গতরাতে তছির উদ্দিনের ঘুম হয়নি। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে এসেছে আনন্দ করতে, কিন্তু মনে তার আনন্দ নেই। সে সবসময় ভাবছে কক্সবাজার আসার সময় কমলাপুর রেল স্টেশনে দেখা পাগলটা কি সেই বাবুর্চি? যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে বাবুর্চির এই দুরাবস্থার জন্য তছিরই দায়ি। বাবুর্চির বাঁশ ডলা খাওয়া ও হারিয়ে যাওয়ার জন্য তছিরই দায়ি – এই অনুশোচনায় ভোগছে।
তছির উদ্দিন ১৯৭৮ সনের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। বোর্ডের ফাইনাল পরীক্ষার বিশেষ প্রস্তুতি নেয়ার জন্য দুইমাস হোস্টেলে ছিল। একটা বড় কক্ষে ২০ জন পরীক্ষার্থী থাকত। আরেকটা ছোট কক্ষে থাকত তছির উদ্দিন ও হানিফ সিকদার। এক জ্যোস্না রাতে হোস্টেলের কাছেই স্থানীয় যুবসংঘ নাটক মঞ্চস্থ করেছিল। হোস্টেল তত্বাবধায়ক শিক্ষকদ্বয় রাতে ঘুমিয়ে পড়লে বড় রুমের ২০ জনই দরজা খোলা রেখে নাটক দেখতে চলে যায়। তছির শোবার আগে একটু বড় রুমে যায়। দেখে রুমের দড়জা খোলা, ভিতরে কেউ নেই। এদিকে স্যারেরা ঘুমিয়ে পড়েছেন। তছিরের মাথায় শয়তানি বুদ্ধি চাপলো। রুম লিডারের বালিশ ও কম্বল তোষক দিয়ে মুড়িয়ে সিলিং-এর উপর লুকিয়ে রেখে নিজের রুমে চলে গেল। ভোরে নাটক দেখা শেষ করে সবাই রুমে ফিরে দেখে রুম লিডারের বালিশ ও বিছানা পত্র চুরি হয়ে গেছে। রুমে কোথাও পাওয়া গেলো না। কেউ সিলিং-এর উপর খোজ করেনি। লিডার বলল, “চুপি চুপি কথা বলো। স্যারদের ঘুম ভাংলে বিপদ হবে। বেলা উঠার আগেই চুরি যাওয়া মাল উদ্ধার করতে হবে। চল, আমরা জগলু ভাইর কাছে যাই। তিনি এই ব্যাপারে আমাদের কাজে আসতে পারেন।
জগলু ভাইকে অনুরোধ করে হোস্টেলে আনা হলো। তিনি ঘটনার বিস্তারিত শুনলেন। জিজ্ঞেস করলেন
– রুম ছেড়ে যখন নাটক দেখতে গেলে তখন এখানে কে ছিলো?
– পাশের ঘরে মেসের বাবুর্চি ছিলো।
– একাজ বাবুর্চিই করেছে। তাকে ডেকে আনো।
বাবুর্চিকে ডেকে আনা হলো। সে চোখ ঘষতে ঘষতে এসে সালাম দিলো। জগলু ভাই জিজ্ঞেস করলেন
– এই বাবুর্চি, ওদের বিছানা পত্র কোথায় রেখেছ?
– স্যার, আমি তো কিছুই জানি না।
– তাড়াতাড়ি বল কোথায় রেখেছিস। নাবললে পেটের মধ্যে পাড়া মারবো।
– স্যার, খোদার কসম, কিছুই জানি না।
স্বীকারোক্তি আদায় করার জন্য বিভিন্ন কৌশল করা শুরু হলো। প্রতিটা হাটুতে শক্ত লাঠি দিয়ে সজোরে আঘাত করা শুরু হলো। কোন মতেই চুরি করার কথা স্বীকার করলো না। প্রতিটি নখের নিচ দিয়ে সূঁচ ঢুকানো শুরু হলো। যন্ত্রণায় শুধু কাতরাচ্ছে। তছির দাড়িয়ে দাড়িয়ে অসহায়ভাবে শুধুই দেখে যাচ্ছে। বলার সাহস পাচ্ছে না যে সেই এই কাজ করেছে। বলে দিলে যদি তছিরের উপরই এরুপ নির্যাতন চলে! বাবুর্চির প্রতিটি আঙ্গুলে সূঁচ ঢুকানো হলো একে একে।
সূঁচ ঢুকানোয় কোন কাজ হলো না। জগলু ভাই বললেন, ” বাঁশ ডলা ছাড়া কাজ হবে না। পাশের ক্ষেতের আইলেই ৬ ফুট লম্বা বাঁশের খুটি ছিল। দু’টা তুলে আনা হলো। একটা বাঁশ বাবুর্চির পিঠের নিচে, আরেকটা বাঁশ পেটের উপর রাখা হলো। এক দিকে জগলু ভাই, আরেক দিকে হোস্টেল লিডার এক যোগে পাড়া দিয়ে প্রচন্ড চাপ দিলো। বাবুর্চি হৃদয়বিদারক একটা চিতকার দিয়ে বললো, “আমি নিছি, স্যার।” জগলু ভাই খুশি হয়ে বললেন,
– এই বার কাজ হয়েছে বাঁশ ডলায়। কোথায় রাখছস?
– বাড়িত নিয়া রাখছি।
– তাড়াতাড়ি নিয়া আয়। নইলে জানে মেরে ফেলবো।
এখান থেকে বাবুর্চির বাড়ি প্রায় আধা কিলোমিটার দক্ষিণে। সে উঠে দাড়িয়ে চোখ মুছতে মুছতে দক্ষিণ দিয়ে চলে গেলো চুরি হওয়া মালামাল ফেরত ফিতে। কিছুদূর গেলে সে আকাশের দিকে দু’হাত প্রসারিত করে আকাশের মালিকের কাছে কি জেন বলে বিচার দিল কেউ তা শুনেনি। তারপর সে গাছ গাছড়ার আড়ালে মিলিয়ে গেলো। সেই যে গেলো আর তাকে ফিরে পেলোনা। আজ ৪৮ বছর হয়ে গেছে বাবুর্চি আর ফিরে আসেনি। তবে কি সে মরে গেছে!
এদিকে বিনা অপরাধে বাবুর্চি মার খেলো তছির উদ্দিনের কারনে। এটা জানাজানি হয়ে গেলে তছিরের খবর আছে। তাই টুকরা কাগজে তছির লিখলো, “বাবুর্চি চুরি করেনি। আমি দুষ্টুমি করে বিছানা সিলিং এর উপর লুকিয়ে রেখেছি। মাইরের ভয়ে প্রকাশ করতে পারছি না।” লিখা কাগজগুলো গোপনে হোস্টেলের দরজার সামনে ছিটিয়ে রাখলো।
দরজা দিয়ে বের হতেই কাগজের লিখা রুম লিডারের চোখে পড়লো। কাগজগুলো কেউ দেখার আগেই টোকিয়ে নিয়ে নষ্ট করে ফেললো। সিলিং এ উকি দিয়ে ঠিকই দেখতে পেলো তার চুরি যাওয়া বিছানা পত্র। রুমের সবাইকে জানিয়ে সতর্ক করে দিলো এগুলো যে বাবুর্চি চুরি করেনি এটা যেন কেউ না জানে। নইলে সবারই খবর আছে। সবাইকে বাঁশ ডলা খেতে হবে।
জীবন অনেক পেরিয়ে গেছে। ৪৮ বছরেও বাবুর্চি ফিরে আসেনি। তছির সারাজীবন অনুশোচনায় ভোগেছে। প্রতি বছর শবে কদরের রাতে বিশেষ ভাবে প্রার্থনা করে গুনাহ মাপের জন্য। ইমাম সাব বয়ান করেন, “আল্লাহ বান্দার সব গুনাহ মাফ করতে পারেন। কিন্তু কেউ যদি আল্লাহর কোন বান্দার প্রতি অন্যায় করে, বান্দায় ক্ষমা না করা পর্যন্ত আল্লাহ তাকে সেই অপরাধের গুণা ক্ষমা করেন না।” এখন মৃত্যুর আগে যদি বাবুর্চির কাছ থেকে ক্ষমা নিতে পারে তছিরের মৃত্যুর পর শেষ বিচারের দিন কিভাবে রক্ষা পাবে, এই ভাবনায় তছিরের ঘুম হয়না। সিদ্ধান্ত নিলেন ফেরার পথে ট্রেন থেকে নেমে প্লাটফর্মে দেখা সেই পাগলটা খোজ করবে। পাগলটা যদি সেই বাশ ডলা খাওয়া বাবুর্চি হয়ে থাকে যে কোন কিছুর বিনিময়ে হলেও ক্ষমা করিয়ে নিবেন।
বিকেল হয়েছে। সবাই বীচের দিকে যাচ্ছে সূর্যাস্ত দেখতে।তছিরের তেমন আগ্রহ নেই সৈকতে যেতে। তার স্ত্রী বুঝতে পারছে সে কোন কিছু নিয়ে চিন্তা করে বিমর্শ আছে। বলে কয়ে তছিরকে নিয়ে সৈকতে গেল। সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন, পর্যটকদের কোলাহল এবং গাং চিলের ডাকে সমুদ্র সৈকতে অন্য রকম এক পরিবেশ সৃষ্টি হলো। ডোবার আগে সুর্যটা একটা লাল বলের মতো দেখা যাচ্ছে। অনেকেউ ওটাকে দু’হাতের মাঝে রেখে ছবি নিচ্ছে, ভিডিও করছে, ফেইসবুকে লাইভ করছে। তছির ডুবন্ত সূর্যাটার দিকে ফেল ফেল করে তাকিয়ে আছে। এক সময় সুর্যটা এমনভাবে কালো মেঘের আড়াল হলো যেন সেই কমলাপুর রেল স্টেশনে দেখা সেই পাগলের মুখ, যাকে দেখে মনে হয়েছে সেই বাশ ডলা খাওয়া বাবুর্চি। দেখতে দেখতে যুর্যটা তলিয়ে গেলো। দূর থেকে মাগরিবের আযানের ধবনি ভেসে এলো “হাইয়ালাল ফালাহ, (কল্লাণের জন্য এসো)।
আজকের ব্যস্ততম ঢাকার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র মতিঝিল। চারদিকে সুউচ্চ ভবন, ব্যাংক-বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অফিস, ব্যস্ত সড়ক, যানবাহন আর মানুষের ছুটে চলা—এটাই আজকের মতিঝিল।
কিন্তু আজ থেকে কয়েকশ বছর আগে এই জায়গার চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ছিল জলাশয়, দিঘি, বাগান আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
মতিঝিল নামটি এলো কীভাবে?
‘মতিঝিল’ শব্দটি দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত—মতি বা মোতি, যার অর্থ মুক্তা, এবং ঝিল, যার অর্থ জলাশয়। অর্থাৎ মতিঝিলের আক্ষরিক অর্থ ‘মুক্তার ঝিল’ বা Pearl Lake।
মতিঝিলের নামকরণ নিয়ে একটি প্রচলিত কাহিনি মুঘল আমলের সঙ্গে যুক্ত।
সে সময় বর্তমান মতিঝিল ও বঙ্গভবন সংলগ্ন এলাকা মুঘল কর্মকর্তা মির্জা মোহাম্মদ মুকিমের মহল হিসেবে পরিচিত ছিল। তাঁর মহলের ভেতরে ছিল একটি বড় দিঘি বা পুকুর।
কথিত আছে, মির্জা মুকিমের কন্যা প্রতিদিন সেই দিঘিতে অলংকার বা গহনা ফেলে দিতেন। অলংকারের মধ্যে মুক্তাও থাকতে পারে—এমন জনশ্রুতির সূত্রেই দিঘিটির নাম হয়ে যায় ‘মতিঝিল’—মুক্তার ঝিল। পরে সেই জলাশয়ের নাম থেকেই আশপাশের এলাকার নাম হয়ে যায় মতিঝিল।
তবে নামটির উৎপত্তি সম্পর্কে এটিই একমাত্র মত নয়। আরেকটি ঐতিহাসিক ব্যাখ্যায় বলা হয়, মতিঝিল নামটি প্রথমে একটি খাল বা জলধারার সঙ্গে যুক্ত ছিল; পরে নামটি একটি পুকুর বা জলাশয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় এবং ধীরে ধীরে পুরো এলাকার নাম হয়ে যায়।
জলাশয় থেকে বাণিজ্যিক রাজধানী
মতিঝিলের ইতিহাস শুধু একটি ঝিলের ইতিহাস নয়। মুঘল আমলের মহল ও জলাশয় থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চল ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বাগান ও প্রশাসনিক এলাকার অংশ হয়ে ওঠে।
একসময় এই বৃহত্তর এলাকায় ছিল দিলকুশা বাগান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা শহর বিস্তৃত হয়েছে, জলাশয় ও বাগানের জায়গা নিয়েছে রাস্তা ও ভবন। আর সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় মতিঝিল পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ব্যবসা ও আর্থিক কেন্দ্রে।
আজকের মতিঝিলে দাঁড়িয়ে হয়তো কল্পনাও করা যায় না—এই ব্যস্ত নগরীর কোথাও একসময় ছিল একটি দিঘি, আর সেই দিঘির নাম ঘিরেই জন্ম নিয়েছিল ‘মতিঝিল’ নামটি।
ইতিহাসের পাতায় তাই মতিঝিল শুধু একটি এলাকার নাম নয়; এটি ঢাকার রূপান্তরের একটি গল্প—ঝিল থেকে নগরী, জলাশয় থেকে বাণিজ্যিক কেন্দ্র।
ইতিহাস আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। শুধু একটু থেমে তাকাতে হয়।
মোগল সম্রাট আকবরের রাজত্বের প্রথম দিকে তাঁর প্রধান রাজধানী ছিল আগ্রা। তবে তাঁর শাসনামলে রাজধানী একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছিল।
সম্রাট আকবর দীর্ঘদিন নিঃসন্তান ছিলেন। পুত্রসন্তানের আশায় তিনি সিক্রিতে বসবাসকারী সুফি সাধক শেখ সেলিম চিশতির কাছে যান এবং তাঁর কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন। শেখ সেলিম চিশতি তাঁকে পুত্রসন্তানের আশীর্বাদের জন্য দোয়া করেন।
এর কিছুদিন পর আকবরের স্ত্রী মরিয়ম-উজ-জামানি, যাঁকে ইতিহাসে সাধারণভাবে জোধা বাই নামে উল্লেখ করা হয়, গর্ভবতী হন। ১৫৬৯ সালের ৩১ আগস্ট সিক্রিতে তাঁর গর্ভে এক পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। তাঁর নাম রাখা হয় নূরউদ্দিন মুহাম্মদ সেলিম। এই সেলিমই পরবর্তীকালে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর নামে পরিচিত হন।
পুত্রসন্তানের জন্মে অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে সম্রাট আকবর সিক্রিতে শেখ সেলিম চিশতির স্মরণে একটি বৃহৎ স্থাপত্য কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেন। পরবর্তীকালে সেখানে নির্মিত হয় বিখ্যাত ফতেহপুর সিক্রি। শেখ সেলিম চিশতির সমাধিও সেখানে অবস্থিত। সমাধিটি পরবর্তীকালে সাদা মার্বেল পাথরে সুসজ্জিত করা হয়।
আকবর ১৫৭১ সালের দিকে ফতেহপুর সিক্রিকে তাঁর সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন এবং প্রায় ১৫৮৫ সাল পর্যন্ত এটি মোগল সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। এখানেই তিনি তাঁর দরবার বসাতেন এবং তাঁর বিখ্যাত নবরত্নদের নিয়ে সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন।
আজও ফতেহপুর সিক্রিতে গেলে সেই ইতিহাসের অনেক নিদর্শন চোখে পড়ে—সম্রাট আকবরের রাজদরবার, প্রাসাদ, মসজিদ এবং শেখ সেলিম চিশতির সমাধি। শত শত বছর পেরিয়ে গেলেও এসব স্থাপনা যেন মোগল সাম্রাজ্যের সেই গৌরবময় সময়ের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সম্রাট আকবরের পুত্র সেলিম যখন যুবরাজ, তখন ফতেহপুর সিক্রিতেই তাঁর সঙ্গে বেড়ে ওঠেন শেখ সেলিম চিশতির নাতি শেখ আলাউদ্দিন চিশতি। দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে ঘনিষ্ঠ বাল্যবন্ধুত্ব । সিংহাসনে আরোহণের পর সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁর সেই বাল্যবন্ধুকে “ইসলাম খান” উপাধি দেন এবং ৫,০০০ মনসব প্রদান করেন। প্রথমে তাঁকে বিহারের সুবাদার নিযুক্ত করা হয়।
১৬০৮ সালে বাংলার সুবাদার জাহাঙ্গীর কুলি খানের মৃত্যুর পর জাহাঙ্গীর ইসলাম খান চিশতীকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন। তখন বাংলা মোগল সাম্রাজ্যের অধীন হলেও পূর্ব বাংলার ভাটি অঞ্চলে বারো ভূঁইয়া, আফগান নেতা ও স্থানীয় জমিদারদের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। বিশেষ করে মুসা খান, ঈসা খানের পুত্র ও ভাটি অঞ্চলের প্রধান নেতা, মোগল কর্তৃত্বের অন্যতম প্রধান প্রতিপক্ষ ছিলেন।
ইসলাম খান ১৬০৮ সালের শেষদিকে রাজমহল থেকে বিশাল মোগল বাহিনী নিয়ে পূর্ব বাংলার দিকে অগ্রসর হন। তাঁর সঙ্গে ছিল অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্য, কামান, হাতি এবং বিপুলসংখ্যক যুদ্ধনৌকা। পথে বিভিন্ন স্থানীয় শক্তিকে বশে এনে তিনি ধীরে ধীরে পূর্ব বাংলার দিকে অগ্রসর হতে থাকেন।
১৬০৯ সালের জুনে তিনি দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে পৌঁছান। বর্ষাকাল শুরু হওয়ায় সেখানে অবস্থান করে তিনি পরবর্তী ভাটি অভিযানের প্রস্তুতি নেন। ১৫ অক্টোবর ১৬০৯ ঘোড়াঘাট ত্যাগ করে তিনি দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অগ্রসর হন। করতোয়া নদীর পথ ধরে শাহজাদপুর অঞ্চলে পৌঁছে তাঁর নৌবাহিনীর সঙ্গে মূল বাহিনীর সমন্বয় ঘটে।
এরপর তাঁর প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ান মুসা খান ও বারো ভূঁইয়ারা। ব্রহ্মপুত্র, ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা নদীঘেরা দুর্গ ও নৌবাহিনী দিয়ে তাঁরা মোগল বাহিনীকে প্রতিরোধ করেন। ইসলাম খান একে একে যাত্রাপুর ও ডাকছড়া দুর্গ দখল করেন। মুসা খানের প্রতিরোধ ভেঙে গেলে ঢাকার পথ খুলে যায়।
অবশেষে ১৬১০ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইসলাম খান চিশতী ঢাকায় প্রবেশ করেন। তিনি রাজমহল থেকে বাংলার রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করেন এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের নাম অনুসারে ঢাকার নাম দেন জাহাঙ্গীরনগর। রাজমহল থেকে শুরু করে ঘোড়াঘাটের দীর্ঘ অবস্থান, ভাটি অঞ্চলের যুদ্ধ এবং নদীপথের প্রতিরোধ পেরিয়ে ঢাকায় পৌঁছাতে তাঁর অভিযানে প্রায় দেড় বছর সময় লেগেছিল।
ইসলাম খান চিশতী ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় তাঁর সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ভাটি বাংলার শক্তিশালী বারো ভূঁইয়া, বিশেষ করে ঈসা খানের পুত্র মুসা খান। নদী-নালা ও দুর্গম জলাভূমিকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা মোগল বাহিনীকে দীর্ঘদিন প্রতিরোধ করেন। ইসলাম খানও সরাসরি যুদ্ধের পাশাপাশি কৌশল ও নৌ-সামরিক শক্তি ব্যবহার করে একের পর এক তাঁদের ঘাঁটি দখল করতে থাকেন।
শেষ পর্যন্ত ১৬১০ সালের দিকে মুসা খান ও অন্যান্য প্রধান ভূঁইয়ারা মোগল সম্রাটের কর্তৃত্ব স্বীকার করে ইসলাম খানের কাছে বশ্যতা স্বীকার করেন। তাঁরা নিজেদের জমিদারি ও সম্পত্তির অধিকার বজায় রেখে মোগল সম্রাটের অধীনস্থ হিসেবে রাজস্ব প্রদান ও প্রয়োজনমতো সামরিক সহযোগিতা করার ব্যবস্থা মেনে নেন। এভাবেই পূর্ব বাংলায় মোগল কর্তৃত্ব ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়।
তবে সব প্রতিরোধ তখনই শেষ হয়ে যায়নি। খাজা উসমান-এর মতো আফগান নেতারা শেষ পর্যন্ত মোগলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে যান। ফলে ইসলাম খানের বাংলা বিজয় ছিল একদিনের ঘটনা নয়; এটি ছিল কয়েক বছর ধরে চলা সামরিক অভিযান, কূটনীতি ও স্থানীয় শক্তিগুলোকে মোগল প্রশাসনের অধীনে আনার একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া।
মোগল আমলে ঢাকায় রাজকীয় হাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনা ছিল। হাতি রাখা, পোষ মানানো ও প্রশিক্ষণের জন্য যে স্থান ব্যবহৃত হতো, সেটিই ক্রমে পিলখানা নামে পরিচিত হয়। ‘পিল’ ফারসি শব্দ, যার অর্থ হাতি; আর ‘খানা’ অর্থ স্থান বা ঘর—অর্থাৎ পিলখানা মানে হাতি রাখার স্থান বা হাতিশালা। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, মোগল ও পরবর্তী ব্রিটিশ আমলেও ঢাকার পিলখানা হাতি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
পিলখানায় থাকা হাতিগুলোকে নিয়মিত গোসল করানো এবং চারণের জন্য আশপাশের জলাভূমি ও ঝিল এলাকায় নিয়ে যাওয়া হতো। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, পিলখানার হাতিগুলোকে যে ঝিলে গোসল করানো হতো, সেই কারণেই ঝিলটি একসময় “হাতির ঝিল” নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
হাতিগুলোর চলাচলের সঙ্গে ঢাকার আরও কয়েকটি স্থানের নাম জড়িয়ে আছে। পিলখানা থেকে হাতিদের নিয়ে যাওয়া হতো বর্তমান এলিফ্যান্ট রোড হয়ে; পথের একটি পারাপারের স্থান পরবর্তীকালে হাতিরপুল নামে পরিচিত হয়। এসব নাম আজও ঢাকার পুরোনো ইতিহাসের সঙ্গে হাতির সেই দিনের সম্পর্কের স্মৃতি বহন করে চলেছে।
আজকের আধুনিক হাতিরঝিল আর সেই পুরোনো জলাভূমি এক নয়—সময়ের সঙ্গে এর চারপাশে নগরায়ণ হয়েছে এবং পরবর্তীকালে হাতিরঝিলকে আধুনিক বিনোদন ও নগর ব্যবস্থাপনা প্রকল্প হিসেবে উন্নত করা হয়েছে। কিন্তু নামটি যেন তার বহু পুরোনো একটি স্মৃতি ধরে রেখেছে—এই জলাভূমির পানিতে একসময় ঢাকার রাজকীয় হাতিরা গোসল করত।
শত শত বছর আগে যে জলাভূমির সঙ্গে ঢাকার রাজকীয় হাতির স্মৃতি জড়িয়ে ছিল, সেই হাতিরঝিল আজ আধুনিক ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ জলাশয় ও নগর বিনোদনকেন্দ্র। সময়ের সঙ্গে এর চেহারা বদলেছে, কিন্তু জলাধার হিসেবে এর গুরুত্ব রয়ে গেছে।
বর্তমান সরকারও ঢাকার জলাশয়, খাল ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে নগর পরিবেশ উন্নয়নের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা বলছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশনের সমস্যা সমাধানে খাল পুনঃখনন, জলাশয় সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন।
হাতিরঝিলকে ঘিরে গুলশান-বনানী-বারিধারা লেকের সঙ্গে জলপথের সংযোগ এবং সমন্বিত উন্নয়নের পরিকল্পনাও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। এর উদ্দেশ্য শুধু সৌন্দর্যবর্ধন নয়; বরং জলাধার সংরক্ষণ, পানি চলাচল, জলাবদ্ধতা কমানো এবং ঢাকার পরিবেশ ও যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা।
একসময় যেখানে রাজকীয় হাতিরা পানিতে নামত, সেই হাতিরঝিল আজ আধুনিক নগরীর অংশ। ভবিষ্যতে যদি এর জলাধার, পরিবেশ ও স্বাভাবিক পানি প্রবাহ রক্ষা করা যায়, তাহলে হাতিরঝিল শুধু অতীতের একটি নাম নয়—ঢাকার ভবিষ্যৎ নগরজীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে।
ওকে পেলাম ৫৫ বছর পর। তাই সাথে নিয়ে ছবি তুললাম। ওর নাম কামরুজ্জামান। চাচীর ছোট ভাই সোহরাব মামার বড় ছেলে। চাচী ছিলেন বাবার চাচাতো ভাই মরহুম শামসুদ্দিন (শমে ডাক্তার) তালুকদারের স্ত্রী। ওনাদের বাড়িটা হচ্ছে আমাদের বাড়ির উত্তরে বুইদ্দার চালায়। চাচীর বাবার বাড়ি হচ্ছে কালিহাতী উপজেলার আমজানী গ্রামে। বাড়িটা বর্গা-আমজানী-তালতলা-দেওপাড়া রাস্তার সাথেই। ওনাদের বাড়ির উত্তর পাশেই ছিল বলরাম বসু ওরফে বলাই বাবুর বাড়ি। চাচীর ছোট দুই ভাই – খসরু ও সোহরাব। সোহরাব মামুর বয়স আমাদের ডাক্তর কাক্কুর বড় ছেলে মরহুম ইখতিয়ার উদ্দিন বাশার (বাশার মাষ্টার) ভাইর সমান। ছোট বেলায় আমি সিদ্দিক ভাইয়ের সাথে সিদ্দিক ভাইর মানুর বাড়ি গিয়েছি। সিদ্দিক ভাইও ডাক্তর কাক্কুর ছোট ছেলে, আমার থেকে ৪ বছরের বড়। একবার সিদ্দিক ভাইর সাথে ঐ বাড়িতে গিয়ে তিন দিন ছিলাম। ঘটনাটা মুক্তিযুদ্ধের আগের। সোহরাব মামুগ বাড়ির দক্ষিণ দিকে দিগন্ত জুড়ে বিস্তির্ণ শস্যের মাঠ ছিল। তখন মাঠ ভর্তি খেসারি কলাই গাছ ছিল চামাড়া ধানের নাড়া বিছানো খেতে। আমি নাড়ার উপর পরন্ত বিকেলে গড়াগড়ি খাচ্ছিলাম আর কচি কচি ছেই তুলে খাচ্ছিলাম। কথায় কথায় সিদ্দিক ভাইর সাথে কি নিয়ে যেন বিরক্ত হয়ে তাকে বিরক্ত করছিলাম। তিনি বিরক্ত হয়ে আমার মুখে থুতু নিক্ষেপ করলেন। আমি এসেছি সিদ্দিক ভাইর সাথে তার নানা বাড়ি, সেই নাকি আমার মুখে থুতু নিক্ষেপ করেছে, এই ক্ষোভ নিয়ে আমি সোহরাব মামুগ বাড়ি চলে গিয়ে কাপড় চোপড় গুছিয়ে৷ নিয়ে চিতকার করে বললাম, “আমি তগ মামুর বাড়ি থাকমু না। আমার মুখে ছেব দিছস!” তখন সোহরাব মামুর স্ত্রী বাড়ির নতুন বউ। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “আমরা সিদ্দির বিচার করমু। যাইয়ো না, বাবা।” আমি খোভ দেখিয়ে বললাম, “এই বাইত্যে থাকমু না, আমি বুগ বাড়ি গিয়া থাকমু।” জোর করেই চলে গেলাম হাফ কিলোমিটার দূরের আমার বড় আপার শশুর বাড়ি লাইলি বুবুর কাছে। এই হলো মুক্তিযুদ্ধের আগের ছোট বেলার একটা কাহিনি।
১৯৭১ সনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমজানি থেকে প্রায় এক দেড় কিলোমিটার কাছেই দেওপাড়ার পাহাড়ের চুড়ায় বাংকার করে ক্যাম্প তৈরি করে। ওখান থেকে আশে পাশের গ্রামগুলোতে প্রতিদিন তারা সেল নিক্ষেপ করে আতংক তৈরি করতো। যুবুকদেরকে ধরে নিয়ে মেরে ফেলতো। গ্রামে প্রবেশ করে ধান, চাল, গরু, ছাগল, হাস মুরগী সব লুট করে নিয়ে যেতো। বুবু, দুলাভাই, তার দুই সন্তান নিয়ে আমাদের বাড়ি চলে এলেন। মুক্তি যুদ্ধের ৯ মাস তারা আমাদের বাড়িতেই ছিলেন। তখন আমি ক্লাস ফাইভে পড়তাম। সোহরাব মামু তার দুই সন্তান কামরুল ও কামালকে নিয়ে সিদ্দিক ভাইদের বাড়িতে উঠলেন। মরহুম মাওলানা সালাহউদ্দিন ছিলেন সিদ্দিক ভাইর পিঠাপিঠি বড় হেলেনা আপার স্বামী। তিনি এই বাড়ির সাথেই বাড়ি করে থাকতেন। তিনি তার বাংলাঘরে থাকতে দিলেন আমজানী গ্রামের এক হিন্দু শিক্ষক নাম তার মৃত্যুঞ্জয় বাবু। তিনি বর্গা স্কুলের অংকের টিচার ছিলেন। তার দুই ছেলে ছিল। বড়টার নাম ছিল অসীম। ও একটু ঝড়ঝড়া ছিল। ওর ছোটটা ছিলো দুধের বাচ্চা। ওরাও ৯ মাস এখানেই ছিলো।
মুক্তি যুদ্ধ কালীন ৯ মাস আমাদের স্কুল বন্ধ ছিলো। কোন কাজ ছিলো না। স্কুল বন্ধ থাকলে কোন পড়াও থাকে না। কামুরুলকে নিয়ে বেড়াতাম, খেলতাম। কামালকে কোলে নিয়ে বেড়াতাম। অসীমকে আদর করতাম, বিরক্ত করতাম। এমন অনেক স্মৃতি আছে কামরুল, কামাল, অসীম এবং ওর ছোট ভাইকে নিয়ে।
অনেক বছর আগে, ২০০০ সনের পরে সিদ্দিক ভাইর ছোট বোন ছালে (সালমা) আপার কাছে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
– সোহরাব মামুর ছেলেটা কি করে?
– গত বছর মইরা গেছে। অনার্স মাস্টার্স পাশ কইরা কোম্পানিতে একটা ভালা চাকরি করতো। হঠাৎ কইরা জ্বর আইসা ঢাকায়ই ঘরে মরেছিল।
সেই থেকে আমি জানি কামরুল ২০০০ সনে মারা গেছে। কিন্তু গত কাল সিদ্দিক ভাই আমাকে ফোন করে বলেন
– সাদেক, আমগ ছোট মামুর ছেলে কামরুল তার বউকে ডাক্তার দেখাবে। ভালো একজন অর্থোপিডিক্স ডাক্তার দেখিয়ে দিও।
– কামরুল না মারা গেছে শুনছিলাম।
– কামরুল মারা যায় নাই, মারা গেছে তার ছোটটা কামাল। যেটা যুদ্ধের সময় ছেচইর (হামাগুড়ি) পাড়তো উঠানে।
আমি কামরুলকে বউ নিয়ে আসতে বললাম। আমার চেম্বারে আসতে দেড়ি হবে। তাই বলে দিলাম আগেই ডাক্তার দেখাতে। ডাক্তার দেখানো শেষে ওরা আমার কক্ষে প্রবেশ করলো। দেখি পাকা চুল, পাকা দাড়ি ওয়ালা অন্য রকম এক বৃদ্ধ কামরুল। তার বউয়ের প্রেস্ক্রিপশন পড়ে দেখলাম। বয়স লিখেছে ৬০ বছর। বললাম, “ভালো হয়ে যাবে ইনশা আল্লাহ। “
আমি কামরুলের কাছে তাদের বাড়িতে যাওয়া, ফিরে আশা ও মুক্তি যুদ্ধের সময়ের গল্প বললাম। আমি বললাম
-আমি তো জানি তুমি মারা গেছো। তাই আর খোজ নেই নাই। আমার স্মৃতিতে এত দিন সেই ছোট্ট কামরুলই ছিল। আজ থেকে বৃদ্ধ কামরুল হয়ে গেলো। তুমি লেখা পড়া কি পর্যন্ত করেছিলে?
– আমি এইচ এস সি পাস কঅরে মালয়েশিয়া গেছিলাম। সেখান থেকে এসে আবার সৌদি আরব গেছিলাম। সারাজীবন বিদেশে চাকরি করেই কাটিয়েছি।
– তোমার সাথে একটা ছবি তুলে রাখবো, স্মৃতি কথা লিখে ফেইসবুকে দিবো। পড়ে দেখবে। আসো।
ওর বউ বলো, “চুল আচরাও।”
দুইজনই আমাকে ওদের বাড়ি যাবার জন্য দাওয়াত দিলো। আমি যাবো বলে কথা দিলাম। আমাদের বাসায় থাকতে বললাম। বললো, “সি এন জি অটোরিকশা ভাড়া করে এসেছি। ফিরতে হবে।”
গ্রামে দুই শস্য ক্ষেতের মাঝ দিয়ে যে উচু পথ চলে যায় তাকে বলে আইল।
যে আইল ঘাট পর্যন্ত চলে গিয়েছে তাকে বলে ঘাটাইল (ঘাট+আইল)।
যে আইল দিয়ে টাঙ্গা (ঘোড়ার গাড়ি) চলাচল করে তাকে বলে টাঙ্গাইল (টাঙ্গা+আইল)।
যে আইলের পাশ দিয়ে বাঁশ গাছ তাকে বলে বাশাইল (বাশ +আইল)।
খাল পাড় হতে বাঁশ দিয়ে যে উচু রাস্তা করা হয় তাকে বলে বাঁশের সাঁকো।
পাশাপাশি দুইটি সাকো থাকলে তাকে বলে জোড়া সাকো। কোলকাতায় রবি ঠাকুর বাড়ির কাছে জোড়া সাকো।
সাকোর ইংরেজি নাম ব্রিজ। দিনাজপুর শহরে একটা জোড়া ব্রিজ আছে।
সিমেন্ট, বালি ও খোয়া মিশিয়ে ঢালাই করলে বলা হয় কংক্রিট ঢালাই। তার সাথে রড দিলে বলা হয় আর সি সি ঢালাই।
রডের পতিবর্তে বাঁশ দিলে বলা হয় বাশ ঢালাই।
রাতের আঁধারে চুরি করলে বলা হয় রাত চোরা।
রাতের আধারে আর সি সি করার পরিবর্তে চুরি করে বাশ ঢালাই করলে তাকে বলবেন ঢালাই চোরা।
চোর ধরা পড়লে গ্রামের মানুষ চোরকে বাশ ডলা দেয়। পিঠের নিচে একটা এবং পেটের উপর একটা বাশ রেখে সজোড়ে চাপ দিয়ে চোরের স্বীকারোক্তি আদায় করার পদ্ধতির নাম বাশ ডলা বলা হয়।
একবার বাশ ডলা খেলে কেউ আর রডের পরিবর্তে রাতের আধারে বাশ ব্যবহার করতো না।
ঢ্নডনিয়া জলপ্রপাত (Dhandania Water Fall) মুলত প্রথম মিডিয়া জগতে প্রচার পায় বাশারচালা গ্রামের ধলা মিয়ার ফেইসবুক পোস্ট দেখে। তিনি সেখানে মাছ ধরতে গিয়ে তার সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে ভিডিও ক্লিপ ফেইসবুকে পোস্ট দেন। এলাকার কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের নজরে আসলে ক্রমেই এটা নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হতে থাকে। যেহেতু এর নির্দিষ্ট কোন নাম ছিলো না, সেহেতু বিভিন্ন জন বিভিন্ন নাম দিয়ে প্রচার করেন। যেহেতু ছোট চওনা ব্রিজ হয়ে হেটে এই জায়গায় যেতে হয় সেহেতু অনেকেই এর নাম দিয়েছেন ছোট চওনা মিনি জলপ্রপাত। আশেপাশের সবুজের সৌন্দর্য সহ এর নাম দিয়েছেন মিনি সুইজারল্যান্ড। আমার মতে, যেহেতু এটা ঢ্ণডনিয়া বাইদে, ঢ্নডনিয়া মৌজার অন্তর্ভুক্ত তাই এর নাম “ঢ্নডনিয়া জল প্রপাত (Dhandania Water Fall)” হওয়াই ভালো।
টাংগাইল জেলার সখিপুর উপজেলার কাকড়াজান ইউনিয়নের ঢনডনিয়া জল প্রপাতটি ঢ্নডনিয়া ও তৈলধারা পাহাড়ের উপত্যকায় অবস্থিত। এই সবুজ পাহাড়, উপত্যকার বাইদের সবুজ ঘাস ও ফসল এবং বাইদ চিড়ে প্রবাহমান পানির স্রোত – এসব মিলে এক অপরুপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি তৈরি করেছে। ভ্রমণ পিপাসুরা এর নাম দিয়েছে মিনি সুইজারল্যান্ড। পানির স্রোতের শব্দ, পর্যটকদের জল-কেলি ও কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠে এই পর্যটন কেন্দ্রটি।
ঢনঢনিয়া জল প্রপাতের পানির প্রবাহ
(ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার, বড়বাইদপাড়া, সখিপুর)
ঢনঢনিয়া জল প্রপাতের পানি আচড়ে পড়ে প্রথমে খাদের সৃষ্টি হয়েছে। এই পানি প্রবল বেগে ভাটির দিকে অর্থাৎ পূর্ব-পশ্চিম দিকে ন্যাচারাল খাল দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ইন্দারজানী পাদদেশে বিরাট চাপড়া বিলে গিয়ে মিশেছে। এই খাল মান্দার (মান্দাইর) খাল নামে পরিচিত। শুধু জল প্রপাতের পানিই নয়, এই খালের দুই দিকের পাহাড়ি অঞ্চলের পানিও এই খাল দিয়ে প্রবাহিত হয়। চাপড়া বিল এই এলাকার বিরাট এক জলাধার। বর্ষার শেষে চাপড়া বিলের পানি সাইল সিন্দুর খাল দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মরিচার কাছে গিয়ে বংশী নদীতে গিয়ে পড়ে। বর্ষাকালে এই খাল দিয়ে নৌকা নিয়ে ছোট চওনা ঘাটে এসে নৌকা ভিড়ে। এই খালের পানি স্বচ্ছ। মান্দার খাল, চাপড়া বিল, সাইল সিন্দুর খাল ও বংশী নদীর মাছ সুস্বাধু হয়। জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষের দিকে যখন প্রচুর বৃষ্টি হওয়া শুরু হয় তখন মান্দার খালে প্রবল স্রোত থাকে। এই স্রোতের ভিতর দিয়ে চাপড়া বিল থেকে প্রচুর ডিমওয়ালা দেশীয় মাছ উজাতে থাকে। বিভিন্ন বাইদে প্রবেশ করে বিভিন্ন ডোবায় এসে ডিম ছাড়ে। ডিম থেকে মাছের পোনা বড় হলে আষাঢ় -শ্রাবনের ঢলের পানির সাথে মিশে মান্দার খাল দিয়ে চাপড়া বিলে আশ্রয় নেয়। সেখানে গভীর পানিতে মাছ বড় হয়। পাহাড়ের ঢলের পানিতে মাছের জন্য প্রাকৃতিক খাদ্যও চলে যায় এই চাপড়া বিলে। এই জন্য চাপড়া বিলের মাছ হৃষ্টপুষ্ট ও সুস্বাদু হয়। বর্ষার শেষে পানি যখন সাইল সিন্দুর খাল দিয়ে বংশি নদীতে নামতে থাকে তখন বড় বড় বোয়াল, চিতল, আইড়, শোল, গজার ইত্যাদি মাছও বংশী নদীতে চলে যায়। সেখানে গিয়ে আরও বড় বড় হয়।
এই পানির গতি পথ দিয়ে আগের দিনে নৌকা যোগে অনেক পন্য আনা নেয়া হতো।
শীত-বসন্তের দিনে এগুলোর পানি অনেক কমে যায়। পানি যেটুকু থাকে শান্ত ও স্বচ্ছ থাকে।
ঢ্নডনিয়া জলপ্রপাত দেখতে যাওয়ার পাকা রাস্তা আছে। ভ্রমণ স্পটের তিন শত মিটার উত্তরে ছোট চওনা ব্রিজ। এখানেই গাড়ি থেকে নামবেন। এখান থেকে পায়ে হেঁটে ভ্রমণ স্পটে যাবেন। এখানে থাকা-খাওয়ার তেমন ভালো ব্যবস্থা নেই। তবে ফুস্কা, ঝাল মুড়ি জাতীয় স্ট্রিট ফুড পাওয়া যায়। যেহেতু এটা স্থানীয় জনগনের জমির উপর প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি হয়েছে, সেহেতু এর কোন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নাই। নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। তবে এলাকার লোকজন ভালো। রাত্রি যাপন করতে হলে জেলা শহরে চলে যাওয়াই ভালো।
ছোট চওনা ব্রিজটি বড় চওনা – কালিহাতী রাস্তায় মান্দার খালের উপর অবস্থিত। ব্রিজ এলাকাও বেড়ানোর জন্য উপযুক্ত স্থান। এই সড়কে বাস চলাচল করে না। সি এন জি চালিত অটোরিকশা চলে বড় চওনা থেকে পারখী চৌরাস্তা এবং এখান থেকে কালিহাতী। বাংলাদেশের যেখান থেকেই আসবেন হয় বড় চওনা দিয়ে প্রবেশ করবেন নায় হয় কালিহাতী দিয়ে। মোটর বাইক অথবা প্রাইভেট কার নিয়ে এলে সরাসরি ছোট চওনা ব্রিজে পৌছুতে পারবেন। বড় চওনা থেকে ছোট চওনার দূরত্ব ৪.৬ কিলোমিটার এবং কালিহাতী থেকে ছোট চওনার দূরত্ব প্রায় ১৯ কিলোমিটার। দূর থেকে আসতে হলে কালিহাতী অথবা বড় চওনা যেতে গুগল ম্যাপে সার্চ দিবেন। এখানে পৌঁছে ছোট চওনার পথ ধরবেন। বিকেল ৬ টার মধ্যেই ভ্রমণ স্পট ত্যাগ করবেন।
একটা কথা মনে রাখতে হবে, যেহেতু পাহাড়ি বৃষ্টির পানির ঢল থেকে সৃষ্টি হয় এই জল প্রপাত, সেহেতু জল প্রপাত দেখতে হলে বৃষ্টির মাসগুলোতে যেতে হবে এই ভ্রমণ স্পটে।
২০ জুলাই ২০২৬
ঢ্নডনিয়া জলপ্রপাত রিসোর্ট
(প্রস্তাবনা, পরিকল্পনা ও ডিজাইন)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর উপজেলার কাকড়াজান ইউনিয়নের ঢনডনিয়া জলপ্রপাতকে কেন্দ্র করে এই এলাকার ভূমি-মালিক ও পর্যটন করপোরেশন অথবা পর্যটন শিল্পের উদ্দোক্তাদের নিয়ে একটা রিসোর্ট নির্মানের আমি কল্পনা করে এআই টুল দিয়ে একটা ছবি একেছি, যেটা এখানে শেয়ার করা হলো।
রিসোর্টের মাঝখানে থাকবে ১০ ফুট উচু জল প্রপাত। জল প্রপাতের দক্ষিণ পাশে উজানে থাকবে একটা লেক।এখানে বোটিং করা হবে। উত্তরে থাকবে জল প্রপাতের পানি। সেই পানি সরু হয়ে মান্দার খালে প্রবাহিত হবে উত্তর দিকে।খালের পাড় দিয়ে ছোট সাইজের সবুজ গাছ পালা থাকবে। খালের দুই দিকে সমতল ভুমিতে বাগান থাকবে। রিসোর্টের দুই দিকে ঢালু পাহাড়। সেখানে বড় বড় পাহাড়ি গাছ। তার নিচ দিয়ে বেড়ানোর পরিবেশ থাকবে। পুর্ব পাহাড়ের ঢালে রিসোর্টের টাওয়ার। এতে থাকবে রিসেপশন, রেস্টুরেন্ট, হোটেল ইত্যাদি। পাশে একটা অবজারভেশন টাওয়ার। রিসোর্টের পুর্ব ও পশ্চিমে দিগন্তজোড়া সবুজ বন। পূর্ব – দক্ষিন কোণ থেকে উত্তর -পশ্চিম কোণ পর্যন্ত লিপলাইন দিয়ে ঝুলে ঝুলে যাবে পর্যটকরা। দৃশ্যগুলো দারুণ হবে।
এই ভুমি থেকে ভুমি তেমন কিছু পান না। তখন অনেক লাভবান হবেন।
আপনি কী মনে করেন? কমেন্ট বক্সে লিখুন। শেয়ার করে জানিয়ে দিন।
আমি ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সনে ৭ম ও ৮ম শ্রেণীতে পড়তাম কচুয়া পাবলিক হাই স্কুলে। স্কুল থেকে এসে সাধারণত পাড়ার বন্ধুরা খেলতে যেতো। আমি ছিলাম ব্যতিক্রমী। আমি মাছ ধরার ছলে ঢনডনিয়া জলপ্রপাত এলাকা থেকে শুরু করে মাহা সরকারের বাঁধ, হাজীর বাঁধ, ছোট চওনা ঘাট, ভুয়াইদের ক্ষেত এবং এর ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া সর্পিল মান্দার খালে মাছ ধরতে ধরতে এই পাহাড়ি এলাকার নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতাম। যেতাম ঢনডনিয়া বংশী পাড়া হয়ে। ফিরতাম ছোট চওনা, জিতাশ্বরি হয়ে। মাছ যাই ধরতাম, সেটা বড় কথা না, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করাই আমার আসল উদ্দেশ্য ছিলো।
গ্রামের ছেলে। লুংগি ও সেন্ডো গেঞ্জি গায়ে মাছেরে যেতাম। মাছ ধরতে যাওয়াকে আমরা মাছেরে যাওয়া বলতাম। ঘাস কাটতে যাওয়াকে বলতাম ঘাসেরে গেছে। একেক সিজনে একেক রকম মাছ পাওয়া যেতো। পাহাড়িয়া ছোট মাছ। খুব স্বাদের হয়। টাকি মাছকে বলতাম ছাইতান মাছ। চিংড়ি মাছকে বলতাম ইচা মাছ। চিরকা মাছকে বলতাম বাইং মাছ। আসল বাইম মাছকে বলতাম নাইয়া বাইং। ইচা মাছ ধরার জন্য ব্যবহার করতাম খুইয়া জাল ও জাহইর। জাহইর বাঁশ দিয়ে বুনানো তিন কোনা একটা ডিভাইস। পানির নিচ দিয়ে ঠেলে সামনের দিকে নিয়ে খালের পাড়ে নিয়ে ঠেকিয়ে পাড়ের গর্তের ভিতর হাত দিয়ে খাবলা খাবলা করলে ইচা মাছ জাহইরে অথবা খুইয়া জালে উঠে আসতো। কোমড়ে মাছ রাখার খালই বাঁধা থাকতো। মাছ ধরে ধরে খালইতে রাখতাম। বেলা ডোবার আগে ডান কাঁদে খুইয়া নিয়ে এবং বাম হাতে খালই ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরতাম। পথে মুরুব্বিদে সামনে পড়লে “দেহি গেদা কতোরি মাছ ধরছ” বলে খালইর মুখে উকি দিয়ে বলতেন, ভালাই ধরছ।”
কোন কোন সময়, বিশেষ করে মান্দার খালে পানি কমে গেলে হাতিয়ে মাছ ধরতাম। আঞ্চলিক ভাষায় বলতাম য়াতাইয়া মাছ ধরা। পানির স্তর কমে গেলে মাছগুলো পানির তলায় মাটির সাথে মিশে বিশ্রাম নিতো। দু’হাত ডুবিয়ে মাটি ছইয়ে হাঁস যেভাবে শামুক ঝিনুক খুঁজে, সেইভাবে হাত দিয়ে খাবলা খাবলা করতাম। মাছের স্পর্শ অনুভূত হলে মাছের ঘারে ঘরে তুলে আনতাম। এভাবে বড় বড় টাকি মাছ, সরপুঁটি, নোন্দা জাতীয় ঝড়ঝড়া মাছ ধরা যেত।
মান্দার খালের পাড় দিয়ে মাঝে মাঝে হিজল গাছ ছিলো। আর ছিলো বড় বড় ঝোপঝাড়। এগুলো দেখতে খুব ভালো লাগলো আমার। মাছ ধরা বাদ দিয়ে এদের দিকে চেয়ে থাকতাম অপলক দৃষ্টিতে। আশে পাশে থেকে সাদা বক মাছ ধরে এনে এসব গাছের উপর বসতো। হাট টিমা টীম পাকিকে আমরা হটেট্টি পাখি বলতাম। মান্দার খালের দুপাশের শস্য ক্ষেতগুলোতে অনেক হটেটটি পাখি বিচরন করতো। ওড়া উড়ে কিন্তু গাছে বসে না। উড়ে উড়ে চিল্লা চিল্লি করে এভাবে “হ টি টি, হ টি টি, টি টি হট, টি টি হট।” আমার এগুলো শুনতে ভালো লাগতো। মাঝে মাঝে বিড়াট বিড়াট সাড়স পাখি ক্ষেতের উপর দিয়ে হেটে হেটে সাপ বেঙ ধরতো। আমি যেনো এখনো ময়মনসিংহ বসে কল্পনার জগতে প্রবেশ করে সেগুলো দেখতে পাই।
একবার মাছ ধরার আরেক পদ্ধতি আবিষ্কার করলাম। তখন পানি কমে গিয়েছিলো মান্দার খালে। পায়ের নিচে ছিলো পিচ্ছিল কাদা। মাঝে মাঝে পায়ের নিচে কাদার ভেতরে মাছের অনুভুতি টের পেতাম। এগুলো ছিলো চিরকা মাছ, আমরা বলতাম বাইং মাছ। আর ছিল টাকি মাছ, আমরা বলতাম ছাইতান মাছ। যে পায়ের তলায় মাছে উপস্থিতি অনুভূত হতো সেই পায়ের দুপাশ দিয়ে দু’গাত প্রবেশ করিয়ে কাদাসহ মাছ এনে খালের পাড়ে ডাংগায় ছুড়ে মাড়ছিলাম। কাদা থেকে মাছ বেড়িয়ে এসে হাটিহুটি পারছিলো, আর ধরে ধরে খালইয়ে ভরছিলাম। এক সময় কাদার সাথে বিড়াট এক টাকি মাছ উঠছিলো। আকাশেই হাটিহুটি করে মান্দার খালের পাড়ে ঝোপের ভিতর গিয়ে পড়লো। এত বড় মাছটা নিয়ে যেতে হবে বলে আমি ঝোপের ভিতর প্রবেশ করলাম। অবাক হয়ে দেখলাম অনেক গুলো আস্ত মানুষের কংকাল স্তুপ করা আছে। ভয়ে গা শিউরে উঠলো। খালই হাতে নিয়ে দুরু দুরু বুকে বাড়িতে ফিড়লাম। মাছ দেখে মা খুশি হলেন। কিন্তু যতই রাত গভীর হতে লাগলো কংকাল দেখার ভয় আমার বাড়তে লাগলো। বাবা আমার আচরণ বুঝতে পেরে জিজ্ঞেস করলেন, “বাজান, শরীর খারাপ?”
– না, বাজান। ডরাইয়ো না। উন্না বংশি-মান্দাইগ কংকাল। ওগো ধর্মে আছে যে কলেরা, বসন্ত মহামারী য়ইয়া মইরা গেলে হেন্নারে না পুইড়া চাপড়া মাটি দিয়া ফালায়। হেইন্না তিগা মোনয় কংকাল য়ইছে। ডরাইয়ো না।
গ্রাম থেকে যত দুরেই থাকি সদা গ্রামের শৈশবের স্মৃতি মনে পড়ে। কিন্তু কংকালের রহস্য আমার রইয়েই গেছে। ইদানিং ঢ্নডনিয়া লেভেলের জল প্রপাতটি সোসাল মিডিয়ার মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ওগুলো দেখে আমার শৈশবের স্মৃতি বেশী বেশী মনে পড়ছে। আমিও ওগুলো শেয়ার করছি। নিজের মতামত ব্যক্ত করছি। জল প্রপাত দেখতে আমাদের দেশের ভ্রমণ পিপাসুরা সিলেট যায়। অথচ বাংলাদেশের মাঝখানে সখিপুরের ঢনঢনিয়া গ্রামেই সুন্দর জল প্রপাত আছে। পর্যটন শিল্পের আওতায় এনে জল প্রপাতকে কেন্দ্র করে দুই পাহাড়ের এই উপত্যকায় পরিকল্পনা করে আকর্শনীয় এক রিসোর্ট তৈরি করা যায় – এমন একটা ফেইসবুক পোস্ট আজ আমি দিয়েছি। তার একটা কাল্পনিক ছবিও পোস্ট করেছি। সন্ধায় স্থানীয় তৈল ধারা গ্রামের সাইদ মেম্বার ভাইকে ফোন করে অনেক আলাপ করলাম এব্যাপারে। তাকে শেষে কংকালের র্হস্যাটা কী জিজ্ঞেস করলে বললেন, “আপনার আব্বা যেটা বলেছেন, সেটাই ঠিক। এক সময় গুটি বুসন্ত হয়ে অনেক বংশী-মান্দাই মারা যায়। ঐসময় নাকি পুজায় তারা কি যেন ভুল করেছিলো, তাই প্রচুর লোক মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।”
আমি বললাম, “পুজার ভুলের জন্য নয়, পুজার সময় সবাই কাছাকাছি আসাতে ছোয়া ছুয়ি হয়ে বেশী আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। দেখেননি, করোনার সময় মানুষকে কিভাবে লক ডাউন করে আটকিয়ে রাখা হয়েছিলো যাতে মহামারী না ছড়ায়।” তিনি বললেন, “এলাকায় বেড়ায়ে আসেন। জল প্রপাত দেখে যান। অনেক দূর থেকে জল প্রপাত দেখতে আসে।”
১৯৭৭ সন। মার্চ মাসে এসএসসি ফাইনাল পরীক্ষা দিতে করটিয়া গিয়েছিলাম। আমাদের স্কুল ছিলো ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বাটাজোর গ্রামে বাটাজোর বি এম হাই স্কুল। পরীক্ষার কেন্দ্র ছিলো টাংগাইলের বাসাইল উপজেলার করটিয়ায় জমিদার বাড়ি সংলগ্ন মরহুম ওয়াজেদ আলী খান (চান মিয়া) প্রতিষ্ঠিত হাফেজ মাহমুদ আলী ইনস্টিটিউটে। পরীক্ষা উপলক্ষে আমি ভাতকুরা গ্রামে এক বাড়িতে পেইং গেস্ট ছিলাম। পাশের বাড়িতে আমার ফুফাতো ভাই মরহুম আসাদুজ্জামান তালুকদার (জিয়াউল) ভাই লজিং থেকে করটিয়া সাদত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অনার্স পড়তেন। তিনিই আমাকে ২০ দিনের জন্য পেয়েইং গেস্টের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। পাশের বাড়িতে খেলেও আমি থাকতাম জিয়াউল ভাই থাকার বাংলাঘরে। পড়ার ফাকে ফাকে ভাইর সাথে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে আলাপ আলোচনা করতাম। তিনিই আমাকে করটিয়া নিয়ে যেতেন এবং নিয়ে আসতেন। তিনি আমার থেকে প্রায় চার বছরের বড় ছিলেন। একদিন বললাম, “ভাই ছোট বেলা থেকেই করটিয়া কলেজের নাম শুনি। কাজেম উদ্দিন নানাও এই কলেজ থেকে বিএ পাস করেছিলেন। আমাকে আপনার কলেজটা একদিন ভালো করে দেখাবেন।” জিয়াউল ভাই পরীক্ষার অফ ডে-তে একদিন আমাকে কলেজ দেখাতে নিয়ে গেলেন।
এসএসসি পাস করার পর হয়তো এই কলেজেই পড়তে হবে, এই স্বপ্ন নিয়ে ভাইর সাথে কলেজ দেখতে গেলাম। জীবনে আমি প্রথম কলেজ দেখেছি তথকালীন মুজিব মহাবিদ্যালয়, তথকালীন কাদের নগর, সখিপুর। বর্তমানে যার নাম সখিপুর সরকারি মহাবিদ্যালয়। ওটা তখন একটা টিনশেড ঘর ছিলো। এরপর দেখি ভালুকার বাটাজোর গ্রামের সোনার বাংলা মহাবিদ্যালয়। ওটাও টিনের ঘর ছিলো। তারপর দেখি কালিহাতির আউলিয়াবাদ গ্রামের আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ।
ওটাও টিনের ঘর ছিলো।
করটিয়ায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী সরকারি সা’দত কলেজ ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয। করটিয়ার জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নী তাঁর পিতামহ সাদাত আলী খান পন্নীর নামে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন। সাদত কলেজ ছিলো বিল্ডিং। উন্নত কলেজ। ভবিষ্যতে হয়তো এই কলেজেই পড়তে হবে এই চিন্তাভাবনা ধারণ করে ভাইর সাথে ঘুরে ঘুরে কলেজ দেখলাম। বিভিন্ন কক্ষে গিয়ে গিয়ে সেই কক্ষে কি ধরনের ক্লাস তা বলে দিচ্ছিলেন। বিজ্ঞানের প্রতি আমার খুব আগ্রহ ছিলো। ভাইকে বললাম, “বিজ্ঞান ভবন দেখালেন না?” তিনি বিজ্ঞান ভবন দেখালেন। একটা বড়সড় কক্ষে নিয়ে গিয়ে বললেন, “এটা সেমিনার হল। এখানে সেমিনার হয়।”
আমি “সেমিনার” কী, “সেমিনার হল” কী, কিছুই বুঝলাম না । ভাইর কাছে ভয়ে জিজ্ঞেস করারও সাহস পেলাম না। ভাই যদি আমাকে বোকা মনে করে বলে ফেলেন, “এই পাহাইড়া, এখন পর্যন্ত সেমিনার কী তা জানো না?”
সেমিনার কী, কিভাবে হয় তা ভালো করে দেখলাম এবং বুঝলাম এইচ এস সি পাস করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস ভর্তি হয়ে পড়ার সময়। আমি ছাত্র অবস্থায়ই নিয়মিত সাপ্তাহিক সেমিনারে শিখার জন্য উপস্থিত থাকতাম। পোস্ট গ্রাজুয়েট করার পর শিক্ষকতা করার সময় জার্নাল প্রেজেন্টেশন সেমিনারের একটানা আমি ৫ বছর কো-অর্ডিনেটর ছিলাম। গত বছর ঢাকায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কনফারেন্স এর একটি সেমিনারে আমি চেয়ারম্যান ছিলাম। কে বলবে আমি পাহাইড়া! এই বয়সেও আমি কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ এর প্রতিটি সেমিনারে উপস্থিত থাকি। সেমিনারের ভিডিও রেকর্ড করে ইউটিউব ও ফেইসবুকে পোস্ট করি নিয়মিত। যারা বাস্তবে সেই সেমিনারে উপস্থিত হতে পারে না তারাও নেট থেকে আমার রেকর্ড করা সেমিনার দেখে নেয়। জিউউল ভাইকে মনে পড়ে।
১৯৮০ সনের জানুয়ারি মাসে আমাদের এমবিবিএস ক্লাস শুরু হয়েছিল। আমি ভর্তি হয়েছিলাম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে। রেগুলার ব্যাচ হিসাবে ফাইনাল পরীক্ষা দেয়ার কথা ছিল ১৯৮৫ সনের মে মাসে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা মে মাসেই হয়ে যায়। তারা পাস করে সরাসরি সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন মেডিকেল কলেজের ছাত্রগুলায় অতিরিক্ত রাজনীতি পছন্দ করতো। তারা সংগ্রাম করে পরীক্ষা পিছায়। তাই আমরা ফাইনাল পরীক্ষা দেই সেপ্টেম্বরে। নভেম্বরের ২০ তারিখে পাসের রেজাল্ট পাই এবং ২১ তারিখে ইন-সার্ভিস ট্রেইনি হিসাবে এক বছরের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগদান করি। সরকার সিদ্ধান্ত নেয় এবার আগের মতো ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং এর শেষে আমাদেরকে সরাসরি মেডিকেল অফিসার হিসাবে সরকারি অফিসার পদে নিয়োগ দিবে না। আমরা ট্রেইনিং করতে করতে সারা বছর সংগ্রাম চালিয়ে যেতাম। ট্রেইনিং শেষে আমরা হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেলেও সংগ্রাম চলতে থাকে। বে-উপায় হয়ে এরশাদ সরকার সাদা কাগজে স্বহস্তে চাকরির আবেদন করার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়। ইতিমধ্যে হতাস হয়ে প্রায় চার ভাগের একভাগ বেকার ডাক্তার দেশ ত্যাগ করে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আমেরিকা পারি জমিয়েছে। সোনার দেশে আমরা যারা ছিলাম তারা স্বহস্তে দরখাস্ত করে একজন বাদে সবাই চাকরি পেলাম সরকারি মেডিকেল অফিসার হিসাবে। ডা: আব্দুর রহমান চাকরি পেলো না, আমি এক মাস পর জানতে পারলাম। জেনে আমি তাকে ঢাকায় গিয়ে ডিজি অফিসে খোজ নিতে বললাম কেন সে বাদ পড়েছে। এসে জানালো এক তাজ্জব কাহিনি। ডিজি অফিসের অফিস সহকারী তাকে জানায় আপনি স্বহস্তে না লিখে টাইপ করে দরখাস্ত দিয়েছেন। স্বহস্তে লিখার জন্য বিজ্ঞপ্তিতে লিখা ছিলো। তাই, আপনার দরখাস্ত গ্রহন করা হয়নি।
– আমি তো স্বহস্তেই লিখেছি।
– এই যে আপনার টাইপ করা দরখাস্ত।
– এটা তো টাইপ করা না, এটা আমার হাতের লেখা। আমি এমন করেই লিখি।
– তাই নাকি? এত সুন্দর আপনার হাতের লিখা! আহারে, এক মাস পার হয়ে গেলে নিয়োগ বাতিল হয়ে যায়। আপনার জন্য করার কিছু নাই। দু:খিত।
আমার কোথায় পোস্টিং হয়েছে জানিনা। আমি ও নজরুল ঢাকায় গিয়ে জানতে পারলাম আমাদেরকে খুলনা বিভাগে বিভাগীয় পরিচালকের কাছে ন্যাস্ত করেছে পোস্টিং দেয়ার জন্য। ১ জুলাই আমরা দুজন খুলনা রওনা দিলাম টাংগাইল থেকে। রাতে খুলনায় পৌঁছে ডাঃ নাসিম কাকার বাসায় খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লাম । ২ তারিখ সকালে বিভাগীয় পরিচালকের অফিসে গিয়ে দেখি পোস্টিং অর্ডার হয়ে গেছে। নজরুলকে দিয়েছে খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার একটা সাবসেন্টারে। আমাকে দিয়েছে বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। দুইজন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম। রাতে সাতক্ষিরায় সুলতানের বাসায় খেয়ে পিরোজপুর শহরে হোর্ডিংএ রাত্রিযাপন করলাম। ৩ তারিখ সকাল ৬ টায় হুলারহাট থেকে লঞ্চে উঠলাম, ৯ টায় গিয়ে বরিশাল পৌছলাম। এটাই আমার জীবনে প্রথম লঞ্চে জার্নি। তখন ডেপুটি সিভিল সার্জন ছিলেন চরামদ্দির ডা: জাহাঙ্গীর স্যার। তিনি আমাকে পেয়ে খুশি হলেন। সিভিল সার্জন থেকে কমিউনিকেশন লেটার নিয়ে বাস যোগে বাকেরগঞ্জ পৌছলাম দুপুরের দিকে। ডা: হুমায়ুন কবীর ভাই ছিলেন টিএইচএ। তিনি আমার যোগদান পত্রে সই করলেন। আমি চরামদ্দি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দায়িত্ব ভার গ্রহন করলাম ডা: সহিদুর রহমান ভাই থেকে। অর্থাৎ আমি ১৯৮৮ সনের ৩ জুলাই সরকারি মেডিকেল অফিসার হিসাবে প্রথম চাকরিতে যোগদান করলাম। আজ সেই ৩ জুলাই। এই তারিখ এলেই সেই তারিখ মনে পড়ে। এখনে চরামদ্দি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট রোস্তমকে পেলাম। তার সাথে চারামদ্দি রওনা দিলাম বিকেলে। বাস যোগে বরিশাল গিয়ে রাতে গেস্ট হাউজে রাত্রিযাপন করলাম। ৪ তারিখ সকাল ৬ টায় বরিশাল থেকে ছোট লঞ্চে করে চরামদ্দির কাছে কাটাদিয়া ঘাটে গিয়ে নামলাম। সেখান থেকে নৌকা যোগে চরামদ্দি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে পৌছলাম সকাল ১০ টায়। সবার সাথে পরিচয় হলো। বিকেলে রোস্তমের বাসায় গিয়ে রাত্রিযাপন করলাম। ৫ তারিখ দুপুরে খেয়ে ছোট লঞ্চে করে বরিশাল চলে গেলাম। বিকেল ৬ টার লঞ্চে উঠলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। ৬ তারিখ সকালে ঢাকায় সদরঘাট নামলাম। মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে বাসে উঠে টাঙ্গাইল চলে এলাম। তখন টেলিফোন ছিলো না। এই কয়দিন কী হয়েছে কেউ জানে না। দুপুরের দিকে টাংগাইলের বাসায় পৌছলে স্ত্রী স্বপ্না অধীর আগ্রহে জানতে চায়, “কী খবর?”
এএফএম গোলাম কিবরিয়া স্যার ছিলেন আমার শিক্ষক। তিনি আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। ১৯৭৩ সনে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী স্যার কলেজটি তার গ্রামের বাড়ি ছাতিহাটির কাছে আউলিয়াবাদে প্রতিষ্ঠা করে তার দাদার নামে নামকরন করেন আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ। কলেজ প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পরই আব্দুল লতিফ সিদ্দকী স্যার প্রিন্সিপালের দায়িত্ব নেন। সেই সময় ভোলা জেলা নিবাসী এএফএম গোলাম কিবরিয়া নামে একজন সমাজ কল্যাণ বিষয়ের প্রভাষক ছিলেন। তিনি লতিফ সিদ্দিকী স্যারের একজন অন্যতম পছন্দের মানুষ ছিলেন। কলেজটি আবাসিক ছিল। ছাত্রদেরকে করা শাসনের ভিতর রাখা হত। তাই, তাদের রেজাল্ট ভাল হত। কলেজের সাথে একটি কৃষি খামার ছিল। ছাত্রদেরকে রুটিন অনুযায়ী দিনের কিছুক্ষণ কৃষিকাজ করতে হত। এলাকার জনগনের কাছে কলেজটির বেশ কদর ছিল।
১৯৭৫ সনের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর লতিফ সিদ্দিকী স্যার অনেক বছর ভারত ও রাশিয়া অবস্থান করেন। নয় মাস কলেজ বন্ধ থাকার পর প্রবাস থেকে স্যারের নির্দেশনায়, স্যারের চাচা জনাব ওয়াদুদ সিদ্দিকী (হুদ্দু মিয়া) সাহেবের তত্বাবধানে কলেজটি আবার চালু হয়। ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল হন বল্লার মোসলেম উদ্দিন স্যার। সব স্যারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কলেজটির লেখাপড়ার পরিবেশ আগের মত রাখার চেষ্টা করা হয়।
এই কলেজে আমি ভর্তি হই ১৯৭৭ সনে। ছাত্র সংখ্যা কম থাকাতে এবং সরকারী অনুদান কম আসাতে কলেজটি আর্থিক সংকটে পড়ে। কয়েকজন টিচার চলে যান। আমি দেখেছি কলেজ ক্যাম্পাসের ইট টুকিয়ে টুকিয়ে বিক্রি করে সেই টাকায় স্যারদের বেতন দিতে হতো। আমরা কলেজের এবং আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। ডিসেম্বরের দিকে স্যারদের কাছে শুনলাম কিবরিয়া স্যার নামে আগে এক প্রভাষক ছিলেন । তিনি প্রিন্সিপাল হয়ে আসছেন। তিনি এলে অবস্থার উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তিনি জানুয়ারির দিকে এলেন। দেখলাম অদ্ভুত এক ধরনের মানুষ তিনি।
তিনি সব সময় খাকি রংগের কুরতা পরতেন। দেখতে ঠিক যুবক বয়সের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ছবির মত। মাথায় ঠিক জাতীয় কবির মত ঝাকরা চুল। বুদ্ধিদীপ্ত চোখ। স্বল্পভাষী। মৃদুভাষী। কথা বলার সময় মনে হয় যেন অনেক্ষণ মন খারাপ করে ছিলেন। কান্না কান্না গলার স্বর। অল্প বলতেন। কিন্তু মূল্যবান কথা বলতেন। সব টিচার তাকে পীরের মত মানতেন। আমরা ভয়ে ভয়ে থাকতাম।
২১ শে ফেব্রুয়ারি ও ২৬ মার্চের অনুষ্ঠান পালনের মধ্য দিয়ে স্যারের পারদর্শিতার বেশ কিছু প্রমাণ পেলাম। আমাদের কলেজের পিছনে বাঁশের তৈরি এক লাইনে ১০-১২টি কাঁচা লেট্রিন ছিল। ৮-১০ দশ ফুট উপর থেকে খোলা গর্তে পায়খানা পরত। ছাত্র-শিক্ষক সবাইকে এগু্লো ব্যবহার করতে হতো। কিবরিয়া স্যার প্রথমেই এগু্লোর পরিবর্তে ১০-১২টি পাকা সেনিটারি লেট্রিন তৈরি করলেন এবং কয়েকটি টিউবওয়েল বসালেন সরকারী অনুদান এনে। অল্পদিনের মধ্যে কয়েক লাখ টাকা সেংশন করিয়ে টিচারদের জন্য ডর্মেটরি বিল্ডিং নির্মান করালেন। পুকুর সংস্কার করে খেলার মাঠ সমতল করালেন। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বোর্ডের চেয়ারম্যানকে এনে কলেজ পরিদর্শন করালেন। ছাত্রশিক্ষকদের কর্মস্পৃহা দেখে চেয়ারম্যান স্যার মুগ্ধ হলেন। ফিরে গিয়ে কলেজের জন্য অনেক সরঞ্জামাদি বরাদ্দ দিলেন। প্রিন্সিপাল স্যারের অনুরোধে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজকে এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র হিসাবে অনুমোদন দিলেন। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এসেছিলেন কালিহাতি হাই স্কুল মাঠে জন সভায়। বিরাট এক ব্যানার নিয়ে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ থেকে আমাদের সব ছাত্র পাঠিয়েছিলেন উক্ত সভায়। মাঠের মাঝখানে এতগুলি ছাত্রের মুহুর্মুহু স্লোগানে প্রেসিডেন্ট-এর দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। তিনি কয়েকলাখ টাকা কলেজের জন্য মঞ্জুরি দিতে নির্দেশ দেন। এরপর কলেজের অবস্থা অনেক পাল্টে যায়।
ফেব্রুয়ারি বা মার্চের দিকে কিবরিয়া স্যার আমাদের ব্যাচের হোস্টেলে থাকা ছাত্রদের নিয়ে বিকেলে ছাতিহাটি গেলেন। কলেজের নামে এলাকায় অনেক ধানী জমি ছিল। সেই জমিতে ইরি ধানের জালা বা গাছি ফেলা ছিল। স্যার আমাদের নিয়ে সেই জালা তুলতে বসলেন। আমরা ছাটা কামলার মত স্যারের সাথে লাইন ধরে বসে জালা তুললাম। এক সময় আমি, নজরুল বেলায়েত, কাদের, বুলবুল সবাই মিলে ছাটা কামলাদের মত আঞ্চলিক ভাষার গান গাইলাম। স্যার নিরবে উপভোগ করছিলেন। আমরা স্যারকে ভয় বা লজ্জা পেলাম না। স্যার বললেন “উন্নত দেশে কোন কাজকে কেউ ছোট করে দেখে না। পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে তারা কাজ করে।” এভাবে আমরা মাঝে মাঝেই এক ঘন্টা বা আধ ঘন্টা কাজ করতাম। কাজের শেষে বিস্কুট খেতাম। স্যার আমাদেরকে হোস্টেলে করা শাসনের ভিতর রাখতেন। বেলা ডোবার সাথে সাথে রুমে ফিরতে হত। রাত ১২টার মধ্যে লাইট নিভিয়ে ঘুমিয়ে পরতে হত। শিক্ষকগণও স্যারকে পীরের মত মানতেন। তিনি দৈনিক তিন-চারটি করে ডিম পুচ করে খেতেন। তাই স্যার একটু মোটাসোটা ছিলেন। ঢিলেঢোলা কুরতা পরাতে বিসাল আকৃতির পেটটা তেমন বুঝা যেত না।
১৯৭৯ সনে আমাদের কলেজে প্রথম পরীক্ষার সেন্টার হল আমাদের এইচএসসি পরীক্ষার মাধ্যমে। আমি পরীক্ষার্থী ছিলাম । ২৯ শে মে বৃ্হস্পতিবার বাংলা প্রথম পত্র, ৩১ মে শনিবার বাংলা দ্বিতীয় পত্র এবং ২ জুন সোমবার ইংলিশ প্রথম পত্র পরীক্ষা দিলাম । বিকেলে আমার মায়ের মৃত্যু সংবাদ এলে কিবরিয়া স্যার অখিল স্যারকে দিয়ে আমাকে বাড়ি পাঠালেন মায়ের মুখটি শেষ বারের মতো দেখার সুযোগ করে দিতে। অখিল স্যার আমাকে তার সাইকেলে বসিয়ে ডব্লিং করে চালিয়ে নিয়ে গেলেন । আমি নিরবে সাইকেলে স্যারের সামনে নিরবে বসলাম। আমি তখন হাল্কা পাতলা হলেও ওজন আমার ৫৬ কেজির কম ছিল না। আমাকে নিয়ে অখিল স্যার সাইকেল চালিয়ে পাহাড়ের দুর্গম রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদছিলাম। ভন্ডেশ্বর, খালুয়া বাড়ী, আওলাতৈল, মরিচা, বাঘেরবাড়ী, দেবলচালা, ঢডনিয়া, জিতাশ্বরি, নওপাড়া সুদীর্ঘ ১২-১৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রাত ১০ টার দিকে বাড়ি পৌঁছলাম। সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন জানাজার জন্য। আমি অজু করে জানাজায় শরীক হলাম। দাফন হল। এক সময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।
ভোরে অখিল স্যার বললেন “কিবরিয়া স্যার তোমাকে পরীক্ষা শুরুর আগেই ফিরিয়ে নিতে বলেছেন।” আমি বললাম “চলুন, স্যার।” আমি ভোরে আবার অখিল স্যারের সাইকেলে বসে কলেজে চলে গেলাম । পরীক্ষা শুরুর আধ ঘন্টা আগে গিয়ে পৌঁছলাম। মুখ ধুলাম। আবুল হোসেন তালুকদার স্যার এগিয়ে এলেন। বললেন “কিবরিয়া স্যার তোমাকে পরীক্ষার হলে যেতে বলেছেন।” আমি নিরবে হলে গিয়ে বসলাম। হাতে খাতা ও প্রশ্ন পত্র দেয়া হল। দোয়া পড়ে লিখা শুরু করলাম। বেশ কিছুক্ষণ লিখার পর মায়ের স্মৃতি ভাসা শুরু হয়ে গেল। চোখ দিয়ে পানি ঝরা শুরু হল। কোন এক স্যার মাথায় হাত বুলালেন। আমি আবার লিখলাম। লিখে শেষ করলাম। রুমে ফিরলাম। সবাই পড়া নিয়ে ব্যস্ত। আমাকে শান্তনা দেবার মত সময় সবার হাতে কম। আমিও বুঝলাম। ভাগ্যের নির্মম অধ্যায় অতিক্রান্ত করছিলাম।
কয়েকদিন পর বাবা এলেন হাসেন কাক্কুকে সাথে নিয়ে। বাবার চেহারা দেখে আমি বিমর্ষ হয়ে গেলাম। বাবার স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে গেছে। ভয় হল বাবাকেও হারাই নাকি। বাবা প্রিন্সিপাল স্যারের সাথে দেখা করতে চাইলেন। আমি হাসেন কাক্কু ও বাবাকে প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে নিয়ে রেখে এলাম। কয়েকদিন পর ভিয়াইল থেকে রশিদ কাক্কু এলেন বর্গার বছির মৌলভী স্যারকে নিয়ে আমাকে দেখতে। রশিদ কাক্কুও স্যারের সাথে দেখা করে স্যারকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে যান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হাসেন কাক্কু, বাবা ও রশিদ কাক্কু কিবরিয়া স্যারের আতিথেয়তার প্রশংসা করতেন। এইচএসসি পাস করি আল্লাহর দয়ায় প্রথম বিভাগে ২টি লেটার নিয়ে। স্যারের সাথে দেখা করে কদম্বুচি করি। তারপর ১৯৯৪-এর আগ পর্যন্ত স্যারের সাথে দেখা হয়নি। এর মধ্যে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী স্যার দেশে ফিরে কলেজের দায়িত্ব হাতে নেন। কিবরিয়া স্যার এক সময় চাকরী ছেড়ে দেশে চলে যান। কিছুদিন ঢাকার কোন এক কলেজে শিক্ষকতা করেন। কিন্তু আবার চাকরি ছেড়ে চলে যান বোনের বাড়ী পটুয়াখালীতে।
১৯৯৪ সনে আমি এমফিল পড়াকালীন ঢাকার শাহবাগে পিজি হোস্টেলে থাকতাম। তিনি তার বোনের কাজের মহিলার চিকিৎসা করানোর উদ্দেশ্যে আমার রুমে এসেছিলেন এবং এক রাত আমার রুমে কাটিয়েছিলেন । আমাদেরকে নিয়ে অনেক স্মৃতিচারণ করেন।
এক সময় তিনি ঘাটাইল ব্রাম্মনশাসন মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল হন । সেখানে তিনি কয়েকবছর ছিলেন। একদিন দেশের বাড়ি বেড়ানোর কথা বলে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। তিনি বিছানাপত্র কাপড় চোপর কিছুই নেননি।
অনেকদিন পর জানা গেছে পটুয়াখালী বোনের বাড়ী অবস্থান কালে চিরকুমার, মৃদুভাষী, বিচক্ষণ, স্বাধীনচেতা, বুদ্ধিদীপ্ত সেই বড় মাপের মানুষটি ইহজগৎ ত্যাগ করেছেন।