পান মানসিক রোগীর।

যাহোক, আমার খুব দেখতে ইচ্ছে হলো মনসুর ভাইর চেম্বার। আমি শুক্রবার ল্যাবরেটরি বন্ধ রাখি। এক শুক্রবার সকালে মনসুর ভাইর চেম্বারে গেলাম। বললাম, “ভাই, আমি কিছুক্ষণ আপনার চেম্বারে বসবো। আপনি কিভাবে রোগী দেখেন তার একটা অভিজ্ঞতা অর্জন করবো।” মনসুর ভাই মুসকি হেসে বললেন, “ও সিউর, বসুন, সাদেক ভাই।”

মনসুর ভাইর সামনের টেবিলটা বেশ বড়। টেবিলে হাতের বাম পাশে একটা ডেস্কটপ কম্পিউটার রেখেছেন। উল্টো দিকে রোগী বসেছেন। আমি মনসুর ভাইর সামনাসামনি বসেছি। মহিলা রোগী। মনসুর ভাই জিজ্ঞেস করলেন, “মা, আপনার নাম কী?” রোগী নাম বললেন। মনসুর ভাই কি বোর্ড দিয়ে টাইপ করলেন রোগীর না। মনিটরে ডং করে শব্দ হলো, হাজির হলো ঝাকড়া চুলওয়ালা বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের মতো একটা কার্টুন। চোখ বড় বড় করে রোগীর দিকে তাকালেন, মাঝে মাঝে চোখ মিট মিট করলেন। মাউস নাড়ালে তিনিও নড়াচড়া করতে লাগলেন। রোগী দেখে অবাক হলেন। বয়স জিজ্ঞেস করলে রোগী বললেন ৪০ বছর। বাড়ি জামালপুর। গ্রামের মহিলা। রোগীর সব কম্পপ্লেইন শুনে শুনে শুনে কমিউটারে এন্ট্রি দিলেন। স্টেথোস্কোপ দিয়ে রোগী পরীক্ষা করলেন। শারীরিক পরীক্ষার ফাইন্ডিং তিনি কম্পিউটারে এন্ট্রি দিলেন। ডায়াগনোসিস টাইপ করলেন। প্রেস্ক্রিপশন টাইপ করলেন। তারপর কম্পিউটারে রিডিং কমান্ড দিলে লাউড স্পিকারে পড়ার সাউন্ড বের হতে থাকলো এভাবে, “ট্যাবলেট এভেলিন, ওয়ান ট্যাব থ্রি টাইমস ডেইলি………।” রোগী মনে করলেন, কম্পিউটারের সেই কার্টুন কথা বলছেন। জিজ্ঞেস করলেন, “ইডায়, কি কইলেন, বুঝলাম না।” মনসুর ভাই প্রেস্ক্রিপশন পড়ে পড়ে বাংলায় ব্যাখ্যা করে শুনালেন। আরও বললেন, “মুরগির পাখনা খাবেন বেশী বেশী।”

রোগী বিদায় হবার পর আমি মনসুর ভাইকে বললাম, “আপনি আসলে কম্পিউটার দিয়ে কি করলেন?” ভাই বললেন, “আমি আসলে কম্পিউটার দিয়ে রোগীর ডাটা এন্ট্রি দিয়ে সংরক্ষণ করলাম খাতায় সংরক্ষণ করার পরিবর্তে। হাতে না লিখে প্রেস্ক্রিপশনটাও প্রিন্ট করে দিলাম। তাতে পরিস্কার হলো। আমার রোগী বেশী ভাগই মানসিক। তাই, ওরা মনে করে কম্পিউটারেই সব করে দিচ্ছে। মনোযোগ আকর্শন করার জন্য মনিটরে কার্টুন দিয়ে রাখি। মাউস ও কি বোর্ডে চাপ দিলে কার্টুনও নড়াচড়া করে। রোগীও মনে করে কম্পিউটারেরই কাজ।”
আমি বললাম
– ভাই, কম্পিউটারে আপনার প্রেস্ক্রিপশন পড়ে শুনালো, এটা কিভাবে হলো?”
– সাদেক ভাই, আপনার মাসে ইনকাম কত?
– কেন? বলবো না।
মনসুর ভাই কমিউটারে কিছু একটা টাইপ করলেন। বললেন
– আপনি আমাকে না বললে আমি কম্পিউটারকে জিজ্ঞেস করবো।
– করুন।
– এই, সাদেক ভাইর মাসে ইনকাম কতো?
কমপিউটার বললো
– ওয়ান মিলিয়ন ডলার অনলি।
আমি চমকে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম,
– কি করে বলে?
– আসলে, এটা হচ্ছে রিডিং সফটওয়্যার। আপনি কিছু লিখে সিলেক্ট করে রিডিং কমান্ড দিলে কম্পিউটার পড়ে শুনাবে। আপনাকে চমকে দেয়ার জন্য আগেই টাইপ করে রেখেছিলাম “ওয়ান মিলিয়ন ডলার”। আমি জাস্ট সময়মত এন্টার কমান্ড দিয়ে শুনিয়ে দিয়েছি।
– আচ্ছা ভাই, রোগীকে মুরগির পাখনা খেতে বললেন কেন? সবাই বলে গোস্ত খেতে, আপনি বললেন পাখনা খেতে, কারন কী?
– এটাই তো আমার কেরামতি। রোগীর সমস্যা বলেছে, ডেনায় বল পায় না। ডেনা মানে বাহু। বাহুতে শক্তি পায় না। মুরগির ডেনা বলে পাখনা। মুরগির পাখনায় শক্তি আছে বলেই শরীরের এত ওজন নিয়ে এক গাছ থেকে উড়ে গিয়ে আরেক গাছে গিয়ে বসে। কাজেই মুরগির পাখনা খেলে রোগীর ডেনায়ও বল আসবে। এগুলো তো মানসিক রোগী।
-মুরগির গোসত খেতে বললেই তো হতো।
-শুধু পাখনা খেয়ে মুরগির গোস্তো তো ফেলে দিবে না। পাখনা খেলে গোস্তোও খাবে।
আমি মুসকি হেসে বললাম, ” মনসুর ভাই, এই জন্যই আপনার কাছে এত মানসিক রোগী আসে।”
১০ মার্চ ২০২৬ খ্রি.
ময়মনসিংহ
#মনসুর #স্মৃতি #স্মৃতিকথা #গল্প
কাল্পনিক ছবি একেছি এ আই দিয়ে।

alapsinga-goenda

Alapsinga Goenda

আলাপসিংগা গোয়েন্দা

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বিরাট এক রহুস্যের স্মৃতিকথা আজ শেয়ার করবো। ১৯৭৬ সনের কথা। তখন আমি বাটাজোর বি বিম হাই স্কুলে ১০ম শ্রেনীতে পড়তাম। থাকতাম বাংলা ঘরে। ঐ ঘরে চারটি চৌকি ছিলো। পশ্চিম পাশে পাশাপাশি দুইটি চৌকি ছিলো। একটিতে শুইতেন হাফিজ ভাই, আরেকটিতে শুইতাম আমি। আমারটার পাশে ছিলো আমার পড়ার টেবিল। হাফিজ ভাই ইন্টেরমেডিয়েট পাশ করে পড়ালেখা ক্ষান্ত দেন। সংসার দেখাশোনা করতেন আর শুয়ে শুয়ে গোয়েন্দার বই পড়তেন। মাঝে মাঝে সেই ঘটনা আমাকে শুনাতেন। ঘরের অন্য দিকের চৌকিতে আরফান ভাই থাকতেন। তিনি খুব একটা পড়াশুনা করেননি। কিন্তু খুব মার্জিত ছিলেন। সংসারের কাজকর্ম করতেন। তার পাশের চৌকিতে থাকতেন কামলারা। কৃষি শ্রমিকদেরকে গ্রামে কামলা বলা হতো। ময়মনসিংহের আলাপসিং পরগণা থেকে একজন কৃষি শ্রমিক এলেন এই বাড়ির কৃষি কাজ করতে। তিনি দুই সপ্তাহ ছিলেন এই কাছারি ঘরে।

আমি আলাপসিংগা ঐ কামলার চেহারা এবং আচার-আচরণে ভিন্নতা লক্ষ করি। তার থলেতে ছোট আয়না ও চিরুনি থাকতো। শরীরে মাখার তেল থাকতো। কাপড় চোপড় থাকতো পরিস্কার। আমার টেবিল থেকে বই নিয়ে নিরবে পড়তেন। আমি মাঝে মাঝে গুনগুনিয়ে গান গাইলে তিনি সেই গান নিয়ে মন্তব্য করতেন। এভাবে গল্প করতে করতে আমি তাকে একজন রুচিশীল মানুষ হিসাবে পছন্দ করতে থাকি।

এক রাতে তাকে বললাম, “আমাদের সখিপুর এলাকার একজন গানের শিল্পী আছেন খুব ভালো গান গায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। তাঁর নাম আবুল হোসেন তালুকদার। বাটাজোর সোনার বাংলা কলেজে শিক্ষক হয়ে এসেছেন। শুনলাম আজ প্রিন্সিপাল বানিজুর রহমান স্যারের বাসায় রাত ৯ টায় তিনি জলসায় গান গাবেন। তার গান আমার ভালো লাগে।” তিনি বললেন, “চলো যাই।” আমরা দুজনে চলে গেলাম গান শুনতে। গিয়ে দেখি গান শুরু হয়ে গেছে। বেশ কয়েকটা গান শুনলাম মুগ্ধ হয়ে। আবুল স্যার প্রিন্সিপাল স্যারকে বললেন, “স্যার, এতক্ষণ তো কঠিন কঠিন গান গাইলাম। এখন একটু পপ গান গাই।” প্রিন্সিপাল অনুমতি দিলেন। আবুল হোসেন স্যার পপ গুরু আজম খানের গান “ওরে মালেকা, ওরে সালেকা, ওরে ফুলবানু, পারলিনা পারলিনা বাচাতে…..। ” বানিজ স্যার বললেন, “আবুল, ভুলে যেয়ো না যে তুমি এখন কলেজের টিচার!” গানের সময় আবুল স্যারের ঠোটে হাসির ঢেউ খেলে গেলো।

আলাপসিংগা ভাইর একটা আন কমন নাম শুনেছিলাম। সেই নামটা এখন ভুলে গেছি। তিনি আমাকে ফিরে যাওয়ার সংকেত দিলেন। বিশাল পুকুর পাড়েই ছিল বানিজ স্যারের বাড়ি। পুকুর পাড় দিয়ে হেটে হেটে ফিরছিলাম। আকাশে ছিলো পুর্ণিমার চাঁদ। কি যে মিষ্টি ছিলো সেই জ্যোস্না! পানিতে চাঁদের প্রতিবিম্ব পড়ে অপরুপ লাগছিলো। পুকুর পাড়ে বসতে ইচ্ছে হলো। তিনি বললেন, আসো কিছুক্ষণ এখানে বসি। বসে পড়লাম চাঁদ আর পুকুরের পানির দিকে মুখ করে। আলাপসিংগা বললেন, “নজরুল গীতি গাও, আমি বাঁশের বাঁশি বাজাই।” আমি পর পর অনেক গুলো নজরুল গীতি গাইলাম। প্রতিটিতেই তিনি বাঁশী বাজালেন মধুর সুরে।

আলাপসিংগা ভাইর প্রতিভা ও রুচি দেখে আমি মুগ্ধ হলাম। এরপর তার সাথে উচ্চাংগ সুংগীত বাংলা গানের বিভিন্ন ধরণ নিয়ে অনেক আলোচনা করেছি। তিনি এখানে প্রায় দুই সপ্তাহ কৃষি শ্রমিকের কাজ করেছেন। একদিন সকালে দেখি তিনি শার্টের সাথে ফুল প্যান্ট পরেছেন। বললেন, “তোমার সাথে কয়েকদিন কাটিয়ে ভালো লাগলো। তোমার মধ্যে অনেক প্রতিভা আছে। ছাত্র হিসাবে তুমি খুব মেধাবী। তুমি লেখাপড়া চালিয়ে যাবে। অনেক বড় হতে পারবে, দোয়া করি। আমার যাবার সময় হয়ে গেছে। কাজ মোটামুটি শেষ হয়েছে। আসলে আমি কামলা না। আমি গোয়েন্দা বিভাগে চাকরি করি। আমার এখানে কিছুদিনের জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো। দায়িত্ব পালন করা হয়ে গেছে। আসি তাহলে, ভালো থেকো। গোয়েন্দা চলে গেলেন। আমি অবাক হয়ে ফেল ফেল করে তাকিয়ে দেখলাম। চোখের কোনায় পানি এসেছিলো কিনা মনে নেই। প্রায় ৫০ বছর আগের কথা তো।

তার আগে এই এলাকায় বড় বড় কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটে। কুতুবউদ্দিন মাস্টারের খুনের জের ধরে আবদুল হাকিম মন্ডল খুন হন। এর পর আরও খুনের আশংকা থাকে। তাই, এই এলাকায় গোয়েন্দা তৎপরতা চলতে থাকে। তারই অংশ হিসাবে হয়তো আলাপসিংগা গোয়েন্দা এসেছিলেন এখানে।

আমার আজও তাকে মাঝে মাঝে মনে পড়ে। বিশেষ করে যখন পুর্ণিমার চাঁদ চোখে পড়ে। কত মার্জিত ছিলো সেই আলাপসিংগা গোয়েন্দা। সরকারি কাজের অংশ হিসাবে ডিউটি করতে এসে কৃষি শ্রমিক হতে হয়েছে।

২৮/২/২০২৬ খ্রি.

ময়মনসিংহ

#স্মৃতি #স্মৃতিকথা #গল্প #সাদেকুল

dullakaler-seheri

Dullakaler Seheri

দুল্যাকালের সেহেরি

(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমি দুল্যাকাল থেকেই রোজা রাখতাম। মা আমাদের জন্য গরম ভাত রান্না করতেন সেহরি খাবার জন্য। আমি খেতে বসলে অনেক সময় লাগতো খাওয়া শেষ করতে। দরুন, সেই ১৯৬৫ সনের কথা। আমার বয়স তখন ৭ বছর। পরনে হাফ হাতা আকাশী রঙের শার্ট ও চেক লুংগি। রমজান মাসে ভোর বেলা পাটিতে বসে সেহেরি খাচ্ছি ভাত ও মাছের তরকারি দিয়ে টিনের প্লেটে। সামনে পিতলের পানির গ্লাস। টিনের বাটিতে ডাউল আছে পিতলের চামুচসহ। সামনে গাছার উপর কুপি বাতি মিটি মিটি জ্বলছে। ঘরে মাটির বেড়া। টিনের চাল। সবার সেহেরি খাওয়া শেষ। আমার খাওয়া শেষ হচ্ছে না। ধীরে ধীরে খেয়েই চলেছি। পাতের খাবার শেষ হচ্ছে না। মা বলছেন, “বাজান, তাত্তারি খাও। বেইল উইঠা গেলো গা।” বাবা বলছেন, “তুমি যে পর্যন্ত আমার য়াতের পশম দেহা না যাবো হে পর্যন্ত খাইতে পারবা। আমি উঠানে টুলে বইয়া পশম দেকতে তাহি। তুমি খাও, বাজান।” আমার খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাবার হাতের পশম দেখা যাইত না। আমি খাওয়া শেষ হলে বলতাম, “বাবা, আমার খাওয়া শেষ।” বাবা বলতেন, “বাজান, অহন পশম দেহা যাইতাছে। রোজার নিয়ত কইয়া ফালাও।”
২৫/২/২০২৬ খ্রি.
ময়মনসিংহ
#গল্প #স্মৃতি #স্মৃতিকথা #সাদেকুল

surzaobanur-chheleti

Surzobanur Chheleti

সূর্যবানুর ছেলেটি

(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার


সূর্যবানু ছিল নাহার নার্সিং হোমের আয়া। তখন টাংগাইল শহরে তথা টাংগাইল জেলায় মাত্র একটি প্রাইভেট ক্লিনিক ছিল এই নার্সিং হোম। এটা ছিল আকুরটাকুর পাড়ায় একটা বড় পুকুরের পাড়ে। আশেপাশে বড় বড় আমগাছ ও নারিকেল গাছ ছিল। শহরের প্রাণ কেন্দ্রে হলেও এখানে প্রাকৃতিক পরিবেশ ছিল সুন্দর, মনোরম । ক্লিনিকের মালিক ছিলেন টাঙ্গাইল শহরের পশ্চিম পাশে অবস্থিত কাইয়ামারার নিঃসন্তান মোয়াজ্জেম হোসেন ফারুক ভাই। তিনি তার স্ত্রী নাহারের নামে এই ক্লিনিক করেন পৈত্রিক সুত্রে পাওয়া জমির উপর তিন তলা বিল্ডিং-এ। পাশেই আগে থেকেই পুরাতন আধাপাঁকা একটা ঘর ছিল তাদের । সেই বাড়িটা চিকিৎসকের থাকার কাজে ব্যবহার হতো । আমি ফ্যামিলি নিয়ে সেই বাসায় থাকতাম। বাসা ভাড়া দিতে হতো না। সর্ব সাকুল্যে মাসিক বেতন ছিল আমার ১,৮৫০ টাকা। ১৯৮৮ সনের জুলাই মাসে সরকারি চাকুরি হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি এক বছর এই ক্লিনিকে চাকরি করেছিলাম। আমার কর্তব্যনিষ্ঠা ও দক্ষতায় মুদ্ধ হয়ে ফারুক ভাই ছয় মাসের মাথায়ই আমাকে ক্লিনিকের মেডিকেল ডাইরেক্টর বানিয়ে দেন। তিনি ছিলেন জীবন বীমা কোম্পানির ম্যানেজার। অফিস ছিল ঢাকায়। থাকতেন ঢাকায়। প্রতিদিন তিনি আমাকে ফোন করে ক্লিনিকের খোঁজ খবর নিতেন। প্রথম দিকে ক্লিনিকে লোকশান হতো। আমি লোকশান কাটিয়ে লাভের মুখ দেখিয়েছিলাম। লাভের টাকা তার হাতে তুলে দিলে তিনি টাকা ফেরৎ দিয়ে বললেন “আমার ক্লিনিক থেকে লাভ নেয়ার দরকার নেই। লাভের টাকা দিয়ে ক্লিনিকের উন্নয়ন করতে পারলেই হবে।” আমি সেই টাকা দিয়ে ক্লিনিকের রিপেয়ারিং-এর কাজ করিয়েছিলাম। তিনি খুব খুশী ছিলেন আমার প্রতি। আমার সরকারি চাকরি হলে তিনি আমাকে দ্বিগুণ বেতন অফার করেছিলেন রেখে দেয়ার জন্য। আমি সেই অফার গ্রহণ করিনি।

ফারুখ ভাইর  ছোট ভাই খোকা ভাই ও তার শ্যালক দীপু ভাই ছিলেন প্রথম দিকে ক্লিনিক পরিচালনার দায়িত্বে। কর্মচারীদের বেশীরভাগই ছিল ফারুক ভাইর  প্রতিবেশী ও আত্বীয়। সামসু ও ফজলু ছিল ওয়ার্ডবয় কাম পাহারাদার। এলেঙ্গার মোতালেবকে আমি নিয়োগ দিয়েছিলাম পরে। আমীর হামজা ছিলেন রিসেপসনিষ্ট। এলেঙ্গার মজিদকে ম্যানেজার পদে আমি রিক্রুট করেছিলাম। সূর্যবানু, হ্যাপির মা (নূরজাহান) ও সাহিদা ছিল আয়া। এই তিনজনই ছিলো স্বামী-হারা অসহায় মহিলা। তাই তারা ফারুক ভাইর প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল। হ্যাপির মার হ্যাপিকে অল্প বয়সেই বিয়ে দেয়া হয়। তাকে আমি দেখিনি। হ্যাপির পরই এক ভাই ছিলো। তাকে নিয়ে হ্যাপির মার খুব অশান্তি ছিলো। হ্যাপির আরেকটা ভাই ছিলো ছোট ছয়-সাত বছর বয়সের। হ্যাপির মা সন্তান নিয়ে ক্লিনিকে আসতোনা। সাহিদার কোন সন্তান ছিল না। সূর্যবানুর স্বামী মারা গিয়েছিল। একমাত্র সন্তান ছিল তার ছেলে আল-আমীন। সবাই ডাকতো আলামিন। সূর্যবানু ছেলে আলামিনের কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাকী জীবন বিয়ে করবে না। সূর্যবানু কাজে কর্মে ও রোগীদের প্রতি দরদী ছিলো। আমাদের বাসায় যেতো। আমার স্ত্রী তাকে পছন্দ করতো। আমার স্ত্রীর কাছে সে ছিলো ভালো মানুষ। আমার স্ত্রী ভালো মানুষ চিনতে সাধারণত ভুল করে না। সময় সময় আমার স্ত্রীকে সূর্যবানুর সাথে গল্প করতে দেখেছি।

আলামিনের বয়স ছয় কি সাত বছর ছিলো। চেহারায় মায়া মায়া ভাব ছিলো। আদর করতে ইচ্ছে হতো। কিন্তু প্রকাশ্যে আদর করতাম না। কারন, আমি জানি, শিশুরা আদর করলে মাথায় উঠে। হয়তো দেখা যাবে স্টেথোস্কোপটা আমার গলায় থেকে খুলে নিয়ে তার কানে ঢুকাবে। অথবা আমার অনুপস্থিতিতে আমার চেয়ারে বসে দোল খাবে। অথবা মুল্যবান যন্ত্রপাতি নিয়ে খেলা করবে। অথবা মিষ্টি ঔষধ নিজের মনে করে খেয়ে ফেলবে।  ফারুক ভাইর সামনে আলামিন পড়লে সূর্যবানুকে ধমক দিয়ে বলতেন “এই সূর্যবানু, আমি কতবার বলেছি না, যে বাচ্চা নিয়ে ডিউটিটে আসবি না।” সূর্যবানু মাথা নিচু করে থাকতো। ফারুক ভাই আমার দিকে চেয়ে বলতেন “ডাক্তার সাব, আপনি মানা করেন নাই সূর্যবানুকে বাচ্চা না নিয়ে আসতে?” আমি সূর্যবানুর দিকে চেয়ে চোখ রাঙ্গিয়ে বলতাম “এই সূর্যবানু, আমি কতবার বলেছি তুমি আলামিনকে নিয়ে ডিউটিতে আসবা না। তুমি আমার কথাই শুনছো না।” সূর্যবানু মনে মনে বলতো “আপনি অমন নিষ্ঠুর হতেই পারেন না। বলবেন কি করে?” আসলে বাবা-হারা মাসুম আলামিন কি মাকে ছেড়ে একা বাড়িতে থাকতে পারে? তাই, আমি কোন দিন সূর্যবানুকে মানা করিনি। আলামিন সব সময় মায়ের কাছাকাছি থাকতো। কোন জিনিসে হাত দিত না। কোন জিনিস নষ্ট করতো না। কেউ কেউ তাকে দিয়ে ফুট ফরমায়েস করাতো। আমি করাতাম না। কারন, চাকরি করতো তার মা, সে তো না।

আলামিনের একটা মাত্র শার্ট ছিলো। হাল্কা আকাশী রঙের হাফ হাতা হাওই শার্ট। সে বেশী সময়ই ঠিক ঘরে বোতাম লাগাতে পারতো না। এক ঘরের বোতাম আরেক ঘর পর লাগাতো। তাতে শার্টের নিচের দিকে একপার্ট নিচু আরেক পার্ট উচু থাকতো। আমি বলতাম “আলামিনের শার্ট নিচের দিকে সমান না। ক্যাঁচি দিয়ে কেটে সমান করে নিও।” আলামিন বুঝতে পেড়ে সুন্দর দাঁত বের করে মুচকি হাসতো।

আলামিনকে দিয়ে বেশী ফরমাইস করাতো আজিজ ভাই। আজিজ ভাই ছিলেন প্যাথলজি ল্যাবের টেকনোলজিস্ট। ক্লিনিকের নিচ তলায় ল্যাবরেটরি ছিলো। আলামিন এই ল্যাবে যাতায়াত করতো। একদিন দেখা গেলো ল্যাবের মূল্যবান একটি কাঁচের যন্ত্র ভেঙ্গে মেঝেতে পড়ে আছে। আজিজ ভাই জোড়ে সোড়ে বলছিলেন “আমার দামী নিউবার কাউন্টিং চেম্বারটা ভাংলো কে?” সারা ক্লিনিক জুড়ে তোলপাড় করতে লাগলেন। প্রফেশনাল ঝাড়ুদারের প্রতিই সবার সন্দেহ। কিন্তু সে ভগবানের নামে কসম খেয়ে বলছিলো যে সে ভাংগেনি। একদিন পর্যন্ত সন্দেহের দৃষ্টি ঝাড়ুদারের উপরই ছিল। ঝাড়ুদার বলছিলো “বাবু, হামি গারীব হোতে পারি, হামি মিছা কথা কইতে পারিনেক।” আমি আজিজ ভাইকে মানা করে দিলাম ঝাড়ুদারে প্রতি সন্দেহ না করতে। এবার আজিজ ভাইর সন্দেহ পড়লো আলামিনের প্রতি “আলামিনই ভাংছে। এই জন্যই বাচ্চা নিয়ে হাসপাতালে ডিউটিতে আসা ঠিক না।” আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। এবার ফারুক ভাই শুনলে আলামিনকেসহ সূর্যবানুকে তাড়াবে। আজিজ ভাই ল্যাবে এসেই ক্যাঁচ ক্যাঁচ করতে থাকেন “নিউবার কাউন্টিং চেম্বার ছাড়া আমি রক্ত পরীক্ষা করব কিভাবে? আমি যেনো কালকে থেকে আলামিনকে না দেখি।” আলামিনকে নানা ভাবে জিজ্ঞেস করে বের করার চেষ্টা করা হলো। কিন্তু না সে ভাংগেনি। সেও খুব চিন্তিত ছিল যে এবার থেকে সে তার মায়ের সাথে আসতে পারবে না। সূর্যবানুও চিন্তিত ছিলো। আমি লাঞ্চ করতে বাসায় এসেছিলাম। বাসা আর ক্লিনিক পাশাপাশি ছিল। আজিজ ভাই বারান্দায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন “কেউ স্বীকার করছে না যে সে ভেংগেছে। তাইলে ভাংলো কে? তাইলে কি ভূমিকম্প হয়েছিলো?” আমি জানালা দিয়ে চিৎকার করে উত্তর দিলাম “হ্যা, হ্যা, দুই দিন আগে রাতে ভূমিকম্প হয়েছিলো। সারাদেশ কেঁপে উঠেছিলো। চিটাগাং দুইটা ভবন ধ্বসে গেছে ভূমিকম্পে। আপনার টেবিলে ঝাকুনি খেয়ে কাউন্টিং চেম্বার পড়ে গিয়ে ভেংগে গেছে।” সবাই শুনে দৌড়িয়ে এলো আজিজ ভাইর কাছে। বলাবলি হাসা হাসি হচ্ছিলো। ঝাড়ুদার ও আলামিন অভিযোগ থেকে রক্ষা পেলো। খুশীতে আমি একটু বেশীই খেলাম।

একবার কোন একটা কারনে আমি এবং ফারুক ভাই মিলে একটা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেই। কিন্তু সূর্যবানু বুঝতে না পেড়ে সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে। তাতে ক্লিনিকে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে থাকে। আমি সূর্যবানুর উপর ক্ষেপে গিয়ে উচ্চস্বরে ধমকাতে থাকি। সূর্যবানু নিরবে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলে। আলামিন সাথেই ছিলো। সে তার মায়ের মুখের দিকে চেয়ে ফোঁফাতে থাকে। হটাৎ আমার দিকে আঙুল নির্দেশ করে সিনেমার নায়কের স্টাইলে বলতে থাকে “এই আমার মায়েরে কিছু কবিনা।” শুনে আমি হতভম্ব হয়ে যাই। বুঝতে পারি সন্তানের সামনে মাকে অপমান করা ঠিক হয়নি। শুধু বললাম “যাও।” আলামিন মাকে টেনে নিতে নিতে বললো “নও, মা, এনে চাকরি করবা না।” সূর্যবানুর বিদ্রোহের কথা ফারুক ভাইর কানে গেলে ফারুক ভাই নির্দেশ দিলেন সূর্যবানুকে বরখাস্ত করতে। সবাই সূর্যবানুকে পরামর্শ দিলো তোমার চাকরি থাকতে পারে যদি আমি তাকে ক্ষমা করে দেই। আমারও ইচ্ছা ছিলো তাকে রাখবো। আমি বাসায় ছিলাম বিশ্রামে। সুর্যবানু বাসায় এসে অনেকক্ষণ অনুনয় করে ক্ষমা চাইলেন। আমি কোন কথা বললাম না। আমার স্ত্রী সূর্যবানুকে বললো “যাও, কাজ করোগে। তোমার স্যার তোমাকে মাফ করে দিয়েছে।” সূর্যবানু বুঝতে পারলো যে আপার কথাই স্যারের কথা। পরদিন সব কিছু সাভাবিক নিয়মে চললো। আলামিনকে আশ্বস্ত করার জন্য তার মাথায় হাত বুলালাম। বললাম “তোমার শার্টের উচু নিচু অংশটা ক্যাঁচি দিয়ে কেটে সমান করে নাও।” আলামিন মুচকি হাসলো।

এবার রোজা হবে গ্রীষ্মককালে। ৩০ বছর আগে সেবারও রোজা হয়েছিল গ্রীষ্মকালে। প্রচুর আম ধরেছিলো ক্লিনিকের দক্ষিণ-পূর্ব কোণার আম গাছে। কঁচি কঁচি আম। ঝোকা ঝোকা ঝুলছিলো। ছাদে উঠলে হাতের কাছেই ছিলো। পেড়ে খেতে ইচ্ছে হতো। কিন্তু গাছটা ক্লিনিকের বাইরের সীমানায় ছিলো। তাই, এই আম আমাদের ছিড়তে মানা। আমি ইফতার করার জন্য বাসায় গিয়েছিলাম। সবাই যার যার মতো করে ইফতার করছিলো। সূর্যবানুও দক্ষিণ পাসের দোতলা এক রুমে ইফতার করছিলো। আলামিন ছোট মানুষ। তাই রোজা রাখেনি। আলামিন মায়ের সাথে ছিলোনা। আমি মাত্র আজান দেয়ার সাথে ইফতার মুখে দিয়েছিলাম। ধরাম করে একটা শব্দ হলো ক্লিনিকের দিক থেকে। ‘আলামিন’ বলে সূর্যবানু চিৎকার করে থেমে গেলো। আমি ইফতার রেখে দৌড়িয়ে গেলাম ক্লিনিকের পূর্ব পাশে। দেখি আলামিন উপুর হয়ে পড়ে আছে চার হাত পা ছড়িয়ে কংক্রিটের রাস্তার উপর নিস্তেজ হয়ে। মুষ্ঠিতে আমের ডাল সহ আম। বুঝতে দেরী হলো না যে সবাই যখন ইফতারে ব্যস্ত আলামিন সেই সুযোগে ছাদে গিয়েছিলো আম চুরি করে ছিড়তে। আমের ঝোকা ধরে টান দিলে আমের ডালেও তাকে  বিপরীত দিকে টান দিয়েছিলো। আমের ডাল ছিড়ে আলামিনও পড়ে গিয়েছিল তিন তলা বিল্ডিং-এর ছাদ থেকে। অর্থাৎ চার তলা থেকে। চার তলা থেকে সিমেন্ট-এর পাকা রাস্তায় পড়ে কেউ কি বাঁচার কথা? আলামিনের পালস ও রেস্পাইরেশন পেলাম না। দু’হাত দিয়ে কোলে করে নিয়ে গেলাম দোতলার অপারেশন থিয়েটারে। ওটি টেবিলে শুইয়ে কৃত্তিম শ্বাস প্রশ্বাস দিলাম।  বুকে হার্টের উপর মাসাজ দিলাম। পালস ফিরে এলো। শ্বাস ফিরে এলো আলামিনের। অক্সিজেন চালু করে দিলাম আলামিনের নাকে। আসার সময় দেখেছিলাম সূর্যবানু বারান্দায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। শব্দ শুনে জানালা দিয়ে আলামিনকে পড়ে থাকতে দেখে সূর্যবানু এক চিৎকারে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকে দোতলার বারান্দায়। তাকেও ওটিতে এনে চিকিৎসা দেয়া হলো। অনেক্ষণ পর মা-ছেলের জ্ঞান ফিরে এলো। সারারাত পর্যবেক্ষণে রাখলাম। পরীক্ষা করলাম। বুকের এক্স-রে করা হলো। আল্লাহ্‌র রহমতে কোথাও কোন হাড় ভাংগা পাওয়া গেলো না। উভয়েই সুস্থ হয়ে উঠলো। মহল্লাবাসী ও সাংবাদিকরা যেন না জানতে পারে সে জন্য সবাইকে সতর্ক করে দেয়া হলো। সাংবাদিকরা যদি জানতে পাড়তো তাহলে হয়তো খবর বের হতো “৪ তলা থেকে পড়ে গিয়েও অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছে আলামিন নামে এক ছেলে।” শোকজ খেত ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ ।

কিছুদিন পর থেকে দেখলাম আলামিন তার মায়ের সাথে আসছে না। আলামিনের কী হয়েছে জিজ্ঞেস করলে সূর্যবানু জানালো যে তাকে খোকা ভাইর ভাইয়ের ফাস্ট ফুডের দোকানে নিয়ে গেছে।
– ওখানে কি তাকে চাকরি করতে দিলে?
– না। এতো ছোট ছেলে, চাকরি করবে কেন? তাকে নাকি খোকা ভাইর ভাইয়ের মতো মনে হয় তাই তারা নিয়ে নিয়েছে। কাজ শিখুক। বড় হয়ে তো কাজ করেই খেতে হবে।

যে ছেলে সব সময় মায়ের সাথে থাকতো সে ছেলে এখন ফাস্টফুডের দোকানে ফুট ফরমায়েশ করবে। শুনে আমার কিঞ্চিৎ খারাপ লাগলো।

একদিন পুরান বাস স্ট্যান্ড-এ একটা ফাস্ট ফুডের দোকানে গেলাম কিছু কিনতে। দেখি একটা টুলে আনমনে বসে আছে আলামিন। শরীরটা শুকিয়ে গেছে। সেই জামাটি গায়। কিন্তু সোজা করে বোতাম লাগানো আছে। সেলসম্যান ধমক দিয়ে আলামিনকে বললো “এই ছেরা, ঝিম ধরে বসে আছস ক্যান, পানি দে।” আলামিন বিনম্র ভাবে উঠে গিয়ে কাস্টমারকে পানি দিলো। ঘুরে আমাকে দেখে একটা কাষ্ঠ হাসি দিলো। আমার অন্তরে কোথায় যেনো ব্যাথা অনুভূত হলো।

তারও কিছুদিন পর দেখি ভিক্টোরিয়া রোডে হ্যাপির মার ছোট ছেলে ও আলামিন রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ফেরী করে চা বিক্রি করছে। একটা বড় ফ্লাস্কে রেডিমেড চা নিয়ে কাপে ভরে বিক্রি করছে। হ্যাপির মার ছেলের হাতে ফ্লাস্ক আর আলামিনের হাতে জগ, কাপ, গ্লাস ও টোস্ট বিস্কুট। আমাকে দেখে ইশারা দিয়ে সালাম দিয়ে দুইজনই মিটি মিটি হাসছিলো। আমিও মিটিমিটি হাসছিলাম।
– তোমরা কি করছো?
– আমরা ঘুরে ঘুরে চা বিক্রি করি। মায় টাকা দিছে দোকান করতে। ভালোই লাভ হয়। আমরা দুইজনে ভাগে দোকান করি।
(বুঝলাম তারা স্বাধীন ব্যবসা উপভোগ করছে)
– তোমরা পড়তে যাওনা?
– না। পইড়া কি হইব? স্যার, চা খাইন।
– না। চা খাব না।
– খাইন স্যার, একটা।
তারা দুইজনই আমাকে খুব করে ধরলো চা খেতে। আমি এক কাপ চা খেয়ে বললাম
– খুব ভালো হয়েছে।
– আরেক কাপ দেই, স্যার?
– আরে, না।
তারা দুইজনই খুব খুশী আমাকে চা খাওয়াতে পেরে। আমি পকেটে হাত দিতেই সমস্বরে দুইজন বলে উঠলো “দাম লাগবে না, স্যার। এমনি দিয়েছি।”

আমি কিছুতেই দাম দিতে পারছিলাম না। পরে বললাম যে এটা চায়ের দাম না এটা এমনি দিলাম তোমাদেরকে কিছু খাওয়ার জন্য। কত দিয়েছিলাম তা মনে নেই। তবে তখন আমার পকেটে বেশী টাকা থাকতো না। সারামাসের বেতন ছিলো মাত্র ১,৮৫০ টাকা।
তবে এটাই মনে হয় আলামিনের সাথে আমার শেষ দেখা। সেদিন তার গায়ে সেই শার্ট ছিল অসমানে লাগানো বোতাম। হাফ হাতা হাল্কা আকাশী হাওই শার্ট।

সূর্যবানু আমার মেয়েকে কোলে নিয়ে বেড়াতো। কোন সময় ধাওয়া কান্না শুরু করলে সূর্যবানু এসে কোলে নিতো। তার কোলে সে চুপ হয়ে যেতো। ছোট্ট মেয়েটাকে সে বুড়ি বলে ডাকতো। বেজার হয়ে থাকলে নানান ভঙ্গী করে হাসাতে চেষ্টা করতো। সরকারি চাকরি নিয়ে চলে আসার পর আমার স্ত্রী সুর্যবানুকে নিয়ে কথা বলতো। “আবার টাঙ্গাইল গেলে সূর্যবানুকে দেখে আসব” বলে মন্তব্যও করেছে অনেকবার। মাঝে মাঝে আমরা নাহার নার্সিং হোমে বেড়াতে গিয়ে সূর্যবানুকে দেখে আসতাম। সব সময়ই সুর্যবানু আমার মেয়েরা কেমন আছে কি করছে খোঁজ নিতো। আমি কখনো আলামিনের খোঁজ নেইনি। বহু বছর হয়ে গেছে সূর্যবানুর খোঁজ নেইনি। বেঁচে আছে কিনা তাও জানিনা। বেঁচে থাকলেও বয়সের ভারে তার শরীর ভেংগে যাওয়ার কথা। আলামিনের বয়স তো এখন ৩৬ সের উপরে হবে। সেকি তার মাকে কামাই করে খাওয়াচ্ছে? যে ছেলের জন্য তার জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছে। যদি কোনদিন আলামিনের সাথে দেখা হয় তবে নিশ্চয়ই আমি আগের আলামিনকে পাবো না। পাবো কি সেই মাসুম শিশু, হাল্কা আকাশী রংগের হাফ হাতা হাওই শার্ট গায়ে অসমান বোতাম লাগানো, যেমনটি দেখেছিলাম শেষবারে ভিক্টোরিয়া রোডে আলামিনকে, সূর্যবানুর ছেলেটিকে!

২৪/২/২০১৯ খ্রি.
ময়মনসিংহ- কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ জার্নি #গল্প #স্মৃতিকথা #সাদেকুল

riksaoala-chauler-dor-janena

Riksaoala Chauler dor Janena

রিক্সাওয়ালায় চাউলের দর জানেন না

(জীবনের গল্প)

ডা; সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

রাত ৯ টার পর চেম্বার থেকে বের হলাম। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিলো। রিক্সা খুচ্ছিলাম। খুব কম রিক্সা ছিলো। কেউ যেতে রাজি হলেন না। চিন্তা করলাম এর পর যাকে খালি পাবো তাকে এভাবে প্রস্তাব দেবো “ভাই, মাসকান্দা নুতুন বাজার ৫০ টাকা, যাবেন?” চেম্বার থেকে ওখানকার ভাড়া হলো ২০ টাকা। কিন্তু ২-৩ জনকে ৫০ টাকা প্রস্তাব দিয়েও রাজি করাতে পারলাম না।

এবার একজন খালি পেলাম। বললাম

– ভাই, মাসকান্দা নতুন বাজার যাবেন?

– যাবো, ভাড়া ৩০ টাকা।

– চলুন।

বাসার সামনে নেমে তার হাতে ৫০ টাকা দিয়ে বললাম

– আমি আজকের ভাড়া ৫০ টাকা দেয়ার নিয়ত করেছিলাম। আপনি ৫০ টাকাই নেন।

তিনি নিয়ে নিলেন। এই ৫০ টাকায় কতটুকু চাউল কিনতে পারবেন জানার জন্য জিজ্ঞেস করলাম

– চাউলের কেজি কত টাকা করে?

– কইতে পারতাম না।

– কেন, চাউল কিনতে হয় না?

– আমি তো হোটেলে খাই সবসময়। তাই, জানি না।

– আপনার বাড়ি কোথায়?

– গৌরিপুর।

– ডেইলি গৌরিপুর চলে যান?

– না। ময়মনসিংহ শহরেই থাকি।

– বাসা ভাড়া কত দিতে হয়?

– বাসা ভাড়া লাগেনা। রিক্সার গ্যারেজেই থাকি।

– গ্যারেজওয়ালা ভাড়া নেয় না?

– না, রিক্সা তো তারই। রিক্সা চালক গ্যারেজে থাকতে চাইলে থাকতে দেন।

সালাম দিয়ে রিক্সাওয়ালা বিদায় নিলেন। আমি বাসায় প্রবেশ করতে করতে ভাবলাম “সব কর্মজীবী মানুষ এভাবে কষ্ট করে যাচ্ছে তার স্ত্রী, সন্তান ও নিকট আত্মীয়দের সুখে রাখতে।”

লিখনঃ ১৯/৬/২০২২
পুনঃলিখনঃ ১৩/২/২০২৬

#গল্প #জীবনেরগল্প #সাদেকুল

parcel-nirvor-jibon

Parcel Nirvor Jibon

পার্সেল নির্ভর জীবন

(ছোট গল্প)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

সকাল ঠিক আটটায় সে বাসার গেইট বন্ধ করে। তালার শব্দটা গলির ভেতর একটু বেশিই জোরে শোনা যায়। গলিটা তখনও পুরো জেগে ওঠেনি। একতলা বাসার দেয়ালের সঙ্গে লাগানো ছোট কাঠের বাক্সটার দিকে একবার তাকায় সে। উপরে লেখা—

“Keep Parcel Here”

আজ সেখানে কিছু নেই। কাল রাতে ডিনারের পার্সেলটা নিজেই তুলে নিয়েছে।

সে ত্রিশ বছরের একজন ডাক্তার। অবিবাহিত। এই শব্দটা নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই, গর্বও নেই।

হাসপাতালে গিয়ে সারাদিন রোগী দেখে। কারও বুক ধড়ফড় করে, কারও শ্বাস আটকে আসে, কারও জীবনে অকারণ ভয়। সে মন দিয়ে শোনে, পরীক্ষা করে, প্রেসক্রিপশন লেখে। মানুষের জীবন ঠিক করার কাজে সে ক্লান্ত হয়, কিন্তু বিরক্ত হয় না।

বিরক্ত হয় অন্য জিনিসে।

বাজার করা—ঝামেলা।

কী রান্না হবে ভাবা—ঝামেলা।

রান্না করা—সবচেয়ে বড় ঝামেলা।

হোটেলে গিয়ে খাওয়া—লাইন, শব্দ, মানুষ, অপ্রয়োজনীয় কথা।

ডাইনিং—আরও বেশি ঝামেলা।

তার কাছে খাওয়া মানে শুধু খাওয়া।

ক্ষুধা → খাবার → শেষ।

দুপুরে হাসপাতালের ক্যান্টিন, রাতে পার্সেল।

মাঝে মাঝে একটাই অ্যাপ, আগের অর্ডার হিস্ট্রি থেকে “Repeat Order”।

নতুন কিছু ট্রাই করার মতো মানসিক জায়গা তার নেই।

বিকেলে প্রাইভেট চেম্বার। সেখানে সে আরও শান্ত। মানুষ টাকা দিয়ে আসে, কথা শোনে, বিশ্বাস করে। বিশ্বাস—এই শব্দটা সে শুধু রোগীদের চোখে খোঁজে, নিজের জীবনে নয়।

রাত হলে বাসায় ফিরে। গেইট খুলে ঢোকার আগেই চোখ যায় দেয়ালের দিকে। আজ পার্সেল এসেছে। বাদামি প্যাকেট, নাম লেখা নেই—শুধু তার মোবাইল নম্বর।

সে প্যাকেট তুলে নেয়। মনে পড়ে না কবে শেষবার কেউ তার জন্য কিছু হাতে তুলে দিয়েছে।

খেয়ে নেয়। টেবিলে বসে নয়, বিছানায় শুয়ে।

তারপর মোবাইল।

মেডিকেল আর্টিকেল, শর্ট ভিডিও, সিরিজের আধা-আধা দেখা এপিসোড।

সবই চলতে থাকে আঙুলের একটুখানি নড়াচড়ায়।

বিয়ে?

সে বিষয়টা নিয়ে কখনো গভীরভাবে ভাবেনি।

তার কাছে স্ত্রী মানে অতিরিক্ত সমন্বয়, অতিরিক্ত ব্যাখ্যা, অতিরিক্ত দায়িত্ব।

কারও অপেক্ষা করা, কারও জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া—এসব তার দৈনন্দিন তালিকায় নেই।

তার জীবন খুব পরিষ্কার।

খাওয়া আছে।

কাজ আছে।

ঘুম আছে।

আর আছে পার্সেল।

মাঝে মাঝে রাতে শুয়ে থাকতে থাকতে ভাবে—

যদি কোনোদিন এই “Keep Parcel Here” লেখাটা মুছে যায়,

যদি একদিন পার্সেল না আসে,

তাহলে কি তার জীবনে সত্যিই কিছু বদলাবে?

এই প্রশ্নটার উত্তর সে খোঁজে না।

মোবাইল স্ক্রিনটা আবার জ্বলে ওঠে।

ভিডিও শুরু হয়।

আর তার জীবন, ঠিক পার্সেলের মতোই,

নীরবে দরজার পাশে পড়ে থাকে—

খোলা হবে কি না, সেটা কেউ জানে না।

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

#গল্প #ছোটগল্প #সাদেকুল

Get ISNN

To Obtain an ISNN for a Medical Journal in Bangladesh

To obtain an ISSN (International Standard Serial Number) for a medical journal in Bangladesh, you must apply through the national ISSN center of Bangladesh.

Bangladesh’s official ISSN authority is:

👉 Bangladesh National Scientific and Technical Documentation Centre (BANSDOC)
(Under the Ministry of Science and Technology)

They work in coordination with the ISSN International Centre (Paris).


✅ Eligibility Requirements

Before applying, your medical journal should have:

  • A fixed journal title
  • A defined scope (medical/health sciences)
  • An editorial board
  • A publisher (institution or organization)
  • At least one published issue (preferred)
  • A journal website (for online journals)

📝 Documents Needed

Prepare the following:

For Print Journal

  • Cover page (PDF/JPEG)
  • Title page
  • Editorial board page
  • Table of contents
  • Publisher information
  • First issue sample (soft copy)

For Online Journal

  • Journal website URL
  • Homepage screenshot
  • About Journal page
  • Editorial board page
  • Latest issue link
  • Contact page

🌐 Application Process (Bangladesh)

Step 1: Visit BANSDOC Website

Go to BANSDOC official site:
👉 https://www.bansdoc.gov.bd


Step 2: Download ISSN Application Form

Look for ISSN Application Form under services/downloads section.


Step 3: Fill the Form

You must provide:

  • Journal title
  • Format (Print / Online / Both)
  • Publisher name
  • Address
  • Frequency (Monthly/Quarterly/etc.)
  • Language
  • Subject area (Medical/Health Sciences)
  • Editor-in-chief details

Step 4: Submit Application

You can submit:

✔ By Email (scanned form + documents)
✔ By Physical Submission (office visit or courier)

BANSDOC Address (Main Office):

BANSDOC  
Ministry of Science and Technology  
Dhaka, Bangladesh

⏳ Processing Time

Typical timeline:

  • 15–30 working days
  • May take longer if documents are incomplete

💰 ISSN Fee in Bangladesh

Currently:

  • ISSN is FREE (No government fee)
  • Courier or printing costs may apply

📌 Important Notes for Medical Journals

  • ISSN does NOT mean indexing or impact factor
  • ISSN is mandatory for:
    • Journal recognition
    • DOAJ application
    • University acceptance
    • PubMed/Scopus application later
  • Separate ISSN needed for:
    • Print version
    • Online version

⚠ Common Reasons for Rejection

  • Fake or incomplete website
  • No published issue
  • Missing editorial board
  • Duplicate journal title
  • Poor journal structure

✅ Pro Tip for Medical Journals

If you plan international indexing later:

  • Use English title + abstract
  • Add publication ethics policy
  • Use DOI system (Crossref later)
  • Follow ICMJE guidelines

If you want, I can help you with:

✔ BANSDOC ISSN application form filling
✔ Required document checklist (PDF format)
✔ Journal website structure
✔ Medical journal naming rules
✔ Online vs Print ISSN difference

Just tell me 👍

Dr. Sadequel Islam Talukder

sadequel@yahoo.com

BMDC Recognition

How to Get BMDC Recognition of Your Journal

To get BMDC registration / recognition for your medical journal, you must apply for official approval as a recognized medical journal from the Bangladesh Medical and Dental Council. BMDC does not issue a “registration number” like doctor registration, but they grant formal recognition/approval that allows your journal to be used for academic promotion and professional evaluation.

Below is the complete official process:


✅ Step-by-Step Process to Get BMDC Recognition for Your Medical Journal


🔹 Step 1: Fulfill Minimum Journal Requirements

Before applying, your journal must meet BMDC academic standards:

📌 Mandatory Criteria (Commonly Required)

✔ Valid ISSN number (Print or Online)
✔ Regular publication schedule (Quarterly / Biannual / Annual)
✔ Peer-reviewed process
✔ Editorial board with BMDC-registered doctors
✔ Clear author guidelines
✔ Ethical policy (plagiarism, conflict of interest)
✔ Indexed or abstracted (preferred but not always mandatory)
✔ Proper website (for online journals)


🔹 Step 2: Collect Required Documents

Prepare the following:

📂 Journal Documents

  • ISSN certificate
  • Latest 2–3 published issues (hard copy + PDF)
  • Journal aim & scope
  • Peer review policy
  • Editorial board list with BMDC numbers
  • Publication frequency declaration
  • Publisher information

📂 Application Documents

  • Application letter addressed to BMDC
  • Cover letter from Editor-in-Chief
  • Office address & contact details
  • Website URL (if online journal)

🔹 Step 3: Write Formal Application to BMDC

Your application should include:

  • Journal name
  • ISSN number
  • Start year
  • Publication frequency
  • Purpose of recognition
  • Request for academic approval

📌 Example subject line:

Application for Recognition of Medical Journal by BMDC


🔹 Step 4: Submit Application to BMDC Office

Submit physically to:

🏢 Bangladesh Medical and Dental Council Office

Academic & Registration Section
Dhaka, Bangladesh

(Some applications may also accept email copies — physical submission is safer)


🔹 Step 5: BMDC Review Process

BMDC will evaluate:

✔ Journal quality
✔ Editorial standards
✔ Peer review authenticity
✔ Ethical compliance
✔ Publication regularity

They may:

  • Ask for clarification
  • Request sample copies
  • Suggest improvements

🔹 Step 6: Receive Recognition Letter

If approved, BMDC will issue:

✅ Official recognition letter
✅ Journal included in BMDC Approved Journal List
✅ Validity period (usually renewable)

This acts as your official BMDC recognition proof.


⚠ Important Points

❌ BMDC does NOT give online instant approval
❌ No “journal ID card” or unique number system
✔ Recognition is based on official listing and circular reference


✅ Tips to Increase Approval Chances

✔ Use plagiarism checker (Turnitin standard)
✔ Maintain DOI system
✔ Follow ICMJE guidelines
✔ International editorial advisors help
✔ Publish consistently (no gaps)


📌 Common Reasons for Rejection

🚫 Fake peer review
🚫 Irregular publication
🚫 Weak editorial board
🚫 No ethical policy
🚫 Poor article quality


If you want, I can help you with:

  • Application letter format
  • Required document checklist (PDF format)
  • Editorial board structure
  • Journal website content template
  • ISSN application guidance
  • BMDC compliance checklist

Just tell me:

1️⃣ Journal name
2️⃣ Print / Online / Both
3️⃣ Already have ISSN?
4️⃣ Publication frequency
5️⃣ Year started

I’ll guide you step-by-step 👍

Dr. Sadequel Islam Talukder

sadequel@talukderbd