প্রিন্সিপাল এএফএম গোলাম কিবরিয়া
(স্মৃতিকথা)
এএফএম গোলাম কিবরিয়া স্যার ছিলেন আমার শিক্ষক। তিনি আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। ১৯৭৩ সনে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী স্যার কলেজটি তার গ্রামের বাড়ি ছাতিহাটির কাছে আউলিয়াবাদে প্রতিষ্ঠা করে তার দাদার নামে নামকরন করেন আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ। কলেজ প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পরই আব্দুল লতিফ সিদ্দকী স্যার প্রিন্সিপালের দায়িত্ব নেন। সেই সময় ভোলা জেলা নিবাসী এএফএম গোলাম কিবরিয়া নামে একজন সমাজ কল্যাণ বিষয়ের প্রভাষক ছিলেন। তিনি লতিফ সিদ্দিকী স্যারের একজন অন্যতম পছন্দের মানুষ ছিলেন। কলেজটি আবাসিক ছিল। ছাত্রদেরকে করা শাসনের ভিতর রাখা হত। তাই, তাদের রেজাল্ট ভাল হত। কলেজের সাথে একটি কৃষি খামার ছিল। ছাত্রদেরকে রুটিন অনুযায়ী দিনের কিছুক্ষণ কৃষিকাজ করতে হত। এলাকার জনগনের কাছে কলেজটির বেশ কদর ছিল।
১৯৭৫ সনের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর লতিফ সিদ্দিকী স্যার অনেক বছর ভারত ও রাশিয়া অবস্থান করেন। নয় মাস কলেজ বন্ধ থাকার পর প্রবাস থেকে স্যারের নির্দেশনায়, স্যারের চাচা জনাব ওয়াদুদ সিদ্দিকী (হুদ্দু মিয়া) সাহেবের তত্বাবধানে কলেজটি আবার চালু হয়। ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল হন বল্লার মোসলেম উদ্দিন স্যার। সব স্যারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কলেজটির লেখাপড়ার পরিবেশ আগের মত রাখার চেষ্টা করা হয়।
এই কলেজে আমি ভর্তি হই ১৯৭৭ সনে। ছাত্র সংখ্যা কম থাকাতে এবং সরকারী অনুদান কম আসাতে কলেজটি আর্থিক সংকটে পড়ে। কয়েকজন টিচার চলে যান। আমি দেখেছি কলেজ ক্যাম্পাসের ইট টুকিয়ে টুকিয়ে বিক্রি করে সেই টাকায় স্যারদের বেতন দিতে হতো। আমরা কলেজের এবং আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। ডিসেম্বরের দিকে স্যারদের কাছে শুনলাম কিবরিয়া স্যার নামে আগে এক প্রভাষক ছিলেন । তিনি প্রিন্সিপাল হয়ে আসছেন। তিনি এলে অবস্থার উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তিনি জানুয়ারির দিকে এলেন। দেখলাম অদ্ভুত এক ধরনের মানুষ তিনি।
তিনি সব সময় খাকি রংগের কুরতা পরতেন। দেখতে ঠিক যুবক বয়সের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ছবির মত। মাথায় ঠিক জাতীয় কবির মত ঝাকরা চুল। বুদ্ধিদীপ্ত চোখ। স্বল্পভাষী। মৃদুভাষী। কথা বলার সময় মনে হয় যেন অনেক্ষণ মন খারাপ করে ছিলেন। কান্না কান্না গলার স্বর। অল্প বলতেন। কিন্তু মূল্যবান কথা বলতেন। সব টিচার তাকে পীরের মত মানতেন। আমরা ভয়ে ভয়ে থাকতাম।
২১ শে ফেব্রুয়ারি ও ২৬ মার্চের অনুষ্ঠান পালনের মধ্য দিয়ে স্যারের পারদর্শিতার বেশ কিছু প্রমাণ পেলাম। আমাদের কলেজের পিছনে বাঁশের তৈরি এক লাইনে ১০-১২টি কাঁচা লেট্রিন ছিল। ৮-১০ দশ ফুট উপর থেকে খোলা গর্তে পায়খানা পরত। ছাত্র-শিক্ষক সবাইকে এগু্লো ব্যবহার করতে হতো। কিবরিয়া স্যার প্রথমেই এগু্লোর পরিবর্তে ১০-১২টি পাকা সেনিটারি লেট্রিন তৈরি করলেন এবং কয়েকটি টিউবওয়েল বসালেন সরকারী অনুদান এনে। অল্পদিনের মধ্যে কয়েক লাখ টাকা সেংশন করিয়ে টিচারদের জন্য ডর্মেটরি বিল্ডিং নির্মান করালেন। পুকুর সংস্কার করে খেলার মাঠ সমতল করালেন। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বোর্ডের চেয়ারম্যানকে এনে কলেজ পরিদর্শন করালেন। ছাত্রশিক্ষকদের কর্মস্পৃহা দেখে চেয়ারম্যান স্যার মুগ্ধ হলেন। ফিরে গিয়ে কলেজের জন্য অনেক সরঞ্জামাদি বরাদ্দ দিলেন। প্রিন্সিপাল স্যারের অনুরোধে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজকে এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র হিসাবে অনুমোদন দিলেন। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এসেছিলেন কালিহাতি হাই স্কুল মাঠে জন সভায়। বিরাট এক ব্যানার নিয়ে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ থেকে আমাদের সব ছাত্র পাঠিয়েছিলেন উক্ত সভায়। মাঠের মাঝখানে এতগুলি ছাত্রের মুহুর্মুহু স্লোগানে প্রেসিডেন্ট-এর দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। তিনি কয়েকলাখ টাকা কলেজের জন্য মঞ্জুরি দিতে নির্দেশ দেন। এরপর কলেজের অবস্থা অনেক পাল্টে যায়।
ফেব্রুয়ারি বা মার্চের দিকে কিবরিয়া স্যার আমাদের ব্যাচের হোস্টেলে থাকা ছাত্রদের নিয়ে বিকেলে ছাতিহাটি গেলেন। কলেজের নামে এলাকায় অনেক ধানী জমি ছিল। সেই জমিতে ইরি ধানের জালা বা গাছি ফেলা ছিল। স্যার আমাদের নিয়ে সেই জালা তুলতে বসলেন। আমরা ছাটা কামলার মত স্যারের সাথে লাইন ধরে বসে জালা তুললাম। এক সময় আমি, নজরুল বেলায়েত, কাদের, বুলবুল সবাই মিলে ছাটা কামলাদের মত আঞ্চলিক ভাষার গান গাইলাম। স্যার নিরবে উপভোগ করছিলেন। আমরা স্যারকে ভয় বা লজ্জা পেলাম না। স্যার বললেন “উন্নত দেশে কোন কাজকে কেউ ছোট করে দেখে না। পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে তারা কাজ করে।” এভাবে আমরা মাঝে মাঝেই এক ঘন্টা বা আধ ঘন্টা কাজ করতাম। কাজের শেষে বিস্কুট খেতাম। স্যার আমাদেরকে হোস্টেলে করা শাসনের ভিতর রাখতেন। বেলা ডোবার সাথে সাথে রুমে ফিরতে হত। রাত ১২টার মধ্যে লাইট নিভিয়ে ঘুমিয়ে পরতে হত। শিক্ষকগণও স্যারকে পীরের মত মানতেন। তিনি দৈনিক তিন-চারটি করে ডিম পুচ করে খেতেন। তাই স্যার একটু মোটাসোটা ছিলেন। ঢিলেঢোলা কুরতা পরাতে বিসাল আকৃতির পেটটা তেমন বুঝা যেত না।
১৯৭৯ সনে আমাদের কলেজে প্রথম পরীক্ষার সেন্টার হল আমাদের এইচএসসি পরীক্ষার মাধ্যমে। আমি পরীক্ষার্থী ছিলাম । ২৯ শে মে বৃ্হস্পতিবার বাংলা প্রথম পত্র, ৩১ মে শনিবার বাংলা দ্বিতীয় পত্র এবং ২ জুন সোমবার ইংলিশ প্রথম পত্র পরীক্ষা দিলাম । বিকেলে আমার মায়ের মৃত্যু সংবাদ এলে কিবরিয়া স্যার অখিল স্যারকে দিয়ে আমাকে বাড়ি পাঠালেন মায়ের মুখটি শেষ বারের মতো দেখার সুযোগ করে দিতে। অখিল স্যার আমাকে তার সাইকেলে বসিয়ে ডব্লিং করে চালিয়ে নিয়ে গেলেন । আমি নিরবে সাইকেলে স্যারের সামনে নিরবে বসলাম। আমি তখন হাল্কা পাতলা হলেও ওজন আমার ৫৬ কেজির কম ছিল না। আমাকে নিয়ে অখিল স্যার সাইকেল চালিয়ে পাহাড়ের দুর্গম রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদছিলাম। ভন্ডেশ্বর, খালুয়া বাড়ী, আওলাতৈল, মরিচা, বাঘেরবাড়ী, দেবলচালা, ঢডনিয়া, জিতাশ্বরি, নওপাড়া সুদীর্ঘ ১২-১৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রাত ১০ টার দিকে বাড়ি পৌঁছলাম। সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন জানাজার জন্য। আমি অজু করে জানাজায় শরীক হলাম। দাফন হল। এক সময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।
ভোরে অখিল স্যার বললেন “কিবরিয়া স্যার তোমাকে পরীক্ষা শুরুর আগেই ফিরিয়ে নিতে বলেছেন।” আমি বললাম “চলুন, স্যার।” আমি ভোরে আবার অখিল স্যারের সাইকেলে বসে কলেজে চলে গেলাম । পরীক্ষা শুরুর আধ ঘন্টা আগে গিয়ে পৌঁছলাম। মুখ ধুলাম। আবুল হোসেন তালুকদার স্যার এগিয়ে এলেন। বললেন “কিবরিয়া স্যার তোমাকে পরীক্ষার হলে যেতে বলেছেন।” আমি নিরবে হলে গিয়ে বসলাম। হাতে খাতা ও প্রশ্ন পত্র দেয়া হল। দোয়া পড়ে লিখা শুরু করলাম। বেশ কিছুক্ষণ লিখার পর মায়ের স্মৃতি ভাসা শুরু হয়ে গেল। চোখ দিয়ে পানি ঝরা শুরু হল। কোন এক স্যার মাথায় হাত বুলালেন। আমি আবার লিখলাম। লিখে শেষ করলাম। রুমে ফিরলাম। সবাই পড়া নিয়ে ব্যস্ত। আমাকে শান্তনা দেবার মত সময় সবার হাতে কম। আমিও বুঝলাম। ভাগ্যের নির্মম অধ্যায় অতিক্রান্ত করছিলাম।
কয়েকদিন পর বাবা এলেন হাসেন কাক্কুকে সাথে নিয়ে। বাবার চেহারা দেখে আমি বিমর্ষ হয়ে গেলাম। বাবার স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে গেছে। ভয় হল বাবাকেও হারাই নাকি। বাবা প্রিন্সিপাল স্যারের সাথে দেখা করতে চাইলেন। আমি হাসেন কাক্কু ও বাবাকে প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে নিয়ে রেখে এলাম। কয়েকদিন পর ভিয়াইল থেকে রশিদ কাক্কু এলেন বর্গার বছির মৌলভী স্যারকে নিয়ে আমাকে দেখতে। রশিদ কাক্কুও স্যারের সাথে দেখা করে স্যারকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে যান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হাসেন কাক্কু, বাবা ও রশিদ কাক্কু কিবরিয়া স্যারের আতিথেয়তার প্রশংসা করতেন। এইচএসসি পাস করি আল্লাহর দয়ায় প্রথম বিভাগে ২টি লেটার নিয়ে। স্যারের সাথে দেখা করে কদম্বুচি করি। তারপর ১৯৯৪-এর আগ পর্যন্ত স্যারের সাথে দেখা হয়নি। এর মধ্যে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী স্যার দেশে ফিরে কলেজের দায়িত্ব হাতে নেন। কিবরিয়া স্যার এক সময় চাকরী ছেড়ে দেশে চলে যান। কিছুদিন ঢাকার কোন এক কলেজে শিক্ষকতা করেন। কিন্তু আবার চাকরি ছেড়ে চলে যান বোনের বাড়ী পটুয়াখালীতে।
১৯৯৪ সনে আমি এমফিল পড়াকালীন ঢাকার শাহবাগে পিজি হোস্টেলে থাকতাম। তিনি তার বোনের কাজের মহিলার চিকিৎসা করানোর উদ্দেশ্যে আমার রুমে এসেছিলেন এবং এক রাত আমার রুমে কাটিয়েছিলেন । আমাদেরকে নিয়ে অনেক স্মৃতিচারণ করেন।
এক সময় তিনি ঘাটাইল ব্রাম্মনশাসন মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল হন । সেখানে তিনি কয়েকবছর ছিলেন। একদিন দেশের বাড়ি বেড়ানোর কথা বলে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। তিনি বিছানাপত্র কাপড় চোপর কিছুই নেননি।
অনেকদিন পর জানা গেছে পটুয়াখালী বোনের বাড়ী অবস্থান কালে চিরকুমার, মৃদুভাষী, বিচক্ষণ, স্বাধীনচেতা, বুদ্ধিদীপ্ত সেই বড় মাপের মানুষটি ইহজগৎ ত্যাগ করেছেন।
প্রথম লিখনঃ ২১/১২/২০১৭ খ্রি.
সংক্ষিপ্তকরনঃ ১২/১০/২০২২ খ্রি.
