স্যার, আপনে এইরকম ঘাউড়া ক্যান?
(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
১৯৮৮ সনের জুলাই মাসের ৩ তারিখে সরকারি মেডিকেল অফিসার হিসাবে প্রথম যোগদান করি বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। একা একটা পরিত্যক্ত সরকারি টিনের ঘরে হারিকেন জ্বালিয়ে থাকতাম। কেরোসিনের চুলায় সকালে নিজ হাতে রান্না করে তিন বেলা খেতাম। আলু ভর্তা, বেগুন ভর্তা, ডিম ভর্তা, ডিম ভাজি এবং ডাল দিয়ে সাধারণত ভাত খেতাম। মাঝে মাঝে খাসির বা গরুর গোস্তো নিজ হাতে রান্না করে খেতাম। একাকি তাকতাম, তাই নিরবতা কাটানোর জন্য এক ব্যান্ডের ছোট্ট একটা পকেট রেডিও বাজাতাম, বাংলাদেশ বেতার ঢাকা ও আকাশবাণী কলকাতা শুনতাম।
১৯৮৯ সনের মার্চ মাসে ঐ এলাকায় কলেরায় মহামারি আকারে অনেক লোক আক্রান্ত হয়। আমি সকালে হাসপাতালে বসে রোগী দেখছিলাম। হাসপাতালটা ছিল অতি পুরাতন টিনের ঘর। ব্রিটিশ আমলের লোহা কাঠের ভাংগা ভাংগা চেয়ার টেবিল ছিলো। আমার সামনে অন্তত ১০০ জনের মতো রোগী লাইনে দাড়ানো ছিলো। মনোযোগ দিয়ে দ্রুত রোগীর প্রেস্ক্রিপশন লিখে বিদায় দিচ্ছিলাম। একজন ছাত্র লাইনে না দাড়িয়ে খোলা জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে উকি দিয়ে বারবার বলছিলো, ” স্যার আমাকে দুই তিনটা রগে দেয়ার সেলাইন দিন, রোগীর সাংঘাতিক ডাইরিয়া হইছে।” আমি বার বার বলছিলাম লাইনে দাড়াতে। কিন্তু সে লাইনে না এসে জানালা দিয়ে বারবার একই অনুরোধ করছিলো। আমি বিরক্ত হয়ে জানালা দিয়ে তাকে কয়েকটা খাবার সেলাইন সাধলাম। কিন্তু ছেলেটি নাছোড়বান্দা, রগে দেয়ার সেলাইনের ব্যাগই নিবে।আমি বললাম যে রোগী না দেখে রগে দেয়ার সেলাইন দেয়া যাবে না। এভাবে সে প্রায় ঘন্টাখানিক বারবার একই দাবি জানিয়ে আসছিল। আমি সে দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে অন্য রোগীদের সমস্যা শুনে শুনে ঔষধ দিয়ে আসছিলাম।
এক পর্যায়ে ছেলেটা হঠাৎ বলে উঠলো, “স্যার, আপনে এমন ঘাউড়া ক্যান?” মুরুব্বিরা লাইনে থেকে বলে উঠলেন, “এই বে-আদব ছেলে, কাকে কি বলছো? একজন ফার্স্ট ক্লাস গ্যাজেটেট অফিসারের স্যাথে এভাবে আচরন করে?”
আমি হেসে ফেললাম। জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার নাম কী? কোন ক্লাসে পড়ো?”
ছেলেটি বললো যে সে ক্লাস নাইনে পড়ে। আমি বললাম আমি এই রোগীগুলো দেখা শেষ করে তোমার সাথে তোমাদের বাড়ি গিয়ে রোগী দেখে নিজ হাতে সেলাইন পুশ করে আসবো। রোগী না দেখে সেলাইন দিয়ে দেয়ার নিয়ম নাই।” আরও কিছুক্ষণ বাক বিতনণ্ডা করে চুপ রইল। হাস্পাতালের রোগী দেখা শেষ করে তিনটি সেলাইনের ব্যগ সাথে নিয়ে ছালেটির বাড়িতে চলে গেলাম দুই কিলোমিটার হেটে। ঐ বাড়ির বড়রা ছেলের কান্ড দেখে অবাক। বলেন, “আমরা লজ্জিত, আমাদের ছেলেটা আপনার সাথে বেয়াদবি করেছে। আমরা লজ্জিত। আমরা তাকে এভাবে সেলাইন আনতে বলি নাই।” আমি বললাম, “সমস্যা নাই। রোগী দেখান।”
মুরুব্বিরা বললেন, “আপনি বাসায় ফিরেন নাই। দুপুরে খান নাই। একা একা থাকেন। কি খান, না খান আমরা খোজ রাখিনা। আজ আমাদের বাড়িতে খাবেন। পোলাও – মাংস রান্না করা আছে। আপনি আগে খেয়ে লন। তারপর রোগী দেখবেন। আমরা জানি, আপনারা রোগী দেখার পর খান না। কাজেই রোগী দেখার আগেই খেতে হবে।”
আমি অজু করে খেয়ে নিলাম। অনেকদিন পর ভালো খাবার খেলাম। ভালো লাগলো। তারপর রোগী দেখে সেলাইন পুশ করে ফিরে এলাম চরামদ্দি। সাথে ব্যাগ হাতে বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেলো সেই ছেলেটা। যে আমাকে ঘাউড়া বলেছিলো। আমি একটুও মাইন্ড করিনি। এরপর যদিন চরামদ্দি ছিলাম, ছেলেটা আমার কাছে আসতো ভালোবেসে। আমার ভালো লাগতো। চরামদ্দির ঘাউড়া ডাকা ছেলেটিকে।
৫ জানুয়ারি ২০২৬ খৃ.
(ছবিটা এ আই দিয়ে তৈরি করিয়েছি)
