Ekaler Kabulioala

Ekaler Kabulioala

একালের কাবুলিওয়ালা

(স্মৃতি কথা)

খুব ছোট বেলাতেই আমি কাবুলি দেখেছি। প্রতিবছর কা্বুলিরা আমাদের গ্রামে আসত। আফগানিস্তানের কাবুল থেকে এরা নানা রকম ব্যবসা করতে আমাদের দেশে আসত। এদের গায়ে ঢিলেঢালা কুরতা ও সালোয়ার থাকত। কুরতাকে আমরা কাবলি শার্ট বলতাম। তাদের পাথায় পাগড়ী থাকত। মোটা মোটা গোফ ছিল। গালভর্তি দাড়ি ছিল। শরীরের সাইজ আমাদের বাপ দাদাদের দেকেও দেড় গুণ বড় ছিল। বাম কাঁধে থাকত একটা বিরাট ঝোলা। এই ঝোলার ভিতর কিসমিস, জাফরান, শক্তি বর্ধক বটিকা,  টাকা পয়সা ইত্যাদি থাকত। ডান হাতে থাকত একটা মোটা লাঠি। তারা খুব সাহসী ছিল। উর্দু, হিন্দি, ইংরেজি ও বাংলা একাত্র করে তারা মোটা ও ঘাঢ় গলায় কথা বলত। কাবুলিকে আমরা কাব্লি উচ্চারণ করতাম । কাবলি আসলে দাদা বাইরবাড়ি গাছতলায় টুলে অথবা পাটিতে বসতে দিতেন। দাদা তাদের সাথে নানারকম গল্প করতেন। আমি কিছু কিছু বুঝতাম। আমি দাদার পিঠ ঘেষে দাঁড়িয়ে কাবলির দিকে চেয়ে চেয়ে তার কথা বলার ভঙ্গি দেখতাম। দাদা শক্তি বর্ধক বটিকা কিনতেন। মুধুর মত ঘ্রাণ ছিল বটিকার। আমার খেতে ইচ্ছা করত। যুবক শ্রেণীর ছেলেরা কাবলিকে একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে গোপনে কি যেন বলতেন। পরে কাবলির কাছ থেকে সেই অনুযায়ী গুড়া ঔষধের পুড়িয়া নিতেন।  কোন কোন কাবলি দাদাদের সাথে চুক্তি করতেন জাহাজে করে বোম্বে হয়ে পবিত্র হজ্জ পালন করিয়ে দিবেন। বোম্বে থেকে করাচি নিয়ে হজ্জের কার্ড সংগ্রহ করিয়ে দিতেন। বিনিময়ে তারা একটা ফি নিতেন। কোন কোন হজ্জ গমনেচ্ছুক কার্ড না পেয়ে বোম্বে থেকেই ফেরৎ আসতেন। তাদেরকে কেউ কেউ ‘বোম্বাইয়া হাজী’ বলতেন। কেউ কেউ হজ্জে যেতে ইচ্ছা করতেন । শুনিয়ে বেড়াতেন হজ্জে যাবেন। কিন্তু কোন উদ্যোগ নিতেন না। অনেকে তাদেরকে তিরস্কার করে বলতেন ‘যামু হাজী’।

কাবলিদের নিয়ে আরও জানতে পারলাম ক্লাস সেভেনে উঠে। বাংলা পাঠ্য বইয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত গল্প ‘কাবুলিওয়ালা’ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইনসান স্যার বাংলা পড়াতেন। এই গল্পে রবীন্দ্রনাথ কাবলিদেরকে কাবুলিওয়ালা বলেছেন। গল্পের কাবুলিওয়ালাদের বর্ণনা পড়ে আমার ছোটবেলার কাবলিদের কথা মনে পড়ত। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর আমি কাবলিদের দেখিনি। খুব সম্ভব বাংলাদেশ সরকার আফগানিস্তানের কাবলিদের প্রবেশ কড়াকড়ি করেছে। যেটা পুর্বপাকিস্তান সরকারের ছিল না। কাবুলিওয়ালা গল্পের ৫ বছর বয়সের মিনি নানান রকমের কথা নিয়ে তার বাবার কাছেই ঘুরঘুর করত। তার পায়ের কাছেই হাটু গেড়ে বসে হাত তালি দিয়ে ‘আগডুম বাগডুম’ ছড়া বলত। মিনির বাবা তাতে বিরক্ত হয়ে ভোলানাথের সাথে খেলতে যেতে বলতেন। এই অংশটুকু পড়ানোর সময় ইনসান স্যার তাঁর বাচ্চাদের সাথে তুলনা করে গল্পের ব্যখ্যা দিতেন। বলতেন “আমার বাচ্চাও আমার কাছে দাঁড়িয়ে আমার পিঠের সাথে ঘষাঘষি করে। সরিয়ে দিলেও আবার এসে পিঠ দিয়ে পিঠ ঘষতে থাকে।” গল্পের মিনি ও ইনসান স্যারের বাচ্চার কথা শুনে আমার ছোট বেলার সাথে মিল খুঁজে পেয়ে উৎফুল্ল হতাম। মনে পড়ত বাবা যখন খালি গায়ে পিড়িতে অথবা টুলে বসে কোন কাজ করতেন তখন তিন চার বছর বয়সের আমার ছোট বোন সোমেলাও খালি গায়ে বাবার পিঠ ও হাত ঘেষে দাঁড়িয়ে ঘষাঘষি করত। আমার হিংসা হত। আমি তাকে সরিয়ে দিয়ে নিজে ঘষাঘষি করতাম। বাবার কাজে বাধা পরত। বাবা বিরক্ত হয়ে হাত দিয়ে আমাদেরকে ঠেলে দিতেন। আমরা আবার আসতাম পিঠে ঘষাঘষি করতে। ক্লাস সেভেনে কাবুলিওয়ালা গল্প পড়ে কাবলিদের সম্পর্কে আমার ধারনা আরেকটু বাড়ল।

আমার চোট মেয়ে ডাঃ দীনার বয়স যখন দুই-তিন বছর ও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বড় মেয়ে মুনার বয়স যখন পাচ-ছয় বছর তখন তারাও আমার গা ঘেষতে কাড়াকাড়ি করত। আমি চেয়ারে বসে ক্লাশ নোট লিখতাম, গবেষণা নিবন্ধ লিখতাম তাতে আমার অসুবিধে হত। সড়িয়ে দিলেও বার বার আসত। মনে মনে ভাল লাগত। কাবুলিওয়ালার মিনির কথা মনে পড়ত। ঐ সময় দেশে টেলিভিশনে ডিস চ্যানেল ছিল না। শুধু বাংলাদেশ টেলিভিশন ও কলকাতা দুরদর্শণ চ্যানেল দেখা যেত ইনডোর এন্টিনা দিয়ে। রাতে দুরদর্শনে একটা সাদাকালো সিনেমা দেখলাম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প অবলম্বনে সিনেমা ‘কাবুলিওয়ালা ‘। সেদিন বাসায় একা ছিলাম। একটানা দেখে শেষ করলাম। ছবি বিশ্বাস কাবুলিওয়ালা ‘রহমতের’ চরিত্রে অভিনয় করছিলেন। তার অভিনয় দেখে মনে হল তিনিই সত্যিকারের ‘রহমত’। রহমত ছোরা দিয়ে এক বদমাসকে ঘা দিয়ে আট বছর জেল খেটেছিল বিদেশের বাড়িতে। পাচ বছর বয়সের তার মেয়েকে রেখে এসেছিল মায়ের কাছে কাবুলে। আসার সময় মেয়ের হাতে ছাই মেখে কাগজে একটা হাতের ছাপ নিয়ে এসেছিল। আট বছর জেল খেটে ছাড়া পাবার পর রহমত কিছু পেস্তাবাদাম ও কিসমিস নিয়ে মিনিকে দেখতে গিয়েছিল। সেদিন মিনির বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল। সে ভেবেছিল মিনি সেই পাঁচ বছর বয়সের মিনির মতই ‘ও কাবলিওয়ালা’ বলে ডাকতে ডাকতে আসবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল সে এক বড় লাজুক নববঁধু। কাবলি ভাবল কাবুলে তার মেয়েটিও এখন বড় হয়ে বিয়ের যোগ্যভয়ে গেছে এই আট বছরে। কুরতার পকেট থেকে সেই ছোট্ট হাতের ছাপটি বের করে টেবিলের উপর মেলে ধরে অশ্রু ফেলল। লেখক তাকে দেশে ফিরে যাবার জন্য হাতে কিছু টাকা গুছে দিল। মিনির বিয়ের ধুমধাম করার খরচ কিছুটা কাটছাঁট করে এই টাকা দেয়া হয়েছিল। ধুমধাম কিছুটা কম হওয়াতে পরিবারের লোকজন একটু মনখুন্ন ছিল। কিন্তু রহমতকে দেশে চলে যাবার ব্যবস্থা করে দিতে পারার জন্য মিনির বাবা প্রফুল্ল ছিলেন।

আট বছর দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে চাকরি করেছি । সন্তানদের পড়াশুনার জন্য ফ্যামিলি ঢাকায় রেখেছিলাম । আমি একাই দিনাজপুর থাকতাম ডরমিটরিতে হাউজে । সেই ডরমিটরি হাউজে আরো ১০-১২ জন শিক্ষক থাকতেন । প্রতিরাতে চেম্বার থেকে ফিরে একসাথে রাতের খাবার খেয়ে ফ্যামিলির সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করতাম। ছোট মেয়ে দীনা, বড় মেয়ে মুনা ও স্ত্রী স্বপ্নার সাথে কথা শেষ করে ঘুমিয়ে পড়তাম। ডাঃ জাকিউল দরজা খোলা রেখে শুয়ে শুয়ে অনেক্ষণ স্কাইপিতে বাচ্চাদের সাথে ভিডিও চ্যাট করতেন। আমার রুমের ওয়ালের উপর ভেন্টিলেটর ছিল। তাদের সবকথাই আমার রুম থেকে শোনা যেতো। তার ছোট মেয়ে তখনো কথা বলতে শিখে নি। শত বার আব্বু আব্বু করতেন মেয়ের মুখে আব্বু বের করার জন্য। একসময় তার মেয়ে কথা বলতে শিখে। বড় হতে থাকে। দুই মেয়ের সাথেই তিনি ভিডিও চ্যাট করতেন। দুই মেয়ে মারামারি বেধে দিলে তিনি আদরের সাথে কথা বলে থামিয়ে দিতেন। সবই হতো স্কাইপিতে। শুধু ছুয়ে দেখতে পারতেন না। তার ফ্যামিলি ঢাকার ধানমন্ডিতে দামী বাড়ি ভাড়া করে থাকত।

ডাঃ জাকিউল আমার গল্প শুনে মজা পেতেন। তিনি যখন সাম্প্রতিক সময়ের কোন চমকপ্রদ ঘটনার বর্ণনা করতেন, বর্ণনার শেষে   আমি এটার মতই এরচেয়েও বেশী একটা চমকপ্রদ পুর্বের ঘটনার বর্ণনা দিতাম। ডাঃ জাকিউল বলতেন “সাদেক ভাই অনেক মজার মজার ঘটনা মনে করে গল্পাকারে সুন্দর করে বলতে পারেন। আপনি এগুলি গল্পাকারে লিখে রাখতে পারেন। পড়ে অনেকে মজা পাবে।” আমি বলতাম “লিখতে বসলে গল্প মনে আসে না। কিন্তু অনুরূপ একটি ঘটনা ঘটলে আগের ঘটনা মনে পড়ে যায়।“

মাঝে মাঝে করিডোরে দাঁড়িয়েও গল্প করতাম। একদিন দেখলাম ডাঃ জাকিউলের টিশার্ট-এ একটা স্কচ ট্যাপের কোণাকাটা টুকরা লেগে আছে। আমি ময়লা মনে করে তুলে ফেলতে হাত দিলাম। আমার হাত চেপে ধরে ডাঃ জাকিউল বললেন “না, না, না, সাদেক ভাই, এটা তুলবেন না।”

-কেন? এটাতো স্কচ ট্যাপের টুকরা মনে হচ্ছে।

-আমি এবার ঢাকা থেকে ফেরার সময় হঠাৎ আমার মেয়েটা তার রুম থেকে স্কচ ট্যাপের এই টুকরাটা কেটে এনে আমার টিশার্ট-এ লাগিয়ে দিয়ে বলে ‘এই ট্যাপটা লাগিয়ে দিলাম। যতদিন এই ট্যাপটা লাগানো থাকবে ততদিন আমাকে তোমার মনে থাকবে। ‘

আমি আবার এই ট্যাপ নিয়েই ঢাকায় ফিরতে চাই।

-আপনার মেয়ে কয়জন?

-দুইজন। এই বড়।

-এর বয়স কত?

-প্রায় ছয় বছর।

-আপনি একালের একজন কাবুলিওয়ালা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাবলিওয়ালা গল্পের রহমতের কথা আমার মনে পড়ল। মনে হল আমার যদি ক্ষমতা থাকতো আমি এই কাবলিওয়ালাকে বদলী করে ঢাকায় তার মেয়ের কাছে নিয়ে যেতাম। কিন্তু আমার সেই ক্ষমতা নেই। আমিও যে একালের আরেক কাবুলিওয়ালা।

২৪/২/২০১৮ খ্রি.

#কাবুলিওয়ালা #স্মৃতি #গল্প #সাদেকুল

কাল্পনিক ছবিটি একেছি জেমিনি এ আই টুল দিয়ে ।