Category Archives: Writings

indrajani

Indrajani

ইন্দ্রজানী
(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ইন্দ্রজানীকে আমরা ইন্দাজানী বলতাম। ইন্দাজানীতে তেমন কিছুই ছিল না। ইন্দাজানীর হাট ছাড়া এটার তেমন গুরুত্ব ছিল না। ছিল না কোন হাই স্কুল, ছিল না কোন গোলাঘর (দোকানঘর)। এখানে বর্ষাকালে অস্থায়ী হাট বসতো প্রতি মঙ্গলবারে। এটা বসতো পাহাড় ও ভরের সংযোগস্থলে। পাহাড়ের পর নিচু সমতলভুমিকে আমরা ভর অঞ্চল বলতাম। ভরের বড় বড় মহাজন বড় বড় নৌকা নিয়ে আসতেন দামী দামী মালামাল নিয়ে। ক্রেতারা আসতেন ছোট ছোট নৌকা নিয়ে সদাই করতে (কেনাকাটা করতে)। পাহাড়ের ব্যবসায়ীরা মাল নিয়ে যেতেন গুরুর গাড়ী করে। পাহাড়ের বাইদে (নিচু ভুমি) প্রচুর পাট চাষ হতো। পাহাড় থেকে রফতানি হতো পাট, কাঠাল, সবজি, লাকড়ি ইত্যাদি। ভৌরা ব্যবসায়ীরা নিয়ে আসতেন সিলভারের পাক পাতিল, নারিকেল, ইলিশ, কাপড়-চোপড় ও অন্যান্য শহর থেকে আনা দামী দামী জিনিষপত্র। নারায়ণগঞ্জ-এর ব্যবসায়ীরা নদী পথে এসে এখান থেকে পাট ও কাঠ নিয়ে যেতেন। ভর অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা বরিশাল অঞ্চল থেকে নারিকেল নিয়ে এসে এই হাটে বিক্রি করতেন। এলেংগার পাইত্তাগণ(পাটির কারিগর) তাদের হাতে বুনুনো পাটি এখানে এনে বিক্রি করতেন। বল্লার ও কালিহাতির তাতী, কুমার ও কামারগণ তাদের হাতের তৈরি কাপড়, মাটির পাতিল ও দা, বটি, কোদাল, খোন্তা এখানে এনে বিক্রি করতেন। ভুয়াপুর ও গোপালপুর থেকে আসতো আখ বা কুশাইর । বর্ষাকাল ছাড়া আমরা ইলিশমাছ পেতাম না। বাবা পাট বিক্রি করে ইয়া বড় বড় ইলিশ মাছ কিনে আনতেন ইন্দাজানী হাট থেকে। আস্ত ইলিশ ও নোনা ইলিশ দুই প্রকারই আনতেন। মা আস্ত ইলিশ  বড় বড় ডাটা দিয়ে রান্না করতেন। নোনা ইলিশ বড় বড় কাচের বৈয়ামে সংরক্ষণ করে রাখতেন। পরে শিবচরন (চিচিংগা) দিয়ে ভাজি করতেন। বাবা আমাদের জন্য মোটা মোটা কুশাইর আনতেন। কুশাইরের দুইদিকে ইলিশ ও সদাই ঝুলিয়ে কাঁধে নিয়ে আসতেন। পদ্মপাতার টোবলায় (পেঁচানো প্যাকেট) টসটসে পেঁচানো জিলাপা (জিলাপি) এনে আমাদের হাতে দিতেন। আমরা সবাই ভাগ করে খেতাম। ইন্দাজানী হাটের জিলাপির স্বাদ আমি আর কোন জিলাপি খেয়ে পাই নি। মা-বাবাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করতাম। কিন্তু খেতেন না। আমি মনে করতাম মা-বাবারও জিলাপি খেতে মন চায়। কিন্তু বড় হয়ে যাওয়াতে খেতে লজ্জা পান। আমি বাবা হবার পর বুঝেছি তা হয়তো হতো না। আমাদের খাওয়াইয়া তারা জিলাপির স্বাদ পেতেন। সবাইকে বেশী দিয়ে আমি কম খেতাম।

কোথাও পাকা রাস্তা ছিল না। সস্তায় নৌকা যোগাযোগের ফলে এখানে প্রতি মঙ্গলবার পাহাড় ও ভরের মানুষদের একটা মিলন মেলা হতো। ভৌরাগণ হাটুরা নৌকায় ইন্দাজানী নেমে পায়ে হেটে পাহাড়ে তাদের আত্বীয়বাড়ী যেতেন। আর পাহাইড়াগণ পায়ে হেটে ইন্দাজানী হাটে গিয়ে হাটুরেদের সাথে নৌকাযোগে তাদের ভরের আত্বীয়স্বজনের বাড়ী যেতেন। সাথে নিয়ে যেতেন স্ব স্ব অঞ্চলের উৎপাদিত বিশেষ বিশেষ স্বস্য ও ইন্দাজানী হাটের জিলাপি। পদ্মপাতার প্যাকেট পেঁচানো হতো ছেতুকা দিয়ে (কলাগাছের খোলের আঁশ)।

এই যে এত স্বাদের জিলাপা ও এত দামী দামী জিনিস যে হাট থেকে আনা হয় একদিন সেই হাটে যাওয়ার বায়না ধরলাম বাবার কাছে। একটা কথা বলে রাখি। আমরা ভাইবোনরা ৫ জন। কখনো আমরা বাবাকে বলিনি যে “বাবা আমার জন্য এটা আনবেন সেটা আনবেন।” বলতে হতো না। না বলতেই তিনি তার স্বাধ্যমত জামাকাপড় ও খাওয়ার জিনিস কিনে আনতেন। বুর (বুবু/আপার) যখন বিয়ে হয় তখন আমি খুব ছোট ছিলাম। আমার নাতী তানভীরের সমান হয়তো ৪/৫ বছর। দুলাভাইর চেহারা ছিল আমাদের এলাকার সব দুলাভাইর চেয়ে সুন্দর। লিক লিকে লম্বা। সব সময় সাদা ফিট ফাট শার্ট পরতেন। দুলাভাইর বাড়ী ভর এলাকায় আমজানী গ্রামে। এই দুলাভাইও ইন্দাজানী হাট হয়ে আমাদের বাড়ী আসতেন আমাদের জন্য জিলাপা ও রসগজা নিয়ে। রস গজাও আমার খুব পছন্দের ছিল। দুলাভাই আসলেই মার নির্দেশে আমাদের পোষা সুন্দর মোরগটি তিন চাইর বাড়ী দৌড়িয়ে হয়রান করিয়ে যখন খেরের (খর) পালার গোড়ায় আশ্রয় নিত তখন ধরে ফেলতাম। আর ওটা উচ্চ স্বরে কঅক কঅঅক করতো তখন মনে মনে বলতাম ”কক কক করিস না, দুলাভাই এসেসে, তারজন্য এতদিন অপেক্ষা করছিলাম, আইজ তরে রান্না করে খামু। সারাবাড়ী বাসনা ( ঘ্রাণ) করবে।”

একবার বাবার সাথে ইন্দাজানী হাট দেখতে গেলাম। বড়বাইদপাড়া নাপিতের চালা, জিতাশ্বরি পাড়া, ছোট চওনা, ঘাট চওনা, ভুয়াইদ ও ভাতগড়া হয়ে যেতে হতো ইন্দাজানীর হাটে। আমাদের বড়বাইদ পাড়া থেকে ইন্দাজানী উত্তর -পশ্চিম দিকে, এই ৫/৬ কিলোমিটার পথ হবে। পায়ে হেটে যেতে হতো। ছোট চওনার পাহাড়ের পাদদেশে কয়েকটা ছোট ছোট ঝর্না ছিল। স্বচ্ছ পানি প্রবাহিত হতো। ওটা দেখলেই আমার পিপাসা হতো। আমি অঞ্জলি ভরে ঝর্নার পানি পান করতাম। ঝর্নার সাথেই ছিল চোরাবালি। একবার পাড়া দিলে কাঁধ পর্যন্ত ঢুকে আটকা পরতো যে কেউ। এক রাতে কয়েকজন আর্মি আসামী ধরে এই চোরাবালির নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। আসামীরা এই এলাকার হওয়াতে সব জানতেন। এখানে এসেই সব আসামী একযোগে গোলমাল করে চোরাবালি ঘুরে দৌড়িয়ে তেলধারার (তৈল ধারা) বনে পালিয়ে যান। আর্মিরা মসৃন বালি মনে করে সোজা চোরা বালির উপর দিয়ে দৌড় দেন আসামী ধরার জন্য। ফলে তিনজন আর্মি চোরাবালিতে আটকা পড়ে। বাকীরা তাদেরকে উদ্ধার করতে করতেই কর্ম শেষ।

যা বলছিলাম। ইন্দাজানীর রাস্তা একেক যায়গায় একেক রকম ছিল। জংগলের ভিতরকার রাস্তা কর্দমাক্ত ও পিচ্ছিল ছিল। বাইরের রাস্তা শুকনো হলেও বাইটাবাছ্রায় ভরা ছিল। সপ্তাহে মাত্র একদিন লোক যাতায়াত করাতে বাইটা বাছ্রার পরিমান বেড়ে যেতো। বাইটাবাছ্রার নাম যে প্রেমকাটা এটা আমার স্ত্রী স্বপ্নার কাছে শুনেছি। প্রথম যেদিন এসেছিল আমাদের বাড়ী সে শাড়ী থেকে বাইটা বাছ্রা বাছতে বাছতে বলছিল “তোমাদের পাহাড়ের রাস্তা প্রেম কাটায় ভর্তি। শাড়ী ভর্তি প্রেমকাটা। এগুলি বাছতে বাছতেই আমার ঘন্টা কেটে গেলো। ”
– প্রেমকাটা মানে?
– এইযে এইগুলি।
– এইগুলি তো বাইটাবাছ্রা।
– আমরা এগুলিকে প্রেমকাটা বলি।

যেসব মাঠ শুকনো এবং আবাদ করা হয়না সেগুলিতে এক প্রকার ঘাষ গজিয়ে মাঠ সবুজে ভরে যায়। এগুলিতে হাল্কা কাটাযুক্ত দানা হয়। পাড়িয়ে যাওয়ার সময় হাটুর নিচের কাপড়ে আটকে যায় এই কাটা। জার্নি শেষে এই কাটা বাছতে হয়। না বাছলে পায়ে কুটকুটি কামড়ায়। ছোট বেলা বাছ্রা ক্ষেতে শুয়ে থাকতে আমার ভাল লাগতো। বাচ্ছ্রা ক্ষেতের উপর দিয়ে ঢালুর দিকে গড়িয়ে পড়তে বেশ মজা পেতাম। স্কুল মাঠ থেকে আমরা দল বেঁধে মাঝে মাঝে বাইটাবাছ্রা তুলে পরিস্কার করতাম।

প্রথম ইন্দাজানীর হাটে গিয়ে একটু বেশী ভালোলেগেছিল এই কারনে যে এটা বড় চওনা ও কচুয়ার হাট থেকে বেশী জমজমাট ছিল। বাবা প্রথমেই আমাকে একটি রসগোল্লার দোকানে নিয়ে গিয়ে একটি টুলে বসিয়ে দোকানিকে বললেন আমাকে পেট ভরে রসগোল্লা খাওয়াতে। আমি ভাবলাম আজ পেট ভরে ১০/১২ টা রসগোল্লা খাব। দুইটি খাবার পরই পেটের তলার দিকে মোচড় দিয়ে উঠলো। বললাম “আর খেতে পারব না।” তারপর বাবার সাথে পরামর্শ করে একটা কাজ সেরে নিয়ে হাল্কা হলাম। বাবা আমাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ইন্দাজানী হাট দেখালেন। অনেক দোকান কিন্তু কোন গোলাঘর নেই। সব দোকানই অস্থায়ী। তাবু গেড়ে গেড়ে দোকানের স্থান করা হয়েছে। পশ্চিম-দক্ষিন দিকে ভর অঞ্চল থেকে আশা নৌকাগুলি সারিবদ্ধভাবে বাঁধা লগি গেড়ে অথবা নোংগর ফেলে। উত্তর -পুর্ব দিকে পাহাড় অঞ্চল থেকে গরুর গাড়ি, গাড়ীর বলদ, মহিষ ও ঘোড়া বেঁধে রাখা হয়েছে। তারা কেউ কেউ জাবর কাটছে, কেউ কেউ ভুষি ও কুড়া খাচ্ছে। হারমোনিয়ামের সুরে মুগ্ধ হয়ে গোলাকার সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো মানুষের কাতারে দাঁড়ালাম। মনমুগ্ধকর গান শুনলাম। গান শেষে ক্যানভাচার বনাজি ঔষধ বিক্রি করা শুরু করল। আমরা চলে গেলাম হাটের ভিতর। আবার ঘুরে ঘুরে বাকী হাটটুকু দেখলাম। বাবা ফ্রিভাবে কেনাকাটা করার জন্য বাবার পরিচিত একটা দোকানে আমাকে বসিয়ে চলে গেলেন হাটের ভিতর। এটা ছিল জামা কাপড়ের দোকান। দোকানে ঝুলানো শার্টের দিকে আমার চোখ পড়লো। ইতিপূর্বে আমি কোনদিন নিজে দেখে পছন্দ করে জামাকাপড় কিনি নি। বাবা যা কিনে আনতেন তাই পরেছি। তাই পছন্দ হয়েছে। এইবার সুযোগ এসেছে পছন্দ করে কেনার। স্থির করলাম এই আকাশী রঙের শার্টটা আমি কিনবো। বাবা বেগভর্তি বাজার কিনে এসে বললেন “চলো বাজান।” আমি কোন সাড়া দিলাম না। কয়েকবার ডাকলেন। সাড়া দিলাম না। হাতে ধরে টানলেন। মোরচামুর্চি করলাম। কিছু বললাম না। বাবা বললেন “বাজান, কি হয়েছে?” আমি আকাশী রঙের শার্টটি দেখিয়ে বললাম “এটা নিব।” এটা ভালো শার্ট না বাবা আমাকে বুঝানোর চেষ্টা করছিলেন। যতই চেষ্টা করছিনেন ততই নেয়ার জন্য আমার ইচ্ছাশক্তি বাড়ছিল। বর্গা হাট থেকে এর চেয়েও ভালো শার্ট কিনে দিবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দিলেন। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল। এক সময় তিনি আমাকে একটু বস বলে চলে গিয়ে কিছুক্ষণ পরেই ফিরে এলেন। আমি নতুন শার্ট গায়ে দিয়ে পুরাতন শার্ট বেগে ভরে ইন্দাজানী হাট থেকে ফিরলাম। বাবা কেন কিছুক্ষণের জন্য কোথাও গেলেন তা বড় হয়ে আমি বুঝতে পেরেছি। সেই থেকে এই পর্যন্ত যতবার এই কথা মনে করি ততবার আমি কষ্ট পাই এই মনে করে যে না বুঝতে পেরে আমি বাবাকে শার্ট কেনার জন্য কষ্ট দিয়েছি। বাজার করার আগে আমি শার্ট কেনার আবদার করলে সাথে সাথেই তিনি শার্ট কিনে দিতেন। এর চেয়েও বড় কষ্ট আমি বাবাকে দিয়েছি কি না আমার মনে নেই।

এরপর আমি অনেকবার ইন্দাজানি হাটে গিয়েছি। হাট থেকে ফেরার সময় প্রথমেই একটা খাল পাড় হতে হতো গুদারা (খেয়া) দিয়ে। আমি, বাবা ও আমার সুন্দর দুলাভাই ছিলাম গুদারায়। ছোট চওনার সমশের হাজী সাবও ছিলেন সেই গুদারায়। তিনি খুব প্রভাবশালী লোক ছিলেন। তিনি কয়েকবার ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান বা পঞ্চায়েত ছিলেন। তার মেঝো ছেলে শওকত আলী দাদা নাম করা পল্লী ডাক্তার ছিলেন। ময়মনসিংহ লিটন মেডিকেল স্কুল থেকে তিনি এল এম এফ না পাশ করেই চলে গিয়ে এলাকায় ডাক্তারি করেন। ভালো প্রাক্টিস ছিল। তার বড় ভাই হামি (আ: হামিদ) দাদা আলাদা পাকে খেতেন একই বাড়িতে। যাহোক, গুদারা থামিয়ে শওকত ডাক্তার সাব গুদারায় উঠলেন। হাতে বিড়াট একটা ইলিশ মাছ। সমশের হাজী সাব বললেন
– এই মাছটা কত টাকা?
– ‘এত’ টাকা।
– কয়টা মাছ কিনছস?
– একটা।
– কার জন্য?
– আমাদের জন্য।
– হামির জন্য কিনস নাই?
– না।
– ক্যান?
– ভুল হয়ে গেছে।

এরপর হাজী সাব মাছটি নিয়ে গুদারা থেকে ছুড়ে মারলেন প্রবাহমাণ খালের পানিতে। রাগান্নিত হয়ে ছেলের দিকে তাকালেন। উপস্থিত যাত্রীরা হাজী সাবকে বুঝিয়ে শান্ত করলেন।

গুদারা থেকে নেমে চলার পথে বাবার কাছ থেকে এই ঘটনার মাহাত্ব বুঝতে পারলাম। হাজী সাহেব ডাক্তার ছেলের সাথে এক পাকে খেতেন। বড় ছেলে হামিকে রেখে কি করে তিনি ইলিশ মাছটি খাবেন!

আমরা চলতে লাগলাম ভাতগড়ার পিচ্ছিল পথ দিয়ে। সামনে বাবা, মাঝে দুলাভাই, পিছে আমি। বাবা বার বার সতর্ক করে দিচ্ছিলেন যাতে পিছলা না পড়ি। দুলাভাইর গায়ে দবদবে পরিষ্কার সাদা শার্ট ছিল। পরনে টুইস লুঙ্গী। খুব ভালো লাগছিলো আমার। আগামীকাল পালা মোরগটা জবাই হবে। হটাৎ দেখলাম দুলাভাই নাচের ভঙ্গী করে দড়াম করে পিছলা খেয়ে রাস্তায় পাতালি হয়ে পড়ে গেলেন। কাদায় শরীর লেটাপেটা। আমি হাততালি দিয়ে হাসতে লাগলাম। এটা আমাদের এলাকার নিয়ম। কেউ পিছলা খেয়ে পরে গেলে আমরা তাকে উদ্ধার না করে হাততালি দিয়ে হাসতে থাকি। আমার হাসি আর থামে না। বাবা দুলাভাইকে ধরে উঠালেন। আমাকে হাসতে বারন করলেন। আবার হাটা শুরু হলো। থেকে থেকেই আমি হেসে উঠছি। আমার হাসির শব্ধ শুনে বাবারও হাসি পেলো। তিনি মেয়েজামাইর কান্ড নিয়ে হাসতে পারেন না। তাই হাসি চেপে রাখলেন। এক সময় ফেকৎ করে হেসে দিয়ে আমাকে ধমক দিলেন “এই গাবর, হাসিস না।” গাবর কথার অর্থটা আমার জানা নেই। তবে বাবা যখন আদরের সাথে আমাকে ধমক দিতেন তখন বলতেন “গাবর!”

আশির দশকের দিকে গারোবাজার-সখিপুর-হাটুভাংগা-মীর্জাপুর পাকা রাস্তা হওয়ার পর ইন্দাজানীর হাটের কদর কমে যায় আমাদের পাহাড়িয়াদের কাছে। আমিও লেখাপড়া ও চাকুরীরর জন্য সেই থেকে দূরে আছি। ঐ দিকে আর যাওয়া হয় না। ইন্দাজানীর সামসুল হক পান্না মামা চার বার আমাদের কাকরাজান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হয়েছেন। ঐ দিকে নাকি অনেক উন্নতি হয়েছে। ইউনিয়ন অফিস কাকরাজান থেকে ইন্দাজানীর কাছে গড়বাড়ী এনেছেন। ঐ এলাকার অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু আমার গ্রামের বড়বাইদপাড়া সেই আগের মতো পিচ্ছিলই রয়ে গেছে। জনপ্রতিনিধিগনকে দাওয়াত দিলে পিছলা খাওয়ার ভয়ে  আমাদের পাড়ায় আসেন না। কিন্তু আমাদেরকে পিছলা খেতেই যেতে হয়। কারন, ওখানেই আমি জন্মেছি, ওখানেই আমার নাড়ী মাটি চাপা দিয়ে রেখেছেন, ওখানেই আমার বাবা-মা আপনজন শায়িত। ওখানেই আপনজনরা থাকেন। আমাকেও ওখানেই শায়িত হতে হবে। আজ লিখে রাখলাম আমার স্মৃতিবিজড়িত ইন্দাজানীর কিছু স্মৃতি আমার স্মৃতির পাতায়। আপনাদের ইন্দ্রজানী।
তারিখ: ২৫/১১/২০১৮ ইং
স্থান : ময়মনসিংহ -কিশোরগঞ্জ জার্নি।

(লেখাটি আমার বর্নিল অতীত বইয়ে প্রকাশিত হয়েছে)

ek-takar-gan

Ek Takar Gan

এক টাকার জ্ঞান

(স্মৃতিচারণ)

ডাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আনুমানিক ২০০০ সালের ঘটনা । একটু ব্যাংকে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ল। বায়োকেমিস্ট ফারুক সাহেবকে সাথে নিলাম। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে বের হয়ে ক্যাম্পাসে অবস্থিত অগ্রণী ব্যাংকে প্রবেশ করছিলালাম । কলেজের ক্যাসিয়ার ওয়াহেদুজ্জামান সাব ব্যাংক থেকে বের হচ্ছিলেন  । আমাকে সালাম দিয়ে হ্যান্ডসেক করার ছলে ঘুষ দেয়ার মত করে আমার ডান হাতে টাকা গুঁজে দিলেন । আমি অপ্রস্তুত হয়ে কিংকর্তব্যবিমুর বনে গেলাম । বললাম “এটা কি করছেন ?” সে এক চোখ ছোট করে বলল “রেখে দেন, স্যার ।“ সিন ক্রিয়েট যাতে না হয় তার জন্য টাকাটা পেন্টের ডান পকেটে রেখে দিলাম । কেউ দেখলো না। আমার শরীর ঘেমে গেল। ম্যানেজারের রুমে প্রবেশ করলাম । ম্যানেজার রুমে একা ছিলেন । আমি ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করলাম “আপনাকে কি কখনো কেউ ঘুষ সেঁধেছে ?” ম্যানেজার বললেন “গতকালই তো এক লোক আমাকে ঘুষ সেঁধেছিল ।“ ম্যানেজার আমার চোখের দিকে আঙ্গুল তাক করে অভিনয় করে বলতে লাগলেন “আমি তাকে বললাম, বেরিয়ে যান, বেরিয়ে যান আমার রুম থেকে ।“ এমন ভাবে অভিনয় করছিলেন যেন তিনি আমাকেই বেরিয়ে যেতে বলছেন । এমন সময় ম্যানেজারের রুমে একজন প্রফেসর প্রবেশ করলেন । ম্যানেজার তাকে সালাম দিয়ে বসালেন এবং তার সাথে কথা বলা শুরু করলেন । আমার মনে হল প্রফেসর মনে করতে পারেন ম্যানেজার আমাকে বের করে দিচ্ছিলেন । ভুলটা ভাংবার জন্য আমি ম্যানেজারকে প্রশ্ন করলাম
– ভাই, আপনি লোকটিকে বের হতে বললেন। তারপর কি হল?
– লোকটি মাথা নিচু করে চলে গেল। ঘুষ দেয়াও খারাপ কাজ আর নেওয়াও খারাপ কাজ।

আমি আর বায়োকেমিস্ট একসাথে ব্যাংক থেকে বের হলাম । পকেট থেকে বের করে দেখি মাত্র এক টাকা । বায়োকেমিস্টকে প্রশ্ন করলাম “ক্যাসিয়ার আমাকে সালাম দেয়ার পর এভাবে এক টাকা হাতে গুজে দিলেন কেন ?” তিনি বললেন “কোন কোন এলাকার প্রথা আছে সকাল বেলা সম্মানিত ব্যাক্তিকে সালামি দিলে সারাদিন ভাল কাটে । আপনাকে হয়তো সালামি দিয়েছেন ।“ আমি বললাম “আমাদের এলাকায়ও এমন প্রথা আগে ছিল । গত নির্বাচনের আগে যখন করটিয়ার জমিদার  পন্নি সাহেব এলাকায় ভোট চাইতে এলেন তখন এলাকার জনগণ তাকে টাকা দিয়েছেন সালামি হিসাবে। বৃটিশ আমলে করটিয়ার জমিদার পন্নি সাহেবেরা আমাদের এলাকায় আসতেন । তখন প্রথা ছিল জমিদারকে সালামি দেয়া। দশ বিশ টাকা যার যেমন সামর্থ ছিলে তাদের হাতে দিয়ে ধন্য হতেন। তাদের এখন আমাদের এলাকায় আসার প্রয়োজন পড়ে না। শুধু ভোটের জন্য এসেছিলেন একবার। পাবলিককে বিড়ি, সিগারেট, টাকা পয়সা বিলাতে হয় নি। উলটা পাবলিকই তাকে টাকা পয়সা দিয়ে দিয়েছে। তবুও তিনি ভোট পেয়ে এম পি হয়েছিলেন।“ পথে দেখা হল এলাকার এক ছোট খাটো নেতার সাথে । ক্যাসিয়ারের নাম না প্রকাশ করে ঘটনাটা বর্ণনা দিয়ে তাকে জিগালাম “আপনাদের এলাকায় কি এমন প্রথা আছে ?” তিনি বললেন “যিনি করেছেন তিনি হয়তো একজন দান্দাল, বাটপার । এক টাকার বিনিময়ে একদিন হয়ত আপনার ল্যাব থেকে একশ টাকার টেস্ট ফ্রী করায়ে নিবেন ।“ কলেজ লাউঞ্জে আবার দেখা হল ক্যাসিয়ারের সাথে । আমি জিগালাম “আপনি এভাবে আমার হাতে এক টাকা গুঁজে দিলেন কেন ?” তিনি বললেন “স্যার, এক সপ্তাহ আগে আমার এক টাকা রিক্সা ভাড়া কম পরেছিল । আপনি এক টাকা দিয়েছিলেন । সেই টাকা আমি ফেরৎ দিলাম ।“ আমি বললাম “মাথা খারাপ, এক টাকা আমাকে ফেরৎ দিতে হবে ? আমিত এই টাকার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম ।“ তিনি বললেন “হোক, একটাকা। আমি তো ওটা ধার নিয়েছিলাম। ঋণি থাকতে নেই।”

এক টাকা ধার দিয়ে ভালোই জ্ঞান অর্জন করলাম ।
২১/৪/২০১৮ খ্রি.

Chuler-Mullo

চুলের মুল্য

(মানুষের গল্প)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

লোকটার সাথে দেখা হলো শুক্রবার। জুম্মা নামাজের পর বাসায় ফিরছিলাম। ময়মনসিংহ সিটির মাসকান্দার নতুন বাজারের উত্তর পাশেই ব্রম্মপুত্র আবাসিক এলাকায় আমার বাসা। এই মহল্লায়ই সে আমার সামনে পড়লো। বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর। গায়ে হাফ হাতা শার্ট ও পরনে লুঙ্গি। বাম হাতে একটা বাজারের ব্যাগ। ডান হাতে একটা লাউড স্পিকার। স্পিকার উপরের দিকে ধরে কি যেন বলছে বুঝতে পারছিলাম না। আমি বললাম

– এই, আপনি কি বলছেন?

– আমি পুরাতন নষ্ট মোবাইল সেট এবং চুল কিনি।

– আপনি জুম্মার নামাজের সময় আবাসিক এলাকায় আসেন কেন? সব বেটা মানুষ মসজিদে চলে গেছে, আর আপনি আবাসিক এলাকায় ঘুরাঘুরি করছেন? এই সময় মহল্লায় মাঝে মাঝে চুরি হয়। আপনাকেও সন্দেহ করতে পারে।

– স্যার, চুরি যারা করে তারা হাতে লাউড স্পিকার নিয়ে আসে না। চুপি চুপি চুরি করে চলে যায়। আমার কাছে আইডি কার্ডও আছে।

– আপনাকে আইডি কার্ড কে দিয়েছে?

– আমাদের ময়মনসিংহে হকার সমিতি আছে শম্ভু গঞ্জে নদীর ওপারে অফিস। সেখান থেকে আইডি কার্ড নিয়েছি। দেখতে পারেন।

– না, দেখার দরকার নেই। আমি বিশ্বাস করি আপনি হকার। তা, আপনি কি কি কেনেন?

– আমি দুইটা জিনিস কিনি, একটা হলো পুরাতন মোবাইল ফোন, আরেকটা হলো মেয়েদের চুল।

– মোবাইল কত টাকা করে কেনেন?

– বাটন মোবাইল একদাম ৬০ টাকা। টাচ মোবাইল অবস্থা বুঝে।

– এত কম দাম? চুল পান কোথায়?

– মেয়েরা রেখে দেয়।

– মেয়েরা চুল কেটে কেটে রেখে দেয়?

– না, কাটা চুল বিক্রি হয় না। হলে তো বস্তায় বস্তায় কিনতে পারতাম। মেয়েরা চুল আচরানোর সময় কিছু কিছু চুল চিরুনির সাথে উঠে আসে। সেগুলো দলা পাকিয়ে রেখে দেয় আমাদের জন্য। আমরা মাঝে মাঝে এসে নিচ থেকে লাউড স্পিকারে ডেকে ডেকে কিনে নেই।

কোন কোন অসুখের সময় ডাক্তার যখন বলে দেয় ঔষধের জন্য তার লম্বা চুল ঝরে পড়বে। তখন একজনের কাছ থেকেই অনেক চুল পাওয়া যায়। কোন কোন ফ্যামিলিতে চার/পাচ জন মেয়ের চুল একাত্র করে রেখে দেয়। তখন অনেক চুল পাওয়া যায়।

– চুলের দাম কেমন?

– আমরা ১০ হাজার টাকা কেজি দামে কিনি। বেচি ১২ হাজার টাকা দরে। এগুলো দিয়েই পরচুলা বানায়।

– ও, তাই তো দেখলাম, আমাদের বড়বাইদপাড়া গ্রামের কিশোরী মেয়েরা কয়েক জনে পরচুলা বানাচ্ছে কোম্পানির সাপলাই দেয়া চুল দিয়ে। এখন বুঝলাম কোম্পানি চুল পায় কোথায়। গ্রামের মেয়েরা এমন হাতের কাজ করে বেশ টাকা আয় করছে।

– চুল মাপেন কি দিয়ে?

ফেরিওয়ালা ব্যাগ থেকে ছোট একটা ওয়েট মেশিন বের করে দেখিয়ে বললো,

– এটা দিয়ে। অল্প অল্প চুল কিনি তো এটাতেই হয়ে যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম ১,০০০ টাকা।

– গুড, এখন আমার আর সন্দেহ নেই। চালিয়ে যান।

লোকটা লাউড স্পিকার হাতে নিয়ে বলতে বলতে চলে গেলো “চুল কিনি, পুরাতন মোবাইল কিনি।”

আমি বাসার দিকে ফিরে যেতে যেতে ভাবলাম কাউকে অযথা সন্দেহ করতে নেই। বিচিত্র মানুষের জীবন। বিচিত্র মানুষের জীবীকা। বয়স প্রায় ৬৭ হয়ে গেলো। এখনো মানুষের জীবন পড়তে, শিখতে বাকী আছে। ফেলে দেয়া ছেড়া চুলের মূল্য কতো হতে পারে আজ জানতে পারলাম।

৩০ নভেম্বর ২০২৫ খ্রি.

ময়মনসিংহ

#গল্প #মানুষেরগল্প #সাদেকুল

চ্যাট ডিপিটিকে এই গল্প বলে একটা ছবি একে দিতে বলেছিলাম। ভালোই একেছে।

Writing

স্মৃতি কথা – Memoir

মানুষের গল্প — Human Stories

facebook-profile-picture

ফেইসবুকের প্রোফাইল পিকচার পলিসি বা নিয়ম-কানুন হলো এমন কিছু নির্দেশনা যা নিশ্চিত করে যেন প্রোফাইল ছবি নিরাপদ, সম্মানজনক এবং সঠিকভাবে পরিচয় প্রকাশ করে। নিচে মূল নিয়মগুলো দেওয়া হলো

Description: ✅যা দেয়া যাবে (অনুমোদিত):

• নিজের স্পষ্ট মুখের ছবি – নিজের মুখ পরিষ্কারভাবে দেখা যায় এমন ছবি সবচেয়ে ভালো।

• সাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ডে ছবি – যেমন ঘর, অফিস, বা প্রাকৃতিক পরিবেশ।

• নিজের পেশাগত বা আনুষ্ঠানিক ছবি – যেমন ডাক্তার, শিক্ষক, অফিসার ইত্যাদি পেশায় ব্যবহৃত প্রফেশনাল ছবি।

• শিক্ষামূলক বা সামাজিক উদ্দেশ্যে নিজের ছবি – যেমন আপনি কোনো প্রোগ্রামে অংশ নিচ্ছেন, সেটার ছবি।

Description: 🚫যা দেয়া যাবে না (নিষিদ্ধ বা নিরুৎসাহিত):

• অন্যের ছবি বা সেলিব্রিটির ছবি – নিজের পরিবর্তে অন্য কারও মুখ ব্যবহার করা যাবে না।

• পশু, কার্টুন বা অবজেক্টের ছবি – যেমন বিড়াল, কুকুর, ফুল, গাড়ি, লোগো ইত্যাদি।

• মাস্ক পরে বা মুখ ঢেকে রাখা ছবি – মুখ পরিষ্কারভাবে দেখা না গেলে তা প্রোফাইল পিকচার হিসেবে অনুপযুক্ত।

• ধর্ম, রাজনীতি, বা অশালীন বার্তা সম্বলিত ছবি – কোনো বিভেদ, ঘৃণা বা অশালীন বিষয়যুক্ত ছবি দেওয়া যাবে না।

• ফটোশপ বা বিকৃত মুখের ছবি – অতিরিক্ত ফিল্টার বা বিকৃত রূপে নিজের ছবি দেওয়া নিষেধ।

Description: 💡পরামর্শ:

• প্রোফাইল পিকচার আপনার পরিচয়ের প্রতীক, তাই এমন ছবি দিন যা আপনাকে প্রতিনিধিত্ব করে।

• ছবি যেন উজ্জ্বল, পরিষ্কার, এবং মুখের অভিব্যক্তি বন্ধুত্বপূর্ণ হয়।

• ব্যবসায়িক পেইজ হলে, লোগো বা ব্র্যান্ড ইমেজ দেওয়া যায় (ব্যক্তিগত পেইজ নয়)।

(AI aided content, prompted by Dr. Sadequel Islam Talukder)

kofil-haidarer-biye

কফিল হায়দারের বিয়ে

(মিনি গল্প)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বিয়ে পাস করার পর অনেক চেষ্টা করেও কোন চাকরি যোগার করতে পারেনি কফিল হায়দার। তারা ৪ ভাই ৪ বোন। সবাই তখন পড়ার মধ্যেই ছিল। সংসারে তখন অভাব লেগেই থাকতো। বেশ কিছু টাকা ঋণ করে দালালের মাধ্যমে মিডল ইষ্টে কর্মি হিসাবে চাকরি করতে যায়। সেখানে যা বেতন পায় তা ঋণের টাকার কিস্তি দিতেই শেষ হয়ে যায়। কাজেই প্রথম ৪ বছর সংসার খরচের জন্য তেমন কিছুই দিতে পারেনি। যখন দেয়া শুরু করে তখন ভাই বোন আত্মীয় স্বজনরা কে কত নিতে পারে সেই প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। কফিলের মনে হয় সবাই যেন তার টাকাকেই ভালোবাসে, তাকে নয়। পাচঁ বছরের মাথায় দুই মাসের ছুটি নিয়ে দেশে আসে। সাথে সবার জন্য গিফট নিয়েও আসে। সেই গিফট পেয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে রেসারেসি শুরু হয়। তাদের এই আচরণ ভালো লাগে না। তার ইচ্ছা ছিলো এবারের ছুটিতে এসে একটা বিয়ে করে যাবে। কিন্তু সে কথা উঠাবার সুযোগ হলো না। মনের কষ্ট নিয়ে ফিরে গেলো আবার বিদেশে।

এবার বিদেশ যাওয়ার পর বাড়ির মানুষগুলোকে আগের মতো আর ভালো লাগে না। শুধু নিজের জীবন নিয়ে ভাবে। শুধু মা-বাবার জন্য অল্প কিছু টাকা পাঠায়। ঠান্ডু ঘটক কফিল হায়দারের ঠিকানা সংগ্রহ করে চিঠি লিখে জানায় যে তার হাতে একটা সুন্দরী পাত্রী আছে। খুবই বুদ্ধিমতি। দ্বিতীয় বার বিদেশে আসার পর আবার প্রায় ৫ বছর হয়ে গেছে। বেশ কিছু টাকা ব্যাংকে জমিয়েছে। বেশ কিছু স্বর্নালংকারও কিনেছে হবু বৌয়ের জন্য। এগুলোর খবর পরিবারের কাউকে জানায়নি। এবার টাকা পয়সা সোনাদানা ব্রিফকেসে ভরে দেশে আসে পরিবারের কাউকে না জানিয়ে। শুধু জানে ঘটক। উঠে একটা রিসোর্টে। ঠান্ডু ঘটক তাকে পাত্রী দেখানোর ব্যবস্থা করে। পাত্রী খুবই সৌষ্ঠবের। ঘটা করে বিয়ের তারিখ ঠিক হয়। বিয়ের পর ব্রিফকেসটা গহনা ও টাকাসহ ঘটকের মাধ্যমে মেয়ের বাবার কাছে হস্তান্তর করা হয়।

বাসর ঘর সাজানো হয়েছে। বর কফিল হায়দার সেরোয়ানি পরেছে। কনে কইতরি বেগম বেনারশী শাড়ি পরেছে। বাড়িতে বিয়ে বাড়ির মতো তেমন লোকজন চোখে পড়লো না। রাত তখন গভীর। কনে সাজানো বিছানার মাঝখানে ঘোমটা দিয়ে আনত নয়নে বসেছিলো। কফিল ডান হাত দিয়ে কইতরির ঘুমটা সামান্য একটু ফাক করলো। কনে সাপের মতো ফণা তোলে লাফ দিয়ে টেবিলের উপর গিয়ে দাড়ালো। লম্বা একটা চাকু বের করে ঘোরাতে ঘোরাতে রৌদ্রমূর্তি হয়ে বললো, “সাবধান, আমার গায়ে হাত দিবি না। তোর আগেও এভাবে আমি কম পক্ষে ১০ টা বিয়া করছি। বুঝতে পারছস? জান নিয়ে বাচতে চাইলে এখই এলাকা ছাড়বি। গেলি!”

কফিল হায়দার হাত জোড় করে করুণ দৃষ্টিতে কইতরি বেগমের দিকে ফেল ফেল করে চেয়ে রইল।

২২ অক্টোবর ২০২৫ খ্রি.

#গল্প #মিনিগল্প #সাহিত্য

বি:দ্র:

এটা একটা কাল্পনিক গল্প।

এই আইকে প্রোমট করে কাল্পনিক ছবি বানিয়েছি।

My Father

আমার বাবা

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমার বাবার নাম দলিল উদ্দিন তালুকদার। জন্মগ্রহণ করেন কালিহাতির ভিয়াইল গ্রামের দক্ষিণ পাড়ায় তালুকদার বাড়ি। আমার দাদা ছিলেন মোকছেদ আলী তালুকদার। বাবার ডাক নাম ছিল দলু ।  বাবার শরীরে ইমুনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম ছিল। তাই, ঘনঘন অসুস্থ্য হতেন । অসুস্থ থাকার কারনে বাবা পরিশ্রমের কাজ করতে পারতেন না। একজন কৃষক হয়েও কৃষিকাজ তেমন করতেন না। যার দরুন অনেক জমি জমা থাকলেও তিনি তেমন সচ্ছল ছিলেন না।

বাবা বেশিরভাগ সময়ই ঘুরে বেড়াতেন। লাইলি বুবু ও আকবর ভাইর জন্মের পরই দাদা বাবাকে পাঠিয়ে দেন পাহাড় অঞ্চলের জমি দখল করে আবাদ করার জন্য। বাবা ঢনডনিয়া মোউজার বড়বাইদপাড়া গ্রামে  এসে বাড়ি করেন। মা আমাকে গর্ভে করে নিয়ে আসেন আমাদের নতুন বাড়িতে। তাই, আমার জন্ম হয়েছে এই গ্রামে আনুমানিক ১৯৫৮ সনে । তখন এটা কালিহাতি থানার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখন এটা পড়েছে সখিপুর উপজেলার অধীন।

বাবাকে দেখেছি ঘনঘন ভিয়াইল যেতে। জিজ্ঞেস করলে বলতেন “তোমার দাদাগো বাড়ি গেছিলাম। তোমার ফুফুগ বাড়ি গেছিলাম।” অল্প বয়সেই আমার দাদী অন্ধ হয়ে যান। আমার দাদার সভাবও উড়াটে ধরনের ছিলো। আমার বড় ফুফু খুব বুদ্ধিমতি ছিলেন। অল্প বয়সেই ভাই বোনদের দায়িত্ব নিতে হয় তাকে। আমার বাবা চাচার একজন নির্ভরযোগ্য বোন ছিলেন আমার বড় ফুফু। তাই তিনি ফুফুর কাছে চলে যেতেন। ফুফুর বিয়েও হয়েছিল ভিয়াইল গ্রামের উত্তর পাড়ার তালুকদার বাড়ি। মফিজ উদ্দিন তালুকদার ছিলেন আমার ফুফা।

বাবা জমিতে ফসল তেমন ফলাতে পারতেন না। তাই, তালুকের জমি বিক্রি করে বাজার সদায় করে খেতেন। বাবার কাছে আমাদের কিছু চাইতে হয়নি। আমাদের যার যখন যা কিছু লাগতো বাবা জমি বেচা টাকা দিয়ে কিনে আনতেন।

বাবা খুব পাড়া পেড়াতেন। খেয়ে কুলি ফেলতেন নওপাড়া গিয়ে। জিতাস্বরি পাড়ার হাতু কাক্কু, দলু কাক্কু ও বুর্জু কাক্কুর সাথে বাবার খুব খাতির ছিলো। তারাও বাবার মতো অলস ছিলেন। তাদের সাথেই বেশি সময় কাটাতেন। বর্ষাকালের অর্ধেক সময় নৌকায় কাটাতেন। ভিয়াইলের মধ্য পাড়ার তোমজ বেপারির ছেলে হাসান বেপারি সম্পর্কে আমাদের দাদা হতেন। আমাদের কাছে হাছেন দাদা নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি তায়েজ উদ্দিন কাক্কুর বাবা। হাছেন দাদা আমাদের খুব আদর করতেন। আমাদের জন্য জিলাপি নিয়ে আসতেন। কিন্তু আমরা তাকে পছন্দ করতাম না। কারন হলো তিনি বাবাকে আমাদের থেকে নিয়ে যেতেন তার সাথে ব্যবসা করতে। তিনি পাট ও কাঠের ব্যবসা করতেন। তার বিরাট নাও (নৌকা) ছিলো। নাওয়ের সামনের অংশ প্রসস্থ ছিলো। এই অংশে মালামাল বোঝাই করা হতো। পিছনের অংশে ছই ছিল। এই ছইয়ের নিচে বসে হাছেন দাদা, বাবা ও হাছেন দাদার বড় ছেলে কদ্দুস কাক্কু গল্প করতে করতে হুক্কা খেতেন। আমি মাঝে মাঝে এই নায়ে বাবার সাথে ছোট চওনা ঘাট থেকে উঠে ভিয়াইল গিয়েছি। ছোট চওনা ঘাট থেকে গজারি কাঠের গুড়ি অথবা পাট কিনে নায়ে ভরে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে বিক্রি করার উদ্যেশ্যে রওনা দিতেন। চারজন মাল্লায় এই নাও বেয়ে নিতেন। সামনে দুই পাশে দুইজন, পিছনে দুইপাশে দুইজন মাল্লা লগি দিয়ে খোজ দিতেন এক সাথে। ভারী নাও ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতো। বাবা অথবা কদ্দুস কাক্কু পিছনের গলুইয়ে বসে হাল ধরে থাকতেন। আমি বাবার টোনায় বসে বাবার সাথে হাল ধরে মজা পেতাম। খাল ও নদী দিয়ে যাওয়ার সময় মাল্লারা পাড় দিয়ে হেটে হেটে গুন টেনে যেতেন। গুনের কাঠি কাঁধে নিয়ে বাঁকা হয়ে আঁকা বাঁকা শুকনো ও কাঁদা পথে হাটতেন মাল্লারা। তাদের কষ্টের কথা আমি এখনো ভুলতে পারিনি। পথে রাত হয়ে যেতো। হাছেন দাদা মাটির চৌকায় রান্না করতেন। ভাতে বেগুন সিদ্ধ দিয়ে খাস (সরিষা) তেল দিয়ে ভর্তা করতেন। চামারা চাউলের গরম ভাত দিয়ে খেতে কি যে স্বাদ পেতাম! খেয়ে নায়ের গুড়ায় বসে পানিতে প্রশ্রাব করে ছইয়ের নিচে বেতের পাটিতে ঘুমিয়ে পড়তাম। ঘুমের ভিতরেই বাবা আমাকে কোলে নিয়ে নাও থেকে নামিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিতেন।

বাবা যখন নায়ে যেতেন তখন একটানা ১০-১৫ দিন কাটিয়ে আসতেন। ঐসময় আমার মন খারাপ থাকতো। আমি হাছেন দাদার প্রতি বিরক্ত থাকতাম। মাও বিরক্ত হতেন হাছেন দাদাকে দেখে। তিনি বলতেন “অইজে আবার আইছে, তোমার বাবাকে নিয়ে যেতে।” বড় হয়ে আমার হাছেন দাদার প্রতি অভিযোগ ছিল না। আমি বুঝতে পেরেছি আয় রোজগার করতে বাড়ি ছেড়ে থাকতে হয় অনেকদিন। হাছেন দাদাই ছিলেন বাবার সবচেয়ে ভালো বন্ধু।

বাবাকে বিদায় দেয়ার জন্য মা অনেকদূর পিছে পিছে যেতেন। আমিও মার সাথে গিয়েছি। আমার চোখের পানি গাল বেয়ে পড়তো। বাবা গামছা দিয়ে মুছে দিতেন। কোলে নিয়ে আদর করে বলতেন “বাজান, কাইন্দো না, কয়দিন পরই আই পরমু।” মার কোলে আমাকে বসিয়ে দিয়ে বাবা বুইদ্দাচালার সরু পদ দিয়ে আড়াল হয়ে যেতেন। আমি নিশ্চুপ দাড়িয়ে থাকতাম। চারদিক নিরব হয়ে যেতো। সবুজ গাছের আড়াল থেকে থেকে-থেকে ঘুঘু ডেকে উঠতো। আমার মনে হতো বাবা চলে গেলেন বলেই ঘুঘুরা কাঁদছে। অন্যদিন অত ডাক শুনিনি।

আমার কপালের এক পাশে, গাল ও চোখ সহ প্রতিবছর শীতকালে ব্যাথা করতো। তীব্র ব্যাথা। যন্ত্রনায় কান্না করতাম মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে, কপাল দু’হাতে ধরে। এটাকে বলা হতো আধকপালে মাথার বিষ। আমার কষ্টে বাবাও কষ্ট পেতেন। বাবা বড় চওনা ও কচুয়া হাট থেকে বড়ি এনে দিতেন। পানি দিয়ে খেতাম। কোন কাজ হয়নি। একজন বললেন যে ভুয়াইদের এক মান্দাই মহিলা কবিরাজ আধকপালে মাথার বিষের চিকিৎসা জানেন। বাবা আমাকে কাঁধে নিয়ে ভুয়াইদ গেলেন। মহিলা বিধান দিলেন “সকালে উদিয়মান সূর্যের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মাটিতে সেজদা দিতে হবে কিছুক্ষণ করে কয়েকদিন। তাতে কোন কাজ হলো না। ছোট দাদা জয়নাল আবেদীন তালুকদার শুনে বললেন “মুসলমানের পোলা হয়ে হিন্দু কবিরাজের কথায় সূর্যপূজা করতাছ? বাড়ির পাশেই কবিরাজ থাকতে গেছস ভুয়াইদ! আমিই তো আধকপালে বিষের চিকিৎসা জানি।” এই বলে তিনি গাছান্ত বেটে বটিকা বানিয়ে দিলেন। আমি প্রতিদিন সকালে বিষ ওঠার শুরুতেই ঐ বটিকা খেতাম। ওটা এমন ঝাল লাগতো যে বিষের যন্ত্রনার চেয়ে ঝালের তীব্রতাই বেশি ছিল। দাদার ঔষধ বাদ দিলাম। বাবা খবর পেলেন বাঘেরবাড়িতে একজন আধকপালী মাথা বিষের ভালো কবিরাজ আছেন। বাবা আমাকে পর পর তিন দিন কাঁধে করে নিয়ে গেলেন ঝার ফুক দিতে। কোন কাজ হলো না। প্রতিবছর আমার এমন রোগ হতো। আমি কষ্ট পেতাম। কোন চিকিৎসা নেইদনি। মেডিকেল কলেজে ৩য় বর্ষে পড়ার সময় শিখলাম যে ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়াতে এমন কপালের এক পাশে ব্যাথা হয়। এর ঔষধ কি তাও বই পড়ে জেনে নিলাম। আমি নিজের বুদ্ধিতেই ফার্মেসী থেকে ঔষধ কিনে কাউকে না জানিয়ে সকালে খেয়ে নিলাম। শুরু হলো সারা শরীরে তীব্র যন্ত্রণা। বুঝতে পেলাম। ভুল করেছি। ভুল চিকিৎসা করেছি নিজের উপর। অসহ্য যন্ত্রণায় বিছানায় ছটফট করলাম। বিছানা থেকে উঠতে পারলাম না। কাউকে আমার বোকামির কথা বললাম না। মৃত্যুর জন্য প্রস্তত হলাম। কিন্তু আল্লাহ বাচিয়ে দিলেন। এরপর নাক-কান-গলা বিভাগের আউটডোরে মেডিকেল অফিসারকে দেখালাম। তিনি আর এস ডাঃ সিরাজুল আরেফিন স্যারের কাছে রেফার্ড করলেন। তিনি আমার সব ইতিহাস শুনে এবং নাক-কান-গলা দেখে বললেন “তোমার প্রতিবছর শীতকালে সাইনোসাইটিস রোগ হয়। তোমার সাইনোসাইটিস রোগ হয়েছে।” তিনি সাইনোসাইটিস সম্পর্কে বিস্তারিত আমাকে শিখিয়ে দিলেন। তারপর থেকে আমার আর সাইনোসাইটিসের ব্যাথার কষ্ট আর হয়নি। আলহামদুলিল্লাহ।

বাবা আমাকে প্রথম হাট দেখিয়েছেন। বড় চওনা, কচুয়া, ইন্দ্রজানী, বর্গা ও পলাশতলীর হাট বাবাই আমাকে প্রথম দেখিয়েছেন। বাবার সাথেই আমি প্রথম বাসে উঠি। বাবাই আমাকে প্রথম সিনেমা দেখান। বাবার পেটের নাভীর কাছে ব্যথা করতো। তীব্র ব্যাথায় অনেক রাতে পেট ধরে কাঁদতে দেখেছি। হাট থেকে বোতলের ঔষধ এনে খেতেন। কোন কাজ হতো না। একবার, তখন আমি খুব ছোট, আমি মার সাথে রৌহার মামাবাড়ি ছিলাম। বাবা কোথাও যাচ্ছিলেন। আমি বললাম

– বাবা, কুনু যাবাইন?

– তোমার হাছেন দাদার সাথে সয়ার হাটে যামু। তোমার দাদা একটা গরু কিনবেন।

– আমি যামু।

– দুর আছে। মোটরে চইড়া যাইতে অয়।

– ভোঁ মোটর সাইকলে?

– না, মোটর গাড়িতে।

– আমি মোটরে চরমু।

– এখন না। বড় অইলে নিয়া যামুনি।

– না, আইজকাই যামু

বলে কান্না শুরু করে দিলাম। বাধ্য হয়ে বাবা আমাকে সাথে নিতে রাজি হলেন। মা আমার গায়ে একটা হাওই শার্ট পরিয়ে দিলেন। কালিহাতির রাজাফৈরের কাছে গেলে ভোম ভোম রকম শব্দ পেলাম। বাবা বললেন “এইটা মোটরের শব্দ।” চামুরিয়া পাড়ি দিলে ফটিকজানি নদীর উপর ব্রিজ দেখিয়ে বললেন “ঐযে দেখ কত বড় পুল।” পুলের উপর তাকাতেই দেখা গেলো বিরাট এক কাছিমের মতো জিনিস পুলের উপর দিয়ে চলে গেলো। আমি বললাম “ওঠা কি গেলো?” বাবা বললেন “ওঠা, প্রাইভেট কার। বড় লোকেরা ওঠায় চড়ে।” এরপর বড় একটা কিছু যাচ্ছিল। বললেন “এইডা মোটর গাড়ি।” কালিহাতি বাসস্ট্যান্ডে কিছুক্ষণ দাড়ালে ময়মনসিংহ থেকে একটা মোটর গাড়ি এসে থামলো। কাঠবডি বাস। কাঠের জানালা। সীট খালি নেই। আমরা দাড়িয়েই গেলাম। সয়া গিয়ে নেমে পড়লাম। কালিহাতি ও এলেঙ্গার মাঝামাঝি হলো সয়ার হাট। ঘুরে ঘুরে গরু কিনতে রাত হয়ে গেলো। রাতে আমরা চলে গেলাম বাগুনডালি গ্রামে। সেই গ্রামে একজন কবিরাজ ছিলেন। সেই বাড়ি গিয়ে রাত কাটালাম। কবিরাজ বাবার পেটের ব্যাথার ঔষধ দিলেন। ঔষধ দেখতে লোহার করাতের গুড়ার মতো। খেলে ব্যাথা ভালো হয়। পরেরদিন সকালে ঐ বাড়িতে নাসতা করে আমরা পা পথে গরু নিয়ে ভিয়াইল চলে আসি। সেই ঔষধ খেয়ে বাবা ভালো থাকতেন। এরপরও কয়েকবার বাবা সেই ঔষধ এনে সেবন করেছেন। কিন্তু ঔষধের দাম খুব বেশি ছিল। আমি এখন মনে করি ওগুলো আসলেই করাতের গুড়া। করাতে থাকে এলুমিনিয়াম। এই এলুমিনিয়াম পাকস্থলির হাইড্রোক্লোরিক এসিডের সাথে বিক্রিয়া করে এসিডকে নিউট্রাল করে দিয়ে পেট ব্যাথা তথা পেপ্টিক আলসার ভালো করে। বাবা এরপর খোজ পান খাওয়ার সোডা বেকিং পাউডার। বাবা বেকিং পাউডার খেয়ে পেপ্টিক আলসারের ব্যাথা থেকে উপসম হতেন। আমি ডাক্তার হবার পর আর বাবাকে বেকিং পাউডার খেতে হয়নি।

বাবা আমাকে কোনদিন কোন কাজ করতে বলেননি। বাবা না বললেও আমি সংসারের অনেক কাজ করেছি। বাবা আমাকে কোনদিন পড়তে বলেননি। কারন, তিনি জানতেন সাদেককে পড়তে বলতে হবেনা। আল্লাহ সাদেককে ও গুণটি দিয়েই তৈরি করেছেন। আমি যখন দোয়াত জ্বালিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত পড়তাম বাবা আমার পাশেই শুয়ে শুয়ে মশা মেরে দিতেন এবং বিচুন দিয়ে বাতাস দিতেন। পিঠে হাত বুলিয়ে দিতেন। প্রাইমারির পড়া বুঝিয়ে দিতেন। বাবার অনেক বিষয়ে ভালো সাধারণ জ্ঞান ছিলো। তিনি কোন নিতিকথা শিখাননি। কারন, তার বিশ্বাস ছিল সাদেক কোন অনৈতিক কাজ করতে পারেনা।

১৯৭৯ সনে যখন মা মারা যান তখন বাবার বয়স হয়তো ৫৫ বছর। ঘটকরা চেষ্টা করেছিলেন বাবাকে পুনরায় বিয়ে করিয়ে দিতে। আমি তখন এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। আমরা বিয়ের ব্যাপারে হা না কিছু বলিনি। বাবা বিবেচনা করে দেখেছেন যে সংসারের আমাদের নতুন মা এলে আমাদের শান্তি বিগ্নিত হতে পারে। তাই তিনি ধৈর্য ধরেন।

আমি ডাক্তার হবার পর বাবাকে সতর্ক করে দেই যে এখন থেকে তিনি জমি বিক্রি করে খেতে পারবেন না। আমি সংসারের জন্য যতটুকু পাড়ি করে যাবো। তারপর থেকে তিনি আর জমি বিক্রি করেননি। তিনি ঘনঘন জ্বরে আক্রান্ত হতেন। আমি তখন আমার এম ফিল কোর্সের পড়া নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। বাবার জন্য সময় দিতে পারিনি। এম ফিল শেষ করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে যোগদান করে বাবাকে আমার বাসায় রাখলাম। কিন্তু আমার মনে হয়েছে বাবাকে জেল খানায় বন্দী করে রেখেছি। বাবার সাথে সময় দেয়ার কেউ ছিল না। বাবা ঘনঘন বাড়ি চলে যেতেন। আমি বুঝতে পারি বাবা এখন গ্রামময় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বন্ধুদের সাথে গুপ ছেড়ে হেসে হেসে গল্প করছেন। তাই আমি শহরে এসে থাকতে বাবাকে পিড়াপিড়ি করিনি।

২০০১ সনের দিকে বাবা খুব বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দেখানো হয়। পরীক্ষা করে দেখা যায় বাবার প্যানসাইটোপেনিয়া আছে। অর্থাৎ সব রক্তকণিকা কম আছে। এজন্যই ঘনঘন ইনফেকশন হয়। ইনফেকশনের জন্যই জ্বর হয়। বাবাকে অনেকদিন হাসপাতালে ভর্তি রাখতে হয়। ভাতিজা আব্দুল মান্নান তালুকদার তখন কলেজে পড়তো। ওর পড়াশোনা ক্ষতি করে বাবার সাথে থাকে অনেক দিন। এরপর ধরা পড়লো বাবার লিভারে সিরোসিস হয়েছে। এ রোগ ভালো হবার নয়। ৭৫ বছর বয়সে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করাও ঠিক হবে না মনে করলাম। যতটুকু সম্ভব সাধারণভাবে চিকিৎসা করে যেতে লাগলাম। বাবার ইচ্ছে অনুযায়ী বাড়িতে রাখলাম। সুবিধা ছিল, ভাই, ভাবী, মান্নান ও আফ্রোজা বাবার ঠিকমতো যত্ন নিতে পারবেন নিজ বাড়িতে। তখন ছিল অক্টোবর মাস। আবহাওয়া ছিল দুর্যোগপূর্ণ। বাড়ির চারিদিকে ছিল কাদা আর কাদা। এমন একটি দিনে ২০০১ সনের ২০ অক্টোবর বাবার ইন্তেকালের সংবাদ পেলাম। কার নিয়ে ছুটে গেলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। দুই কিলোমিটার দুরে পাকা রাস্তায় নেমে কর্দমাক্ত রাস্তা দিয়ে হেটে গিয়ে বাবার মৃতদেহের কাছে উপস্থিত হলাম। দেখলাম আমার নিস্পাপ বড় ভাই আকবর হোসেন তালুকদার বাবার কাছে বসে বাবার মুখের দিকে ফেলফেল করে তাকিয়ে আছেন। আনুমানিক ৭৫ বছর বয়সে বাবা চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। বাবাকে ছেড়ে মা চলে গিয়েছেন পরপারে ২০ বছর আগে। আল্লাহ আমার ধৈর্যশীল বাবার জন্য বেহেস্ত নসীব করুন।

১৫/৪/২০২০ খ্রি.