Author Archives: talukderbd

Haque-sir-er-basay

Haque Sir-er Basay

হক স্যারের বাসায় গিয়েছিলাম

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হক স্যার তখন অবসর জীবন যাপন করছিলেন। ময়মনসিংহের চরপাড়ার লাশকাটা ঘরের বিপরীত দিকের রাস্তায় তিনি বাড়ি করে থাকতেন। ১৯৯৭ সনের পরে হবে। বাংলাদেশ জার্নাল অব প্যাথলজি-তে আমার প্রথম দুটি সাইন্টিফিক রিসার্চ আর্টিকেল প্রকাশিত হলো। এগুলো ছিলো ঢাকার শাহবাগে ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিসিন এন্ড রিসার্চ (আইপিজিএম আর)-এ এম ফিল কোর্স করার সময় আমার থিসিস। পাকস্থলীর ক্যান্সারের সাথে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি জীবাণুর সম্পর্কে গবেষণা করছিলাম। আমার গবেষণার ফলাফল জার্নালে প্রকাশ পাওয়ায় খুব আনন্দিত ছিলাম। এই আনন্দ সবার সাথে শেয়ার করা যায় না। সবাই এর মর্জাদা বুঝে না। ঢাকার হোটেল শেরাটনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সোসাইটি অব প্যাথলজিস্ট-এর সম্মেলনে জার্নাল বিতরণ করা হয় নিবন্ধিত মেম্বারদের মাঝে। আমি আমার প্রিয় শিক্ষক প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হক স্যারকে প্রদান করার জন্য অতিরিক্ত দুটি কপি সংগ্রহ করেছিলাম। হক স্যার ছিলেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ও অধ্যক্ষ। তিনি ময়মনসিংহ বিএমএ-এর এক সময় প্রেসিডেন্টও ছিলেন।

আমি তখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের লেকচারার ছিলাম। অফিস থেকে বের হয়ে সকাল আনুমানিক ১০ টার দিকে জার্নাল দুটি হাতে নিয়ে স্যারের বাসার দিকে গেলাম। গেইটে করা নাড়ায় স্যার নিজেই দরজা খুলে দিলেন। আসেন আসেন বলে স্যার খুব খুশি হয়ে আমাকে তার বেড রুমে নিয়ে গিয়ে বাসালেন। সিম্পল একটা খাটে সাধারণ বিছানা পাতা। মশারীর দুই কোণা বাঁধা আছে। অন্য দুই কোণা বিছানার অর্ধেক পর্যন্ত কভার করে আছে। বাসায় অন্য কেউ আছে বলে মনে হলো না। স্যারের স্ত্রী ঢাকার বাসায় থাকেন। মেয়েরাও ঢাকায় থাকে। বাসার পরিবেশ দেখে মনে হলো আমি সেই হাজার বছর আগের দিনের কোন এক দার্শনিকের কাছে এসেছি। স্যার জার্নাল দুটি হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলেন। আমি আমার আর্টিকেল বের করে দিয়ে বললাম “স্যার, এ দুটি আমার প্রথম আর্টিকেল।” স্যার আমাকে

অভিনন্দন জানিয়ে আনন্দিত চোখে পড়া শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পড়ার পর বললেন “খুব ভালো হয়েছে। তবে বেশ কিছু গ্রামার ভুল আছে।” আমি বললাম

– স্যার গতকাল আমাদের সোসাইটির বার্ষিক সম্মেলন ছিলো। সেখানে সবাইকে এই জার্নাল দিয়েছে। আমি আপনার জন্য দুটি নিয়ে এসেছি।

– খুব ভালো করেছেন। সাদেক, কেউ এখন দায়িত্ব নিয়ে খোঁজ খবর নেয় না। অথচ, দেখেন, আমি এই সোসাইটির আজীবন সদস্য। একটা চিঠিও পাই না। আপনি আমার কথা মনে করে জার্নাল নিয়ে এসেছেন, এজন্য অনেক ধন্যবাদ। আপনি আরও পেলে আমার জন্য নিয়ে আসবেন। নতুন কিছু জানতে হলে জার্নাল পড়তে হবে। এই যে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি জীবাণু যে স্টোমাকে থাকে কজনে জানেন? আপনি স্টোমাক থেকে জীবাণু আইসোলেট করেছেন এবং তার সাথে যে ক্যান্সারের এসোসিয়েশন আছে তার প্রমাণও করেছেন।

স্যার ছোট বড় সবাইকে আপনি করে বলতেন। আমি স্যারের ছাত্র হলেও তিনি আমাকে আপনি করে বলতেন। অনেক্ক্ষণ তিনি অনেক স্মৃতিচারণ করে কথা বললেন। বিশেষকরে তিনি যখন ইংল্যান্ডে পোস্ট গ্রাজুয়েট কোর্সে ছিলেন সেই সময়ের স্মৃতি কথা বলছিলেন। আমার ক্লাস আছে বলে উঠতে চাইলে স্যার বললেন “সাদেক, একটু বসেন। চা দিচ্ছি” বলে দ্রুত ভিতরের রুমে গিয়ে নিজেই চা বানিয়ে আমার জন্য নিয়ে এলেন।” আমি বিনয়ের সাথে বললাম “স্যার, আপনি কষ্ট করে চা বানালেন!” স্যার, হালকা হেসে বলেলেন “এই সামান্য এক কাপ চা, আর কি, খান। এভাবেই কেটে যাচ্ছে। “

৯ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রি

ময়মনসিংহ

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ম-১৭ ব্যাচ

সাবেক বিভাগীয় প্রধান

প্যাথলজি বিভাগ

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ

#memoryofsadequel

Jummaghor

Jummaghor

আমাদের গ্রামের জুম্মাঘর

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমি বুঝমান হয়েই দেখেছি আমাদের বড়বাইদপাড়া গ্রামের আজিম উদ্দিন সিকদার বাড়ির কেন্দ্রীয় মসজিদটি। আমরা বলতাম জুম্মাঘর। এটার চালের ছাউনি ছিলো ঢেউ টিনের। বেড়া ছিল চেপটা টিনের। মেঝে ছিল কাঁচা। চট বিছিয়ে নামাজ পড়তাম। ঐ বাড়ির মানুষ জুম্মা ঘরে পাঞ্জেগানা নামাজ আদায় করতেন আজান দিয়ে। গ্রামের মুছুল্লিরা শুধু শুক্রবার জুম্মার নামাজ জামাতে আদায় করতেন। প্রতি বৃহস্পতিবার কাক্কী (জয়নাল ভাইর মা) জুম্মাঘরের মাইঝাল (মেঝে) ও পিড়া (ডোয়া) হাইল মাটি (বাইদের মাটি) দিয়ে লেপে দিতেন।

আজিম উদ্দিন সিকদার দাদা বহরমপুর থেকে এসে এখানে বাড়ি করে একটা পুকুর খনন করেন সেই ব্রিটিশ আমলে। পুকুরের পশ্চিম পাশে তিনি এই জুম্মাঘর নির্মাণ করেন গ্রামের মানুষের নামাজ আদায় করার জন্য। উত্তর পাড়া, পশ্চিম পাড়া, পূর্বপাড়া, তালুকদার বাড়ি, নওপাড়া ও চনপাড়ার সব মুছুল্লিরা এই মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করতেন। এই মসজিদকে কেন্দ্র করে গ্রামের মানুষের মিলন মেল হতো। মসজিদ প্রাঙ্গণে বড় আম গাছ ছিলো। সেই আমগাছের নিচে একটা বাঁশের মাচাং ও দুইটা ঘোড়া কাঠ ছিলো। নামাজ শুরুর আগে ও পরে এখানে বসে যুকক ও কিশোর বয়সের মুছুল্লিরা খোস গল্প করতো। গ্রামের মানুষের সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে বড়রাও আলাপ আলোচনা করতেন। গ্রামের মাতবর ছিলেন কোরবান আলী সিকদার কাক্কু ও কাশেম তালুকদার কাক্কু (মিয়াকাক্কু)। মাতবরের মুখের উপর কেউ কথা বলতে পারতো না।

এই মসজিদের ইমাম ছিলেন শিরিরচালার হাছেন ক্কারীসাব। তিনি শুক্রবারের জুম্মার নামাজে ইমামতি করতেন। বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে দাওয়াত খেয়ে মিলাদ পড়ে দোয়া করে বখসিয়ে দিতেন। আমাদের শমে কাক্কুও মিলাদ পড়াতেন। আমাকেও সাথে নিয়ে যেতেন তালেবে ইলিম হিসাবে।

আমগাছ তলায় মাঝে মাঝে মাসআলা নিয়ে অল্প বয়সের যুবকদের মধ্যে তর্ক লেগে যেতো। মিয়া কাক্কু এগিয়ে এসে থামিয়ে দিয়ে সঠিক মাসআলা কি হবে বলে দিতেন। মিয়া কাক্কুর উপরে কেউ কোন মাসআলা বলতে সাহস পেতো না। মাসআলা বলার পরে এটা পাকাপোক্ত করার জন্য ইমাম সাবকে জিজ্ঞেস করতেন “তাই না হুজুর?” হুজুর ইতস্তত করে গোল টুপিটা ডান হাত দিয়ে হালকা ঘুরান মেরে বলতেন “ঐত্য।” তারপর টুপিটা মাথা থেকে খুলে ফু দিয়ে গোল করে আবার মাথায় পরে দ্রুত চলে যেতেন জুম্মা ঘরের ভিতর। ‘ঐত্য’ কথাটি একটি হালকা সম্মতিসরূপ একটি শব্দ। আমার মেয়ে দুটি যখন ছোট ছিলো তখন দুজনে মাঝে মাঝে তর্কে করে কার কথা ঠিক এটির সমাধান নিতে আমার কাছে এলে আমিও বলে দিতাম “ঐত্য। তোমাদের জন্য আজ কি যেনো আনত হবে?”

ইমাম সাব ছিলেন ক্কারী। অল্প কিছু মাস আলা জানতেন। অল্প কিছু বয়ান করতেন খুতবার আগে অথবা নামাজের পর দোয়ার আগে। দোয়াকে মুছুল্লিরা খুব প্রয়োজন মনে করতেন। শেষ দোয়া না করে কেউ বের হতে চেতেন না। জুম্মার নামাজ শেষ হতে প্রায় দুটো বেজে যেতো। মুছুল্লিদের ক্ষুধা পেতো। হুজুর দোয়া করার আগে কিছুক্ষণ বয়ান করতেন। মুছুল্লিরা কেউ কেউ বলে উঠতেন “হুজুর, দোয়া কইরা দেইন।” হুজুর বলতেন “মুক্তাছার করতাছি। আর এটু বহুন।” মুক্তাছার মানে কি আমি জানি না। তবে বুঝে নিয়েছি ‘সংক্ষিপ্ত’। হুজুর হাছেন ক্কারী সাব ছিলেন মুক্তার আলী মাস্টার স্যারের বড় ভাই। উভয়ই খুব ভালো মানুষ।

আয়েন উদ্দিন সিকদার দাদার ছেলে হাছেন সিকদার কাক্কু খুব নিয়মিত মুছুল্লি ছিলেন। তিনি সবার আগে এসে প্রথম কাতারে ইমাম সাবের পিছনেই বসতেন। সবার শেষে তারাহুরো করে উপস্থিত হতেন ওহাদালী কাক্কু (ওয়াহেদ আলী)। ওহাদালী কাক্কু অল্প লেখাপড়া জানলেও সুর করে ভালো পুথি পড়তে পারতেন। আমি মাঝে মাঝে কাক্কুদের বাড়ি গিয়ে পুথি পড়তে বলতাম। কাক্কু বারান্দায় জলচৌকিতে বসে আমাকে পুথি পড়ে শুনাতেন। আমরা পুথিকে বলতাম কিতাব। এটা ছিলো জংগে কারবালার কিচ্ছা। কাক্কু চৌকিতে কিতাব খুলে রেখে সোজা হয়ে বসে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে অভিনয় করে কিতাব পাঠ করতেন। “ঘোরায় চড়িয়া মর্দ চলিতে লাগিলো ” বলার সময় মনে হতো যেনো কাক্কুই চড়ে তলোয়ার হাতে ছুটে চলেছেন। “শত শত মারা গেলো মর্দ কাতারে কাতার” শুনে মনে হতো কাক্কুর সামনেই শত শত সৈন্য শহীদ হয়ে পড়ে আছে। কিতাবের করুণ পংতিগুলো কাক্কু এক গালে হাত রেখে করুণ শুরে বিলাপ করে পড়তেন “ও সিমার সিমাররে……। “

জুম্মার নামাজের কোন টাইম টেবিল ছিলো না। সব মুছুল্লিরা চলে এলেই নামাজ শুরু হতো। সব মুছুল্লিরা চলে এলেও অনেক সময় মাদবর কাক্কুরা আসা পর্যন্ত হুজুর অপেক্ষা করতেন। ওহাদলী কাক্কু সবার শষে তারাহুরো করে এসে অজু করে টুপিটা মাথায় ঢুকাতে ঢুকাতে জুম্মাঘরে প্রবেশ করতেন। হাছেন সিকদার কাক্কু বলতেন ” হুজুর, নামাজ শুরু করুন। ওহাদালী আইপড়ছে।” হাছেন কাক্কু খুব ফক্কর ছিলেন। তিনি খালি হাসাতেন। একবার জুম্মায় আগে আসার গুরুত্ব নিয়ে মুক্তাছার বয়ান করছিলেন “জুম্মার নামাজে আগে আইলে বেশী লাভ। যেমন ধরুন, যে অজ প্রথম আইলো, হে পাইল একটা উট কোরবানি করার সমান ছোয়াব, যে তারপর আইল, হে পাবো একটা গরু কোরবানি করার সমান ছোয়াব, তারপর যে আইলো হে পাবো একটা ছাগল কোরবানি করার সমান ছোয়াব, এভাবে কমতে কমতে সবার শেষে যে আইলো হে পাইলো একটা মুরগি কোরবানি করার সমান ছোয়াব।” হাছেন কাক্কু হেসে বলেন “হুজুর, মুরগি কোরবানি করার ছোয়াবটা তাইলে ওহাদালী পাবো।” হুজুর বললেন “বয়ানের সোম কথা কইন না জানি কেউ।” আমি মনে করলাম “উট কোরবানি করার সমান ছোয়াবটা হাছেন কাক্কুই পেলেন।” অথচ ওয়াদালী কাক্কুর বাড়ি কিন্তু জুম্মাগরের কাছেই ছিলো। তারপরও উট কোরবানি করার সমান ছোয়াব কামাই করতে পারেননি।

আরেকদিন আল্লাহর নিয়ামত ও কুদরত নিয়ে হুজুর জুম্মাঘরে বয়ান দিতেছিলেন “আল্লাহ কত নিয়ামত আমাদেরকে দিয়েছেন! কত সুস্বাদু ফল দিয়েছেন আমাদের জন্য! কাঠাল, আম, জাম, কলা, লিচু, আনারস, এমন অনেক কিছু।” হাছেন কাক্কু খুশি হয়ে বলে উঠলেন “হুজুর, আর তেঁতুল। ঐডাই ত মজা বেশি। মনে অইয়াই জিলবায় পানি আই পড়ছে।” হুজুর বললেন “বয়ানের সোম কতা কইন না জানি।”

আমাদের বাড়ি জুম্মা ঘর থেকে বেশ দূরে ছিলো। প্রায় আধা কিলোমিটার হবে। পাঞ্জেগানা নামাজ জামাতে আদায় করা সম্ভব হতো না। বাড়িতেই পড়ে নিতাম। উট কোরবানি করার সমান ছোয়াব কামাই করার ইচ্ছা থাকলেও আগে যেতে পারতামনা। তালুকদার বাড়ির বড় ছোট সব মুছুল্লিরা একত্র হতে সময় লাগতো। দল বেধে মুরুব্বিদের পিছনে হেটে যেতে হতো জুম্মায়। তাই একটু দেড়িতে পৌছতে হতো জুম্মায়। রমজান মাসে তারাবি নামাজে যেতে হতো রাতের অন্ধকারে সরু পথ দিয়ে। বুইদ্যা চালা ও জুয়াদালী কাক্কুদের জঙ্গলের ভিতর দিয়ে। সাপ ও জংলী শুকুরের ভয় ছিলো রাস্তায়। তাই দলবেধে হারিকেন, চুঙ্গাবাতি (মশাল), দোয়াত (কুপি বাতি), বদনাবাতি, বা পাটখড়ির (সোলা) আগুন জ্বালিয়ে এই দুর্গম পথে যেতে হতো তারাবি নামাযে। এই পথে ৪ টা ঘোনাও পারি দিতে হতো। ঘোনার পিচলা বাতর (আইল) থেকে অনেকেই কাদা ক্ষেতে অন্ধকারে পড়ে যেতাম। এমন কষ্ট করে যেতে হতো আমাদের জুম্মায়।

আমাদের মক্তবে যারা প্রথম কোরআন পড়ার উপযুক্ত হতেন তারা জুম্মার দিন জুম্মায় গিয়ে সবার সামনে কোরআন হাতে নিতেন। সবাই দোয়া করতেন। মিষ্টি বিতরন করা হতো এ উপলক্ষে। আমি ও এছাক ভাই একসাথে এই জুম্মায় এসে সবার সামনে কোর আন হাতে নিয়েছিলাম। আমাদের শিক্ষক ছিলেন নোয়াখালী নিবাসী আব্দুল কদ্দুস ক্কারী সাব। তিনি পরে পাইন্নাবাইদ গ্রামে স্থায়ী হন। খুব ছোট ছিলাম। এত ছোট কাউকে কেউ কোরআন হাতে নিতে দেখেননি। তাই, সবাই আমার দিকে উৎসুক দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়েছিলেন।

জুম্মায় আনন্দও ছিলো। একবার সবে ক্কদরের রাত জেগে ইবাদত করতে আমরা জুম্মাঘরে একত্র হয়েছিলাম। মাওলানা সালাউদ্দিন দুলাভাই এটার কো-অর্ডিনেটর ছিলেন। একটা খাসি জবাই করা হয়েছিলো। জুম্মাঘরের উত্তর পাশে মাটি কেটে চুলা করা হয়েছিলো। কয়েকজনে মিলে রান্না করছিলেন। বাকীরা জুম্মাঘরে বসে ইবাদতে মসগুল ছিলেন। আমার ভাগে পড়েছিলো দুই পাড়া কোরআন পড়া। একেক জনে একেক রকম ইবাদত করছিলেন। কোরআন পড়া শেষ করে আমি রান্না দেখতে গেলাম। এক জনে বললেন যে যারা রান্না করছে তারাও ইবাদতের ছয়াব পাবেন। ফিরে গিয়ে দেখি মাওলানা দুলাভাই বয়ান করছেন। আমি প্রবেশ করা মাত্রই দুলাভাই বললেন “এই যে, সাদেকই বলতে পারবে। সাদেক, বলতো চাঁদে কে কে পৌছেছিলো?” আমি একটু স্টাইল করে কথা বলে উত্তর দিলাম “নীল আর্মস্ট্রং, এড উইন ই অল্ড্রিন এন্ড মাইকেল কলিন্স।” তিনি বললেন “হে, সাদেক ঠিক বলছে। ও বিজ্ঞান জানে। কাজেই আমরা যে রকম দেখি চাঁদ সে রকম না। আল্লাহ চন্দ্র সূর্য গ্রহ নক্ষত্র সব সৃষ্টি করেছেন……….। “

আমাকে ১৯৭৫ সন থেকে পড়শুনা ও চাকরি করার জন্য গ্রামের বাইরে থাকতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে গ্রামে আরও দুটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে। সেহেতু ঐ কেন্দ্রীয় মসজিদে আমার আর যাওয়া হয় না। নওপাড়া ও চনপাড়ার মুছুল্লিদের সুবিধার্থে দুইপাড়ার সংযোগ স্থলে একটি পাকা মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। তালুকদার বাড়ির মুসুল্লিদের সুবিধার্থে তালুকদার বাড়ির পারিবারিক গোরস্থানের পশ্চিম পাশে শিরিরচালা – সারাসিয়া রাস্তার ধারে আরেকটি পাকা মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। আমি বাড়ি গিয়ে তালুকদার বাড়ি জামে মসজিদে জুমআর নামাজ পড়ি। ইচ্ছা থাকলেও কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ও চনপাড়া জামে মসজিদে যেতে পারিনা। যদি যাই, তবে নিন্দুকেরা বলবে “ডাক্তরে নিজের বাড়ির মসজিদে না গিয়ে অন্য পাড়ার মসজিদে গেছে।” বস্তুত তিনটি মসজিদই আমাদের। তিনটি মসজিদেই গ্রামের মানুষের আর্থিক সহযোগিতা আছে। নামাজে মুছুল্লিদের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই আরও দুটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে। শুধু মসজিদ না, গ্রামের সবার সহযোগিতায় মাদ্রাসা, স্কুল, হাসপাতাল, বাজার ইত্যাদি তৈরি হয়েছে। একটা জিনিসের অভাব আছে, সেটা হলো পাকা রাস্তা। পাকা রাস্তা করার এখতিয়ার গ্রামের মানুষের নেই। এটা সরকারি অর্থায়নের কাজ। সরকার দেশের মেঘা মেঘা রাস্তার প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত। একদিন হয়তো পাকা রাস্তা হবে। সেদিন হয়তো আমরা থাকবোনা। ঘুমিয়ে থাকবো চির নিদ্রায় রাস্তার ধারের তালুকদার বাড়ি পারিবারিক গোরস্থানে বাবা-মার পাশে আসাদুজ্জামান তালুকদার মুকুলের মতো। পথচারীরা সালাম দিয়ে যাবে। মসজিদের মুছুল্লিরা জুমআর নামাজ শেষে দোয়া করবে “ইয়া, আল্লাহ, মেহেরবানী করে করববাসীদেরকে মাফ করে দিন।”

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বড়বাইদপাড়া, সখিপুর, টাঙ্গাইল।

১৮ নভেম্বর ২০২২ খ্রি.

ময়মনসিংহ

এমন স্মৃতি কথা আরও পড়তে নিচের হ্যাস ট্যাগ শব্দের উপর ক্লিক করুন

#memoryofsadequel

ads banner:

bichhun-dhan

Bichuun Dhan

বিছুন খেয়ে ফেললে কী হয়?

(কথিকা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

কৃষক জমি থেকে ফসল তোলার পর নিজেদের প্রয়োজন হিসাব করে রেখে দিয়ে বাকীটা বিক্রি করে দেয়। বাংলাদেশের কৃষকদের প্রধান ফসল ধান। ভাত রান্না করার জন্য ধানকে সিদ্ধ করে শুকিয়ে গোলায় রেখে দিতে হয়। সিদ্ধ শুকনো ধান ঢেকিতে ভাঙ্গিয়ে অথবা ধান ভাঙ্গার মেশিন দিয়ে ভাঙ্গিয়ে চাউল বের করে চাউলের ড্রামে রেখে দেয় ভাত রান্না করার জন্য। এই চাউলকে বলা হয় সিদ্ধ চাউল। পিঠা-পায়েস-পোলাও রান্না করার জন্য যে চাউল বের করা হয় সেটাকে বলা হয় আতপ চাউল বা আওলা চাউল। এই চাউল বের করা হয় শুকনো আসিদ্ধ বা আওলা ধান থেকে। মুড়ি বানানোর জন্য সাধারণত বড় বড় ধান বেছে নিতে হয়। এগুলোও সিদ্ধ ধান থেকে বের করতে হয়। আগের দিনে আলোই ধান নামে বড় বড় জাতের ধান ছিলো। এগুলোর মুড়ি বড় বড় হতো। আগামীতে বোনার জন্য কিছু ধান রেখে দিতে হয়। এগুলোকে বলা হয় বিছুন ধান। যেগুলোকে আমরা বীজ ধান নামে জানি। রোগমুক্ত হৃষ্টপুষ্ট ধানগুলো বিছুন ধান হিসাবে রেখে দেয়া হয়।

সারাবছর কী পরিমাণ ধান লাগবে তার একটা ভালো হিসাব রাখতে হয়। কেউ যদি আনন্দ ফুর্তি করে গোলায় রেখে দেয়া ধান বিক্রি করে, শেষের দিকে খাদ্যের অভাবে পড়বে। এমন মানুষকে বলা হয় বেইন্যা। বেইন্যারা খাওয়ার জন্য রেখে দেয়া ধান বিক্রি করে ভালো ভালো খাবার কিনে খায়, ভালো ভালো কাপড় চোপড় কিনে পরে ফ্যারাংগি করে। শেষে ভাতের ধান কম পড়ে যায়। তখন বেইন্যারা বিছুন ধানও সিদ্ধ করে ভাতের চাউল বানিয়ে খেয়ে ফেলে। ধান বোনার সময় এলে বিছুন ধান তো ঘরে থাকেই না, বিছুন ধান কেনারও টাকা হাতে থাকে না। শেষে জমি বিক্রি করে ভাতের ধান ও বিছুন ধান কিনতে হয়। বেইন্যারা এভাবে গরীব হতে থাকে। কাজেই এমন ভাবে হিসাব করে চলতে হবে যেনো বিছুন ধানে হাত দিতে না হয়।

৮ অক্টোবর ২০২২ খ্রি.

#talkofsadequel

ads banner:

kathal churi

কাঁঠাল চুরি

(স্মৃতি কথা)

তখন ক্লাস ওয়ান বা টুতে পড়তাম। তখন আম-কাঁঠাল গাছ তেমন বেশী ছিলো না। যেহেতু, তালুকদারদের মধ্যে মেঝ দাদা মেছের আলী তালুকদার প্রথম এই গ্রামে এসে বাড়ি করেছিলেন সেহেতু দাদাদের গাছগুলো তুলনামূলক বড় ছিলো। কি কারনে যেন আমরা মেছের দাদার স্ত্রী, যিনি আমাদের দাদী হন তাকে সব নাতী নাত্নিরা বাব্বু ডাকতাম। বাব্বু আমার বাবার আপন চাচী। মুকুলের আপন দাদী। দাদুদের গাছগুলো প্র‍্থম দিকে বাব্বুই লাগিয়েছিলেন। তাই, গাছগুলোর নাম বাব্বুর নামে হয়েছে। যেমন, বাব্বুর কাঁঠাল গাছ, বাব্বুর আম গাছ। বাব্বুর কাঁঠাল গাছটা ছিল বাব্বুগ ঘরের পিছে, বাঁশ আড়ার সাথে । তাই কাঠাল চুরি করা সহজ ছিলো।

এই কাঁঠাল পাকলে হয় জুম্মাঘরে দেয়া হবে শুক্রবারে। না হয় ভেঙ্গে বাব্বু মুকুলকে খাইয়ে দিবে। না হয় বাটি ভর্তি রোয়া নিয়ে ছোট কাক্কুর হাতে দিবে। এটাই ছিলো আমাদের ধারণা। শাজাহান, রাজ্জাক, মুকুল ও আমি সাধারণত এক সাথে পাড়াময় ঘুরে বেড়াতাম। বাব্বু মুকুলকে খুব আদর করতেন এবং চোখে চোখে রাখতেন। আমরা মুকুলকে নিয়ে যেদিকে যেতাম, বাব্বুও সেদিকে যেতেন। কাঁঠালটা বড় হলে পাকলো কিনা জানার জন্য পাজুন (গরু পিটানোর লাঠি) দিয়ে বারি দিতাম প্রতিদিন একবার করে। একসময় পাকার জন্য আর ধৈর্য্য ধরে না। সিদ্ধান্ত নিলাম পেড়ে মুখে কচি ঠুকায়ে পাঁকাবো। তাতে তো আমাদের লাভ হবে না। মুকুল একা খেতে পারবে, আমরা পারবো না। তিনজনে সিদ্ধান্ত নিলাম মুকুলকে সাথে নিয়ে এই কাঁঠাল চুরি করবো। তাতে ধরা পরলে মুকুল সাথে থাকলে কেউ চোর বলতে পারবে না। সেই মতো একদিন আমরা কাঠালটা ঝেংটা টান মেরে পেড়ে বাঁশ আড়ার ভিতর দিয়ে লুকিয়ে এক দৌড়ে ঘোনা পার হয়ে বুইদ্যা চালার জঙ্গলে লুকিয়ে পড়লাম। কোদাল দিয়ে মাটি কেটে গর্তে কাঠাল রেখে মাটি দিয়ে ঢেকে ফেললাম। তারপর ৪ চোর মিলে বুইদ্যা চালার মাঝখানে যেখানে বন ছিলনা সেখানে বসে শলাপরামর্শ করলাম কিভাবে ফলোআপ দিতে হবে। সিদ্ধান্ত হলো সব চোর একাত্র হয়ে প্রতিদিন একবার করে কাঁঠাল দেখে যাব। একটা আসংকা ছিলো যে কাঁঠাল পেকে গেলে আড়ার শিয়াল মাটি থেকে কাঁঠাল তুলে খেয়ে ফেলবে। তাই রাতে হুয়া হুয়া করে শিয়াল ডাকলে মনে করতাম কাঁঠালটা খেয়ে শিয়াল আনন্দ করছে। কাঁঠাল দেখতে যাওয়ার আগে আমরা একে অন্যকে ডাকতাম। সিদ্ধান্ত হয়েছিলো যে “ঠাল” বললে মনে করবো ঐ চুরি করা কাঠাল।

in-feed-ads:

একদিন আমি শাজাহানকে ডাকলাম “এই শাজাহান, ঠাল।” অন্যরাও বলে উঠলো “ঠাল।” সেখানে কয়েকজন মুরুব্বিও ছিলেন। মোতালেব ভাই বললেন “কি ব্যাপার? কিসের ঠাল?” আমি বললাম “এটা আপনি বুঝবেন না। এটা আমাদের সাংকেতিক ভাষা।” ভাই বললেন “বুঝব না মানে? কাঁঠাল চুরি করছস। এখন কাঁঠালকে বলছস ঠাল। তাই না?” আমরা বললাম “তা না।” তাড়াতাড়ি সরে পড়লাম জেড়ার হাত থেকে। পরামর্শ করলাম এখন থেকে ঠাল বলা যাবে না। বলবো লঠাকা। রাজ্জাক বললো “এটা বললে আবার ধরা খাবা। বাশার ভাই বানান উল্টো করে কথা বলতে পারে। বুঝে ফেলবেন লঠাকা মানে কাঠাল।” চুরি নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলাম। ঐদিন আর ফলোআপ দিতে গেলাম না। পরেরদিন গিয়ে দেখি শিয়ালে কাঁঠাল খেয়ে মাটির সাথে চেড়াবেড়া করে রেখে গেছে। কেইত্তা দেখে মনে হলো বাত্তি হইছিলো না। আমরা খেলে হয়তো পাইনছা লাগতো। যাহোক, চুরিটা সাকসেসফুল হলো না।

বড় হয়ে বুঝেছি, ওটা চুরি ছিলো না। দাদীর গাছের কাঁঠাল চুরি করে খেলে সেটা চুরি হয় না। চুরি করে খেয়েছে শিয়ালে।

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১১ অক্টোবর ২০২২

ময়মনসিংহ

#memoryofsadequel

Jibito Uddhar

Mohilake Jibito Uddhar

মহিলাকে জীবিত উদ্ধার

(স্মৃতি কথা)

ঢাকা থেকে বরিশাল যাচ্ছিলাম লঞ্চে ১৯৮৮ সনে। রাতের খাবার খেয়ে ডেকে বিছানার চাদর বিছিয়ে ব্রিফকেস মাথায় দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। গভীর রাতে যাত্রীদের কোলাহল শুনে ঘুম ভেঙে গেলে চমকে গেলাম। তখন মাঝে মাঝে লঞ্চে ডাকাতি হতো যাত্রীদের মাথায় হাতুড়ি পেটা করে। সেই ইঞ্জুরির চিকিৎসা চরামদ্দিতে ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আমিই করেছিলাম। কি ভয়াবহ সেই হাতুড়ির আঘাত! তাই, ডাকাতির কথা মনে হলেই আমি আঁতকে উঠতাম। উঠে দাঁড়ালাম। না, এটা ডাকাতের ঘটনা নয়। দেখলাম সবাই লঞ্চের ডান কিনারে জড়ো হয়ে নদীর পানিতে কী যেনো দেখছে। আমিও দেখতে গেলাম। দেখলাম কেউ একজন শ্রোতোশ্বনি নদীর পানিতে ভেসে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে হাত উচু করে দেখাচ্ছে। দেখতে দেখতে সব যাত্রী যখন লঞ্চের ডান কিনারে জড়ো হলো লঞ্চ কাত হয়ে পানি প্রবেশের উপক্রম হলো। আমরা দৌড়ে এক যোগে বাম কিনারে চলে গেলাম। লঞ্চ বাম দিকে কাত হলো। ভয়ে দৌড়ে ডান কিনারে চলে গেলাম। এভাবে ডান-বাম খেলা চলো কয়েকবার। এবার মানুষটাকে লঞ্চের খালাসিরা নদী বক্ষ থেকে উঠাতে সমর্থ হলো। রাখা হলো ডেকের মাঝখানে। সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো। আমিও পেছন থেকে উকি দিয়ে দেখবার চেষ্টা করলাম। এক নজর দেখেই চোখ নত করে চলে এলাম। দেখলাম উদ্ধারকৃত মানুষটি একজন মধ্য বয়সি মহিলা, একজনে গরম কাপড় দিয়ে ঢেকে দিচ্ছেন। মহিলা মৃত মানুষের মতো পড়েছিলেন। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে জীবন মরণ চেষ্টা করে বেচে ওঠা মানুষ উদ্ধার হবার পর এভাবেই সাধারণত অবসাদগ্রস্ত হয়ে নিস্তেজ পড়ে থাকে। সবাই যার যার বিছানায় ফিরে এসে নৌকাডুবি নিয়ে নানান কাহিনী বলতে লাগলো। শুনলাম মহিলা সুস্থ আছেন। এখান থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার উজানে তারা নৌকাডুবির কবলে পড়েন। তারা এক নৌকা ভর্তি করে আটরশির পীরের খানেকায়ে যাচ্ছিলেন। সেই নৌকা পদ্মা নদী বক্ষে ডুবে যায়। শ্রোতের টানে মহিলা ভাসতে ভাসতে এপর্যন্ত এসে পড়েছেন। হালকা সাতার কেটে তিনি পানির উপর ভেসে থাকেন। পাহাড়ি মানুষ হলেও আমি সাতার কাটতে জানি। যেভাবে লঞ্চ একবার ডান দিকে এবং বাম দিকে কাত হচ্ছিলো, যদি লঞ্চডুবি হতো আমাকেও হয়তো এভাবে ভেসে সাতার কেটে বরিশালের দিকেই যেতে হতো।

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ময়মনসিংহ

৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ খ্রি.

#momoryofsadequel#charamoddisadequel

Bag Niye Nadite Jhap

Bag Niye Nadite Jhap

ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে নদীতে ঝাপ দিলো

(স্মৃতি কথা)

ঢাকা থেকে বরিশাল ফিরছিলাম লঞ্চে কর্মস্থল চরামদ্দি ইউনিয়ন হেলথ সাব-সেন্টারে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। প্রতিমাসেই একবার এভাবে লঞ্চে রাতে যাতায়াত করতে হতো বরিশাল-ঢাকা-বরিশাল ১৯৮৮-৮৯ সনে। সরকারি বেতন মাসে ছিলো ১৮৫০ টাকা। লঞ্চের কেবিন ভাড়া ছিলো ৬০০ টাকা। তাই, সবসময় কেবিনে যাওয়া সম্ভব হয়নি। বেশি সময় লঞ্চের ডেকে শুয়ে যাতায়াত করতাম। ব্রীফকেসে একটা লুঙ্গি ও একটা তোয়ালে রাখতাম। বিকাল ৬ টা বা ৭টায় লঞ্চ ছাড়তো এদিকে ঢাকার সদরঘাট থেকে, ওদিকে বরিশাল সদরঘাট থেকে। সবাই একটা করে সিংগেল বিছানার চাদর সাথে রাখতো। এই চাদরে যতটুকু জায়গা দখল করা যায় ততটুকু জায়গা যাত্রীর অধীন ছিলো। ভাড়া ছিলো ৩০ টাকা। আমি ৩০ টাকার টিকিট কিনতাম। বরিশালের মানুষ আমাকে চিনত না। তাই, অতি সাধারণ ভাবে চলাফেরা করতে আমার লজ্জাবোধ হতো না। লঞ্চের হোটেলে ইলিশের ডিম দিয়ে পেট ভরে ভাত খেয়ে রাত আটটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়তাম লুঙ্গি পরে, বিছার চাদর বিছিয়ে ব্রিফকেসের উপর মাথা রেখে। ব্রিফকেসের উপর তাওয়েল বিছাতাম। লঞ্চের ইঞ্জিনের শব্দে ভালো ঘুম হতো। ছেলে বা মেয়ে আগে উঠলে আগে যে যেখানে জায়গা পেতো সেখানেই চাদর বিছিয়ে জায়গা দখল করতো। পরিচয় যাতে কেউ জানতে না পারে সেজন্য সহযাত্রীদের সাথে তেমন আলাপ করতাম না। ব্রিফকেসের উপরের ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার লেখা নেইম কার্ডটি উল্টিয়ে রাখতাম। যখন বাসে যাতায়াত করতাম তখন নেইম কার্ডটি সোজা করে রাখতাম। কারন, ডাক্তার পরিচয় পেলে সহযাত্রীরা সম্মান করে ৩/৪ ইঞ্চি জায়গা ফাঁক করে দিতো। নিজের পরিচয় প্রকাশ করার জন্য আমি নিজেই সহযাত্রীকে জিজ্ঞেস করতাম “ভাই, কি করেন?” সহযাত্রী উত্তর দিয়ে কিছুক্ষণ আলাপ করে উল্টো আমাকে জিজ্ঞেস করতেন “ভাই, আপনি কি করেন?” আমি ডাক্তার পরিচয় দিলে একটু নড়ে চড়ে বসে ৩/৪ ইঞ্চি জায়গা ছেড়ে দিতো। আমি কাছে এসে বসুন বললে আরও বেশি করে জায়গা ছেড়ে দিতো।

যাহোক, লঞ্চের কথায় আসি। মেডিকেল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা সাধারণত একটা নির্দিষ্ট এলাকা নিয়ে বিছানা পারতো। ঐ এলাকাটার চারিদিকে চাদর ঝুলিয়ে পর্দা করে দিতো। তারা ঘুমাতো কিনা জানি না। যতক্ষণ আমি চেতন থাকতাম তাদেরকে গল্পসল্প, হৈহল্লা করে কাটাতে শুনতাম। এদের সংখ্যা সাধারণত ১২/১৪ জন হতো। এমনি এক লঞ্চ জার্নির সময় আমার শিতানের দিকে শুয়েছিলেন এক ভদ্রমহিলা ও তার পাশের জায়গায় শুয়েছিলো এক যুবক ছেলে। গভীর রাতে হঠাৎ সেই যুবক ভদ্রমহিলার ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে মাঝ নদীতে ঝাপ দিলো। যাত্রীদের কোলাহল শুনে আমার ঘুম ভেঙে গেলো। লঞ্চ থামতে থামতে ছেলেটি অনেক দূরে পড়ে গেলো। লঞ্চ ছেলেটিকে ধরার জন্য পেছাতে লাগলো। ততক্ষণে ছেলেটি নদীর কিনারে কাঁশবনে উঠে পড়লো। ওখানে আগে থেকেই তার সহকর্মীরা তাকে রিসিভ করার জন্য অপেক্ষা করছিলো। তারা ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে কাঁশবনে হারিয়ে গেলো। আমার ব্রিফকেস কেউ ছিন্তাই করতে পারেনি। কারন, ওটা থাকতো আমার মাথার নিচে। নিলেও সমস্যা ছিলো না। টাকা রাখতাম আন্ডারওয়্যারের নিচের পকেটে।

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ময়মনসিংহ

১ সেপ্টেম্বর ২০২২ খ্রি.

#memoryofsadequel #charamoddisadequel

এমন গল্প আরও পড়তে হ্যাস্ট্যাগ শব্দে ক্লিক করুন।

charamoddi Jogdan

First Posting Charamaddi Jogdan

প্রথম কর্মস্থলে যোগদান

সময়টা ১৯৮৮ সালের ২ জুলাই।  পোস্টিং অর্ডার হাতে পেয়ে কর্মস্থলে যাওয়ার পথ কী হবে তার খোঁজ নেয়া শুরু করলাম। এ ব্যাপারে সুলতান নামে আমার এক আত্মীয় তার সহকর্মীদের সাথে আলাপ করে একটা রোড ম্যাপ করে দিল। সে ওখানে চাকরি করত। 

বাসে করে সাতক্ষীরায় তার বাসায় গেলাম। রাতের খাবার খেয়ে সেখান থেকে হুলার হাট গেলাম। একা জার্নি, খুব খারাপ লাখছিল। হুলার হাটে সস্তা একটা হোটেলে রাত্রি যাপন করলাম। 

বাথরুমের অবস্থা ভাল না থাকায় পায়খানার কাজে ওটা ব্যাবহার করলাম না। পায়খানার বেগ নিয়েই ভোর ৫ টায় রিক্সা নিয়ে লঞ্চ ঘাটের দিকে রওনা দিলাম। 

ছিনতাই হবার ভয়ে ভীত ছিলাম। ঘাটে গিয়ে বসলাম। একজন দুইজন করে যাত্রী এসে বসতে লাগল। 

আমি জীবনে তখনো লঞ্চ দেখিনি। আজ  প্রথম লঞ্চ দেখার অভিজ্ঞতা হবে। বাসের মত কি আগে টিকিট করতে হবে? না উঠে টিকিট করতে হবে? এনিয়ে ছিল নানা দুশ্চিন্তা। 

স্থির করলাম আমার মত প্যান্ট-শার্ট পরা ভদ্র যাত্রীরা যা করবে আমিও তাই করব। দেখলাম দক্ষিণ দিক থেকে একটা বড় নৌযান আসছে। উপরে লিখা “এম ভি বাপ্পী”। বুঝতে পারলাম এটাই লঞ্চ। ঘাটে ভিড়ল। দেখলাম দোতলা-নিচ তলা আছে। আমি ভদ্র লোকদের দেখাদেখি দোতলায় গিয়ে বসলাম। 

বোকার মত এদিক সেদিক তাকালাম। বেঞ্চে হেলান দিয়ে বসলাম। লঞ্চ পূর্ব দিকে চলছিলো। পানি আর পানি। সীমাহীন পানি। জীবনে এত পানি দেখিনি। একটা লোক বেঞ্চে পা তুলে বেয়াদবের মত শুয়েছিলো। আমি তার প্রতি বেশ বিরক্ত বোধ করছিলাম। এক লোক ব্রিফকেসে সুই দিয়ে খোদাই করে নাম লিখে দিচ্ছিল। আমিও পাঁচ টাকা দিয়ে নাম লিখালাম ‘সাদেক’। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। 

পানি দেখে খুব ভাল লাগছিল। পানিতে অনেক মহিষ দেখতে পেলাম। মহিষ মাথা ডুবিয়ে ডুবিয়ে কী যেন খাচ্ছিল। 

আমি জানতাম, মহিষ মাঠে ঘাস খায়। কিন্তু পানির নিচ থেকে কী খাচ্ছে সেটা বুঝতে পারছিলাম না। আমার পাশে দাঁড়ানো এক জনকে জিজ্ঞাসা করলাম “মহিষ পানির নিচ থেকে কি খাচ্ছে?”। লোকটি আমাকে অস্বাভাবিক মানুষ ভেবে উত্তর না দিয়ে সটকে পড়ল।  বিপরীত দিকের বারান্দায় গিয়ে আরেকজনকে জিজ্ঞাসা করলাম। সেও তাই করল। 

আমার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। ভেতরে এসে একজনকে বিষয়টি বলার পর সে বলল ”কেন? ঘাস খায়।“

আগের দুইজন তখন মনযোগ দিল। আমি জানতে চাইলাম

-পানির নিচে ঘাস জন্মায় কেমনে?
– এটাতো মাঠ। মাঠে ঘাস খাচ্ছে।
– আমি তো দেখছি সাগরের মত।
– আপনার বাড়ি কই?
 (আমি ভরকিয়ে গেলাম)

– টাঙ্গাইল জেলায় সখিপুরে, পাহাড় অঞ্চলে।
পাশ থেকে একটু শিক্ষিত একজন বললেন
-আপনি বুঝি জোয়ারভাটা দেখেননি। এখন জোয়ার। ভাটার সময় মহিষ ঘাস খাওয়া শুরু করেছিলো, জোয়ারের পানিতে মাঠ ভরে গেছে, এখনো মহিষ মাথা ডুবিয়ে ডুবিয়ে ঘাস খাচ্ছে।
– এখন বুঝতে পেরেছি। বইয়ে পড়েছি।
-আপনি কী করেন? কোথায় যাচ্ছেন?
– আমি ডাক্তার। সরকারি চাকরি হয়েছে। যোগদান করতে যাচ্ছি।
-এমবিবিএস ডাক্তার?
– জ্বী।

সবাই নড়েচড়ে বসে আমার দিকে মনযোগী হল। আমিও সাচ্ছন্দ্যবোধ করা শুরু করলাম। একে একে অনেকেই টুকটাক অসুখের কথা জানাল। আমি সমাধান দিলাম। আমি ওখানকার মধ্যমণি হয়ে গেলাম। যে লোকটি পা তুলে শুয়ে ছিল সেও পা নামিয়ে বসল। বলল “ডাক্তার সাব, আমার সারাক্ষণ পায়ের তলা জ্বালাপোড়া করে। কেন এমন হয়?” এতক্ষণে আমি বুঝতে পারলাম কেন সে বেয়াদবের মত পা তুলে শুয়েছিল।

এভাবে সবার সাথে গল্প করতে করতে সকাল ১০টার দিকে বরিশাল এসে পৌঁছলাম। 

সিভিল সার্জন অফিস থেকে কমিউনিকেশন লেটার নিয়ে বাসে চড়ে বাকেরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলে গেলাম। ইউএইচএফ পিওর নিকট পরিচয় দিলাম। পাশে একজন পাজামা পাঞ্জাবি পরিহিত ৫৪/৫৫ বছর বয়স্ক লোককে বললেন, ‘এই যে আপনার মেডিকেল অফিসার এসে গেছেন। আর চিন্তা নাই।’

আমি যোগদানপত্রে সই করে অফিস ত্যাগ করলাম। ওই লোকটি ছিল আমার সেন্টারের মেডিকেল এসিস্টেন্ট। আমরা চরামদ্দি সাব সেন্টারের উদ্দেশ্যে বাসে রওনা দিলাম। বরিশাল গিয়ে রাত্রিযাপন করে ছোট লঞ্চে করে পরদিন চরামদ্দি যেতে হবে। বাসে যেতে যেতে আলাপ হলো। ওখানে স্টাফদের কথা  জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, ‘ওখানে আছে একজন পাগলা ফার্মাসিস্ট। কোথায় থাকে, কী খায়, কী পরে তার ঠিক নাই। দেখলেই বুঝবেন। আরেকজন পিওন আছে। তাকে দিয়ে কিচ্ছু করাতে পারবেন না। কিছু বললে উল্টা আপনাকেই ভয় দেখায়ে দেবে। আপনি তো অনেক দূরের মানুষ। আপনি সামলাতে পারবেন কিনা। আপনার তো আবার নতুন চাকরি। অসুবিধা হবে না, আমি আছি না?’ শুনে আমার শরীর শিরশির করে উঠল।

সন্ধ্যার সময় আমাকে একটি কমদামি বোর্ডিংয়ে নিয়ে উঠালেন। চলে গিয়ে আবার ফিরে এলেন দুইজন চোখে সুরমা দেয়া যুবক নিয়ে। বললেন, ‘পরিচয় করে দিচ্ছি, ইনি আমার বন্ধু ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার…..!’

আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম! ভাবলাম এই ‘বন্ধুকে’ আমি নিয়ন্ত্রণ করব কীভাবে।

তাদের সাথে আলাপ হল। অনেক কথার পর তারা একটা কথা বলল, ‘আপনি চিন্তা করবেন না। আমরা আছি না? অমুককে একটু ট্যাঁক্টফুলি ম্যানেজ করতে হবে।’ 

তারা চলে গেলে আমি একটু বারান্দায় বেরুলাম। দেখলাম তারা পাশের রুমে দুইটি মেয়ের সাথে কেমন কেমন যেন কথা বলছে। আমি লুঙ্গী পরে বাথরুমে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি এমন সময় বাইরে থেকে দরজার করা নাড়ল।
– কে?
– আমি বোর্ডিংয়ের লোক। কিছু লাগবে, স্যার? আমি সব কিছুর ব্যবস্থা করে দিতে পারি।
– আমার কিছু লাগবে না। আমি এখন ঘুমাব। ডিস্টার্ব করবেন না। 
আমার বুঝতে দেরি হল না পাশের রুমের বোর্ডারদের কারবার। 

মেডিকেল এসিস্টেন্ট আমাকে রেখে তার ভাইয়ের বাসায় থাকতে গিয়েছে। আমি ভয়ে জড়সড় হয়ে গেলাম। পায়খানার বেগ থেমে গেল। বের হবার সাহস পেলাম না। গত রাতেও পায়খানা করতে পারিনি। অমনি শুয়ে পরলাম। কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

সকাল সাড়ে পাঁচটায় মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টের ডাক শোনে ঘুম থেকে উঠলাম। 

ছয়টায় বরিশাল থেকে ছোট লঞ্চে উঠলাম। নয়টার দিকে কাটাদিয়া ঘাটে নামলাম। ওখান থেকে ডিঙি নৌকায় উঠলাম। দুই কিলোমিটার যেতে হল নৌকায়। খালের ধারের মানুষ আমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলো “সাহেব কে?” 
– সাহেব আমাদের চরামদ্দির নতুন ডাক্তার। এমবিবিএস। এর আগে কেউ এমবিবিএস ছিলেন না। 
– আমাদের সরকারি ডাক্তার?
– জ্বী।
-খুব ভাল।

দশটার দিকে নৌকা থেকে নামলাম। তিনি দেখিয়ে বললেন ‘এটাই আপনার হাসপাতাল।’
দেখলাম ডোয়াপাকা একটি পুরাতন টিনের ঘর। সামনে বারান্দা। হাসপাতালের সামনে প্রায় একশত জন লোক। একজন উস্কো খুসকো লোক কানে একটা বিড়ি আটকানো, গায়ে রান্নাকরার ছাই লাগানো শার্ট, মাঝে মাঝে বিড়ির আগুনে গোল গোল করে ছিদ্র করে পোড়া, পেছনে লুঙ্গীর কোছে বিড়ির প্যাকেট, আমার দিকে ইঙ্গিত করে জানতে চাইল ‘সাহেব কে?’
মেডিকেল এসিস্টেন্ট বললেন, ‘ইনি আমাদের নতুন অফিসার, ময়মনসিংহ বাড়ী।’
তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন

-আপনি এমবিবিএস?
– জ্বী।

লোকটি লাফ দিয়ে দুই ফুট উঁচু জায়গায় উঠে দাঁড়ালেন। মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট বললেন,‘ইনিই আপনার ফার্মাসিস্ট’।
ফার্মাসিস্ট নেতার ভঙ্গিতে জনগণের উদ্দেশে  ভাষণ দিতে লাগলেন-
– ভাইসব, আপনারা শান্ত হউন। আমাদের এখানে জয়েন করতে এসেছেন যিনি তিনি এমবিবিএস, যা লন্ডন থেকে পাস করতে হয়!
তিনি আগামীকাল থেকে আপনাদের দেখবেন। আজ তিনি বিশ্রাম নিবেন।
এরপর সবাই শান্ত হলেন। তিনি সবাইকে বিদায় করে আমার কাছে আসলেন।
আমি জানতে চাইলাম
– আপনাদের লেট্রিন কোথায়?
– আমাদের তো লেট্রিন নাই!
-তাহলে আপনি কী ব্যবহার করেন?
– আমি কলার পাতা দিয়ে একটু ঘেরাও করে বানিয়ে নিয়েছি।
– এটা কী?
– এটা ফ্যামিলি প্লানিং ভিজিটরের অফিস।
– এখানে লেট্রিন নেই?
– আছে। পাকা সেনিটারি লেট্রিন। 

শোনে আমার তিন দিনের জমানো পায়খানার বেগ ফারাক্কা বাধের উজানের শক্তি নিয়ে নিচের দিকে ধেয়ে আসা শুরু করল।
– লেট্রিনের চাবি দিন।
– ওটা পিওনের কাছে।
– পিওন কই?
-বাজারে গিয়ে আড্ডা দিচ্ছে।
– ডাকেন তাকে।

তিনি দৌঁড়ে বাজারের দিকে চলে গেলেন। অনেকক্ষণ পর ফিরে এসে বললেন-
-পেলাম না।
– ঠিক আছে, আপনারটাই ব্যবহার করব। এক বদনা পানি আনেন।

তিনি পানি আনতে চলে গেলেন। আশার আলো দেখে আমার ওইটার বেগ আরও তীব্র আকার ধারণ করল। তিনি খাবার পানির এক জগ পানি নিয়ে এলেন। আমি বললাম
– আমি তো পানি খাব না, পায়খানায় ব্যবহার করব, বদনায় পানি আনেন।
– স্যার, আমার এই জগ ছাড়া আর কিছু নাই। এইটা দিয়েই পানি খাই, এইটা নিয়েই পায়খানায় যাই।

আমার রাগে, দুঃখে  বেগ নিস্তেজ হয়ে পরল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলাম। মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট মিটিমিটি হাসছিলো। আমি মেডিকেল এসিস্টেন্টকে বললাম “আমার ক্ষুধা পেয়েছে। খাব কই?”
ফার্মাসিস্টকে বললাম,‘যান, আমার সামনে থেকে’।
তিনি ইডিয়টের মত হেসে চলে গেলেন। 

পরে মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট আমাকে বাজারে নিয়ে গিয়ে খাওয়ালেন। আমি বললাম,

-আমি এখানে থাকতে পারব না। 
– চলেন আমাদের বাড়ী। এখান থেকে ৩ কিলো দূরে হবে।

– চলুন তাই হউক। 

বিকালে মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্টের বাড়ি গেলাম। তার গ্রামের নামটা এখন মনে করতে পারছি না। গিয়েই লেট্রিনের খোঁজ নিলাম। তিনি তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করে দিলেন। পাকা লেট্রিন। তিন দিনের জমা রাখা জিনিসগুলি ত্যাগ করতে পেরে গোপাল ভাঁড়ের মত প্রশান্তি পেলাম। 

তিনদিন গোসল করিনি। অত্যন্ত গরম আবহাওয়া ছিল। গোসল করতে চাইলাম। তিনি আমাকে তার বাড়ির দক্ষিণ পাশে নিয়ে গেলেন। বিস্তীর্ণ এলাকা। পানি আর পানি। দখিনা মিষ্টি বাতাস আসছিল। আমি শার্ট গেঞ্জি খুলে কিছুক্ষণ গায়ে হাওয়া লাগালাম। অমন মিষ্টি হাওয়া আর কোথাও পাইনি। 

বিকালে ঘুম দিলাম। রাতে তার ভাইয়ের সাথে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গল্প হল। আবার ঘুমালাম রাতে।

দুপুরের খাবার পোলাও মাংস খেয়ে বরিশাল রওনা দিলাম। বিকেল ছয়টায় ঢাকার লঞ্চে উঠলাম। ঢাকা থেকে বাসে ফিরতে হবে বাসে। হিসাব করে দেখলাম টাকা প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। তাই কেবিনে টিকিট না করে ৩০ টাকায় ডেকের টিকিট করলাম। ব্রিফকেস থেকে লুঙ্গী বের করে বিছিয়ে শুয়ে পড়লাম। কেউ যাতে চিনতে না পারে সেজন্য ব্রিফকেসের ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার লিখা কার্ডটা উল্টিয়ে লাগালাম। ব্রিফকেস মাথায় দিয়ে ঘুমাতে চেষ্টা করলাম। 

চারদিনের জার্নির ঘটনাগুলি মনে করতে করতে এক সময় কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।


তারিখঃ ১৪/৬/২০১৭ ইং
ময়মনসিংহ – কিশোরগঞ্জ – ময়মনসিংহ জার্নি

Haturi Peta

Haturi Peta

হাতুড়ি পেটা

(স্মৃতি কথা)

প্রথম পোস্টিং ছিল বরিশালের চরামদ্দি ইউনিয়ন সাব-সেন্টারে। ১৯৮৮ সনে এক বছর সেখানে ছিলাম। প্রচুর মারামারির রোগী আসতো। তাদেরকে চিকিৎসা করে ইনজুরির সার্টিফিকেটও দিতে হতো। একবার এক রোগী এলো হাতুড়ি পেটা খেয়ে। বিস্তারিত শুনলাম রোগীর কাছ থেকে। ঢাকা থেকে লঞ্চ যোগে তারা আসছিলো বরিশালে। লঞ্চগুলো সাধারণত রাতে যাতায়াত করতো। বরিশালের অনেক যাত্রী রাতের লঞ্চে ঢাকায় গিয়ে দিনের বেলা অফিসের কাজকর্ম বা মার্কেটিং করে আবার রাতের লঞ্চে ফিরে আসতো। প্রায়ই পথিমধ্যে ডাকাতের কবলে পড়তো। এমনি একটা অভিজ্ঞ ডাকাত পার্টি ছিলো হাতুড়ি পেটা করার। গভীর রাতে ফেরার সময় যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়তো তখন চার পাঁচ জনের অল্প বয়সি ডাকাত পার্টি অতর্কিতে হামলা চালাতো হাতুড়ি দিয়ে। রাইফেল ওয়ালা আনসারের মাথার পেছনে হাতুরি দিয়ে পিটুনি দিলে আনসার অজ্ঞান হয়ে পড়ে যেতো। আনসারের রাইফেল কেড়ে নিয়ে লঞ্চের চালকের মাথার উপর তাক করে ধরে রাখতো ঠিকঠাক মতো চালিয়ে নিতে। অন্য ডাকাতরা সামনে যাকে পেতো তাকেই মাথার চান্দিতে হাতুড়ি পেটা করতো। দুই চার জনকে এভাবে মাথায় পিটুনি দিলে অন্য যাত্রীরা ভয়ে আতংকগ্রস্ত হয়ে মাথা নিচু করে লুকিয়ে উবুত করে বসে থাকতো। আশে পাশে কি হচ্ছে কেউ তা বুঝতে পারতো না। দুই চারজন যাত্রীর মাথায় পিটুনি দিয়ে শত শত যাত্রীকে অকেজো করে রাখতো কয়েকজন ডাকাতে। এ অবস্থায় যাত্রীদের কাছ থেকে নগদ অর্থ ও স্বর্নালংকার কেরে নিতো। কানের অলংকার খুলে না নিয়ে ঝেংটা টান মেরে ছিড়ে নিতো। লুট করা টাকা ও অলংকার পোটলায় ভরে সুবিধাজনক চর এলাকায় লঞ্চ ভিড়িয়ে নেমে দৌড়ে পালিয়ে যেতো কাঁশবনের ভেতর। এদিকে যাত্রীরা অনেক্ষণ পর্যন্ত মাথা নিচু করেই বসে থাকতো। লঞ্চের চালক এসে তাদেরকে ইনফরমেশন দিতো এই বলে যে ডাকাতরা চলে গেছে আপনারা মাথা তুলুন।

রোগীর মুখে এমন বিভৎস কাহিনী শুনে আমিও আতংকগ্রস্ত ছিলাম। কারণ, আমাকেও মাসে একবার এমন লঞ্চে রাতে আসা-যাওয়া করতে হতো। সরকারি বেতন মাসিক ১৮৫০ টাকা ছিলো। প্রথম চাকরি। প্রথম মাসের টাকা ঠিকই পেয়েছিলাম। দ্বিতীয় মাস থেকে আমাকে বেতন দেয়া হয় না। আমি ভাঙ্গা একটা ডোয়াপাকা টিনের ঘড়ে থাকতাম। অর্থ অফিসের দাবী ছিলো আমাকে নিয়ম অনুযায়ী ৩৫% বাড়ি ভাড়া কাটতে হবে। আমি ভাঙ্গা ঘরের ভাড়া কাটতে রাজি ছিলাম না। তাই, বেতন বন্ধ ছিলো। ২০ টাকা করে প্রাইভেট রোগী দেখে খাওয়া খরচ করে যা থাকতো তা থেকে বাবার জন্য কিছু টাকা মানি অর্ডার করে পাঠাতাম। আর যা থাকতো তা নিয়ে টাঙ্গাইল বাসায় আসতাম প্রতিমাসের প্রথম সপ্তাহে। যাহোক, চার মাস পরে এক সাথে বাড়ি ভাড়া সহ বেতন পেয়েছিলাম। সেই টাকায় বাবার ইচ্ছানুযায়ী বাড়ির পাশের ১২.৫ শতাংশ জমি কিনেছিলাম। লঞ্চে উঠে আতংকে মাথা হাতাতাম কখন এসে ডাকাতরা আমার মাথায় হাতুড়ি পিটায়। তারা তো আর আমি ডাক্তার কি না তা জিজ্ঞেস করে না। তখন, ডাকাতরা ডাক্তার ও পুলিশকে সমিহ করতো।

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ময়মনসিংহ

৩০ আগস্ট ২০২২ খ্রি.

#memoryofsadequel

#charamoddisadequel

এমন গল্প আরও পড়তে হ্যাস্ট্যাগ শব্দে ক্লিক করুন।

Khur Die Poch Mara

Khur Die Poch Mara

খুর দিয়ে পোঁচ মারা

(#memoryofsadequel)

১৯৮৮ সনের কথা। বরিশালের বাকেরগঞ্জের চরামদ্দি ইউনিয়ন সাবসেন্টারে যখন চাকরি করতাম, তখনকার কথা। ঐ এলাকায় প্রচুর ছিন্তাই হতো। অল্প বয়সের দুই তিন জন ছেলে ছোরা ও খুর নিয়ে রাতের বেলায় রাস্তার ধারে ওৎ পেতে থাকতো। সুযোগ বুঝে পথচারীদের সামনে দাঁড়িয়ে ছোরা দেখিয়ে সাথে যা যা আছে, সব দিয়ে দিতে বলতো। সামান্য একটু বিলম্ব হলেই খুর দিয়ে পোঁচ মেরে দিতো। এসব পোঁচ খাওয়া রোগী আমার কাছে নিয়ে আসতো।

আমি অপারেশন টেবিলে শোয়ায়ে বুকের শার্টের বোতামগুলি খুলে দেখতে পেতাম গলার নিচে থেকে শুরু করে বুকের মাঝের হাড়ের উপর দিয়ে সোজা নেমে এসেছে খুরের পোঁচ পেটের উপর পর্যন্ত। তেমন কিছু না, মাত্র ৫০ টাকা বা ১০০ টাকা কেড়ে নেয়ার জন্য এই পোঁচ। এখানকার চামড়ার নিচে চর্বি থাকে না। তাই, কাটা চামড়া দুই দিকে সড়ে গিয়ে হা হয়ে থাকতো। বিভৎস দেখা যেতো সেই ক্ষত। মহিলা, শিশু ও দুর্বল চিত্তের পুরুষরা দেখে প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়তো। আমিও খুব আতংকগ্রস্ত ছিলাম এই ভেবে যে কবে আমার বুকেই এমন খুরের পোঁচ মেরে দেয়।

আমি ইন-সার্ভিস-ট্রেইনিং এর সময় সার্জারিতে বিশেষভাবে ৬ মাস ট্রেনিং করেছিলাম। তাই, ভালো সেলাই করতে পারতাম। আমি ক্ষতস্থান জীবাণুমুক্ত করে সিল্কের সুতা দিয়ে সুন্দর করে সেলাই করে দিতাম। ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে দিতাম। ৭ দিনের ঔষধ লিখে দিতাম। ৭ দিন পর ব্যান্ডেজ খুলে সেলাই কেটে দিতাম।

আমি ১৯৮৯ সনে বদলি হয়ে চলে আসি বরিশাল থেকে। এখনো কি ওখানে এমন খুরের পোঁচের প্রচলন আছে? আমার গল্পের পাঠকদের মধ্যে কি কেউ এমন খুরের পোঁচ খেয়েছেন বা মেরেছেন?

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ময়মনসিংহ

২৯ আগস্ট ২০২২ খ্রি.

in-feed-ads:

Garden Starting

Starting Garden

বাগান শুরু করার  কয়েকটি ধাপ

 ১সঠিক অবস্থান নির্বাচন করুন:  বাগানের জন্য এমন একটি স্থান পছন্দ করুন যেখানে প্রচুর রোদ, পর্যাপ্ত স্থান এবং আপনার হাতের কাছেই পানির উৎস আছে।  একটি উচু এলাকা খুঁজুন।

 ২আপনার সবজি নির্বাচন করুন:  আপনার জলবায়ু, স্থান, স্বাদ এবং দক্ষতার  উপর ভিত্তি করে কোন ফসল অন্তর্ভুক্ত করবেন তা নির্ধারণ করুন।  নতুনরা গাজর, মটরশুটি, শসা, গোলমরিচ এবং লেটুস-এর মতো কিছু সহজ ফসলের কথা বিবেচনা করতে পারেন।

   মাটি প্রস্তুত করুন:  আপনার বাগানে কম্পোস্ট এবং প্রাকৃতিক সার মিশ্রিত করুন যাতে আপনার গাছের মাটি ঠিক থাকে।  গার্ডেন-সাপ্লাই স্টোরগুলি আপনার মাটির অম্লতা পরীক্ষা করতে পারে এবং পরিপূরকগুলির পরামর্শ দিতে  পারে, অথবা আপনি রেডিমিক্সড মাটি কিনতে পারেন।

 রোপণের তারিখ পরীক্ষা করুন:  ক্রমবর্ধমান অবস্থা এবং  উদ্ভিদ চক্র এবং ঋতুর উপর নির্ভর করে ফসল লাগাতে হয়। তাই,  একই সময়ে সব বীজ বপন করা উচিত নয়।  বীজের প্যাকেটে রোপণের তারিখ পাওয়া যাবে।  বাগান করার সময়সূচী তৈরি করার আগে আপনি যে সবজি রোপণ করতে চান তার জন্য আদর্শ অবস্থা পর্যালোচনা করুন।

 বীজ রোপণ করুন:  গভীরতা এবং ব্যবধান নির্দেশাবলী সাবধানে অনুসরণ করে আপনার বীজ বা গাছপালা মাটিতে রাখুন।

 পানি দিন করুন:  ক্রমবর্ধমান ঋতু জুড়ে মাটি সমানভাবে আর্দ্র রাখতে আলতো করে পানি দিয়ে বাগানে স্প্রে করুন।  পানি দেয়ার জন্য জন্য একটি স্প্রে  কিনুন যাতে আপনি আপনার বাগানের জন্য একটি মৃদু বৃষ্টির মতো করে পানি দিতে পারেন।

 ৭  আগাছা দূরে রাখুন:  আগাছা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল মালচিং।  আগাছা যাতে আপনার ফসলকে ছাড়িয়ে না যায় তার জন্য আপনার বাগানে জৈব মালচের ২ থেকে ৪-ইঞ্চি-পুরু স্তর তৈরি করুন।  যদি বাগানে আগাছা দেখা যায়, তবে তাদের ডালপালা নীচে ধরুন এবং পুরো শিকড় নিষ্কাশন নিশ্চিত করুন।

 ৮ আপনার গাছপালা বাড়াতে জায়গা দিন:  বীজের প্যাকেটে থাকা ব্যবধান নির্দেশিকাটি পরীক্ষা করে দেখুন এবং অবিলম্বে ঘনঘন চারাগুলি সরিয়ে ফেলতে ভুলবেন না।

 প্রয়োজন অনুযায়ী সার দিন:  হাত দিয়ে হালকাভাবে মাটঙ্ঘন্সাথে সার দিন । আপনি  বাগানের জন্য সার কিনতে পারেন বা ইপসম লবণ, ডিমের খোসা, মাছের ট্যাঙ্কের পানি এবং রান্নাঘরের কম্পোস্টের মতো আইটেমগুলি থেকে নিজের তৈরি স্যার বানাতে  পারেন।

 ১০। সময় মতো সবজি কাটুন:  শাকসবজি সংগ্রহ করুন যখন কচি থাকতেই ।  খাবার উপযুক্ত হবার সময় মূল শস্যগুলিকে টানুন।  জমির ১ ইঞ্চির মধ্যে কেটে শাক জাতীয় ফসল সংগ্রহ করুন।  অবশেষে, আপনার ফসল উপভোগ করুন!