গরু খোজা
(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
আমি তখন অনেক ছোট ছিলাম। ধরুন, ৬-৭ বছর বয়সের। আমাদের এলাকায় পানির খুব অভাব হতো, বিশেষ করে চৈত্র -বৈশাখ মাসে। প্রতি গ্রামে একটা কি দুইটা নলকূপ ছিলো। তাও অগভীর। এই সময় পানির স্তর অনেক নিচে চলে গিয়ে নলকুপে পানি উঠতো না। বড়বাইদপাড়ার তালুকদার বাড়িতে একটা নলকূপ এবং একটা ইদারা কুয়া ছিল। প্রায় ত্রিশ হাত গভীর ইদারা কুয়া ছিলো। তাও শুকিয়ে যেতো। একমাত্র পানির সোর্স ছিলো মাটির কুয়া বা মাইটা কুয়া। মাইটা কুয়া কাটা হতো চালা ও বাইদের সংযোগস্থলে। খরায় মাঠ ঘাট শুকিয়া চৌচির হয়ে যেতো। গরুর ঘাসের খুব অভাব হতো। তখন চাষের জন্য এক মাত্র লাংগল ছিলো গরুর লাংগল। তাই তখন অনেক গরু পালতো আমাদের এলাকার মানুষ। বলতে পারেন এমন যায়গাটা কোথায়। এটা হচ্ছে টাঙ্গাইল জেলার সখিপুরের বড়বাইদপাড়ায়। খরার সময় গরুগুলো না খেয়ে শুকিয়ে পড়তো। তাই এদেরকে মুক্ত ভাবে ঘুরে ঘুরে খাওয়ার জন্য ছেড়ে দেয়া হতো। মাঠে ঘাস না পেয়ে গরু জংগলে প্রবেশ করে লতা পাতা খেয়ে জীবন বাচাত। তাও আবার পেট পুড়ে খেতে পারতো না সারাদিন ঘুরেও। এমন মুক্ত গরুগুলোকে হলা হতো অরণ্যা গরু। সারাদিন অরণ্যা গরু বনে বনে ঘুরে ঘুরে খেয়ে সন্ধার সময় গোয়াল ঘরে ফিরে আসতো। মাঝে মাঝে দু একটা গরু হারিয়ে যেতো। হারিয়ে যাবার কারণ ছিলো বিবিধ। কোন কোন গরু হাটতে হাটতে দিক ভুলে গিয়ে অন্য গ্রামে চলে যেতো। কোন কোন ষাড় গরু বকনা গরুর সাথে চলে যেতো অন্য গ্রামে। অথবা বকনা গরুই চলে যেতো ষাড় গরুর সাথে। অথবা চোরেরা চুরি করে বেচে দিতো দুরের হাটে। অথবা চুরি করে হাটে নিয়ে জবাই করে মাংস বেচে দিতো।
যেভাবেই হোক, গরু হারিয়ে গেলে গরুর মালিক গরু খোজাখুজি করতো। রাখালরা পরিকল্পনা করে বিভিন্ন দিকে গরু খোজতে বেড়িয়ে পড়তো। যারা গরু পেতো তারা গরুকে প্রকাশ্য স্থানে বেধে রাখতো। যারা খোজতে বের হতো তারা সাথে নিতো শুকনা খাবার, যেমন চিড়া বা মুড়ি। একটা গামছার মাঝখানে চিড়ামুড়ি কোমড়ে বেধে নিতো। সাথে পানি নিতো না। তখন এখনকার মতো প্লাস্টিকের বোতল ছিলো না। গরু খোজতে খোজতে খুধা লাগলে পড়ে গ্রামের বাচ্চাদের কাছে পানি চাইতো। চিড়ামুড়ি খেয়ে রাখাল পানি খেতো। হাতে গরু পিটানোর পাজুন (লাঠি) এবং কোমড়ে চিড়ামুড়ির পোটলা দেখলে আমরা বুঝে নিতাম যে লোকটা গরু খুজতে বেরিয়েছে। গরু খোজা একটা কষ্টকর কাজ। এইজন্য কেউ কাউকে খুজে পেতে দেড়ি হলে বলে, “আরে, আমি তোমাকে কয়দিন ধরে গরু খোজা খুজতেছি। তুমি কোথায়?
২৬ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.
