চুলের মুল্য
(মানুষের গল্প)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
লোকটার সাথে দেখা হলো শুক্রবার। জুম্মা নামাজের পর বাসায় ফিরছিলাম। ময়মনসিংহ সিটির মাসকান্দার নতুন বাজারের উত্তর পাশেই ব্রম্মপুত্র আবাসিক এলাকায় আমার বাসা। এই মহল্লায়ই সে আমার সামনে পড়লো। বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর। গায়ে হাফ হাতা শার্ট ও পরনে লুঙ্গি। বাম হাতে একটা বাজারের ব্যাগ। ডান হাতে একটা লাউড স্পিকার। স্পিকার উপরের দিকে ধরে কি যেন বলছে বুঝতে পারছিলাম না। আমি বললাম
– এই, আপনি কি বলছেন?
– আমি পুরাতন নষ্ট মোবাইল সেট এবং চুল কিনি।
– আপনি জুম্মার নামাজের সময় আবাসিক এলাকায় আসেন কেন? সব বেটা মানুষ মসজিদে চলে গেছে, আর আপনি আবাসিক এলাকায় ঘুরাঘুরি করছেন? এই সময় মহল্লায় মাঝে মাঝে চুরি হয়। আপনাকেও সন্দেহ করতে পারে।
– স্যার, চুরি যারা করে তারা হাতে লাউড স্পিকার নিয়ে আসে না। চুপি চুপি চুরি করে চলে যায়। আমার কাছে আইডি কার্ডও আছে।
– আপনাকে আইডি কার্ড কে দিয়েছে?
– আমাদের ময়মনসিংহে হকার সমিতি আছে শম্ভু গঞ্জে নদীর ওপারে অফিস। সেখান থেকে আইডি কার্ড নিয়েছি। দেখতে পারেন।
– না, দেখার দরকার নেই। আমি বিশ্বাস করি আপনি হকার। তা, আপনি কি কি কেনেন?
– আমি দুইটা জিনিস কিনি, একটা হলো পুরাতন মোবাইল ফোন, আরেকটা হলো মেয়েদের চুল।
– মোবাইল কত টাকা করে কেনেন?
– বাটন মোবাইল একদাম ৬০ টাকা। টাচ মোবাইল অবস্থা বুঝে।
– এত কম দাম? চুল পান কোথায়?
– মেয়েরা রেখে দেয়।
– মেয়েরা চুল কেটে কেটে রেখে দেয়?
– না, কাটা চুল বিক্রি হয় না। হলে তো বস্তায় বস্তায় কিনতে পারতাম। মেয়েরা চুল আচরানোর সময় কিছু কিছু চুল চিরুনির সাথে উঠে আসে। সেগুলো দলা পাকিয়ে রেখে দেয় আমাদের জন্য। আমরা মাঝে মাঝে এসে নিচ থেকে লাউড স্পিকারে ডেকে ডেকে কিনে নেই।
কোন কোন অসুখের সময় ডাক্তার যখন বলে দেয় ঔষধের জন্য তার লম্বা চুল ঝরে পড়বে। তখন একজনের কাছ থেকেই অনেক চুল পাওয়া যায়। কোন কোন ফ্যামিলিতে চার/পাচ জন মেয়ের চুল একাত্র করে রেখে দেয়। তখন অনেক চুল পাওয়া যায়।
– চুলের দাম কেমন?
– আমরা ১০ হাজার টাকা কেজি দামে কিনি। বেচি ১২ হাজার টাকা দরে। এগুলো দিয়েই পরচুলা বানায়।
– ও, তাই তো দেখলাম, আমাদের বড়বাইদপাড়া গ্রামের কিশোরী মেয়েরা কয়েক জনে পরচুলা বানাচ্ছে কোম্পানির সাপলাই দেয়া চুল দিয়ে। এখন বুঝলাম কোম্পানি চুল পায় কোথায়। গ্রামের মেয়েরা এমন হাতের কাজ করে বেশ টাকা আয় করছে।
– চুল মাপেন কি দিয়ে?
ফেরিওয়ালা ব্যাগ থেকে ছোট একটা ওয়েট মেশিন বের করে দেখিয়ে বললো,
– এটা দিয়ে। অল্প অল্প চুল কিনি তো এটাতেই হয়ে যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম ১,০০০ টাকা।
– গুড, এখন আমার আর সন্দেহ নেই। চালিয়ে যান।
লোকটা লাউড স্পিকার হাতে নিয়ে বলতে বলতে চলে গেলো “চুল কিনি, পুরাতন মোবাইল কিনি।”
আমি বাসার দিকে ফিরে যেতে যেতে ভাবলাম কাউকে অযথা সন্দেহ করতে নেই। বিচিত্র মানুষের জীবন। বিচিত্র মানুষের জীবীকা। বয়স প্রায় ৬৭ হয়ে গেলো। এখনো মানুষের জীবন পড়তে, শিখতে বাকী আছে। ফেলে দেয়া ছেড়া চুলের মূল্য কতো হতে পারে আজ জানতে পারলাম।
৩০ নভেম্বর ২০২৫ খ্রি.
ময়মনসিংহ
চ্যাট ডিপিটিকে এই গল্প বলে একটা ছবি একে দিতে বলেছিলাম। ভালোই একেছে।
