seminar-hall

প্রথম দেখা সেমিনার হল

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৭৭ সন। মার্চ মাসে এসএসসি ফাইনাল পরীক্ষা দিতে করটিয়া গিয়েছিলাম। আমাদের স্কুল ছিলো ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বাটাজোর গ্রামে বাটাজোর বি এম হাই স্কুল। পরীক্ষার কেন্দ্র ছিলো টাংগাইলের বাসাইল উপজেলার করটিয়ায় জমিদার বাড়ি সংলগ্ন মরহুম ওয়াজেদ আলী খান (চান মিয়া) প্রতিষ্ঠিত হাফেজ মাহমুদ আলী ইনস্টিটিউটে। পরীক্ষা উপলক্ষে আমি ভাতকুরা গ্রামে এক বাড়িতে পেইং গেস্ট ছিলাম। পাশের বাড়িতে আমার ফুফাতো ভাই মরহুম আসাদুজ্জামান তালুকদার (জিয়াউল) ভাই লজিং থেকে করটিয়া সাদত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অনার্স পড়তেন। তিনিই আমাকে ২০ দিনের জন্য পেয়েইং গেস্টের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। পাশের বাড়িতে খেলেও আমি থাকতাম জিয়াউল ভাই থাকার বাংলাঘরে। পড়ার ফাকে ফাকে ভাইর সাথে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে আলাপ আলোচনা করতাম। তিনিই আমাকে করটিয়া নিয়ে যেতেন এবং নিয়ে আসতেন। তিনি আমার থেকে প্রায় চার বছরের বড় ছিলেন। একদিন বললাম, “ভাই ছোট বেলা থেকেই করটিয়া কলেজের নাম শুনি। কাজেম উদ্দিন নানাও এই কলেজ থেকে বিএ পাস করেছিলেন। আমাকে আপনার কলেজটা একদিন ভালো করে দেখাবেন।” জিয়াউল ভাই পরীক্ষার অফ ডে-তে একদিন আমাকে কলেজ দেখাতে নিয়ে গেলেন।

এসএসসি পাস করার পর হয়তো এই কলেজেই পড়তে হবে, এই স্বপ্ন নিয়ে ভাইর সাথে কলেজ দেখতে গেলাম। জীবনে আমি প্রথম কলেজ দেখেছি তথকালীন মুজিব মহাবিদ্যালয়, তথকালীন কাদের নগর, সখিপুর। বর্তমানে যার নাম সখিপুর সরকারি মহাবিদ্যালয়। ওটা তখন একটা টিনশেড ঘর ছিলো। এরপর দেখি ভালুকার বাটাজোর গ্রামের সোনার বাংলা মহাবিদ্যালয়। ওটাও টিনের ঘর ছিলো। তারপর দেখি কালিহাতির আউলিয়াবাদ গ্রামের আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ।

ওটাও টিনের ঘর ছিলো।

করটিয়ায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী সরকারি সা’দত কলেজ ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয। করটিয়ার জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নী তাঁর পিতামহ সাদাত আলী খান পন্নীর নামে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন। সাদত কলেজ ছিলো বিল্ডিং। উন্নত কলেজ। ভবিষ্যতে হয়তো এই কলেজেই পড়তে হবে এই চিন্তাভাবনা ধারণ করে ভাইর সাথে ঘুরে ঘুরে কলেজ দেখলাম। বিভিন্ন কক্ষে গিয়ে গিয়ে সেই কক্ষে কি ধরনের ক্লাস তা বলে দিচ্ছিলেন। বিজ্ঞানের প্রতি আমার খুব আগ্রহ ছিলো। ভাইকে বললাম, “বিজ্ঞান ভবন দেখালেন না?” তিনি বিজ্ঞান ভবন দেখালেন। একটা বড়সড় কক্ষে নিয়ে গিয়ে বললেন, “এটা সেমিনার হল। এখানে সেমিনার হয়।”

আমি “সেমিনার” কী, “সেমিনার হল” কী, কিছুই বুঝলাম না । ভাইর কাছে ভয়ে জিজ্ঞেস করারও সাহস পেলাম না। ভাই যদি আমাকে বোকা মনে করে বলে ফেলেন, “এই পাহাইড়া, এখন পর্যন্ত সেমিনার কী তা জানো না?”

সেমিনার কী, কিভাবে হয় তা ভালো করে দেখলাম এবং বুঝলাম এইচ এস সি পাস করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস ভর্তি হয়ে পড়ার সময়। আমি ছাত্র অবস্থায়ই নিয়মিত সাপ্তাহিক সেমিনারে শিখার জন্য উপস্থিত থাকতাম। পোস্ট গ্রাজুয়েট করার পর শিক্ষকতা করার সময় জার্নাল প্রেজেন্টেশন সেমিনারের একটানা আমি ৫ বছর কো-অর্ডিনেটর ছিলাম। গত বছর ঢাকায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কনফারেন্স এর একটি সেমিনারে আমি চেয়ারম্যান ছিলাম। কে বলবে আমি পাহাইড়া! এই বয়সেও আমি কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ এর প্রতিটি সেমিনারে উপস্থিত থাকি। সেমিনারের ভিডিও রেকর্ড করে ইউটিউব ও ফেইসবুকে পোস্ট করি নিয়মিত। যারা বাস্তবে সেই সেমিনারে উপস্থিত হতে পারে না তারাও নেট থেকে আমার রেকর্ড করা সেমিনার দেখে নেয়। জিউউল ভাইকে মনে পড়ে।

২৯ জুন ২০২৬ খ্রি.

ময়মনসিংহ ছবি কাল্পনিক: এ আই দিয়ে তৈরি।