বিজয়ের আগের মাসে
(মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
যুদ্ধের শেষের দিকে নভেম্বর মাস। ১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল মার্চের ২৬ তারিখ থেকে। সখিপুর, কালিহাতি, ঘাটাইল ও ভালুকার বিরাট এক এলাকা মুক্তিযোদ্ধা কাদেরিয়া বাহিনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীমুক্ত রেখেছে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক বাহিনি জনগণের আইন সৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিত আছে। চুরি, ঢাকাতি, জুলুম করলে সাথে সাথে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনি বিচার করে দিচ্ছে। কারো ঘরে খাবার না থাকলে, যার ঘরে খাবার আছে তার কাছে থেকে ধার হিসাবে নিয়ে দিচ্ছে এই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনি। আমন ধান পাকা শুরু হয়েছে। যার ধান পাকেনি অথচ ঘরে তার ধান নেই, তাকেও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনি ধান ধার হিসাবে নিয়ে দিচ্ছে যার ক্ষেতের ধান পেকেছে তার থেকে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনির জিম্মায়। ধনিদের কাছ থেকে চাল, ডাল ও গরু /খাসি চেয়ে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবারের ব্যবস্থা করছে। এদিকে বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেওপাড়া ক্যাম্পে অবস্থিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীদের শহরে যাওয়ার সড়ক ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে। কালিহাতি থেকে টাঙ্গাইল এবং টাঙ্গাইল থেকে ঢাকা যেতে গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজগুলো ডিনামাইট দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছে। ঢাকা থেকে স্থল পথে তাদের খাবার ও রসদ ক্যাম্পে আসতে পারছে না। এর আগে তারা গ্রামে হানা দিয়ে খাদ্য ও গরু ছাগল লুট করে নিয়ে খেয়েছে। এখন সেগুলোও প্রায় শেষ হয়ে গেছে। হেলিকপ্টার যোগে পাউরুটি জাতীয় ড্রাই ফুড নিয়ে যাচ্ছিল ধলাপাড়ায় অবস্থিতি হানাদার বাহিনীর সদস্যদের জন্য। বীর মুক্তিযোদ্ধারা বন থেকে লুকিয়ে ওটাকে গুলি করেছে। ভয়ে ওটা অনেক উপর দিয়ে চলে গেছে। অবস্থা বেগতিক থেকে তারা পা পথে হেটে ধলাপাড়া ছাড়ে। সাগরদিগী হয়ে কুতুবপুর পর্যন্ত এসে একটা সেল ছাড়ে সেটা এসে পড়ে বড় চওনা প্রাইমারি স্কুলের টিনের চালার উপর। টিন চিদ্র হয়ে সেটা মাটিতে পড়ে গর্ত হয়ে যায়। বড় চওনায় অবস্থানরত বীর মুক্তিযোদ্ধারা এই স্কুলেই অবস্থান করতেন এবং স্কুলের মেঝেতে গর্ত করে অস্ত্র সস্ত্র লুকিয়ে রাখতেন। সেল পড়ার আগেই অস্ত্র নিয়ে মুক্তিবাহিনী সরে পড়ে। এলাকার জনগণের ব্যপক ক্ষয়ক্ষতি হবে মনে করে তারা প্রতিরোধ করেন নাই। হানাদার বাহিনীর পরিকল্পনা হচ্ছে হেটে সোজা ঢাকায় পৌছা। তাই তারা বড় চওনা থেকে ঘোনার চালা, আড়াইপাড়া, মুচারিয়া পাথার হয়ে, গাজীপুর হয়ে ঢাকায় চলে যায়।
এদিকে হানাদার বাহিনীর আগমন হচ্ছে শুনে বড় চওনা, কালিয়া, কচুয়া থেকে সবাই বাড়িঘর ছেড়ে পশ্চিম দিকের বনাঞ্চলের গ্রামগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে। টাঙ্গাইল শহর ছেড়ে যারা ঐসব গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলো তারাও বনাঞ্চলের গ্রামগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে। সাথে নিয়ে এসেছে চিড়ামুড়ি। যেহেতু শহরের শরনার্থীরা বনাঞ্চলের তেমন কারও আত্মীয় নন সেহেতু তারা বিভিন্ন গাছের নিচে আশ্রয় নিয়েছে।
মর্জিনাদের বাড়ি বনাঞ্চলে। কিন্তু মর্জিনার শশুর বাড়ি কালিয়া। ওখান দিয়ে হানাদার বাহিনী অগ্রসর হচ্ছে। মর্জিনার বাবার গোলার ধান শেষ হয়ে যাবার পর বিছুন ধানও ভাঙিয়ে খেয়ে ফেলেছে। কিছু ধান ধারও করেছে। কুয়ারপাড়ের ক্ষেতের ধান আধাপাকা হতেই খাওয়ার জন্য কেটে ফেলেছে। ঘরে দুই এক কাঠা চাল আছে। দুই এক দিন চলতে পারে। এরমধ্যে মর্জিনার চাচাশশুর স্ত্রী ও পাচজন এন্দাগেন্দা পোলাপান নিয়ে হাজির শরনার্থী হয়ে। আসরের নামাজের সময় হয়ে গেছে। দুপুরের খাবার এখনো দেয়া হয় নি। মর্জিনার চাচাশশুর মর্জিনাদের উঠানে একটা কাঠের গুড়ির উপর বসে নারিকেলের হুক্কা টানছে আর খুসখুসি কাসছে। মর্জিনা তার বাবাকে বললো, “বাজান, কাক্কুরে নইয়া খাবার বহুন।” মর্জিনার বাবা বললেন,
– বিয়াই,নইন, ভাত খাই।
– আরেক ছিলিম তামুক খাইয়া নই।
– ভাত খাইয়া হাইরা তামুক খাহাবাইন।
– বিয়াই, আন্নেরা কি নতুন চাইলের ভাত খাইন?
– হ, নতুন চাইলের ভাত।
– আমি ত নতুন চাইলের ভাত খাহাইনা। ঘরে পুরান চাইল নাই?
– পুরান চাইল নাই। আন্নে নতুন চাইলের ভাত এহেবারেই খাহারুইন না?
– না।
– তাইলে আমি পুরান চাইল নইয়াহি।
মর্জিনার বাবা প্রতিবেশির বাড়ি গিয়ে এক খাঠা পুরান চাইল ধার করে আনতে আনতে মনে মনে বললেন, “শালার ফেরাংগি কত, আইছে শরনার্থী য়ইয়া, আবার নতুন চাইলের ভাত খাহারেনা, পুরান চাইলের ভাত খাবো!
(স্মৃতিকথা ও কল্পনার মিশ্রনে লেখা)
১৯ মে ২০২৬ খ্রি.
ময়মনসিংহ
ছবি এ আই টুল দিয়ে তৈরি করেছি।
#স্মৃতি #গল্প #মুক্তিযুদ্ধ #সাদেকুল
