Parcel Nirvor Jibon
পার্সেল নির্ভর জীবন
(ছোট গল্প)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
সকাল ঠিক আটটায় সে বাসার গেইট বন্ধ করে। তালার শব্দটা গলির ভেতর একটু বেশিই জোরে শোনা যায়। গলিটা তখনও পুরো জেগে ওঠেনি। একতলা বাসার দেয়ালের সঙ্গে লাগানো ছোট কাঠের বাক্সটার দিকে একবার তাকায় সে। উপরে লেখা—
“Keep Parcel Here”
আজ সেখানে কিছু নেই। কাল রাতে ডিনারের পার্সেলটা নিজেই তুলে নিয়েছে।
সে ত্রিশ বছরের একজন ডাক্তার। অবিবাহিত। এই শব্দটা নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই, গর্বও নেই।
হাসপাতালে গিয়ে সারাদিন রোগী দেখে। কারও বুক ধড়ফড় করে, কারও শ্বাস আটকে আসে, কারও জীবনে অকারণ ভয়। সে মন দিয়ে শোনে, পরীক্ষা করে, প্রেসক্রিপশন লেখে। মানুষের জীবন ঠিক করার কাজে সে ক্লান্ত হয়, কিন্তু বিরক্ত হয় না।
বিরক্ত হয় অন্য জিনিসে।
বাজার করা—ঝামেলা।
কী রান্না হবে ভাবা—ঝামেলা।
রান্না করা—সবচেয়ে বড় ঝামেলা।
হোটেলে গিয়ে খাওয়া—লাইন, শব্দ, মানুষ, অপ্রয়োজনীয় কথা।
ডাইনিং—আরও বেশি ঝামেলা।
তার কাছে খাওয়া মানে শুধু খাওয়া।
ক্ষুধা → খাবার → শেষ।
দুপুরে হাসপাতালের ক্যান্টিন, রাতে পার্সেল।
মাঝে মাঝে একটাই অ্যাপ, আগের অর্ডার হিস্ট্রি থেকে “Repeat Order”।
নতুন কিছু ট্রাই করার মতো মানসিক জায়গা তার নেই।
বিকেলে প্রাইভেট চেম্বার। সেখানে সে আরও শান্ত। মানুষ টাকা দিয়ে আসে, কথা শোনে, বিশ্বাস করে। বিশ্বাস—এই শব্দটা সে শুধু রোগীদের চোখে খোঁজে, নিজের জীবনে নয়।
রাত হলে বাসায় ফিরে। গেইট খুলে ঢোকার আগেই চোখ যায় দেয়ালের দিকে। আজ পার্সেল এসেছে। বাদামি প্যাকেট, নাম লেখা নেই—শুধু তার মোবাইল নম্বর।
সে প্যাকেট তুলে নেয়। মনে পড়ে না কবে শেষবার কেউ তার জন্য কিছু হাতে তুলে দিয়েছে।
খেয়ে নেয়। টেবিলে বসে নয়, বিছানায় শুয়ে।
তারপর মোবাইল।
মেডিকেল আর্টিকেল, শর্ট ভিডিও, সিরিজের আধা-আধা দেখা এপিসোড।
সবই চলতে থাকে আঙুলের একটুখানি নড়াচড়ায়।
বিয়ে?
সে বিষয়টা নিয়ে কখনো গভীরভাবে ভাবেনি।
তার কাছে স্ত্রী মানে অতিরিক্ত সমন্বয়, অতিরিক্ত ব্যাখ্যা, অতিরিক্ত দায়িত্ব।
কারও অপেক্ষা করা, কারও জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া—এসব তার দৈনন্দিন তালিকায় নেই।
তার জীবন খুব পরিষ্কার।
খাওয়া আছে।
কাজ আছে।
ঘুম আছে।
আর আছে পার্সেল।
মাঝে মাঝে রাতে শুয়ে থাকতে থাকতে ভাবে—
যদি কোনোদিন এই “Keep Parcel Here” লেখাটা মুছে যায়,
যদি একদিন পার্সেল না আসে,
তাহলে কি তার জীবনে সত্যিই কিছু বদলাবে?
এই প্রশ্নটার উত্তর সে খোঁজে না।
মোবাইল স্ক্রিনটা আবার জ্বলে ওঠে।
ভিডিও শুরু হয়।
আর তার জীবন, ঠিক পার্সেলের মতোই,
নীরবে দরজার পাশে পড়ে থাকে—
খোলা হবে কি না, সেটা কেউ জানে না।
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
