Tag Archives: স্মৃতি কথা

guddi

গুড্ডি

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ঘুড়িকে আমরা বলতাম গুড্ডি। গুড্ডি তৈরি করতে কাগজ, বাঁশের বাতি, আঠা ও সুতা লাগতো। শক্ত কাগজ লাগতো। আমরা এই কাগজকে বলতাম বাঁশ তাও। আমরা জানতাম বাঁশ তাও বাঁশ থেকে তৈরি হয়। এই কাগজের রঙ বাদামী ছিল। ডিজাইন করে বাঁশ তাও কেটে আঠা দিয়ে বাঁশের ফ্রেমে আটকানো হতো। ঘুড়ি উড়ানোর মৌসুমে অর্থাৎ জৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসে বল গোটা পাকতো। এগুলো বন্য ফল। আবেদ আলী কাক্কুদের বাড়ির উত্তর পাশে একটা বল গোটা গাছ ছিলো। আমরা বড়বাইদপাড়ার প্রায় সবাই এই গাছের বল গোটা তুলে এর আঠা দিয়ে গুড্ডি বানাতাম। বড় বড় গুড্ডির মাথায় বা ঘারে বেত বাঁধা হতো, বলা হতো বেত আলা গুড্ডি। বর্গা হাটে বেত উঠতো। এই বেত দিয়ে হস্ত শিল্পের কাজ করা হতো। ছাত্র পিটাতেও এই বেত ব্যবহার করা হতো। এই বেতের বাকল মিহি করে ছিলিয়ে পাতলা ফিতার মতো করে গুড্ডির বেত বানানো হতো। বাঁশের বাতিতে টাইট করে বেঁধে ধনুকের মতো করে গুড্ডিতে লাগানো হতো। গুড্ডি ওড়ার সময় বাতাস লেগে বেত গুণ গুণ করে বাজতে থাকতো। এই ধরনের বেত আলা গুড্ডি বড়রা উড়াতো।

আকার আকৃতি অনুযায়ী গুড্ডির বিভিন্ন ধরনের নাম ছিলো। সহজ ও কম খরচে বানানো হতো পতিঙ্গা। পতঙ্গের মতো দেখতে। ছোট এবং পাতলা ছিলো। এটার নিচের দিকে ছোট ছোট দুটো লেজ ছিল। গুড্ডি সুতার সাথে বেঁধে বাতাসে উড়াতে হয়। গুড্ডির সাথে তিনটা সুতা লাগানো থাকে। উপরের দিকে দুইটা, নিচের বা পেটের দিকে একটা। উপরের দুইটা নিচের থেকে খাটো।সাপের মতো ডিজাইন করে যে গুড্ডি বানান হতো তার নাম ছিলো সাপা। অনেকে বলতো হাপা। চার কোনা আয়তকার গুড্ডিকে বলা হতো চং। বড় সাইজের গুড্ডি যার লেজ ছিলো ফিংগে বা ফেইচ্চা পাখির লেজের মতো তাকে বলা হতো ফেইচ্চা গুড্ডি। বড় বড় গুড্ডি যার লেজ ছিল ভাতের পাতিল বা পাইল্যার মতো তার নাম ছিলো পাইল্যা গুড্ডি। বড় বড় চং, ফেইচ্চা গুড্ডি ও পাইল্যা গুড্ডির ঘারে বেত বেঁধে দেয়া হতো ভন ভন করে বাজানোর জন্য। সন্ধ্যার সময় ঝোপে ঝারে এক যোগে শত শত ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকতো। আর আকাশে অনেকের বেতা আলা গুড্ডি ডাকতো। দুই ধরনের ডাক মিলে এক অপুর্ব নৈসর্গিক সুর তৈরি হতো। সেই সুর আজও কানে বাজে। এখনো গ্রামের বাড়ি গিয়ে রাত্রিযাপন করি। সন্ধ্যা নেমে আসলে ঝিঁঝিঁর ডাক শুনতে পাই। কিন্তু গুড্ডির ডাক শুনতে পাই না।

গুড্ডি উড়ানো হতো দখিনা বাতাসে। আমাদের বাড়ির দক্ষিনে বাইদের ওপারে সড়াসিয়া গ্রাম। বড়বাইদপাড়া গ্রামের দক্ষিনেও সাড়াসিয়া গ্রাম আবার পূর্বেও সাড়াসিয়া গ্রাম। চটানের বাইদ সাড়াসিয়া গ্রামকে দুইভাগে ভাগ করেছে – উত্তর সাড়াসিয়া এবং দক্ষিণ সাড়াসিয়া। চটান বাইদের দক্ষিন পাড়ে নুরজাহা ভাইদের বাড়ি এবং উত্তর পাড়ে জাফর ভাইদের বাড়ি। দুই জনের বাড়িই আমাদের বাড়ি থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে। ওনারা সমবয়সী ছিলেন। দুই জনই বিবাহিত যুবক ছিলেন। আমি তখন কিশোর। দুই জনই পাল্লা দিয়ে গুড্ডি উড়াতেন। দুই জনের ঘুড্ডিতেই বড় বড় বেত বাঁধা থাকতো। ওনাডের গুড্ডির সুতা এত লম্বা ছিলো যে বাতাস কমে গেলে গুড্ডিগুলো আমাদের বাড়ির কাছাকাছি নেমে আসতো। আমি চালায় একাকি বসে বসে ঘুড্ডি উড়া উপভোগ করতাম। আমি বাবার কাছে তেমন কিছু আব্দার করতাম না। বাবার যদি কষ্ট হয়! তাই। বাবা আমার ইচ্ছাটা বুঝতে পেরে নিজ হাতে একটা বিনা ভাড়া গুড্ডি বানিয়ে দেন। কিন্তু সেটা দেখতে ভালো ছিলো না। আমার পছন্দ হয়নি। খসরু কাক্কু ঠাট্টা করে বলেছিলেন, “তোর বাপের বানানো বিনাভাড়া, হে, হে, হে।” আমি তারপর থেকে ওটা আর উড়াইনি।

আমি ঘন্টার পর ঘন্টা বাইদের বাতরে (আইলে) বসে জাফর ভাই ও নুরজাহা ভাইর ঘুড্ডি উড়া দেখতাম। বাবা এলেন কাছে। আমি একটু লজ্জিত হলাম। বাবার চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে রইলাম। বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, “বাজান, আমি তোমারে ভালা একটা পাইল্যা গুড্ডি কিন্যা দিমু। নও ইদ্দুগ বাইত যাই।” বাবা, আকবর ভাই ও আমি উত্তর সাড়াসিয়া গ্রামের ইদ্দু ভাইদের বাড়ি গেলাম গুড্ডি কিনতে। ইদ্দু ভাই গুড্ডি তৈরির একজন ভালো কারিগর ছিলেন। মনের আনন্দে ইদ্দু ভাইর কাছ থেকে কেনা গুড্ডি বেশ কিছু দিন উড়ালাম। ঐ গুড্ডিতে বেত বাঁধা ছিলো। আমি ঘরেও সুতা ধরে গুড্ডি মাথার উপর ঘুরাতাম ভন ভন করে ডাক শোনার জন্য। এক দিন বাবা ঘরে প্রবেশ করেছেন এই দময় আমি বাবাকে দেখতে পাইনি। যেই গুড্ডি ঘুরান মেরেছি অমনি ওটার চোক্ষা মুখ বাবার মাথায় লেগে চামড়া ছিদ্র হয়ে রক্ত বের হয়ে গেলো। বাবা মাথায় হাত দিয়ে হাতে রক্ত দেখতে পেয়ে রাগে আমার গুড্ডি ভেঙ্গে চুরমার করে ছুড়ে ফেলে দিলেন। আমি কয়েকদিন শোক কাটালাম। আবার ক্ষেতের বাতরে বসে বসে জাফর ভাইর গুড্ডি উড়া দেখা শুরু করলাম। আমার কষ্ট বুঝতে পেরে বাবা আমাকে আরেকটা গুড্ডি কিনে দিলেন ইদ্দু ভাইর কাছ থেকে।

এবার ঘটলো আরেক ঘটনা। আমাদের একটা দামী টেপাটেপা গাভিন ছাগল ছিলো। আমাদের বাড়ির উত্তর পাশে বারচা ক্ষেতে হাচার দিয়ে পাহারা দিতাম। কারন, পাশের গজারি বনে বাস করতো শেয়াল মশাইরা। একদিন গুড্ডি উড়াতে উড়াতে আমি চলে গিয়েছি বড়বাইদের কুয়ারপাড়ের ক্ষেতের বাতরে। এদিকে একা পেয়ে শেয়াল মশাই ছাগলের গলা দাঁত দিয়ে ছিদ্র করে দিয়েছে। ছাগলটা মারা গেছে। তিনি রাতে টেনে নিয়ে জংগলে নিয়ে ধীরে ধীরে ভক্ষন করবেন। এই দৃশ্য দেখে বাবা রাগে ফেটে পড়ে খুঝতে খুঝতে আমাকে কুয়ার পাড়ের ক্ষেতের বাতরে গুড্ডি উড়ানো অবস্থায় পেলেন। কোন কথা নেই। গুড্ডিটা নামালেন। মট্টশ করে ভেঙে দিয়ে চলে গেলেন। আমি বাড়ি গেলাম। দেখলাম বিশাল দেহি গাভীন প্রিয় ছাগলটা আমাদের ছনপাওড় ক্ষেতে মরে পরে আছে। আমি শোকে ভেঙ্গে পড়লাম। টেনে মরা ছাগলটাকে বাড়ির উঠানে নিয়ে রাখলাম এই ভেবে যে শিয়ালকে এই ছাগল খেতে দেব না।

কয়েকদিন ছাগল ও গুড্ডির শোক এক সাথে পালন করলাম। বাবা আমার কষ্টের কথা ভেবে আবার আরেক বেতায়ালা গুড্ডি ইদ্দু ভাইর কাছ থেকে কিনে দিলেন।

ইদ্দু ভাই, জাফর ভাই, নুরজাহা ভাইরা কি বেচে আছেন। তোমরা কিশোররা, যারা বড়বাইদপাড়ায় থাকো তারা কি গুড্ডি উড়াও? আবেদ আলী কাক্কুগ বাড়ির পিছনের বলগোটা গাছটি কি এখনো আছে?

২৪ জুন ২০২৫ খ্রি

Ruhini

Ruhini Da

রুহিনী দা

রুহিনী দাকে আমি প্রথম দেখি ১৯৯৩ সনে। নাম জানতাম না। পিজিতে এমফিল এডমিশন টেস্টের ভাইবা দিচ্ছিলাম একই দিনে। এখনকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন আইপিজিএমআর নামে একটা পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিকেল ইনস্টিটিউট ছিল। সংক্ষেপে বলা হতো পিজি। পিজিতে পড়া ও শিক্ষকতা করা খুবই সম্মানের ব্যাপার ছিলো। বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর বি আর খান স্যারের অফিস কক্ষে মৌখিক পরীক্ষা হচ্ছিল। একজন একজন করে ক্যান্ডিডেট প্রবেশ করছিলেন। আমরা সবাই ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করছিলাম। ১০/১৫ মিনিট পর ফিরে এসে একেকজন একেক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছিলেন। কী কী প্রশ্ন করলেন এটাই ছিলো অপেক্ষমান ক্যান্ডিডেটদের কমন প্রশ্ন। বর্ণনাকারীরা ভয়ংকরভাবে তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন। সবাই কোলাহল করে সেই সব প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করছিলেন। আমি সাধারণত নতুন কারো সাথে খোলামেলা আলাপ করতে পারি না। তাই, আমাকে অনেকেই বোকা ছেলেই মনে করে থাকেন। সেদিন আমি বোকার মতো এক দিকে বসে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলাম। ছোট বেলা হুজুর ছমির মাওলানা আমাকে দোয়া শিখিয়েছিলেন পরীক্ষার আগে পড়ার জন্য। সেই দোয়াটা বার বার পড়ছিলাম আর দেখছিলাম অন্যরা কিভাবে কি ভঙ্গিতে কথা বলেন। কিভাবে শরীর নাড়াচাড়া করেন। কত স্মার্ট তারা। আমি মানুষের কথা বলার ভঙ্গি খুব নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করে থাকি। দোয়াটা আমার ছাত্রদেরকেও শেখাই পরীক্ষার আগে পড়ার জন্য। দোয়াটা এমন “রাব্বি, জেদনি, এলমা।” অর্থাৎ “হে আমার রব, আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দিন।” একজন ক্যান্ডিডেট ভাইভা দিয়ে ফিরে এসে তার অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন। তার চেহাড়া দেখে বেশী স্মার্ট মনে হলো না। তিনি দু’হাতের দুই তর্জনী আঙ্গুল খারা করে কপালের দুপাশে ঠেকিয়ে বলছিলেন “সবই পারলাম। কিন্তু স্যার বলছিলেন ‘এরপর কি?’ আমি আর বলতে পারছিলাম না।” অন্য এক ক্যান্ডিডেট বলে দিলেন “এরপর হলো ফ্রি র‍্যাডিকেল সেল ইঞ্জুরি।” তিনি “ইয়েস, ইয়েস” বলে জিহব্বায় কামড় দিলেন। বললেন “আমার এবার হবে না।” অন্য এক ক্যান্ডিডেট বললেন “আপনার হবেই। আপনি গত দেড় বছর যাবত চিটাগং মেডিকেল কলেজে প্যাথলজির লেকচারার হিসাবে আছেন। আপনি অভিজ্ঞ।” দেখলাম সবাই সবাইকে চেনেন। আমি কাউকে চিনছি না। আমাকেও কেউ চিনছেন না। আমিও যে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের লেকচার তা কেউ জানেন না। এতক্ষণ যার কথা বললাম তিনিই রুহিনী দা। এই দাদা ১৯৯৯ সনে বিএসএমএমইউ-তে প্রথম এমডি কোর্স চালু হলে চাঞ্চ পেয়ে প্যাথলজিতে এমডি কোর্সে ভর্তি হন। আমি সে ১৯৯৩ সনের জুলাই সেসনেই এম ফিল চাঞ্চ পাই। ১৯৯৫ সনের জুলাই ফাইনাল পরীক্ষায় পাস করে ১৯৯৬ সনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ফিরে আসি। ১৯৯৮ সনে সহকারী অধ্যাপক হই। আমাদের ডিপার্টমেন্টে আমার ব্যাচমেট ডাঃ এএফএম সালেহ (ইকবাল) তখন প্রভাষক ছিল। সে আমার সাথে পরামর্শ করে ১৯৯৯ সনে এমডি কোর্সে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে চাঞ্চ পেয়ে গেলো। সালেহ পিজি থেকে মাঝে মাঝে আমার সাথে দেখা করে আমাকে দোষারোপ করতো। বলত “সাদেক, দোস্ত, তুমি আমারে কি এক সমুদ্রে ফেলে দিলা, আমি এর কূলকিনারা পাচ্ছি না।” আমি সাহস দিতাম এই বলে “দেখতে দেখতে ৫ বছর শেষ হয়ে যাবে। চিন্তা করবা না।” সালেহ রুহিনী দার খুব প্রশংসা করতো। বলত “সাদেক, আমি আমার এক রিডিং পার্টনার পেয়েছি, রুহিনী দা। দাদার মতো এত ভালো মানুষ হয় না।” সালেহ ২০০৩ সনে এমডি পাস করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে আবার প্রভাষক হিসাবে ফিরে আসে। প্যাথলজি বিষয়ে প্রথম এমডি পাস করা হিসাবে সবার কাছে একটু বেশী প্রশংসা পেতে থাকে। আমি যেমন এমফিল পাস করে ময়মনসিংহ এসে ১৯৯৭ সনেই তালুকদার প্যাথলজি নামে নিজের মতো করে স্বাধীনভাবে প্রাক্টিস করতে থাকি সালেহও তেমনি নোভা প্যাথলজি নাম দিয়ে ময়মনসিংহে একটা প্যাথলজি ল্যাব দিয়ে প্র‍্যাক্টিস শুরু করে। সালেহ সারাক্ষণ রুহিনী দার প্রশংসা করতো। রুহিনী দা এমডি পাস করে চিটাগং মেডিকেল কলেজে ফিরে গিয়ে প্র‍্যাক্টিস শুরু করেন। এদিকে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে সালেহর বদলীর প্রস্তাব হয়। সালেহ এই বদলী ঠেকাতে না পেরে রুহিনী দাকেও রাজি করান দিনাজপুর নিয়ে যেতে। কর্তৃপক্ষকে রিকুয়েষ্ট করে সালেহ রুহিনীদাকে সহ একই অর্ডারে বদলীর অর্ডার করায়। অর্থাৎ দুজনই সহকারী অধ্যাপক হিসাবে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে যোগদান করেন। সালেহ প্যাথলজি বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব নেন। মাইক্রবায়োলজির পোস্ট গ্রাজুয়েট করা টিচার না থাকাতে রুহিনী দা মাইক্রোবায়োলজির প্রধানে দায়িত্ব নেন। এভাবে চলে ৩ বছর। দাদা ও সালেহ একসাথে পার্টনারশিপে নোভা প্যাথলজি নামে দিনাজপুর শহরে একটা ল্যাবরেটরি দেন। দিনাজপুরে এর আগে কেউ হিস্টোপ্যাথলজি (বায়োপসি) পরীক্ষা করতো না। এই দু’জন মিলে প্রথম দিনাজপুরে হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষা শুরু করেন। দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, সৈয়দপুর অঞ্চলের সব বায়োপসি ও সাইটোপ্যাথলজি পরীক্ষা এই দু’জন বিশেজ্ঞের দ্বারা করা হতো।

২০০৭ সনের ডিসেম্বরের শেষের দিকে আমার জীবনের ছন্দপতন হলো। তত্ত্বাবধায়ক সরকার সব লণ্ডভণ্ড করে দিল। একই অর্ডারে আমাকে দিনাজপুর এবং সালেহকে ময়মনসিংহ বদলী করা হলো। আমরা যারযার কর্মস্থলে যোগদান করলাম। আমার তালুকদার প্যাথলজির রিপোর্ট করার দায়িত্ব নিলো সালেহ। আমি দিনাজপুর গিয়ে তেমন ভালো ল্যাবরেটরি পেলাম না। ততৎকালীন অধ্যক্ষের পরামর্শক্রমে আমি একটা কর্পোরেট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হিস্টোপ্যাথলজি, সাইটোপ্যাথলজি ও ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি প্রাক্টিস শুরু করলাম। দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে চাকরি করতে হলো আমাকে পূর্ণ ৮ বছর। এই ৮ বছর আমার বিভাগীয় প্রধান ছিলেন সেই রুহিনী দা। যাকে নিয়ে আজ লিখবো।

দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে যোগদান করার পর ভালো ভাবে বুঝতে পারলাম কেনো সালেহ রুহিনী দার এতো প্রশংসা করতো। আসলেই প্রশংসা পাওয়ার মতো বিরাট ব্যক্তিত্ব রুহিনী দা। তিনি আমাকে সাদেক ভাই বলে ডাকতেন। আট বছর একই ডিপার্টমেন্টে কাজ করেছি। তিনি ছিলেন বিভাগের প্রধান। কিন্তু তিনি আমার সাথে বসের মতো আচরণ করেননি। শত শত গল্প করে শত শত ঘন্টা কেটেছে আমাদের। গল্প বলতে বলতে তিনি কমন একটা কথা বলতেন “হইছে কি সালেহ ভাই!” আমি ভুল শুধ্রে দিয়ে বলতাম “দাদা, আমি সালেহ না, আমি সাদেক।” সালেহ দাদার হৃদয়ে এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিলো যে ৮ টা বছরেও দাদা আমাকে সালেহ ভাই বলেই ভুলে সম্ভোধন করে বসতেন। সালেহ আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেও দু’জনের সভাবে বেশ পার্থক্য আছে। কিন্তু দু’জনের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিল হলো দু’জনেই দাদাকে খুব বেশী ভালোবাসি।

আমি একদিন দাদার অফিস-রুমে বসে কিছু কাজ করছিলাম। রুম থেকে বের হয়ে দেখি ৩ জন জুব্বা পড়া টুপি মাথায় দেয়া হুজুর দাদার রুমে প্রবেশের জন্য অপেক্ষা করছেন। একজনের হাতে চাঁদা আদায়ের রশিদ। আমি জিজ্ঞেস করলাম

– আপনারা কিছু বলবেন?

– জি, আমরা এই স্যারের কাছে এসেছি।

– কি ব্যাপারে এসেছেন?

– আমরা একটা মাদ্রাসা ও মসজিদের সাহায্যের জন্য এসেছি।

– আসেন, আমার রুমে আসেন। পাশেই আমার রুম।

– স্যারের কাছ থেকে কিছু নিয়ে আসি। স্যার কি ব্যস্ত?

– মানে, স্যার তো মুসলিম না, পুঁজা করেন। স্যারের কাছ থেকে মসজিদের চাঁদা নিবেন?

– স্যার, হিন্দু?

– হ্যাঁ।

এরপর তারা ভালো করে দাদার নেইম প্লেটটা পড়লেন। ডাঃ রুহিনী কুমার দাস। বললেন “ও হো, ভুল হয়ে গেছে। আমরা ভাবছিলাম মোসলমান নাম “রুহানী।” আমরা সবাই মুস্কি হাসলাম। কোন কোন নামকরা ইসলামী চিন্তাবিদ ও বক্তার নামের শেষে রুহানী টাইটেল থাকে। এই হুজুররা তেমন রুহানী মানুষ ভেবে মসজিদের চাঁদার জন্য এসেছিনেন। তবে দাদার রুহুটা আসলেই রুহানী।

দাদার সাথে আমি অনেক গল্প করে কাটিয়েছি। গল্পের ছলে আমাদের উভয়ের ব্যাক্তিগত ও পারিবারিক অনেক সুখ-দুঃখের কাহিনী জানাজানি হয়ে গেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দাদা ক্লাস সিক্সে পড়তেন। আমি পড়তাম ক্লাস ফাইভে। দাদারা বাড়িঘর ফেলে ভারতে চলে গিয়েছিলেন। আমাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়নি। এই নয় মাস আমরা কে কি করেছি সে কথা নিয়েও আমাদের মধ্যে আলাপ হয়েছে। আমরা দুজনই ব্যবসার কাজে সেসময় হেল্প করেছি। দেশ স্বাধীন হলে দাদারা ফিরে এসে দেখেন বাড়ি ভিটা পরিস্কার। কিচ্ছু নেই তাদের। গ্রামের এক মুসলিম প্রভাবশালী ধার্মিক লোক সব নিয়ে গেছে তাদের বাড়ির। দাদাদের সাথে দেখা করে সেলোক বলে যে “তোমরা চলে যাবার পর এসব জিনিস দুর্বৃত্তরা লুট করে নিয়ে যেতো। তাই আমি তোমাদের সব কিছু নিয়ে আমার হেফাজতে রেখেছি। এখন তোমাদের জিনিসপত্র বুঝে নাও।” দাদারা সব কিছুই ফিরে পান। সেই কথা বারবার দাদা আমাকে বলতেন। মানুষ এতো ভালো হতে পারে আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। দাদা মাঝে মাঝেই লোকটার জন্য দোয়া করতেন যেনো লোকটা জান্নাতবাসী হন।

দাদার ২০০৪ সন থেকেই হার্টের রোগ ধরা পরে। হার্টের রক্তনালী চিকন হয়ে গিয়েছিল। তাই হার্টে রক্ত সরবরাহ কম হতো। তাতে বুক ব্যথা করতো। বুকে হাত দিয়ে চিন্তিত থাকতেন। অল্প হাটলেই হাফিয়ে যেতেন। আমাদের ডিপার্টমেন্ট ছিল নিচ তলায়। আমরা চারতলার ডরমিটরিতে থাকতাম। দাদা চারতলায় উঠে ক্লান্ত হয়ে পড়তেন। দাদার খুব কষ্ট হতো। এইসময় দাদার গ্রামেরই এক টাউট লোক দাদা ও দাদার ভাইয়ের নামে জমি সংক্রান্ত ব্যাপারে মামলা করে হয়রানি করেন। দাদা সারাক্ষণ মোবাইলে এনিয়ে উকিলের সাথে কথা বলেন। আমি খুব টেনশনে থাকতাম দাদাকে নিয়ে হার্ট এটাক করে বসেন কিনা। যাহোক, দাদারা সেই টাউট থেকে রেহাই পান। ২০০৯ সনে আমি, আমিনুল স্যার ও সালেহ দিল্লী-আগ্রা-জয়পুর ভ্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিলে দাদাকেও যেতে বলি। তার কষ্ট হবে বলে তিনি রাজি হলেন না। যেই সালেহ রিকুয়েষ্ট করলো অমনি রাজি হয়ে গেলেন। তবে ইন্ডিয়া টোরে দাদার কষ্ট হয়েছিলো আমরা বুঝতে পারতাম। সালেহকে দাদা এমন ভালোবাসতো যে সালেহর কথায় দাদা না করতে পারেননি।

দাদার বিয়ের আলাপও আমার কাছে করেছেন। দাদা তার বড়ভাইকে খুব মেনে চলেন। বিয়ের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে বড় ভাইকেই দায়িত্ব দিয়েছিলেন। দাদা চোখ বুঝে বড় ভাইয়ের কথায় বিয়েতে রাজি হয়েছেন। দাদা বৌদিকে নিয়ে খুবই সুখী জীবন যাপন করেন। দাদার দু’মেয়ে। খুবই গুণবতী হয়েছে। দুজনই ডাক্তার হয়েছে। দাদা বলেছেন “বিয়ের কথাবার্তা যখন পাকাপাকি হয়ে গেছে তখন আমার শশুর মশাই আমাকে একটু আড়ালে নিয়ে আমার হাত ধরে বললেন ‘আমার মেয়েকে তোমার কাছে সমর্পণ করলাম। তবে তোমাকে আমার একটা কথা রাখতে হবে সেটা হলো তুমি কখনো মোটর সাইকেলে উঠবে না’। ” আমাদের সময় অল্প বয়সে সাধারণত মারা যাওয়ার বেশী চাঞ্চ ছিল মোটর সাইকেল এক্সিডেন্ট। মেয়ে যেনো অল্প বয়সে বিধবা না হয় সে জন্যই হয়ত দাদার শশুর মশাই এমন ওয়াদা করিয়েছিলেন। এখন ইয়াং ডাক্তার মোটর সাইকেল এক্সিডেন্ট করে মারা যাওয়ার খবর তেমন শোনা যায়না। একটা চাঞ্চই বেশী সেটা হলো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে শহীদ হয়ে যাওয়া। দাদাকে আমি কারো মোটরসাইকেলে উঠতে দেখিনি। আমাকে কেউ ওয়াদা না করালেও আমি ভয়েই মোটরসাইকেলে চড়ি না।

দাদার কাছে একদিন একটা গল্প বলেছিলাম। গল্পটা দাদার খুব ভালো লেগেছিল। গুল্পগুজবের আসর বসলে দাদা সেই গল্পটা আমাকে শুনাতে বলতেন। গল্পটা আমি শুনেছিলাম শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডাঃ এখলাছুর রহমান স্যারের কাছে। গল্পটা ছিল এমন।

পাকিস্তান আমলে এক থানার এক দারোগা ছিল। তিনি ঘুষ খেতেন। মফস্বলে গিয়ে আসামী ধরে ঘুষ নিয়ে ছেড়ে দিতেন। রাতে বাসায় ফিরে ঘুষের টাকা বউয়ের হাতে দিতেন। বউ টাকা হাতে পেয়ে খুব খুশী হতেন। ট্রাংকের ভিতর টাকা সুন্দর করে গুছিয়ে রাখতেন। গহনা বানাতেন সেই টাকা দিয়ে। মাসের পহেলা বেশী টাকা দিতেন বউয়ের হাতে। বউ জিজ্ঞেস করতেন

– আইজ এতো বেশী টাকা পেয়েছেন?

– আজকের টাকা হলো বেতনের টাকা।

– অন্যদিনেরগুলা কিয়ের টাকা?

– অন্যদিনেরগুলো মফস্বলের টাকা।

বউ হিসাব করে দেখলেন যে মফস্বলের টাকা অল্প হলেও মাসের প্রতিদিন পাওয়া যায়। আর বেতনের টাকা মাসে মাত্র একদিন। তবে তুলনা করলে মফস্বলের টাকায় আয় বেশী।

একদিন খুব গরম পড়েছিল। সেদিন দারোগা চাকরি থেকে বরখাস্ত হয় ঘুষের খবর জানাজানি হয়ে। দারোগা বাসায় ফিরে খাটে বসে জামাখুলে খুব ঘামতেছিলেন। বউ বিচুন দিয়ে বাতাস করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন

– আপনের কী অইছে? এমন করতাছেন কেন?

– আমার চাকরিটা গেছে গা।

– কোন চাকরি গেছে? বেতনেরটা, না কি মফস্বলেরটা?

– বেতনেরটা গেছে?

– যাউগ গা। মফস্বলেরটা থাকলেই অইব।

– গিন্নি, বেতনের চাকরি না থাকলে মফস্বলেরটাও থাকে না।

– এ্যা?

আমি দাদাকে বলতাম “দাদা, এখনকার দারোগারা ভালো। মফস্বলে গিয়ে ঘুষ খান না। তবে এই গল্প থেকে আমার একটা শিক্ষা আছে। ডাক্তারদের বাড়তি আয়ের জন্য ঘুষ খেতে হয় না। তারা বৈধপথেই বিকেলে প্রাক্টিস করে মোটা অংকের টাকা আয় করতে পারেন। তবে যেসব ডাক্তার ভালো পজিশনে সরকারি চাকরি করেন তাদের বৈকালিক প্রাইভেট প্রাক্টিস আয়ও ভালো। চাকরি চলে গেলে তাদের প্রাইভেট আয়ও চলে যেতে থাকে।” দাদা হে হে করে হেসে বলতেন “ডাক্তারদের প্রাইভেট প্রাক্টিস আয় হলো মফস্বলের আয়ের মতো।”

আমি দু’এক মাস পরপর ছুটি নিয়ে ঢাকায় যেতাম। পরিবার ঢাকার উত্তরায় রেখেছিলাম। রাতের বাসে ফিরে সকালে অফিস করতাম। বিকেলে প্রাইভেট প্রাক্টিস করতাম। কোন কোন দিন ঢাকা থেকে ফিরতে দেরী হলে গাইবান্ধা পর্যন্ত এসে দাদাকে ফোন দিতাম “দাদা, আমি অফিস ধরার চেষ্টা করব। গাইবান্ধা পর্যন্ত এসেছি। অফিস ধরতে না পারলে মাইন্ড কইরেন না।” দাদা হেসে বলতেন “অসুবিধা নাই। মফস্বলেরটা ধরতে পারলেই হবে।” আসলেই মফস্বলের আয় বেতনের আয়ের চেয়ে অনেকগুণ বেশী।

আমাদের সাথে ডরমিটরিতে আরেক দাদা থাকতেন মেডিসিন বিভাগের। তিনি ডাঃ তিমির বরন বসাক। রুহনী দা ও তিমির দা দুজনই আমার থেকে এমবিবিএস-এ এক বছরের সিনিয়র। তারসাথেও আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো। তাকে নিয়ে লেখলে সারাদিনেও পড়ে শেষ করা যাবে না। তার কথা আজ লেখব না। তিনি ছিলেন চিরকুমার। তিনি নিজ হাতে রান্না করে খেতেন। কারন, প্রায় সব মসলাতেই তার এলার্জি ছিলো। তিনি মেডিসিন বিভাগের প্রধান হয়েও নিজের কক্ষে বসতেন না। হাসতালে রাউন্ড দিয়ে ডরমিটরিতে এসে পড়তেন। একটা মাত্র সুতীর হাফ হাতা শার্ট পড়তে পারেন। কারন, অন্য কাপড়ে তার এলার্জি ছিলো। যত শীত হোক, ঐ হাফ শার্ট। তিনি একাকী থাকতে পছন্দ করতেন। আত্বীয় স্বজনের সাথেও বেশী যোগাযোগ করতে দেখিনি। এক সন্ধায় চেম্বারে তার হার্ট এটাক হলো। তাকে দ্রুত স্থানীয় একটা প্রাইভেট হার্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। ওখানকার পরিচর্যা ভালো ছিলো। সাথে এটেন্ডেন্স থাকার তেমন প্রয়োজন ছিল না। তিমির দার আপনজন কেউ আসেননি। দুদিন পর তার এক বড় ভাই এলেন। তিনিও চিরকুমার। তিনিও দু’একদিন থেকে চলে গেলেন। রুহিনী দা তিমির দার কাছে ঘন ঘন যেতেন। আমি কম কম যেতাম। একদিন দেখলাম একজন ঔষধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টিটিভ ব্যাংকের এক কর্মকর্তাকে নিয়ে এসেছেন হাসপাতালে। ব্যাপারটা এমন- তিমির দার ব্যাংকে একাউন্ট আছে বহুদিন যাবত। তিনি বেতনের টাকা ও প্রাক্টিসের টাকা প্রায় সব ব্যাংকে জমা রাখেন। জামাকাপড় কিনতে হয় না তেমন। যা খান তার খরচও তেমন না। জমিজমাও কেনেননি। সব টাকা তার ব্যাংকে জমা। কিন্তু তিনি একাউন্ট করার পর চেক বই উঠাননি ব্যাংক থেকে। ব্যাংক থেকে একটা টাকাও উঠাননি কোনদিন। হার্টের এঞ্জিওগ্রাম করতে ঢাকায় যেতে হবে। অনেক টাকার দরকার। তাই চেকবই উঠাতে হচ্ছে। এজন্য ব্যাংক কর্মকর্তা নিজেই এসেছেন হাসপাতালে নমুনা স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে। যাহোক, টাকা সংগ্রহ করে তিমির দা বিমানে করে ঢাকায় গেলেন। সাথে আপন লোক কেউ গেলেন না। গেলেন শুধু আনাদের রুহিনী দা। কত বড় ভালো মানুষ আমাদের রুহিনী দা। তিমির দার বিপদের সময় এটেনডেন্ট হলেন আরেক হার্টের রোগী রুহিনী দা। রুহিনী দারও এঞ্জিওগ্রাম করার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল ৮ বছর আগে। তিনি মরে যাবেন এই ভয়ে কোন দিন এঞ্জিওগ্রাম করাতে সাহস পাননি। তিনি নিয়ে গেছেন তিমির দাকে এঞ্জিওগ্রাম করাতে প্রাইভেট দামী এক হাসপাতালে। তিমির দার এঞ্জিওগ্রাম করার সময় ডাক্তারগণ হার্টের রক্তনালীতে রিং পরিয়ে দিলেন। তিমির দা সুস্থতা বোধ করলেন। এসব আমি পরে শুনেছি রুহিনী দার কাছে। আমি এগুলো জানতাম না। তিমির দার রিং পরানো দেখে রুহিনী দার সাহস বেড়ে যায়। তিনিও এঞ্জিওগ্রাম করান। কিন্তু ডাক্তার এঞ্জিওগ্রাম করে পরামর্শ দেন যে আজই অপেন হার্ট সার্জারী করে বাইপাস করে দিতে হবে হার্টের রক্তনালী। সংবাদটা রুহিনী দা আমাকে দ্রুত মোবাইলে জানান সকালে। প্রিন্সিপাল প্রফেসর হামিদুল হক খন্দকার সেদিন কলেজে আসেননি। তিনি সেদিন রংপুর বাসায় ছিলেন। আমি স্যারকে মোবাইলে জানালাম আজ রুহিনী দার ঢাকায় বাইপাস সার্জারি হবে। অবস্থা খুব খারাপ। স্যার শুধু বললেন “সেক্রেটারিকে বলে দাও মসজিদে মিলাদ দিতে।” আমি সেক্রেটারিকে বললাম প্রিন্সিপাল স্যার মসজিদে মিলাদ দিতে বলেছেন বাদ জোহর। আমি টিচারদের মধ্যে মোটামুটি রেগুলার ছিলাম মসজিদে জামাতে নামাজ পড়তে। ইমাম, মোয়াজ্জিন ও খাদেমদের সাথে সরলভাবে মিশতাম। মসজিদের মিলাদেও অংশগ্রহণ করতাম।

ছোটবেলা থেকেই আমি মিলাদে অংশগ্রহণ করতাম। ছোট বেলায় আমাদের এলাকায় বাড়ি বাড়ি মিলাদ হতো। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তার আরোগ্য কামনা করে মিলাদ দেয়া হতো। কোন শুভ সংবাদ হলেও মিলাদ দেয়া হতো। নতুন ফসল ঘরে আনলেও মিলাদ দেয়া হতো। যিনি মিলাদ পড়িয়ে দিতেন তাকে বলা হতো মৌলভী। মৌলভীরা ইসলামি শিক্ষায় মোটামুটি শিক্ষিত ছিলেন। তারা মিলাদের সময় হালকা বয়ান করতেন। রাসুল মুহম্মদ (সঃ) এর জন্ম বৃত্তান্ত বলতেন, কোর আন থেকে কিছু আয়াত তেলাওয়াত করতেন এবং উর্দু, ফার্সি ও বাংলায় কবিতাকারে ছন্দ মিলিয়ে সুর করে মহানবী (সঃ) এর গুণ গান করতেন। যেমন,

বালাগাল উলামে কামালি হী

কাসাফাত দোজা বি জামালি হী।

হাসুনাত জামিও খিসালি হী

সাল্লু আলাইহি ওয়ালি হী।।

ইয়া নাবী সালামু আলাইকা

ইয়া রাসুল সালামু আলাইকা।

ইয়া হাবিব সালামু আলাইকা

সালামু তুল্লাহ আলাইকা।।

নবী না হয়ে দুনিয়ায়

না হয়ে ফেরেস্তা খোদার।

হয়েছি উম্মত তোমার

তার তরে শোকর হাজার বার।।

এমন অনেক সিল্কি গাইতেন মৌলভীরা। মিলাদের পর সবাইর মাঝে খাজা, বাতাসা ও কদমা বিলি করা হতো। এগুলোর লোভে সব পোলাপান মিলাদের অংশ গ্রহণ করত। অল্প শিক্ষিত মিলাদ পড়ানে ওয়ালাকে মুন্সী বলা হতো। মৌলভী ও মুন্সীদের ভালো অংকের টাকা দেয়া হতো হাদিয়াসরূপ। একবার আমজানি বুবুদের বাড়ি গিয়ে পাশের বাড়িতে মিলাদে গিয়েছিলাম। একজন মুন্সী মিলাদ পড়াচ্ছিলেন। অনেক পোলাপান হয়েছিল সেই মিলাদে। মুন্সী সুর করে করে মিলাদের বাক্য বলছিলেন। পোলাপানের গ্যাঞ্জামে মিলাদ ভালো শুনা যাচ্ছিল না। মুন্সী মিলাদের সুরে সুরে গেয়ে গেলেন

“পোলাপান গোলমাল করিস না,

নইলে কইল খাজা পাবি না।”

আমরাও সুরে সুরে বললাম

“পোলাপান গোলমাল করিস না,

নইলে কইল খাজা পাবি না।”

শুনে পোলাপানের দল খিলখিল করে হেসে দিলো।

যাহোক, সেই মিলাদ নিয়ে এখন ইসলামি স্কলারদের মধ্যে দ্বিমত আছে। কেউ কেউ এটাকে বিদআত বলছেন। তাই, অনেকেই মিলাদ বর্জন করছেন। প্রিন্সিপাল স্যারের কথামতো আমি কলেজের সেক্রেটারিকে মিলাদের ব্যবস্থা করতে বললাম। মিলাদ উপলক্ষে মসজিদে জিলাপি ও আনুসংগিক তোবারক আনা হলো সরকারি ধর্মীয় ফান্ড থেকে। তোবারক দেখে সেদিন পোলাপান মুসুল্লির সংখ্যা একটু বেশীই হলো। ইমাম সাবের পাশেই আমি বসেছিলাম মিলাদে। ইমাম সাবও মিলাদের পক্ষের লোক না। তিনি সরকারি ইমাম। তাই সরকারি অর্ডার তার পালন করতে হতো। তাই তিনি কবিতাগুলো বাদ দিয়ে কিছু কোরআন তেলাওয়াত করলেন, কিছু দরুদপাঠ করলেন। আমার কানের কাছে মুখ এনে জিজ্ঞেস করলেন “স্যার, কি উপলক্ষে মিলাদ?” আমি বললাম “ডাঃ রুহিনী কুমার দাস স্যার খুব অসুস্থ। তার হার্টের ওপেন সার্জারী হচ্ছে আজ। তারজন্য দোয়া করা।” ইমাম সাব চমকে গেলেন কুমার দাস শুনে। তারপর সাভাবিক হয়ে মোনাজাত ধরলেন। মোনাজাতে এক পর্যায়ে বললেন “ইয়া আল্লাহ আমাদের ডাঃ রুহিনী কুমার দাস স্যারের প্রতি তুমি রহম করো। তাকে তুমি আরোগ্য দান করো।” সবাই বললেন “আমিন, আমিন, আল্লাহ হুম্মা আমিন।” সবাই তোবারক খেয়ে ফিরে গেলো।

যাহোক, রুহিনী দার সেদিন হার্টের অপারেশন হলো। আল্লাহ রুহিনী দাকে সুস্থ করে দিনাজপুর আনলেন। দাদাকে আমি অনেকদিন কাজ করতে দেইনি। আমিই ডিপার্টমেন্টের কাজকর্ম চালিয়ে নিয়েছি। অপারেশনের সময় তিনি অজ্ঞান ছিলেন। জ্ঞান ফেরার পর তার যে তীব্র যন্ত্রণা হতো তার তিনি বিভতস ভাবে বর্ণনা করতেন। বাম বুকে হাত দিয়ে চোখ বড় বড় করে বলতেন “সালেহ ভাই, কি যে কষ্ট হয়েছে আমার! অসয্য কষ্ট!” আমি বলতাম “দাদা, আমি সালেহ না, আমি সাদেক।” আমি ২০১৫ সনের শেষ পর্যন্ত দিনাজপুর ছিলাম। দাদার অপারেশন হয়েছে ২০১২ সনে। এই ৪ বছরই দাদাকে দেখতাম বাম বুকে হাতে দিয়ে থাকতে। মাঝে মাঝে আমি হাত নামিয়ে দিতাম। বুকে হাত দিয়ে থাকা দাদার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল।

আমার বড় মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান হয় ২০১২ সনে ঢাকায়। দাদার কষ্ট হওয়া সত্বেও সেই অনুষ্ঠানে দাদা উপস্থিত হয়েছিলেন। দাদা আমাকে না ছাড়তে চাইলেও আমি যে ৮ বছর ধরে দিনাজপুর কষ্ট করে থাকছি এটা দাদা অনুভব করতেন। তাই তিনিও চাইতেন যেনো আমি ময়মনসিংহে ফিরে আসতে পারি। আল্লাহর রহমতে কিংবদন্তি শিক্ষক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডাঃ মনছুর খলিল স্যার আমাকে বদলি করে কিশোরগঞ্জ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজে নিয়ে আসেন ২০১৫ সনের শেষে। অর্ডার নিয়ে দিনাজপুর গিয়ে দেখি দাদা আমার জন্য সুন্দর একটা নেইম প্লেট বানিয়েছেন। লাগানোর অপেক্ষায় আছেন। আমার বদলীর অর্ডার শুনে তিনি বিমর্ষ হয়ে বললেন “আমি আপনার জন্য সুন্দর একটা নেইম প্লেট বানালাম, আপনি চলে গেলেন! ভগবান আপনার মঙ্গল করুন।” তিনি নেইম প্লেটটা প্যাকেট করে আমাকে দিয়ে দিলেন। সেইটা কিছুটা মোডিফাই করে আমি এখন ব্যবহার করছি। দাদার স্মৃতি ফেলে দেইনি। দাদা ডিপার্টমেন্ট ও ডর্মেটরির পক্ষ থেকে আমাকে গর্জিয়াস ভাবে বিদায় সংবর্ধনা দেন। উপহার দেন অনেক কিছু। আমি তার দেয়া উপহার সামগ্রী গর্ব ও মহব্বতের সাথে ব্যবহার করি।

২০১৯ সনের নভেম্বরে প্রফেসর ডাঃ সালেহ জামালপুর শেখ হাছিনা মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল হয়ে চলে যাওয়ায় ময়মনসিংহের প্যাথলজি বিভাগের প্রধানের পোস্টে আমার ফিরে আসার সুযোগ হয়। আমি জানতাম এই সংবাদে রুহিনী দাই বেশী খুশী হবেন। তাই আমি প্রথমেই রুহিনী দাকে জানাই। দাদা খুব খুশী হন। আমি এই বিভাগে ২০০২ সনেও কয়েকমাস ১৬ তম বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বে ছিলাম। চাকরির শেষ জীবনে এসে আবার ২৫ তম বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পেয়ে খুব ভালো কাটলো ২০২০ সনের এপ্রিলের ১৩ তারিখ পর্যন্ত আমার সরকারি চাকুরির শেষ সময়কাল। আমি বিদায় নিলাম সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধানের পদ থেকে। দাদা দিনাজপুর থেকে অধ্যাপক হিসাবে অবসর নিয়ে এখন কুমিল্লায় এক বেসরকারি মেডিকেল কলেজে আছেন। প্রায়ই আমাদের মধ্যে কথা হয় মোবাইলে।

১৬/৬/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

Cesarean section

Cesarean section

সিজার অপারেশন ছাড়াই বাচ্চা হয় কেমনে?

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

শিক্ষার্থীদেরকে কোন কিছু শিখাতে গেলে তার বয়সের দিকে একটু খেয়াল রাখতে হয়। আমি একদিন এই রকম একটা সমস্যায় পড়েছিলাম। ঈদের ছুটিতে কয়েকজন বাচ্চা ছেলে ও মেয়ে একজায়গায় বসে গল্প করছিলো । আমি ভাবলাম এই সুযোগে তাদেরকে একটু ধর্মীয় জ্ঞান দেই। আমি মানব সৃষ্টির শুরুটা কেমন ছিল বুঝাতে গিয়ে আদম (আঃ) ও বিবি হাওয়া (আঃ) এর সৃষ্টির কাহিনী বললাম। বিবি হাওয়ার অনেক সন্তান হলো বললাম। এরপর বলতে চেয়েছিলাম “যেহেতু সেই সময় আদমের সন্তান ছাড়া আর কোন মানুষের সন্তান ছিলনা, তাই ভাই-বোনের মধ্যেই বিয়ে সম্পাদন হয়। তারপর বিয়ের মাধ্যমে সন্তান জন্ম হয় এবং এভাবে মানব সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পেতে এখন এই অবস্থা হয়েছে।” এর আগেই এক শিশু আমার গল্পে বাধা দিয়ে বলল “তখন তো আদম ও হাওয়া ছাড়া আর কেউ ছিলনা। তাইলে সিজার অপারেশন করে দিলো কোন ডাক্তারে?

– সিজার ছাড়াই হইছে।

– সিজার ছাড়াই বাচ্চা হয়? আমরা এখানে সবাই সিজার অপারেশন হয়ে মায়ের পেট থেকে জন্মেছি। আদমের সন্তানরা সিজার ছাড়াই জন্মিল কেমনে?

আমি ভেবাচেকা খেয়ে গল্প বাদ দিয়ে অন্য ঘরে চলে গেলাম

বইটি ঘরে বসে পেতে নিচের ছবির উপর ক্লিক করুন

শৈশবের একাত্তর

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

Haturi Peta

Haturi Peta

হাতুড়ি পেটা

(স্মৃতি কথা)

প্রথম পোস্টিং ছিল বরিশালের চরামদ্দি ইউনিয়ন সাব-সেন্টারে। ১৯৮৮ সনে এক বছর সেখানে ছিলাম। প্রচুর মারামারির রোগী আসতো। তাদেরকে চিকিৎসা করে ইনজুরির সার্টিফিকেটও দিতে হতো। একবার এক রোগী এলো হাতুড়ি পেটা খেয়ে। বিস্তারিত শুনলাম রোগীর কাছ থেকে। ঢাকা থেকে লঞ্চ যোগে তারা আসছিলো বরিশালে। লঞ্চগুলো সাধারণত রাতে যাতায়াত করতো। বরিশালের অনেক যাত্রী রাতের লঞ্চে ঢাকায় গিয়ে দিনের বেলা অফিসের কাজকর্ম বা মার্কেটিং করে আবার রাতের লঞ্চে ফিরে আসতো। প্রায়ই পথিমধ্যে ডাকাতের কবলে পড়তো। এমনি একটা অভিজ্ঞ ডাকাত পার্টি ছিলো হাতুড়ি পেটা করার। গভীর রাতে ফেরার সময় যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়তো তখন চার পাঁচ জনের অল্প বয়সি ডাকাত পার্টি অতর্কিতে হামলা চালাতো হাতুড়ি দিয়ে। রাইফেল ওয়ালা আনসারের মাথার পেছনে হাতুরি দিয়ে পিটুনি দিলে আনসার অজ্ঞান হয়ে পড়ে যেতো। আনসারের রাইফেল কেড়ে নিয়ে লঞ্চের চালকের মাথার উপর তাক করে ধরে রাখতো ঠিকঠাক মতো চালিয়ে নিতে। অন্য ডাকাতরা সামনে যাকে পেতো তাকেই মাথার চান্দিতে হাতুড়ি পেটা করতো। দুই চার জনকে এভাবে মাথায় পিটুনি দিলে অন্য যাত্রীরা ভয়ে আতংকগ্রস্ত হয়ে মাথা নিচু করে লুকিয়ে উবুত করে বসে থাকতো। আশে পাশে কি হচ্ছে কেউ তা বুঝতে পারতো না। দুই চারজন যাত্রীর মাথায় পিটুনি দিয়ে শত শত যাত্রীকে অকেজো করে রাখতো কয়েকজন ডাকাতে। এ অবস্থায় যাত্রীদের কাছ থেকে নগদ অর্থ ও স্বর্নালংকার কেরে নিতো। কানের অলংকার খুলে না নিয়ে ঝেংটা টান মেরে ছিড়ে নিতো। লুট করা টাকা ও অলংকার পোটলায় ভরে সুবিধাজনক চর এলাকায় লঞ্চ ভিড়িয়ে নেমে দৌড়ে পালিয়ে যেতো কাঁশবনের ভেতর। এদিকে যাত্রীরা অনেক্ষণ পর্যন্ত মাথা নিচু করেই বসে থাকতো। লঞ্চের চালক এসে তাদেরকে ইনফরমেশন দিতো এই বলে যে ডাকাতরা চলে গেছে আপনারা মাথা তুলুন।

রোগীর মুখে এমন বিভৎস কাহিনী শুনে আমিও আতংকগ্রস্ত ছিলাম। কারণ, আমাকেও মাসে একবার এমন লঞ্চে রাতে আসা-যাওয়া করতে হতো। সরকারি বেতন মাসিক ১৮৫০ টাকা ছিলো। প্রথম চাকরি। প্রথম মাসের টাকা ঠিকই পেয়েছিলাম। দ্বিতীয় মাস থেকে আমাকে বেতন দেয়া হয় না। আমি ভাঙ্গা একটা ডোয়াপাকা টিনের ঘড়ে থাকতাম। অর্থ অফিসের দাবী ছিলো আমাকে নিয়ম অনুযায়ী ৩৫% বাড়ি ভাড়া কাটতে হবে। আমি ভাঙ্গা ঘরের ভাড়া কাটতে রাজি ছিলাম না। তাই, বেতন বন্ধ ছিলো। ২০ টাকা করে প্রাইভেট রোগী দেখে খাওয়া খরচ করে যা থাকতো তা থেকে বাবার জন্য কিছু টাকা মানি অর্ডার করে পাঠাতাম। আর যা থাকতো তা নিয়ে টাঙ্গাইল বাসায় আসতাম প্রতিমাসের প্রথম সপ্তাহে। যাহোক, চার মাস পরে এক সাথে বাড়ি ভাড়া সহ বেতন পেয়েছিলাম। সেই টাকায় বাবার ইচ্ছানুযায়ী বাড়ির পাশের ১২.৫ শতাংশ জমি কিনেছিলাম। লঞ্চে উঠে আতংকে মাথা হাতাতাম কখন এসে ডাকাতরা আমার মাথায় হাতুড়ি পিটায়। তারা তো আর আমি ডাক্তার কি না তা জিজ্ঞেস করে না। তখন, ডাকাতরা ডাক্তার ও পুলিশকে সমিহ করতো।

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ময়মনসিংহ

৩০ আগস্ট ২০২২ খ্রি.

#memoryofsadequel

#charamoddisadequel

এমন গল্প আরও পড়তে হ্যাস্ট্যাগ শব্দে ক্লিক করুন।

Khuingar Chala

খুইংগার চালা

গত দুই বছর আগে ইন্দ্রজানী হাট নিয়ে ফেসবুকে একটা গল্প লিখেছিলাম। সে গল্প পড়ে একজন পাঠক আমাকে অনুরোধ করেছিলেন তাদের খুইংগার চালা নিয়ে একটা গল্প লিখতে। গল্পটা ছিল স্মৃতিচারণমূলক। স্মৃতিচারণমূলক গল্প কেউ লিখতে বললে আমি লিখতে পারি না। আমার মাথায় যখন স্মৃতিচারণ খেলতে থাকে তখন আমি স্মৃতিচারণমূলক গল্প লিখি। তাই খুইংগার চালা নিয়ে এখনো কোনো গল্প লেখা হয় নি আমার। গতকাল দুপুরে খাবার সময় মোবাইলে একটা কল আসে। আমি সাধারণত মোবাইলে খাবার সময় কল ধরি না। মোবাইল স্ক্রিনে ‘নূর-ই-আলম খুইংগার চালা’ নামটা দেখে মোবাইলটা আমি রিসিভ করলাম । কথা শেষে স্বপ্না জিজ্ঞেস করলো

– কে ফোন করেছিল? তুমিতো সাধারণত খাবার সময় ফোন ধর না।

– নূর-ই-আজম ফোন করেছিল। রোগী নিয়ে আসবে।

– নূর-ই-আজম কে?

– খুইংগার চালার।

– খুইংগার চালা? খুইংগার চালা আবার কেমন নাম? খুইংগার মানে কি?

আমি স্বপ্নাকে খুইংগা কথাটার মানে ভালো করে বুঝিয়ে দিলাম। এরপর থেকে আমার ইচ্ছা হল খুইংগার চালা নিয়ে কিছু একটা লিখি। তাই আজ দুপুরে খাবার পর শুয়ে শুয়ে খুইংগার চালা নিয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করলাম।

খুইংগার চালা নিয়ে আমার তেমন কোন স্মৃতি নেই। তবে আমি একবার খুইংগার চালায় গিয়েছিলাম । আমার চাচাতো ভাই ইখতিয়ার উদ্দিন (বাশার ভাই)পাকিস্তান আমলে এস এস সি পাশ করে খুইংগার চালা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি নেন। আমি তখন ক্লাস থ্রিতে পড়তাম। যেহেতু এটা স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে তাই আমাদের দেশের নাম ছিল পাকিস্তান। এই পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস ছিল ১৪ ই আগস্ট। আমি স্বাধীনতা দিবস পালন করতে বাশার ভাইর সাথে খুইংগার চালা প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে যাই। মাঠটা ছিল অনেক বড়। অনেক খেলাধুলা হয়েছিল সেদিন। ওই বিরাট মাঠে ঘোড়দৌড়েরও ব্যবস্থা করা হয়েছিল। খুবই উপভোগ্য ছিল সেই ঘোড় দৌড়। যে ঘোড়াটি প্রথম স্থান অধিকার করেছিল সেই ঘোড়ার সওয়ার ছিল মাত্র ৭-৮ বছরের একটি ছেলে। ছেলেটির গা ছিল খালি। ভাঁজ করে লুঙ্গি পড়েছিল। আমরা পাহাড়িয়া পোলারা অনেকেউ ভাঁজ করে লুঙ্গি পড়তাম বাইটা বাছ্রার ভয়ে। লুঙ্গির নিচের অংশে মাঠের বাইটা বাছ্রা ছেঁকে ধরতো। তাই হাটু পর্যন্ত ভাঁজ করে লুঙ্গি পড়তে হতো। কিন্তু ওই ছেলেটি বাইটা বাছ্রার ভয়ে লুঙ্গি ভাঁজ করে পরে নি। সে পরেছিল ঘোড়া চালনার সুবিধার্তে। ঘোড়দৌড়ের সময় তাঁর ঘোড়াটি যেন উড়ে উড়ে চলছিল। সে ঘোড়ার লাগাম ধরে রেখেছিল। ঘোড়ার পিঠের উপর সে ছুটে ছুটে পড়ছিল। এই সময় তার লুঙ্গি উপর দিকে একবার উড়ছিল আর নামছিল। দর্শকরা দুই কারণে আনন্দ পাচ্ছিল। এক নাম্বার আনন্দ ছিল ঘোড়ার দৌড় দেখার আনন্দ। তুই নাম্বার আনন্দের কারন ছিল বাচ্চাদের জন্য। এটা ছিল ছেলের লুঙ্গি উড়ার আনন্দ। লুঙ্গি উড়ার সময় ছেলেটি বেআব্রু হয়ে যাচ্ছিল। তাই বাচ্চারা আনন্দ পাচ্ছিল। আমিও কিন্তু তখন বাচ্চাই ছিলাম। তাই, আমি দুই কারনে আনন্দ পেয়েছিলাম। আরেকটি আনন্দের খেলা ছিল লাঠিবাড়ি খেলা। খুবই চমৎকার ছিল সেই লাঠিয়ালদের লাঠি বাড়ি খেলা। সারাদিন খেলাধুলার আনন্দ উপভোগ করে রাতে বাশার ভাইর সাথে বাড়িতে ফিরি। আমার সাথে মজিবর ভাইও সেদিন গিয়েছিলেন খুইংগার চালা। সাড়াসিয়া বেসরকারি প্রাইমারি স্কুলটি যখন সরকারিকরণ করা হয় তখন বাশার ভাই সাড়াসিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। এটা খুব সম্ভব স্বাধীনতা যুদ্ধের আগেই।

Read more: Khuingar Chala

আপনাদের কিন্তু এখনো খুইংগার কথাটার মানে বোঝানো হয়নি। গাছের ভিতর যদি কোনো কারণে গর্ত থাকে সেটাকে বলা হয় খুং বা খোং। আপনারা বলেন গাছের কোটর। ছোট বেলায় আমরা পড়েছি “আদিম যুগের মানুষ গাছের কোটরে বাস করতো।” সে কোটরকেই আমরা বলতাম খোং। সাধারণত পুরাতন বা বৃদ্ধ গাছে খোং তৈরি হয়। খাঠখোকড়া পাখি ঠুকড়িয়ে গাছে খোং তৈরি করে খোংগের ভিতর বাসা বানায় । গাছের কোন অংশ পঁচে গিয়েও খোং তৈরি হতে পারে। খোং যে কারনেই তৈরি হোক না কেন অনেক প্রকার পাখি এসব খোংগে বাসা বানায়। কাঠঠোকড়া, টিয়া, দোয়েল, ভুতুম পেঁচা ইত্যাদি পাখি খোংগের ভিতর বাসা বানায়। আমি গাছে উঠে খোংগের ভিতর উঁকি দিয়ে পাখির বাসা দেখতাম। ডিম পাড়া থেকে শুরু করে বাচ্চা তোলানো পর্যন্ত প্রতিটি পর্ব আমি পর্যবেক্ষণ করতাম। কোন পাখির ডিম কত দিনে ফোটে তা আমার জানা হয়ে গিয়েছিল। গিরিকিটি বা কক্কে সাপও খোংগে থাকতো। আমাদের বাড়ির উত্তর পাশে একটা অশথ্ব গাছ ছিল। আমরা বলতাম বটগাছ। সেই গাছে অসংখ্য খোং ছিল। সেই খোংগেও অনেক পাখি বাসা করতো। সন্ধায় বড় ভুতুম পাখি ডাকতো “ভুত ভুতুম, ভুতুম।” ছোট ভুতুম পেঁচা ডাকতো “কেচরমেচর” করে। পাখির কাছে গেলে কুতকুতি চেয়ে থেকে ভয় দেখাতো। বেলা ডোবার পর কক্কে সাপ ডেকে উঠতো “কক্কে কক্কে বলে। ” শুনেছি কক্কে সাপের যত বয়স ততবার কক্কে কথাটি উচ্চারণ করে ডাকার সময়। যেমন, যেটার বয়স তিন বছর সেটা ডাকতো তিন বার কক্কে কক্কে কক্কে বলে। একেক কক্কে একেক নির্দিষ্ট সময় দিনে-রাতে মাত্র একবার ডেকে উঠতো।

খোংগের ভিতর মৌমাছিও বাসা বানায়। আমরা বলতাম খুইংগা চাইক (চাক)। এই মৌমাছি আলাদা প্রজাতির মৌমাছি। এরা গাছের ডালে বসে না। এরা চাক বানায় গাছের খোংগে অথবা উলুর টিকরে। উইপোকাকে আমরা বলতাম উলু পোকা। পুরাতন গাছ মাটির উপর বরাবর কেটে ফেললে তার সাথে উইপোকা বাসা বেধেঁ মাটি তুলে ডিবির মতো করে ফেলে। তখন ছোটখাটো পাহারের মতো মনে হয়। এগুলোকে আমরা বলতাম উলুর টিকর। একসময় পাখা গজার পর সব উলু আকাশে উড়ে যেতো। চৈত্র মাসে সন্ধার সময় গজারির মরা পাতায় আগুন দিলে সেই আগুনের উপর উলু ঝাকে ঝাকে উড়ে এসে পড়ে পুড়ে যেতো। তাই বলা হয় “পীপিলিকার পাখা গজায় মরিবার কালে।” উলুও এক প্রকার পীপিলিকা। উলু বাসা ছেড়ে চলে গেলে সেই খোংগে খুইংগা চাক বসত। মনো ভাইদের বাড়ির পিছনের আড়ায় (জংলায়) একটা উলুর টিকর ছিলো। সেই টিকরে প্রতি বছর খুইংগা চাক বসতো। খুইংগা চাকের মৌমাছি সাধারণত কামড়ায় না। আমি খোংগে হাত দিয়ে আসতে করে মৌমাছি চাক থেতে সরিয়ে পাঠশোলা (স্ট্র) দিয়ে টেনে টেনে মধু খেতাম। আমার সাথে একদিন মুকুলও গিয়েছিল মধু খেতে। মৌমাছি কি মনে করে যেনো মুকুলের কঁচি কানের লতিতে হুল ফুটিয়ে বসে। মুকুল আমার চেয়েও তিন বছরের ছোট। মুকুল বিষে কান্না শুরু করে। আমি মুখ চেপে কান্না বন্ধ করে দেই। কারন, মনো ভাই টের পেলে খবর ছিল।

যেসব গাছে বেশি বেশি খোং থাকতো সেসব গাছকে খুইংগা গাছ বলা হতো। যেসব কাঠালের গায়ে গর্ত গর্ত থাকতো সেসব কাঠালকে খুইংগা কাঠাল বলা হতো। আমাদের বাড়ির পশ্চিম পাশে একটা কাঠাল গাছ ছিল। সেই গাছের কাঠাল খুইংগা ছিল। তাই, সেই গাছকে খুইংগা গাছ বলা হতো। খুইংগা হলেও কাঠাল খুব স্বাদের ছিলো।

খুইংগার চালা গ্রামের নাম কেন খুইংগার চালা হয়েছে তা আমার জানা নেই। চালা হলো উচু ভুমি। খুইংগার চালা আমি দেখেছি একটু উচু ভুমি। খুব সম্ভব এই উচু ভুমিতে আগের দিনে অনেক খুইংগা গাছ ছিলো। তাই হয়ত খুইংগার চালা নাম হয়েছে। আপনার কি মনে হয়?

২৮/৩/২০২০ খ্রি.

Salah Uddin

Mawlana Salah Uddin

মাওলানা সালাউদ্দিন

Maolana Salah Uddin

মাওলানা সালাউদ্দিন ছিলেন আমার চাচাতো বোন হেলেনা আপার স্বামী। আরবী লাইনে লেখাপড়া করলেও তিনি বেশ বিজ্ঞান মনস্ক ও সাংস্কৃতিমনা ছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধা ও হিন্দু পরিবারকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। তিনি বিয়ের পর জমি জমা কিনে আমাদের গ্রামেই স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। কচুয়া পাবলিক হাই স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষকের পদে চাকরি করতেন। পাশাপাশি নিকাহ রেজিস্ট্রার করতেন। তিনি কাকরাজান ইউনিয়নের বিবাহ রেজিস্ট্রারের লাইসেন্স পেয়েছিলেন। বিবাহ রেজিস্ট্রি করাকে ইসলামি পরিভাষায় কাবিননামা বলা হয়। আমরা সংক্ষেপে কাবিন বলতাম। বিয়ে বাড়িতে গিয়ে কাবিন করলে দুলাইভাই বেশী ফি নিতেন। তাই, অনেকেই দুলাভাইর বাড়িতে এসে কাবিন করাতেন। যিনি কাবিন রেজিস্ট্রি করতেন তাকে বলা হয় কাজী। তাই দুলাভাইকে কাজীও বলা হতো। দুলাভাই মারা যাবার পর তার মেজো ছেলে কচুয়া পাবলিক হাই স্কুলে শিক্ষকতার সুযোগ পায় এবং কাজীর কাজটাও পায়। এখন তার কাছে কাজীর কাজটা নেই। দুলাভাইর ছোট ছেলে রুহুল আমীনও ঘোনারচালা হাই স্কুলে শিক্ষকতা করে। বড় ছেলে আব্দুল হালিম প্রাইভেট হাসপাতালে চাকরি করে।

আমি ছোটবেলা থেকেই দেখতাম দুলাভাই কাবিন করেন। তিনি কচুয়া আব্দুল্লাহ স্যারদের বাড়ির জামে মসজিদের শুক্রবার জুম্মায় ইমামতিও করতেন। দুলাভাইর সাথে আমি দু-এক বাড়িতে কাবিন করতেও গিয়েছি। ভালো খাবারও খেয়েছি।

শীতের দিনে তিনি বাহিরবাড়ির ধানিখোলায় খর বিছিয়ে তার তার উপর পিঠের বেতের পাটি বিছিয়ে কাবিন করতে বসতেন। বর ও কনে উভয় পক্ষই আসতেন। তারাও পাটির উপর বসতেন। গ্রামের মানুষ তামাসা দেখতে ভালোবাসে। তাই, যেখানে কয়েকজন লোক একত্র বসত সেখানেই গিয়ে সবাই ভীর করতো। কোথাও দুইপক্ষ ঝগড়া বাঁধালেও সবাই তামসা দেখতে যেতো। একবার গোড়াই থেকে একটা ছেলে এবং একটা মেয়ে, বয়স খুব সম্ভব ১৬-১৭ হবে, হাত ধরে ঘুরাফিরা করছিল কচুয়া হাটের রাস্তায়। শুনলাম তারা একে অপরকে ভালোবেসে, বাবা-মার অমতে বিয়ে করার উদ্যেশে বের হয়ে পড়েছে। লোকে বলত বাইরইয়া পড়ছে। কাজেই তাদেরকে ভিন গ্রামের মানুষ ধরে বিয়ে পড়িয়ে দিত। এই জুটির পিছনে প্রায় ৫০-৬০ জন ছেলে মেয়ে তামসা দেখছিল। আমিও কিছুক্ষণ তামসা দেখলাম।

একবার পশ্চিম দিক থেকে কয়েকজন লোক এসেছিল দুলাভাইর কাছে কাবিন করতে। তাদের বেশভূষা দেখে গরীব মনে হলো। কনেটাকে আমার কাছে অসহায় মনে হলো। বর পক্ষের লোকগুলোকে তেমন সভ্য মনে হলো না। দুলাভাই কাবিন রেজিস্ট্রার খাতায় লিখার পর সরকারি ফি নিয়ে নিলেন। তারপর কনের উদ্দেশ্যে বললেন “অমুকের ছেলে তমুক এত টাকার দেন মোহর সাব্যস্ত করিয়া আপনাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়াছে। আপনি রাজি আছেন?” কনে অনেকক্ষণ হয়ে গেলো কিছুই বললো না। দুলাভাই দ্বিতীয় বার ওকথাগুলো বললেন। কনে অনেকক্ষণ চুপ করেই রইলো ঘোমটা দিয়ে। তৃতীয় বার দুলাভাই বিরক্তির সাথে কথাগুলো বলে ধমকের সুরে উচ্চকণ্ঠে বললেন “রাজি আছেন?” কনে বিস্ফোরিত কণ্ঠে উচ্চস্বরে বলে উঠল “রাজি আছি।” আমি চমকে গিয়ে খেরের উপর ঢলে পড়লাম। কনে ফিকুরে ফিকুরে কান্না করতে লাগলো। আমি তখন ক্লাস সেভেন না এইটে পড়ি। আমার মনে হলো এটা ঠিক না। জোর করে বিয়ে দেয়া হচ্ছে। দুলাভাই কিছুক্ষণ মেয়েটির কান্না শুনলেন। আমি দুলাভাইর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। দুলাভাই চুপ করে রইলেন। দুলাভাই বললেন “এ বিয়ে হবে না।” বরপক্ষ বললেন “কনে রাজি আছে বলছে। বিয়ে হয়ে গেছে।” দুলাভাই বললেন “না, হবে না। সমস্যা আছে। কাবিন বাতিল।” মেয়েটি আরও পরিস্কার করে কান্না করতে লাগলো। অনেক কথাকাটাকাটির বরপক্ষ কাবিনের ফি ফেরত চাইল। দুলাভাই বললেন “কাবিনের পাতা খরচ হয়ে গেছে। আমি বই হিসাবে কিনে আনি। ফেরত পাবেন না। আপনাদের বিচার হবে। আপনারা জোর করে মেয়ে বিয়ে করতে নিয়ে এসেছেন। মেয়ে রাজি না। আমার ধমক শুনে রাজি বলেছে। মেম্বার ও পাড়ার মাদবর নিয়ে আসুন। তারপর কাগজ দেয়া হবে।” পরে কি হয়েছিল আমি জানি না।

কাবিননামা শেষ হলে বরের হাতের উপর কনের বাবার হাত রেখে দুলাভাই পাঠ করাতেন কনের বাবাকে “বলুন, আমার কন্যা, মুসাম্মত অমুক খাতুনকে এত টাকা দেন মোহরে আপনার কাছে বিবাহ দিলাম।” দুলাভাই বরকে বলতে বলতেন “আপনি বুলুন, কবুল, আলহামদুলিল্লাহ, কবুল করিলাম।” বর বলতেন “আলহামদুলিল্লাহ, কবুল করিলাম।” দুলাভাই বরের উদ্যেশ্যে বলতেন “আপনার বিবিকে ভরনপোষণ দিবেন, ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী চলাফেরা করাবেন এবং পর্দা পুশিদায় রাখবেন। তিন মাসের অধিক কাল নিরুদ্দেশ থাকিলে, পাগল কিংবা কারাগারাবদ্ধ হইলে বিবি আপনাকে তালাক দিতে পারিবেন। খাতা বন্ধ করলে বরপক্ষ সবাইকে খাজা বাতাসা ও কদমা খাওয়াইত। আমার কাছে সাদা কদমা খুব মজা লাগতো।

আমাদের গ্রামে একজন গরীব লোক ছিল। নিজের জমি ছিলো না। খুব আলসে ছিল। বোকাও ছিল। তার নাম লিখলাম না। ছদ্মনাম দিলাম হামজা। হামজা ভাই মাঝে মাঝে বোকার মতো কথা বলতেন। কেউ বোকার মতো কথা বললে আমরা বলতাম ” তুই অবা হামজা ভাইর নাগাল কথা কস ক্যা?” চৈত্র মাসে অথবা যে মাসে কোন কাজ থাকত না সেই মাসে হামজা ভাই খাবেন কী। কামলা দিলে যা টাকা পাওয়া যেতো সেই টাকা দিয়ে হামজা ভাই চাউল ও আটা কিনে খেতেন। মানে, দিন এনে দিন খেতেন। একদিন কামলা না দিলে না খেয়ে থাকতে হতো তার স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ। হামজা ভাইর বউ পরের ধান ভেনে অল্প কিছু চাউল পেতেন। আঁচলে করে আনতেন। শরীর খুব দুর্বল ছিল অল্প খেয়ে খেয়ে। তাই, ঢেকিতেও তেমন বল করে পার দিতে পারতেন না। যেদিন কামলা দিতে না পারতেন সেদিন হামজা ধনি বাড়ি থেকে এক কামলার দাম নিতেন। সেই টাকায় কাজের সময় তিনি কামলা দিয়ে পরিশোধ করতেন। মৌসুমের সময় কামলার দাম দুইগুন তিনগুন হলেও তিনি তা নিতে পারতেন না। যেহেতু তিনি অগ্রিম টাকা নিয়ে নিয়েছেন। অগ্রিম টাকা নিয়ে মৌসুমের সময় কামলা দিলে তাকে বলা হয় ঠুকা কামলা। হামজা ভাই ছোটদের মতো সামনে ভাজ করে লুঙ্গি পরতেন। তাই, আরও বোধাই বোধাই দেখা যেতো। কম বয়সেই তিনজন সন্তান রেখে হামজা ভাইর স্ত্রী মারা যান।

গ্রামে গরীব পরিবার স্ত্রী ছাড়া চলতে পারে না। তাই, হামজা ভাই আরেকটি বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। সেই বিয়ের কাবিনের সময় আমি উপস্থিত ছিলাম। হামজা ভাই কিস্তিটুপি পাতালি করে পরেছিলেন। তাতে আরও বোধাই বোধাই লাগছিলো। যথারীতি কাবিন সম্পাদন করে হামজা ভাইর হাত ধরলেন তার শশুর। কাজী বলতে বললেন “বলুন, আমার কন্যা।” হামজা ভাইর শশুরে বলার কথা। ভুলক্রমে হামজা ভাই বলে ফেললেন “আমার কন্যা।” দুলাভাই ধমক দিয়ে বললেন “এই বোধাই, কারে কী কয়।” আমি ও মজি ভাই হাসতে হাসতে খেরের উপর লুটিয়ে পড়লাম।

২২/৪/২০২২ খ্রি.
ময়মনসিংহ