ছোট বেলার ঈদগাহর ইমাম
(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
আমাদের ছোট বেলার ঈদের জামাত অনেক বড় হতো। বড় চওনা হাট সংলগ্ন পুকুরের পশ্চিম পাড়ের মাঠে আমাদের ঈদের নামাজ হতো।বড় চওনা গ্রামকে কেন্দ্র করে শ্রীপুর, বামমচালা, খুইংগারচালা, ভুয়াইদ, ছোট চওনা, পাইন্যারবাইদ, জিতাশ্বরি, ঢ্নডনিয়া, বড়বাইদপাড়া, সাড়াসিয়া, ধলিপাড়া, জামাল হাটকুরা, ইত্যাদি গ্রামের মুসুল্লি নিয়ে এই মাঠে ঈদের নামাজের মাধ্যমে মিলন মেলা হতো। এই জামাতের প্রভাবশালী সংগঠক ছিলেন বড় চওনার মরহুম মোকছেদ আলী পঞ্চায়েত। তিনি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা লাল মিয়া চেয়ারম্যানের পিতা। একেক গ্রাম বা এলাকায় একেকজন প্রভাবশালী ব্যাক্তি ছিলেন। তাদের সাথে মোকসেদ পঞ্চায়েতের ভালো সম্পর্ক ছিলো। তাতেই ঈদের জামাতের একতার সম্ভব হয়। যেমন ছোট চওনার মরহুম শমসের হাজী, জিতাশ্বরির মরহুম রশিদ হাজী, বড়বাইদ পাড়ার আমার মেজ দাদা মরহুম মেসের উদ্দিন তালুকদার -এদের জন্যই জামাতটা মজবুত ছিলো। শমসের হাজীও পঞ্চায়েত ছিলেন।
এসব মুরুব্বিগণ ইন্তেকাল করার পর এই বন্ধন দুর্বল হতে থাকে। আমরা দলবদ্ধ হয়ে ঈদগাহর দিকে তাকবীর দিতে দিতে অগ্রসর হতাম। দুল্যাকালে, আমার মনে আছে, ঈদ উপলক্ষে বড় চওনা হাট থেকে আমরা কাগজের তৈরি রঙিন গোল টুপি কিনতাম। সেগুলো মাথায় দিয়ে মুরুব্বিদের পিছনে পিছনে আনন্দ করতে করতে তাকবীর দিয়ে অগ্রসর হতাম। আমাদের কাফেলার সামনে থাকতেন বড় কাক্কু মরহুম সোলাইমান তালুকদার। কাফেলার মুরুব্বিকে পেছনে ফেলে কেউ সামনে যাবার সাহুস পেত না। জিতাশ্বরিদের কাফেলার সামনে থাকতেন মরহুম আব্দুর রশিদ হাজী। ছোট চওনাদের সামনে থাকতেন মরহুম শওকত আলী চেয়ারম্যান।
বিভিন্ন কারনে এই একতার বন্ধন ভেঙে গিয়ে গ্রামে গ্রামে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হতে থাকে। কেন এমন হয়, সেটা নিয়েই এখন লিখবো।
আমি বুঝমান হয়েই দেখেছি আমাদের বড় চওনা মাঠের ঈমাম প্রায় শতববর্ষী মাওলানা মরহুম হাতেম আলীকে। অত্যন্ত সুন্দর তার চেহারা ছিলো। তার বাড়ি ছিলো বাশাইল উপজেলায়। ঈদের আগের দিন এসে পঞ্চায়েত বাড়িতে অবস্থান করতেন। নামাজের আগে বাংলায় সুন্দর সুন্দর বয়ান করতেন। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স:) এর জীবনের ঘটনাগুলো এমন অংগ ভংগী করে বলতেন, আমার মনে হতো এই হুজুরের মতই হয়তো আমাদের মহানবী ছিলেন। নামাজ ও দোয়া শেষে ছাত্র ও যুবকরা হুজুরের কাছে গিয়ে দোয়া চাইতেন। হুজুর মাথায় হাত বুলিয়ে, পিঠে আদর করে কথা বলতেন, উপদেশ দিতেন, খুশী খুশী ভাব নিয়ে কথা বলতেন। ঈদের নামাজ শেষে আমার চাচারা হুজুরকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসতেন। এই রেওয়াজ বহু বছর আগে থেকেই চলে আসছিলো। দুপুরের খাবার খেয়ে তিনি বিশ্রাম নিতেন। রাতে তাকে ডিস্টার্ব করতাম না। সকালে ফজরের নামাজের পর আমরা সব বয়সী মানুষ কাচারি ঘরে হুজুরের কাছে গিয়ে বসতাম। হুজুর চায়ের চুমুক দিতে দিতে সুন্দর সুন্দর ইসলামি গল্প বলে শুনাতেন। আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম।
বয়সের ভাড়ে শেষ বয়সে প্রায়ই অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তার পরিবর্তে তার ছেলেকে পাঠাতেন। ছেলেও মাওলানা ছিলেন। আধুনিক মাওলানা। তিনি বাবার মতো অত নরম ছিলেন না। রাজনৈতিক নেতাদের মতো আংগুল নেড়ে নেড়ে রাগান্বিত হয়ে বয়ান করতেন। পর পর কয়েক বার প্রক্সি দিতে দিতে তিনিই বাবার পরিবর্তে স্থায়ী ইমাম হয়ে যান। আমরাও ধীরে ধীরে বড় চওনা যাবার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি।
একবার আমাদের বড়বাইদ পাড়ার কাফেলা বড় চওনা ঈদের নামাজ ধরতে পারি না। আমাদের রেখেই নামাজ পড়ে ফেলাতে আমাদের মুরুব্বিরা মনখুন্ন হয়। বড় চওনার ইদ্রিস মামারা দু:খ প্রকাশ করেন। আমরা ফিরে এসে আমাদের বাড়ির দক্ষিণে চালা, যেখানে জিন্নাহ ভাই বাড়ি করেছেন, সেই বাছ্রা ক্ষেতে ঈদের নামাজ পড়ি। পরের বছর ঘটে আরেক ঘটনা। যেদিন চাঁদ উঠার কথা, তার আগের দিনই রেডিওতে ঘোষণা দেয় যে পবিত্র শাওয়াল মাসের ঈদের চাঁদ দেখা গিয়েছে। গ্রামের আমরা কেউ চাঁদ খুজে পেলাম না। ছোট কাক্কু মরহুম আব্দুস সালাম তালুকদার বললেন, “আমরা রেডিওর কথা বিশ্বাস করি না। আমরা কেউ চাঁদ দেখি নাই। আমরা আজ ঈদ করবো না।” এদিকে বড় চওনারা রেডিওর কথায়ই ঈদের নামাজ পড়ে ফেললো। আমরা পড়লাম পরের দিন। এভাবে প্রতিছর আমরা আমাদের গ্রামেই ঈদের নামাজ পড়তে থাকলাম। বড়বাইদপাড়ায় হাফেজিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হবার পর থেকে মাদ্রাসা সংলগ্ন ঈদগাহ মাঠেই আমরা নিয়মিত ঈদের নামাজ পড়ি।
আহারে, আগের সেই দিন নেই। নেই আমাদের মুরুব্বিরা। নেই সেই মাওলানা হাতেম আলী। যার কাছ থেকে শিখেছি কিভাবে সবাইকে ভালোবেসে নরম আচরণ করে সবার ভালো বাসা পাওয়া যায়। আমার জীবনে মাওলানা হাতেম আলী প্রভাব প্রবাহিত হোক বাকী জীবন।
৮ মার্চ ২০২৬
ময়মনসিংহ
#স্মৃতি#স্মৃতিকথা#গল্প#বাংলাগল্প#সাদেকুল
ছবিটি কাল্পনিক।
এ আই দিয়ে তৈরি করেছি।
