Tag Archives: স্মৃতি কথা

ten-percent-formalin

১০% ফরমালিন তৈরিতে বদনার ব্যবহার


(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৯৩ সনের কথা। তখন আমি এম ফিল কোর্সে ছিলাম আইপইজিএম আর (এখনকার বিএমিউ)-এ। কোর্স মাত্র শুরু হয়েছে। অফিস টাইম ছিল দুপুর আড়াইটা পর্রন্ত। অফিস টাইমের শেষের দিকে বায়োপসি পরীক্ষার সেম্পলগুলির গ্রস এক্সামিনেশন করে টিস্যু সেম্পল ব্লক নিয়ে ১০% ফরমালিনে রেখে দিতে হতো। সকাল আটটা থেকে ক্লাস ও কাজ করতে করতে গ্রস দেয়ার সময় আমি ক্লান্ত ও ক্ষুধার্থ হয়ে পড়তাম।

একদিন দুইটার সময় গ্রস দিতে গিয়ে দেখি ১০% ফরমালিন নাই। ঐসময় ল্যাব এটেন্ডেট যিনি ছিলেন তার নাম এতদিনে আমি ভুলে গেছি। তিনি পাজামা, পাঞ্জাবি ও টুপি পরে থাকতেন। তিনি পাক্কা নামাজি ছিলেন। আমি বললাম, “হুজুর, আজ গ্রস দেয়া গেলো না। চলে যাচ্ছি। “
– কেন?
– ফরমালিন নাই জারে।
– দাড়ান একটু, আমি বানিয়ে দিচ্ছি।

আমি ভাবলাম, হুজুর প্রথমে একটা মিজারিং সিলিন্ডার আনবেন, জার থেকে তেল মাপার মতো করে ফরমালিন নিবেন জারে, তারপর ডিস্টিল্ড ওয়াটার নিবেন সিলিন্ডার দিয়ে মেপে নব্বই গুন পর্যন্ত। এতক্ষনে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়বো।

হুজুর একটা অজুর বদনা হাতে নিয়ে ভিতর দিকে যাচ্ছিলেন। বললাম
– আমার অত সময় নাই। আপনি যাচ্ছেন অজু করতে। আগামীকাল গ্রস দিব। বানিয়ে রাইখেন।
– না, না,, এক্ষুনি বানিয়ে দিচ্ছি।
বলেই দ্রুত বিতরে গিয়ে বদনা ভর্তি করে কি যেন নিয়ে এনে ১০% ফরমালিন লিখা জারে ঢাললেন। বললাম
– এটা কি ঢাললেন?
– ফরমালিন ঢাললাম।

তারপর তিনি পানির ট্যাপ ছেড়ে দিয়ে পরপর ৯ বদনা পানি ঢেলে মিশিয়ে নিলেন।বললাম
– কি হলো?
– ১০% ফরমালিন হলো। হয় নাই?

আমি হিসাব করে দেখলাল ১০ লিটার ফরমালিনের সাথে যদি ৯০ লিটার পানি মেশাতাম থলে ১০% ফরমালিন হতো। অথবা ১ লিটার ফরমালিনের সাথে যদি ৯ লিটার পানি মেশাতাম তহলেও ১০% ফর্মালিন হতো। অথবা ১ গ্লাস ফরমালিনের সাথে যদি ৯ গ্লাস পানি মেশাই তাতেও তো ১০% হয়। তাহলে ১ বদনা ফরমালিনের সাথে ৯ বদনা পানি মেশাই ১০% ফরমস্লিনই তো হবে। হুজুরকে বললা, “হয়েছে।” হুজুর হাতের আংগুল দিয়ে দাড়ি খেলাল করতে করতে চলে গেলেন। আমি গ্রস দিয়ে হোস্টেলে গেলাম।

এর পর ১৯৯৬ সন থেকে এ পর্যন্ত যখনই ১০% ফরমালিন বানাতে শেখাই তখনই বলি ১০% ফর্মালিন বানাতে সিলিন্ডার লাগে না, তোমাদের হাতের কাছে যা আছে তাই দিয়েই মেপে নাও, হোক সেটা পানি খাওয়ার গ্লাস অথবা অজুর পানির বদনা।

২১ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.
#formaline #story #memory #sadequel
কাল্পনিক ছবিটি জেমিনি এ আই টুল তিয়ে তৈরি করেছি।

mal-nai

মাল নাই

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আজকেরটাও আইপিজিএম আর-এ এম ফিল প্যাথলজি পড়াকালীন স্মৃতি কথা লিখলাম । ১৯৯৩-১৯৯৫ আমি ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত পোস্ট গ্রাজুয়েট ইনস্টিটিউট, বর্তমানে যেটা বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি -তে পড়েছি। আমরা হিস্টোপ্যাথলজি স্লাইড পরীক্ষা করা শিখতাম। আমাদের প্রফেসরগণ স্লাইড দেখার আগে আমরা শিক্ষার্থীর স্লাইড পরীক্ষা করে নিজেদের খাতায় ডায়াগনোসিস লিখে রাখতাম। স্যার যখন মাইক্রোস্কোপে চোখ রেখে স্লাইড দেখতেন আমরা তখন স্যারের পেছনে খাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কে কী ডায়াগনোসিস করেছেন স্যার জিজ্ঞেস করতেন। আমরা যার যার করা ডায়াগনোসিস বলতাম। ফাইনাল ডায়াগনোসিস স্যার বলে দিতেন।

যাহোক, একবার দেখা গেলো টেকনোলজিস্ট স্লাইড তৈরি করে দিচ্ছেন না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “স্লাইড দিচ্ছেন না কেন?”

– মাল নাই, তাই স্লাইড তৈরি করতে পারছি না।

– কবে দিবেন?

– মাল আসলেই দিব।

এভাবে পর পর তিন দিন বললেন যে মাল নেই তাই স্লাইড বানাতে পারছেন না।

আমি বললাম

– কী মাল নাই?

– মাল নাই তা আপনি বুঝতে পারছেন না?

– কী মাল নাই আমাকে বলুন আমি আনার ব্যবস্থা করি।

– মাল এনে দেন আমি কাজ করি।

– যে মাল নেই সেটা আমাকে দেখান।

তিনি এলকোহল লেভেল করা খালি বোতল দেখিয়ে বললেন

– এই যে দেখেন, মাল নাই।

– এটা তো এলকোহলের বোতল। এলকোহল নেই, তাই বলুন। বার বার জিজ্ঞেস করছি কী নাই, আপনি বলছেন, মাল নাই।

– এলকোহল মানেই তো মাল, আর মাল মানেই মদ। আপমাদের এলাকায় মদকে মাল বলে না?

– হ্যা, তাইতো। এলকোহলই হলো মদ। মদকে মালও বলে তিরস্কার করে। বলে, বেটায় মাল খায়।

২২ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.

#alcohol#mal#mod#memory#sadequel

ছবি তৈরি করেছি জেমিনি এ আই টুল দিয়ে।

bus-nosto-hole

বাসের ইঞ্জিন নষ্ট হলে

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বাসে উঠে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা যাচ্ছিলাম। সিট নিয়েছিলাম সি লাইনের বাম পাশে করিডোরে। অর্থাৎ সি-২। আমি সবসময় সম্ভব হলে এই সিটের টিকিট করি। না পেলে পরের লাইনে। বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে সাধারণত ড্রাইভারের সামনের অংশে লেগে দোতরিইয়ে ড্রাইভার সহ পেছনের দুই তিন সিটের যাত্রী মারা যায়। বাম দিক সাধরনত কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জানালার সাথের সিট নেই না দুই কারনে। একটি কারন হলো বাস ওভারটেক করার সময় লেগে গেলে জানালার সাথের যাত্রী আঘাত প্রাপ্ত হতে পারে। আরেকটি কারণ হলো সামনের যাত্রী বমি করা শুরু করলে জানালা দিয়ে ছিটা ছিটা আসে। তাই করি ডোরের সাথের সিটে বসি।

যে কাজে যাচ্ছিলাম সে কাজের জন্য দুপুর ১২টার আগে অফিসে উপস্থিত হতে হবে। বাস সাভাবিক গতিতেই চলছিলো । তখন বাসে সামনের দিকের টিভি মনিটরে মিউজিক ভিডিও চলতো। যাত্রিরা ভিডিও দেখতে দেখতে ঢাকায় চলে যেতো। ড্রাইভার কুরুচির চরিত্রের হলে কুরুচিপূর্ণ ভিডিও চালাতো। যেসব যাত্রী ধার্মিক ছিলো তারা মাথা নিচু করে তাজবি জপতে জপতে জার্নি করতো। উঠতি বয়সের পোলাপানরা বেশ মজা করে উপভোগ করতো সেই ভিডিও। বাচ্চা পোলাপানরা ভিডিওর সিনগুলোকে মজার খেলা মনে করে দেখতো। মহিলারা লজ্জা পেয়ে মাথা অবনত করে থাকতেন। এমন অস্বস্তিকর ছিল সেই সময়ের জার্নি। আমি মাঝে মাঝে চোখ উচু করে দেখছিলাম কী দেখাচ্ছে। এক মহিলা যাত্রীকে বলতে শুনেছিলাম “দূর, খাইচ্চুইরা ব্যাডায় কি দেহাইতাছে?” আমার কাছেও মনে হলো ড্রাইভার বেটা একটা খাচ্চর। কন্ট্রাক্টরকে হাত ইশারায় ডেকে কাছে এনে শান্ত গলায় বললাম “এই যে টেলিভিশন মনিটরের পর্দায় তোমার ড্রাইভার যে ভিডিওগুলো দেখাচ্ছেন এগুলো কোন সেন্সর করা সিনেমা নাটকের দৃশ্য না। ফাজিল লোকেরা এগুলো বানিয়েছে। এই ড্রাইভারের মতো কুরুচিপূর্ণ মানুষ এগুলো দেখে। এই বাসের ৯০% যাত্রী এগুলো পছন্দ করেন না। হুজুর ও মহিলারা মাথা নিচু করে বসে আসে। বাচ্চারা খেলা মনে করে দেখছে। তোমার ড্রাইভারকে বলো এগুলো পালটিয়ে ভালো কিছু দেখাতে।” হঠাৎ হার্ড ব্রেক করে বাস থেমে গিয়ে বাম দিকে কাত হলো। অল্পতের জন্য খাদের গিয়ে পড়লো না। পাশের যাত্রী বলে উঠলো “লায়লাহা, লায়লাহা।” আমি শুধরিয়ে দিলাম “লায়লাহা না, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।” তিনি তখন বললেন “লা ইলাহা, লা ইলাহা।” আমি বললাম “আপনি শুধু লা ইলাহা বলছেন, যার অর্থ হচ্ছে ইলা (আল্লাহ) নাই। তার মানে, আপনি বলছেন আল্লাহ নাই। ইল্লাল্লাহ মানে আল্লাহ ছাড়া। আপনাকে পূর্ণ করে বলতে হবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া ইলা (মাবুদ) নাই।” কন্ট্রাক্টর আমার কথাগুলো ড্রাইভারের কাছে গিয়ে বললেন। ড্রাইভার ভিডিও বন্ধ করে ক্যাসেট ট্যাপ বাজানো শুরু করলেন। ফকিরি গান বাজানো শুরু হলো। “এ দেহ পিঞ্জরে বসাইয়া খোদারে, তার তরে করো প্রার্থনা…..।” গানের অর্থ বোধগম্য না হলেও সুরটা আমার ভালো লাগছিলো। এক ইয়াং যাত্রী চিতকার দিয়ে বলে উঠলো “এই ব্যাটা ড্রাইভার, ইগুলা কি হুনাইতাছো? বন্ধ করো।” ড্রাইভার গানের ক্যাসেট বন্ধ করে দিলেন। কিছুক্ষণ পর আবার ছেড়ে দিলেন অন্ধ হুজুরের ওয়াজ। হুজুর কিছুক্ষণ পর পর বাম কান চেপে ধরে চিতকার করে বলে উঠেন “এ্যাই” সেই চিতকারে কোন কোন যাত্রীও কান চেপে ধরে। গাজীপুর গজারি বনে এসে গাড়িটা থেমে গেলো। যাত্রীরা সমস্বরে বলে উঠলো, “কি হলো, ড্রাইভার, থামলা কেন? আমাদের অফিস ধরতে হবে। তাড়াতাড়ি যাও।” ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দেন। ইঞ্জিন “থ্যা ক, থেক, থেক থেক” বলে থেমে যায়। কিছুক্ষণ থ্যাক থ্যাক করে পুরা পুরি চুপ করে রইলো। গাড়ির লোকেরা মেশিন টুলস নিয়ে ইঞ্জিন মেরামত শুরু করলো। যাত্রীরা চিল্লাতে লাগলো –

“এই শালারা ছাড়ার সময় চেক করস নাই?”

“অফিস টাইম শেষ হইয়া যাইবো, অহন কিবা অইবো?”

এক মহিলা তার স্বামীকে ভর্তসনা করে “আমি প্রথমেই তোমাকে বলছিলাম এই গাড়ির টিকিট না করতে।” তার স্বামী উত্তর দেন “কেউ কি জানতো গাজীপুর এসে গাড়ি নষ্ট হবে?

এক যাত্রী ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বললেন ” গাড়ি ছাড়ার আগে ইঞ্জিন চেক করেন নাই?” ড্রাইভার বলেন “ইঞ্জিন তো চেক করেছি। ইঞ্জিন ভালোই ছিলো। ইঞ্জিন নষ্ট হলো এখন। কখন ইঞ্জিন নষ্ট হয় বলা যায় না। আপনারা শান্ত হয়ে বসুন। আমরা ঠান্ডা মাথায় কাজ করি।“ যাত্রিরা অস্থির, চেচামেচি করতেই থাকলো। আমি নির্লিপ্ত বসে ছিলাম। কোন টেনশন করলাম না। আমারও কাজের টাইম শেষ হয়ে যাবে। করার কিছু নেই। আমি টেনশন করলেও যা হবে, না করলেও তাই হবে। বরং টেনশন করলে ব্লাড প্রেসার বেড়ে যাবে। হার্ট ডিজিজ হবে। সর্বদা ঠান্ডা মেজাজে থাকাই ভালো। বরঞ্চ, এই সময়টা এঞ্জয় করা যাক। জানালা দিয়া দেখলাম সুন্দর গজারির বন। বনের পাশেই বাইদের জমিতে ক্ষেত ভর্তি আধাপাকা ধান। আস্তে করে সামনে গিয়ে ড্রাইভারকে বললাম “তাড়াহুড়ো করবেন না। ঠান্ডা মাথায় কাজ করুন। আমি নিচে নামলাম। সি-২ সিটে বসেছি। আমাকে রেখে চলে যাইয়েন না। ইঞ্জিন ঠিক হলে ডাক দিয়েন।”

গজারির বনে কিছুক্ষণ হাটলাম। টেওড়াকাটা গাছে ফুল ফুটেছিল। ভ্রমর বসেছিল তাতে। প্রজাপতিরা নেচে নেচে ফুলে ফুলে উড়াউড়ি করছিলো। নানা জাতের পাখির গানে মুখরিত ছিল সেই বন। বাইদের ধান ক্ষেতের বাতরে এসে দাড়ালাম। ক্ষেতের মাঝখানে একটি কঞ্চি গাড়া ছিলো। সেই কঞ্চিতে বসেছিলো এক ফেইচ্চা (ফিঙ্গে) পাখি। উড়ে গিয়ে ধান ক্ষেত থেকে ফড়িং ধরে এনে কঞ্চিতে বসে খাচ্ছিল। ক্ষেতের বাতরের এক পাশে জোড় কাটা ছিল। সেখানে একটা পানির ঝরা ছিলো। ওখানেও এক কঞ্চি গাড়া ছিলো। সেই কঞ্চিতে বসা ছিলো একটি সুন্দর মাছরাঙা পাখি। নষ্ট গাড়ি থেকে হর্নের আওয়াজ এলো। দ্রুত এসে সিটে বসলাম। যাত্রীরা চিতকার চেচামেচি করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সবার অফিস টাইম ওভার হয়ে গেছে। সবাই তা নিয়ে আফসোস করছে। আমি ব্যাগ থেকে বই বের করে পড়তে পড়তে মহাখালী বাস টার্মিনালে পৌছলাম। অফিসে গিয়ে আমার কাজ হলো না। ফিরে এলাম বাস টার্মিনালে। ফেরিওয়ালা টসটসে পেয়ারা কুঁচি কুঁচি করে কেটে কাসুন্দি ও বিট লবণ মিশিয়ে কৌটার ভেতর ভরে হাতের তালুতে থাপথুপ করে বিক্রি করছিলো। খুব খেতে ইচ্ছে হলো। মেডিকেল কলেজের শিক্ষক হয়ে খোলা খাবার খাওয়া ঠিক না। ছাত্রদেরকে তাই শেখাই। কাজেই না খাওয়াই ভালো। কিন্তু মনে মানছিলো না। কাছে গেলাম। এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখলাম পরিচিত কেই নেই। অর্ডার দিলাম ১০ টাকার। আমার নির্দেশ মতো বোতলের পানি দিয়ে পেয়ারা ধুইয়ে পরিস্কার ছুড়ি দিয়ে কেটে বানিয়ে দিলো। বেঞ্চে বসে টুথ পিক দিয়ে গেথে গেথে মজা করে খেলাম। ফিরতি টিকিট করে ফিরে এলাম ময়মনসিংহ। ফেরার সময় ইঞ্জিন নষ্ট হয়নি। হলে নেমে এঞ্জয় করতাম।

১৪/১০/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ – ঢাকা জার্নি

#memory #busjourney #smritikotha #sadequel

কাল্পনিক ছবি তৈরি করেছি chatGPT দিয়ে

ghaura

স্যার, আপনে এইরকম ঘাউড়া ক্যান?

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৮৮ সনের জুলাই মাসের ৩ তারিখে সরকারি মেডিকেল অফিসার হিসাবে প্রথম যোগদান করি বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। একা একটা পরিত্যক্ত সরকারি টিনের ঘরে হারিকেন জ্বালিয়ে থাকতাম। কেরোসিনের চুলায় সকালে নিজ হাতে রান্না করে তিন বেলা খেতাম। আলু ভর্তা, বেগুন ভর্তা, ডিম ভর্তা, ডিম ভাজি এবং ডাল দিয়ে সাধারণত ভাত খেতাম। মাঝে মাঝে খাসির বা গরুর গোস্তো নিজ হাতে রান্না করে খেতাম। একাকি তাকতাম, তাই নিরবতা কাটানোর জন্য এক ব্যান্ডের ছোট্ট একটা পকেট রেডিও বাজাতাম, বাংলাদেশ বেতার ঢাকা ও আকাশবাণী কলকাতা শুনতাম।

১৯৮৯ সনের মার্চ মাসে ঐ এলাকায় কলেরায় মহামারি আকারে অনেক লোক আক্রান্ত হয়। আমি সকালে হাসপাতালে বসে রোগী দেখছিলাম। হাসপাতালটা ছিল অতি পুরাতন টিনের ঘর। ব্রিটিশ আমলের লোহা কাঠের ভাংগা ভাংগা চেয়ার টেবিল ছিলো। আমার সামনে অন্তত ১০০ জনের মতো রোগী লাইনে দাড়ানো ছিলো। মনোযোগ দিয়ে দ্রুত রোগীর প্রেস্ক্রিপশন লিখে বিদায় দিচ্ছিলাম। একজন ছাত্র লাইনে না দাড়িয়ে খোলা জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে উকি দিয়ে বারবার বলছিলো, ” স্যার আমাকে দুই তিনটা রগে দেয়ার সেলাইন দিন, রোগীর সাংঘাতিক ডাইরিয়া হইছে।” আমি বার বার বলছিলাম লাইনে দাড়াতে। কিন্তু সে লাইনে না এসে জানালা দিয়ে বারবার একই অনুরোধ করছিলো। আমি বিরক্ত হয়ে জানালা দিয়ে তাকে কয়েকটা খাবার সেলাইন সাধলাম। কিন্তু ছেলেটি নাছোড়বান্দা, রগে দেয়ার সেলাইনের ব্যাগই নিবে।আমি বললাম যে রোগী না দেখে রগে দেয়ার সেলাইন দেয়া যাবে না। এভাবে সে প্রায় ঘন্টাখানিক বারবার একই দাবি জানিয়ে আসছিল। আমি সে দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে অন্য রোগীদের সমস্যা শুনে শুনে ঔষধ দিয়ে আসছিলাম।

এক পর্যায়ে ছেলেটা হঠাৎ বলে উঠলো, “স্যার, আপনে এমন ঘাউড়া ক্যান?” মুরুব্বিরা লাইনে থেকে বলে উঠলেন, “এই বে-আদব ছেলে, কাকে কি বলছো? একজন ফার্স্ট ক্লাস গ্যাজেটেট অফিসারের স্যাথে এভাবে আচরন করে?”

আমি হেসে ফেললাম। জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার নাম কী? কোন ক্লাসে পড়ো?”

ছেলেটি বললো যে সে ক্লাস নাইনে পড়ে। আমি বললাম আমি এই রোগীগুলো দেখা শেষ করে তোমার সাথে তোমাদের বাড়ি গিয়ে রোগী দেখে নিজ হাতে সেলাইন পুশ করে আসবো। রোগী না দেখে সেলাইন দিয়ে দেয়ার নিয়ম নাই।” আরও কিছুক্ষণ বাক বিতনণ্ডা করে চুপ রইল। হাস্পাতালের রোগী দেখা শেষ করে তিনটি সেলাইনের ব্যগ সাথে নিয়ে ছালেটির বাড়িতে চলে গেলাম দুই কিলোমিটার হেটে। ঐ বাড়ির বড়রা ছেলের কান্ড দেখে অবাক। বলেন, “আমরা লজ্জিত, আমাদের ছেলেটা আপনার সাথে বেয়াদবি করেছে। আমরা লজ্জিত। আমরা তাকে এভাবে সেলাইন আনতে বলি নাই।” আমি বললাম, “সমস্যা নাই। রোগী দেখান।”

মুরুব্বিরা বললেন, “আপনি বাসায় ফিরেন নাই। দুপুরে খান নাই। একা একা থাকেন। কি খান, না খান আমরা খোজ রাখিনা। আজ আমাদের বাড়িতে খাবেন। পোলাও – মাংস রান্না করা আছে। আপনি আগে খেয়ে লন। তারপর রোগী দেখবেন। আমরা জানি, আপনারা রোগী দেখার পর খান না। কাজেই রোগী দেখার আগেই খেতে হবে।”

আমি অজু করে খেয়ে নিলাম। অনেকদিন পর ভালো খাবার খেলাম। ভালো লাগলো। তারপর রোগী দেখে সেলাইন পুশ করে ফিরে এলাম চরামদ্দি। সাথে ব্যাগ হাতে বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেলো সেই ছেলেটা। যে আমাকে ঘাউড়া বলেছিলো। আমি একটুও মাইন্ড করিনি। এরপর যদিন চরামদ্দি ছিলাম, ছেলেটা আমার কাছে আসতো ভালোবেসে। আমার ভালো লাগতো। চরামদ্দির ঘাউড়া ডাকা ছেলেটিকে।

৫ জানুয়ারি ২০২৬ খৃ.

#story #Memory

(ছবিটা এ আই দিয়ে তৈরি করিয়েছি)

rajnitir-mor

রাজনীতির মোর

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

অনেক বছর আগের কথা। সনটা ভুলে গেছি। গ্রামের বাড়ি সখিপুর এলাকা থেকে একজন রোগী এলেন আমার ময়মনসিংহ তালুকদার প্যাথলজি ল্যাব এর চেম্বারে। আমি নাম জানার পর জিজ্ঞেস করলাম

– আপনার বাড়ি যেন কোথায়?

– বাড়ি তো আপনাদের বাড়ির কাছেই।

– আপনার বাড়ি কি আমাদের বড়বাইদপাড়ায়?

– না, আমাদের বাড়ি হচ্ছে রাজনীতির মোর।

– এটা আবার কোথায়?

– আপনাদের বাড়ির কাছেই। মনে হচ্ছে, নামই শুনেন নাই?

– আমি এই গ্রামের নাম শুনি নাই। গ্রামটা কোথায় পড়েছে?

রোগী লোকেশনটা সুন্দর করে আমাকে বলে দিলেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম

– জায়গাটার নাম রাজনীতির মোর হলো কেমনে?

– কয়েক বছর আগে ঐ রাস্তার মোরটাতে বড় রকম একটা মারামারি হয়েছিলো। তারপর থেকেই ঐ জায়গাটার নাম হয়েছে রাজনীতির মোর।

– তা হলে তো হবে মারামারির মোর, রাজনীতির মোর হলো কেমনে?

লোকটা হেসে দিয়ে বললেন, “রাজনীতি মানেই তো মারামারি।”

২০ ডিসেম্বর ২০২৫ খ্রি.

#villagelife#story#memory

(ছবি: গল্পটা পড়ে এ আই chatGPT এই কাল্পনিক ছবিটি এঁকে দিয়েছে)

chhoto-kakkur-election

Chhoto Kakkur Election

ছোট কাক্কুর ইলেকশন

ডাঃ সাদেকুল ইস্লমা তালুকদার
ছোট কাক্কু, মানে আমার ছোট চাচা, বাবার চাচাতো ভাই, মরহুম আব্দুস সালাম তালুকদার। তিনি কালিয়া ইউনিয়ন কাউন্সিলের সেক্রেটারির চাকরি করতেন। এজন্য সালাম সেক্রেটারি নামে পরিচিত ছিলেন । এটা একটা সরকারি চাকরি। ভালই ছিলো এই চাকরি। বাড়ী থেকেই সাইকেল নিয়ে অফিসে যেতেন। হাটের দিনে কচুয়া ও বড় চওনা হাটে ঔষধ বিক্রি করতেন। যেমন সুন্দর ছিল তার চেহারা তেমনই সুন্দর ছিল তার ব্যবহার। তিনি বেশ ধার্মিক ছিলেন। ঈদের মাঠে ছোট খাটো বয়ান দিতে শুনেছি। তবে খুব ভালো বক্তা ছিলেন না। তাকে আমি রাজনীতি করতে দেখিনি। তবে রাজনৈতিক সচেতন ছিলেন। ১৯৬৫ সনের পাকিস্তান-ভারতের যুদ্ধের সংবাদ রেডিওতে শুনে আমার বাবা চাচাদের সাথে গল্প করতে শুনেছি। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও তিনি রেডিওতে মুক্তিযোদ্ধাদের কোন বিজয়ের কথা শুনলে চাচাদেরকে নিয়ে উল্লসিত হতেন। স্বাধীন হওয়ার পর বড় চওনা মাঠে যখন কাদের সিদ্দিকীকে গণ সম্বর্ধনা দেয়া হয় সেই সমাবেশে তাকে মোনাজাত পরিচালনা করতে দেখেছি। এলাকার কোন সালিশ বিচারে তাকে দেখিনি। চাকরি করতেন, ব্যবসা করতেন, জমি আবাদ করাতেন, সন্তানদেরকে স্কুল কলেজে পড়াতেন এবং শুখে শান্তিতেই থাকতেন গ্রামে। তিনি আমার একজন ভালো অভিভাবক ছিলেন।

১৯৮৩ সনে আমি যখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস থার্ড ইয়ারে পড়ি তখনকার ঘটনা। রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের শাসন আমলে। কালিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন বড় চওনার জামাল হোসেন সাহেব। অর্থাৎ সালাম কাক্কুর অফিসের  চেয়ারম্যান । আমাদের ইউনিয়ন মানে চোট কাক্কুর ইউনিয়ন কাকরাজান। ছোট কাক্কুর মাথায় চাপলো চেয়ারম্যান হবেন। চেয়ারম্যানের অধীন চাকরি করবেন না। তার অধীনেই আরেক সেক্রেটারি সাহেব চাকরি করবেন। কাক্কু কোন দিন ইলেকশন করবেন আমি কল্পনাও করতে পারিনি। কাকরাজান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে লাঙল মার্কায় কাক্কু ইলেকশনে দাঁড়ায়েছেন শুনে আমি স্তম্ভিত হলাম। লাঙল ছিল এরশাদ সাহেবের জাতীয় পার্টির মার্কা। মনে হলো কাক্কু এই সরকারকে ভালোবাসেন অথবা পাবলিক ভালো বাসে বলে লাংগলে ভোট দিবে ভেবে কাক্কু এই কাজ করেছেন। শুনলাম সবাই কাক্কুর জন্য মরিয়া হয়ে ইলেকশনের ক্যাম্পেইন করছে। আমি কি কাক্কুর জন্য কিছু না করে থাকতে পারি? মেডিকেলের প্রচুর পড়ার চাপ উপেক্ষা করে বাড়ী চলে গেলাম কাক্কুর জন্য কিছু করতে।

দেখলাম ইলেকশন করার জন্য কাক্কু বেশ সংগঠিত। মাওলানা সালাউদ্দিন দুলাভাই নির্বাচন পরিচালনা করছেন। খাওয়া দাওয়ার দায়িত্বে হাফিজ দুলাভাই। মিয়া কাক্কুকে দেয়া হয়েছে রান্না বান্না ও বিড়ি বিতরনের দায়িত্বে। আমাকে একটা দায়িত্ব দিতে অনুরোধ করলাম। সালাউদ্দিন দুলাভাই বললেন “তুমি বাড়ীতেই থাকবে। বসে বসে পড়বে। সকাল ও সন্ধায় মেহমানদের বসতে দিবে।”

ঐবছর আরো যারা ইলেকশনে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের মধ্যে কয়েকজনের নাম আমার মনে আছে। ইন্দ্রজানীর সামসুল হক পান্না মামা গরুর গাড়ী মার্কা, সরিষা আটার আবুবকর সিদ্দিক খেজুর গাছ মার্কা, ছোট চওনার শওকত ডাক্তার আনারস মার্কা। সকাল বেলা বিভিন্ন গ্রাম থেকে লোকজন আসতেন ক্যাম্পেইনে যাওয়ার জন্য। আমি বাংলাঘরে পাটি বিছিয়ে বসতে দিতাম। ডিসেম্বর মাস ছিল সেটা। সকাল বেলা গরম ভাতের সাথে মাসের ডাল দিয়ে পেট ভরে ভাত খেতেন কর্মিরা। নয়টা-দশটার দিকে কুয়াশা কেটে মিষ্টি রোদ ওঠে যেতো। কর্মিরা গায়ের চাদর ও সুয়েটার খুলে কোমড়ে বেধে তার নিচে বিড়ির বান্ডিল বেধে চলে যেতো বিভিন্ন গ্রামে। সন্ধার সময় একে একে ফিরে আসতে থাকতো কর্মিরা। আমি পাটি বিছিয়ে বসতে দিতাম কর্মি ভাইদেরকে। একপাশে বোকার মতো বসে কর্মিবাহিনী ভাইদের আলাপ শুনতাম। উপভোগ করার মতো সেই আলাপ। তাদের সংলাপগুলি ছিল এরকমঃ
– আমি গেছিলাম বইলারপুর গ্রামে। সেখানকার সবাই ভোট দিবে লাংগলে। কয়েক বান্ডিল বিড়ি নিয়ে গেছিলাম। মুহুর্তেই শেষ। বিড়ি না দিয়া কি কারো সাথে ভোটের আলাপ করা যায়?
– আমি গেছিলাম গড়বাড়ী। সেখানকার সবাই ভোট দিবে তালুকদার সাবকে। আমারো একই কথা। নিমিষেই বিড়ির সব বান্ডিল শেষ। কি আর করি। নিজের টাকায় আরো ৫ বান্ডিল বিড়ি কিনে ভোটারদের দিয়ে ভোট চেয়েছি। ভোটাররাও খাচ্চর আছে। একটা নিয়ে কানে বাজিয়ে রাখবে আরেকটা ধরিয়ে টানতে টানতে যাবে। তবে তাদের ভাব দেখে মনে হয় সবাই লাংগলেই ভোট দিবে।
– আরে শুনুন, আমি গেছিলাম ভুয়াইদ। সেখানে তো কাক্কুর মামুর বাড়ী। কাক্কুর মামুই ১১ জন। তাদের গুষ্টির সবাই যদি ভোট দেয় কাক্কু তো এমনি উঠে যায়। তবে সেখানে অল্প বিড়ি নিয়ে গিয়ে ভুল করেছি। তারা বলছে যে ভাইগ্নার জন্য আমাদের ভোট চাইতে হয়। আমাদের কাছে কিছু বিড়ি বেশী রাখা দরকার।

কেউ কেউ আমার কানে কানে বলছিলঃ
-যারা এরকম চাপাবাজি করছে তারা আসলে চোর। কাক্কুর বিড়ি নিয়ে গিয়ে অন্য ক্যান্ডিডেটের কর্মীর কাছে সস্তায় বিক্রি করে দিয়ে এসে এখানে গল্প করছে চাচাকে ফুলানোর জন্য।
– ভোট দিবে সবাই ইন্দারজানীর সামসুরে গরুর গাড়ী মার্কায়। তার কথা মুখে কেউ বলে না। কোন রকম মার্কা বা পোষ্টার ছাপায়নি। তার কর্মিও নাই। একাই বিভিন্ন গ্রামে চাদর গায় দিয়ে ঘুরে আর বলে “চাচা, ইলেকশনে খারাইছি। দেশের ভালো চাইলে একটা ভোট দিয়েন। মার্কাটা গরুর গাড়ী। কোছে বিড়ি থাকলে একটা দেন খাই।“

লাংগলসহ অন্যান্য ক্যান্ডিডেট যেখানে বিড়ি ও পোস্টার বিলিয়ে ভোট চাইছে কর্মি বাহিনী দিয়ে সেখানে পান্না মামা খালি হাতে একা ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছেন। নিজে তো বিড়ি দিচ্ছেন না। উলটা তিনি অন্য ক্যান্ডিডেটের দেয়া বিড়ি নিয়ে খাচ্ছেন।

কেউ কেউ আমাকে জানালেন “তালুকদার সাহেব রাজনীতি জানেন না। তার টাকাগুলি খসানোর জন্য তাকে অনেকে কুবুদ্ধি দিয়েছেন। দুনিয়াটা এত সোজা মানুষের জন্য না। চাকরি ত গেলোই টাকা পয়সাগুলিও শেষ করবেন ইলেকশনে খরচ করে। টাউটদের পকেটভারি হচ্ছে।

রাত নয়টার দিকে ঘর ভরে যেতো কর্মি বাহিনীতে। তাদের মন্তব্য শুনতাম বসে বসে। একেকজন একেকভাবে চাপা মারতো। আর আমি একেকবার একেকজনের মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে শুনতাম। হাফিজ দুলাভাই নেতার মতো মাঝখানে দাঁড়িয়ে শুনতেন। তিনি মিটি মিটি হাসতেন সামনের দুই দাতের আগা বের করে গালে টোল ফেলে। কর্মিদের কথা শেষ হলে হাফিজ দুলাভাই বিজ্ঞের মতো আংগুল খারা  করে বলতেন “শুনুন, আপনারা চুপ করুন, আমার কথা শুনুন। তেলধারা গ্রামে এত ভোট। সেখানে পুরুষ ভোট এতো। মহিলাভোট এতো। কাক্কু পাবে এতো ভোট। নাইন্দা ভাংগা গ্রামে এত ভোট। কাক্কু পাবে তার ৯০ ভাগ। অমুক গ্রামে এত ভোটের মধ্যে কাক্কু প্রায় সব ভোট পাবেন। কাজেই সব গ্রামের ভোট হিসাব করে দেখা গেলো যে কাক্কু বিপুল ভোটে বিজয়ী। দেন খাবার।” সবাই সমস্বরে বলে উঠতো “দেন খাবার। দেন খাবার।” আমি প্লেট ভর্তি আমন ধানের ভাত দিতাম। কাপাভর্তি করে মাস কয়ালাইর ডাইল দিতাম। পেট ভর্তি করে খেয়ে ডিগডিগি চলে যেতো কর্মিরা। আবার চলে আসতো সকালে। পেট ভরে খেয়ে বিড়ি নিয়ে চলে যেতো গ্রামে গ্রামে।

তখন ছিল ডিসেম্বর মাস, শীত কাল। আমন ধান কাটা হয়ে গেছে। গ্রামের লোকের কোন কাজ ছিল না তখন। ইলেকশন আসাতে একটা উৎসব উৎসব ভাব সবার মনে। ছাত্রদেরও পরীক্ষা শেষ হয়েছিল। সবাই ইলেকশন নিয়ে মেতে উঠেছিল। একদিন সকালে দেখলাম এক গ্রামের একজন প্রভাবশালী কাক্কুর বাড়ীতে এসেছেন। উঠানে চেয়ার পেতে বসেছিলেন রোদে। দেখলাম ছোট কাক্কু তার হাত ধরে ফুঁফিয়ে কাঁদছেন। আমার কাছে ব্যাপারটা বেখাপ্পা মনে হচ্ছিল। কাকরাজান ইউনিয়নে এমন কোন ব্যাটা নাই যে তার হাতে ধরে তালুকদারদের কাঁদতে হবে। আমি একজনকে জিজ্ঞেস করলাম “ব্যাপারটা কি?” তিনি আমাকে বুঝালেন “ইনি তার এলাকায় প্রভাবশালী। তার কথায় সবাই ভোট দিবেন। অথচ ছোট কাক্কু ইলেকশনে দাঁড়িয়ে তার সাথে দেখাও করেননি, কথাও বলেননি। তিনি বিদ্রোহী হয়ে অন্যজনের জন্য ভোটের ক্যানভাস করছেন। তাই, তার হাত ধরে কাক্কু কান্নার অভিনয় করছেন। ইলেকশনটা শেষ হোক। তারপর দেখা যাবে কে কার হাত ধরে কাঁদেন।” আরেক রাতে অন্য পাড়ার একজন লিডার এলেন সবাইকে নিয়ে। পাড়ার লিডার তালুকদারদের দেখে রাস্তা চেড়ে দিতেন। তাকে দেখে মনে হলো বেশ প্রভাবশালী। কিছু একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে বলে মনে হলো। আমি আগ্রহ নিয়ে বসলাম। মিয়া কাক্কু, ছোট কাক্কুর বড়জন, আবুল কাশেম তালুকদার, মাদবর শুরু করলেন “আমরা এখন একটা বিরাট কাজ হাতে নিয়েছি। আমাদের এই এলাকা থেকে কোন চেয়ারম্যান নির্বাচন না করাতে এলাকার কোন উন্নয়ন হয় নাই। এবার আব্দুস সালাম ইলেকশনে দাঁড়িয়েছে। সবাই সতস্ফুর্তভাবে তারজন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। ইনশাল্লাহ, আমাদের বিজয় হবেই। তোমার মতন” বলার সাথে সাথে পাড়ার লিডার ক্ষেপে গিয়ে বললেন “এই মোতনের মধেই দোষ। আপনাদের এই মোতনের মধেই দোষ। আমাদেরকে আপনারা মানুষই মনে করেন না। কিছু হলেই বলেন তোমার মোতন অমুক। আমরাও মানুষ। আমাদের মানুষ বলে মনে করবেন। আমি এইজন্যই আপনাদের বাড়ী আসতে চাইনি। থাকুন আপনাদের তালুকদারি নিয়ে।” সাথে আশা অনেকে তাকে বুঝিয়ে শান্ত করলেন। বুঝালেন “তালুকদার সাব কি বলতে চেয়েছিলেন আমরা শুনি।” মিয়া কাক্কু বললেন “আমি যা বলতে চেয়েছিলাম তা তুমি না শুনেই রাগ করা শুরু করলা। আমি বলতে চেয়েছিলাম তোমার মতোন অমুক আর আমার মতোন কাশেম যদি এক থাকি তাহলে আমাদের সাথে কেউ পারবে না।” সবাই বললেন “তালুকদার সাব ঠিক কথাটাই কইছে। আমাদের কথা অইল তারা আমাদের যত বিড়ি আর টাকা পয়সা দেইক না কেন আমরা ভোট দিব তালুকদার সাবকেই।” আমি কানে কানে জানতে পারলাম অন্য ক্যান্ডিডেটের দেয়া বিড়ি ও টাকা পেয়ে এই মাদবর লাঙল বাদ দিয়ে অন্য ক্যানভাস করছিলেন। তাই, এই ব্যবস্থা। আসলে মিয়া কাক্কু প্রথমে তাকে তিরস্কার করতেই চেয়েছিলেন। অবস্থা বেগতিক দেখে সুর পালটিয়ে তোমার মোতনের সাথে আমার মোতন লাগিয়ে দিয়েছেন। আমার মোতন সাদেকেরও বুঝতে অসুবিধা হলো না যে ইলেকশনের পর চাচায় যে তারে কি করে!

কাক্কু এবার চেয়ারম্যান হবেন। সবার মধ্যে আনন্দ আনন্দ ভাব ছিল। বাড়িতে অনেক নায়রী এসেছিল। কাক্কুর শশুর বাড়ির সবাই এসেছিল। আসাদুজ্জামান মুকুল তালুকদার ও আনোয়ার হোসেন কায়সার তালুকদার কাক্কুর ছেলে। আরেক ছেলে আক্তার তালুকদার তখন ছোট ছিল। মুকুল ও কায়সার মিছিলে অংশগ্রহণ করতো। আক্তারের খেলার বয়স ছিল । সে ইলেকশন বুঝত না। মুকুলের মামাদের টেলিভিশন এনেছিল এই বাড়ীতে। যাদের কাজ নেই তারা উঠানে পাটিতে বসে টিভি দেখতো সারাক্ষণ । সাদাকালো টিভির যুগ ছিলো তখন। লম্বা বাঁশের আগায় এন্টিনা বেঁধে টিভি দেখা হতো। ঢাকা ও ময়মনসিংহ থেকে টিভি সিগনাল আসতো প্রায় ১০০ কিলো মিটার দূর থেকে। তাই ছবি ঝিরঝির করতো। বাতাসে একটু নড়ে গেলে ছবি চলে যেতো। বাইরে গিয়ে একজনে বাঁশ ঘুরিয়ে বলতো

-ছবি আইছে?
– আইছে। পরিষ্কার না। আরেকটু ঘুরাও। এখন আইছে। এই গেছে গা। এখন আবার আইছে। থাউক। এইভাবেই থাউক। নড়াইও না।

অবশেষে সেই প্রতিক্ষিত ইলেকশনের দিন এলো। সেদিন বাড়ীতে কোন কাজ ছিল না। মাওলানা সালাউদ্দিন দুলাভাই সবাইকে ডিউটি দিয়ে পাঠালেন বিভিন্ন কেন্দ্রে। আমাকে পাঠালেন সবচেয়ে দূরের কেন্দ্র চকপাড়ায়। আমাকে কেন এত দূরে পাঠালেন এনিয়ে আমি অনেক চিন্তা করে একটা কারন খুজে পেয়েছি। আমি ছিলাম তেমন কাজের না, তাই। চকপাড়া কেন্দ্রের ভোট পাওয়ার কথা সরিষা আটার ক্যান্ডিডেট আবুবকর সাহেব, খেজুরগাছ মার্কা। এখানে ইম্পোর্টেন্ট লোক পাঠিয়ে লাভ নেই। কিছু বিড়ির বান্ডিল নিয়ে আমি নাস্তা করে চলে গেলাম চকপাড়া কেন্দ্রে। অনেকদিন হয় শহরে থাকি। হাটা হয় না তেমন। বাড়ী থেকে হেটে চকপাড়া কেন্দ্রে যেতে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। দুলাভাইর প্রতি খুব মনোক্ষুণ্ণ হয়েছিলাম। এতো কষ্ট আমায় দিলেন! যাহোক কেন্দ্রে পৌঁছে একটা বেডশীট বিছিয়ে বসে পড়লাম বিড়ির দোকান্দারের মতো। সবার মুখে শুধু খেজুর গাছ। সবার হাতের কাগজে খেজুরগাছের ছবি । আমার দিকে এসে লাঙল মার্কা দেখে ফিরে যায়। কেউ কেউ বলে “লাঙল মার্কা ক্যান্ডিডেটকে তো কোন দিন দেখলামই না। এইটা সালাম সেক্রেটারির মার্কা। ইনি আবার সেক্রেটারিগিরি বাদ দিয়ে চেয়ারম্যান হতে চায় কেন?”

আমার বিড়ি নিতে কেউ আসে না। নিজেকে অসহায় মনে হলো। অনেকে দূর থেকে তাকায় আমার দিকে। আমি ফিরে যেতে মনস্থির করলাম। কিন্তু এতগুলি বিড়ি কি করবো? এমন সময় জিতেশ্বরির এক কাক্কু এলেন। নাম বললাম না । তিনি কিছুক্ষণ আমার সাথে বসে উঠে গিয়ে একজন উপজাতী ভাইকে নিয়ে এলেন। বললেন “কাক্কু, ওকে কয়েক প্যাকেট বিড়ি দিন। ও লাংগলে ভোট দিবে।” এভাবে একজন একজন করে কয়েকজনকে নিয়ে এসে মাটি হাতে নিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে বিড়ি দিলেন লাংগল মার্কায় ভোট দেয়ার জন্য। আমি বললাম “কাক্কু, মাটি হাতে নিয়ে কিরা করার দরকার নাই। এমনি বিশ্বাস করে দেন। ভোট দিলে দিবে না দিলে না দিবে। গরীব মানুষ এমনি দিয়ে দেন।” কিছুক্ষণ পর সব বিড়ি শেষ হয়ে গেলো। আমিও হাল্কা হয়ে বেঁচে গেলাম। বাড়ীর দিকে পথ ধরলাম। রাস্তা দিয়ে যাই লোকে বলাবলি করে যে যাই বলুক পাশ করবে গরুর গাড়ী। সবারটা খেয়ে ভোট দিবে সামসুরে। আমি উচ্চস্বরে বলি “লাঙল, লাঙল, যাবেই যাবে, লাংগল।” ছোট চওনা কেন্দ্রে গিয়ে দেখি আমাদের বাড়ীর সবাই উৎসবে মেতেছে। অযথা আমাকে পাঠিয়েছেন চকপাড়ায়। দুলাভাইর প্রতি আরেকবার রাগ হলো। মুকুল ও কায়সার এখানেই ছিল। চাচার নির্ঘাত পরাজয় ভেবে কেন্দ্র ত্যাগ করলাম। কিছুক্ষণ পর মুকুলও কেন্দ্র ত্যাগ করলো। ভোট গণনা অর্ধেক হলে কায়সারও কেন্দ্র ত্যাগ করে চলে এলো। জিতেশ্বরি পর্যন্ত এলে একদল কিশোর জিজ্ঞেস করলো “কায়সার ভাই, খবর কি?” কায়সার ফাল দিয়ে বলে উঠলো “উইঠা গেছি।” কিশোরের দল খুশীতে আত্বহারা হয়ে কায়সারকে কাঁধে নিয়ে নাচতে লাগলো আর স্লোগান দিল “উইঠা গেছে, লাংগল। উইঠা গেছে, লাংগল।” অবস্থা বেগতিক দেখে কায়সার বলে দিলো “এই পোলাপান উঠি নাই। মিছা কথা।” শুনে কিশোরের দল থেকনা দিয়ে কায়সারকে কাঁধ থেকে ছেড়ে দিলো।” এই ঘটনাটুকু আমি স্বচক্ষে দেখেনি । কায়সার পরে আমাদেরকে বঘটনার বর্ণনা করেছে । তবে কত জোড়ে থেকনা দিয়েছে তা আমি কল্পনা করতে পারি।

ইলেকশনের পরেরদিন শুনলাম গরুর গাড়ী মার্কা সামসুল হক পান্না মামা বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। ইলেকশনে কোনরূপ কারচুপি হয়নি। জনগণ স্বাধীনভাবে বিড়ি খেয়েছে, স্বাধীনভাবে টাকা খেয়েছে, স্বাধীনভাবে ক্যানভাস করেছে আর স্বাধীনভাবে চুপি চুপি কর্মীবিহীন ও পোস্টারবিহীন সামসুল হক পান্নাকে ভোট দিয়েছে। একেই বলা হয় ফেয়ার ইলেকশন। ছোট কাক্কু যতই ভালো মানুষ হউন না কেনো তাকে চেয়ারম্যান হিসাবে ভোটাররা পছন্দ করেননি। নয়-মামাদের গ্রাম থেকে নয়টি ভোটও পাননি। আমার চকপাড়ার কেন্দ্রে যারা মাটি হাতে কিরা খেয়ে বিড়ি নিয়েছিল তারাও ভোট দেয়নি হিসাব করে দেখেছি। আচ্ছা, আপনিই বলুন, আমি যে এতো ভালো এবং আপনাদের প্রিয় মানুষ, গ্রামের মেম্বার পদে ইলেকশন করলে কি আমাকে কেউ আপনারা ভোট দেবেন? কাজেই, যার জন্য যে কাজ মানায়। ছোট কাক্কুর চেয়ারম্যানে ইলেকশন করা ঠিক হয়নি। তিনি সেক্রেটারি হিসাবেই ভালো ছিলেন। শুধু শুধু সরকারি চাকরিটি হারালেন। এই ইলেকশনে তিনি হারিয়েছিলেন বানিয়াসিটের জমিটি, জিতাশ্বরি বাইদের জমিটি, কয়েকশ মন আমন ধান ও মাস কালাইর ডাইল।

ইলেকশনের পরদিন আমি সকাল ৯টার দিকে ছোট কাক্কুর বাড়ীতে গেলাম। মিয়া কাক্কু বিছানা থেকে ওঠেননি। ছোট কাক্কু উঠানে রান্না ঘরের দিকে মুখ করে মাথায় আলখেল্লা রেখে রোদ পোহাচ্ছিলেন। সাথে কেউ নেই। বিড়ি ও ডাইল খেকোরা কেউ নেই। শিশু কিশোর ও মহিলারা টেলিভিশন দেখার চেষ্টা করছে। ছোট কাক্কুর যে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়ে গেছে টেলিভিশন দর্শনার্থীদের বুঝার কথা না। আমি কাক্কুর কাছে গিয়ে শান্তনা দেয়ার চেষ্টা করলাম “কাক্কু, আপনি মন খারাপ করুন না যে, সব ঠিক হয়ে যাবে।” কাক্কু বললেন “আমরাই জিতেছি। আমি মন খারাপ করি নাই। আমাগো নাতী সামসু চেয়ারম্যান হওয়া মানে আমরাই চেয়ারম্যান হওয়া। আমি আমাদের গ্রামের জন্য যা করতে চেয়েছিলাম সামসুকে বললে তা করবে। তাই, বলি, আমরাই জিতেছি।” এদিকে টেলিভিশনে সিগনাল আসছিল না। কায়সার শত চেষ্টা করে এন্টিনা ঘুরিয়েও সিগনাল আনতে পারলো না। আমি বললাম “পিছনের জ্যাকটা চেক করো। জ্যাক লুজ হয়ে যেতে পারে।” কায়সার একবার জ্যাক লাগায়, একবার খুলে। টেলিভিশনে ছেৎ  ছেৎ  শব্দ করে। ঝিরঝির করে। ছবি আসে না। ছোট কাক্কু বিরক্ত হয়ে বললেন “থো রে। বাদ দে তরা টেলিভিশন দেখা। তোর মামুর টেলিভিশন, আর আমার ইলেকশন, একই রকম।” আমি হাসি চেপে রাখতে না পেরে বাব্বুর কাঠাল গাছের পিছনে গিয়ে দাড়ালাম। গাছে কটা (কাঠ বিড়ালী) লাফালাফি করছিল। দেখতে ভালোই লাগছিল। কিছুক্ষণ একা একা হেসে নিলাম কাঠাল কাছটার পিছনে দাঁড়িয়ে ।

আমি চলে এলাম ময়মনসিংহ। এদিকে ছোট কাক্কু চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েন। যোগ দেন শিক্ষকতায়। তিনি নিজগ্রাম জিতেশ্বরী পাড়ায় প্রতিষ্ঠিত রশিদিয়া দাখিল মাদ্রাসায় আজীবন শিক্ষকতা করেন। ১৯৮৩ সনের সেই ইলেকশন থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৬ টি বছর কেটে গেছে। কতরকম ইলেকশন আসে যায়। ইলেকশন আসলে কাক্কুর ইলেকশনের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে কাক্কুর কালজয়ী উক্তি “থোরে, তর মামুর টেলিভিশন, আর আমার ইলেকশন, একই রকম।” সেই সামসুল হক পান্না মামা এরপর ৪ বার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ১৯৮৩, ১৯৮৮, ১৯৯৫ ও ২০১১ সনের নির্বাচনে। ২ বার ফেল করলেও সেকেন্ড হন। কোন রকম পোষ্টার, লিফলেট ও মিছিল ছাড়াই। যে সময় তিনি চেয়ারম্যান থাকতেন না সেসময় তিনি ময়মনসিংহে মাঝে মাঝে রোগী নিয়ে আসতেন আমার চেম্বারে। না আসতে পারলে চিঠি লিখে রোগী পাঠাতেন আমার কাছে। এলাকায় হেলথ ক্যাম্প করে রোগী সেবা করতেন। শুনেছি তার এলাকায় বেপক উন্নয়ন করেছেন। ওদিকে আমার তেমন যাওয়া হয় না। তিনি আমাদের গ্রামের মাদ্রাসা, ব্রিজ ও কালভার্ট করে দিয়েছেন সরকারি অনুদানে।

সামসু চেয়ারম্যান মামা বেশ সাহসী মানুষ। তিনি একবার রাত ১২ টার পর আমাদের ময়মনসিংহের বাসায় এলেন। সাথে ছিল তার মোটর বাইক চালক। তিনি এসেছিলেন আমার কাছে পরামর্শ নিতে গড়বাড়িতে একটা হেলথ ক্যাম্প করার ব্যাপারে। রাত একটার সময় চলে যেতে চাইলে আমি বাসায় থাকতে বললাম। তিনি রাজী হলেন না। আমি বললাম “এতো রাতে রাস্তায় বেরোনো রিস্ক আছে। আমার জানামতে আপনার অনেক শত্রু আছে।” তিনি বললেন “আমি এখন ময়মনসিংহ থেকে ইন্দ্রজানী যাবো। এমন কোন বাপের ব্যাটা নাই যে আমার সামনে খারাবে।” মামা চলেই গেলেন।

আরেকদিন মামাকে চোখ অপারেশন করানোর জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পেইং বেড ওয়ার্ডে ভর্তি করালাম। কোন কিছু লাগলে বা কোন কিছুর অসুবিধা হলে সিস্টারকে জানানোর জন্য বলে দিলাম। তিনি এক কান্ড করে বসলেন। তার বেডে  উপরের ফ্যানটা ধীরে ধীরে ঘুরতো। তিনি সিস্টারের রুমে গিয়ে বললেন “সিস্টার, আমার বেডের ফ্যানটা এখনি ঠিক করে দেন।” সিস্টার কর্ণপাত না করায় তিনি বললেন “সিস্টার, আমার  ফ্যানটা খুলে এনে আপনার রুমে লাগান। আর আপনারটা খুলে এনে আমার বেডের উপর লাগান।” সিস্টার কর্নপাত না করাতে তিনি ক্ষেপে গিয়ে বলেন “যদি না পারেন, তবে যে পারেন তাকে পাঠান আমার কাছে।” সিস্টার নার্সদের সেক্রেটারিকে ডেকে আনেন বিচার দিতে। সেক্রেটারি এসে বললেন “কি হয়েছে? আপনি আমাদের সিস্টারকে কি বলেছেন?” মামা বললেন

-আপনি কে?
– আমি নার্সেস এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি।
– ভালোই হলো। সেক্রেটারি সাহেব, দয়া করে আমার ফ্যানটি খুলে নিয়ে আপনার নার্সের রুমে লাগান আর নার্সেরটা আমার উপর লাগান।
– আপনি কে?
– আমি রোগী।
– আপনার পরিচয়?
– পরিচয় পরে হবে। আগে ফ্যান লাগান। গরমে আমার মাথা গরম এখন।

নার্সারা কথা না বাড়িয়ে ইলেক্ট্রিশিয়ান ডেকে ফ্যান বদলিয়ে দিলেন। কেউ আর মামার পরিচয় জানার সাহস পেলো না।
আমাদের তালুকদার বাড়ীর অনেকেই এখন শহরে থাকি। নাড়ির টানে বাড়ী যেতে হয়। আমাদের অনেকেরই প্রাইভেট কার আছে। আমাদের গ্রামের রাস্তাঘাট একদম খারাপ। তাই কার নিয়ে যাওয়া খুবই বিপদের। কাক্কুর ইলেকশনের পর আর কেউ আমাদের গ্রাম থেকে ইলেকশন করেনি। আমাদের একজন চেয়ারম্যান থাকলে হয়তো এতো দুর্গতি হতো না। ছোট চওনার হাজী বাড়ীর রফিক ঘন ঘন রোগী নিয়ে আমার চেম্বারে আসতো। আমি বুঝতে পারলাম এটাও নেতা হওয়ার চেষ্টায় আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম
– হাজী বাড়ীর সমসের হাজী ১৫ বছর চেয়ারম্যানি করেছিলেন। তার ছেলে শওকত ডাক্তারও ৫ বছর চেয়ারম্যান ছিলেন। এখন ঐ বাড়ীর নেতা কে?
– ধরতে পারেন, আমিই। আমিই কিছু কিছু জনসেবা করে থাকি।
– খুব ভালো। চেয়ারম্যান হয়ে আমাদের গ্রামের রাস্তাঘাট গুলা পাকা করবা।

খোদার কি কাম। সেই হবু চেয়ারম্যান স্ট্রোক করে প্যারালাইসিস হয়ে গেছে। হুস জ্ঞান তেমন নাই। তালুকদার বাড়ীতে এই লাইনে আর কেউ আসেনি। চাচাতো ভাইয়ের এক ছেলে বিরোধী দল করে বার বার জেলে যাচ্ছে। আরেক চাচাতো ভাইয়ের ছেলে মামুন তালুকদার এখন রাজধানীতে থেকে পড়াশুনা করে ছাত্রনেতা হয়েছে সরকারি দলের। বড় বড় নেতাদের সাথে ঘুরাফিরা করছে। ভবিষ্যৎ ভালো বলে মনে হচ্ছে। দোয়া করি চেয়ারম্যান না, এম পি মন্ত্রী যেনো হয়। বাড়ীতে যেনো ভালো ভাবে যেতে পারি। ছোট কাক্কুর ইচ্ছা পুরন হউক।

১৮/১/২০১৯ খ্রি.
ময়মনসিংহ -ঢাকা -ময়মনসিংহ জার্নি

(এ আই নির্মিত কাল্পনিক ছবি । সহায়তায়ঃ chatGPT)

indrajani

Indrajani

ইন্দ্রজানী
(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ইন্দ্রজানীকে আমরা ইন্দাজানী বলতাম। ইন্দাজানীতে তেমন কিছুই ছিল না। ইন্দাজানীর হাট ছাড়া এটার তেমন গুরুত্ব ছিল না। ছিল না কোন হাই স্কুল, ছিল না কোন গোলাঘর (দোকানঘর)। এখানে বর্ষাকালে অস্থায়ী হাট বসতো প্রতি মঙ্গলবারে। এটা বসতো পাহাড় ও ভরের সংযোগস্থলে। পাহাড়ের পর নিচু সমতলভুমিকে আমরা ভর অঞ্চল বলতাম। ভরের বড় বড় মহাজন বড় বড় নৌকা নিয়ে আসতেন দামী দামী মালামাল নিয়ে। ক্রেতারা আসতেন ছোট ছোট নৌকা নিয়ে সদাই করতে (কেনাকাটা করতে)। পাহাড়ের ব্যবসায়ীরা মাল নিয়ে যেতেন গুরুর গাড়ী করে। পাহাড়ের বাইদে (নিচু ভুমি) প্রচুর পাট চাষ হতো। পাহাড় থেকে রফতানি হতো পাট, কাঠাল, সবজি, লাকড়ি ইত্যাদি। ভৌরা ব্যবসায়ীরা নিয়ে আসতেন সিলভারের পাক পাতিল, নারিকেল, ইলিশ, কাপড়-চোপড় ও অন্যান্য শহর থেকে আনা দামী দামী জিনিষপত্র। নারায়ণগঞ্জ-এর ব্যবসায়ীরা নদী পথে এসে এখান থেকে পাট ও কাঠ নিয়ে যেতেন। ভর অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা বরিশাল অঞ্চল থেকে নারিকেল নিয়ে এসে এই হাটে বিক্রি করতেন। এলেংগার পাইত্তাগণ(পাটির কারিগর) তাদের হাতে বুনুনো পাটি এখানে এনে বিক্রি করতেন। বল্লার ও কালিহাতির তাতী, কুমার ও কামারগণ তাদের হাতের তৈরি কাপড়, মাটির পাতিল ও দা, বটি, কোদাল, খোন্তা এখানে এনে বিক্রি করতেন। ভুয়াপুর ও গোপালপুর থেকে আসতো আখ বা কুশাইর । বর্ষাকাল ছাড়া আমরা ইলিশমাছ পেতাম না। বাবা পাট বিক্রি করে ইয়া বড় বড় ইলিশ মাছ কিনে আনতেন ইন্দাজানী হাট থেকে। আস্ত ইলিশ ও নোনা ইলিশ দুই প্রকারই আনতেন। মা আস্ত ইলিশ  বড় বড় ডাটা দিয়ে রান্না করতেন। নোনা ইলিশ বড় বড় কাচের বৈয়ামে সংরক্ষণ করে রাখতেন। পরে শিবচরন (চিচিংগা) দিয়ে ভাজি করতেন। বাবা আমাদের জন্য মোটা মোটা কুশাইর আনতেন। কুশাইরের দুইদিকে ইলিশ ও সদাই ঝুলিয়ে কাঁধে নিয়ে আসতেন। পদ্মপাতার টোবলায় (পেঁচানো প্যাকেট) টসটসে পেঁচানো জিলাপা (জিলাপি) এনে আমাদের হাতে দিতেন। আমরা সবাই ভাগ করে খেতাম। ইন্দাজানী হাটের জিলাপির স্বাদ আমি আর কোন জিলাপি খেয়ে পাই নি। মা-বাবাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করতাম। কিন্তু খেতেন না। আমি মনে করতাম মা-বাবারও জিলাপি খেতে মন চায়। কিন্তু বড় হয়ে যাওয়াতে খেতে লজ্জা পান। আমি বাবা হবার পর বুঝেছি তা হয়তো হতো না। আমাদের খাওয়াইয়া তারা জিলাপির স্বাদ পেতেন। সবাইকে বেশী দিয়ে আমি কম খেতাম।

কোথাও পাকা রাস্তা ছিল না। সস্তায় নৌকা যোগাযোগের ফলে এখানে প্রতি মঙ্গলবার পাহাড় ও ভরের মানুষদের একটা মিলন মেলা হতো। ভৌরাগণ হাটুরা নৌকায় ইন্দাজানী নেমে পায়ে হেটে পাহাড়ে তাদের আত্বীয়বাড়ী যেতেন। আর পাহাইড়াগণ পায়ে হেটে ইন্দাজানী হাটে গিয়ে হাটুরেদের সাথে নৌকাযোগে তাদের ভরের আত্বীয়স্বজনের বাড়ী যেতেন। সাথে নিয়ে যেতেন স্ব স্ব অঞ্চলের উৎপাদিত বিশেষ বিশেষ স্বস্য ও ইন্দাজানী হাটের জিলাপি। পদ্মপাতার প্যাকেট পেঁচানো হতো ছেতুকা দিয়ে (কলাগাছের খোলের আঁশ)।

এই যে এত স্বাদের জিলাপা ও এত দামী দামী জিনিস যে হাট থেকে আনা হয় একদিন সেই হাটে যাওয়ার বায়না ধরলাম বাবার কাছে। একটা কথা বলে রাখি। আমরা ভাইবোনরা ৫ জন। কখনো আমরা বাবাকে বলিনি যে “বাবা আমার জন্য এটা আনবেন সেটা আনবেন।” বলতে হতো না। না বলতেই তিনি তার স্বাধ্যমত জামাকাপড় ও খাওয়ার জিনিস কিনে আনতেন। বুর (বুবু/আপার) যখন বিয়ে হয় তখন আমি খুব ছোট ছিলাম। আমার নাতী তানভীরের সমান হয়তো ৪/৫ বছর। দুলাভাইর চেহারা ছিল আমাদের এলাকার সব দুলাভাইর চেয়ে সুন্দর। লিক লিকে লম্বা। সব সময় সাদা ফিট ফাট শার্ট পরতেন। দুলাভাইর বাড়ী ভর এলাকায় আমজানী গ্রামে। এই দুলাভাইও ইন্দাজানী হাট হয়ে আমাদের বাড়ী আসতেন আমাদের জন্য জিলাপা ও রসগজা নিয়ে। রস গজাও আমার খুব পছন্দের ছিল। দুলাভাই আসলেই মার নির্দেশে আমাদের পোষা সুন্দর মোরগটি তিন চাইর বাড়ী দৌড়িয়ে হয়রান করিয়ে যখন খেরের (খর) পালার গোড়ায় আশ্রয় নিত তখন ধরে ফেলতাম। আর ওটা উচ্চ স্বরে কঅক কঅঅক করতো তখন মনে মনে বলতাম ”কক কক করিস না, দুলাভাই এসেসে, তারজন্য এতদিন অপেক্ষা করছিলাম, আইজ তরে রান্না করে খামু। সারাবাড়ী বাসনা ( ঘ্রাণ) করবে।”

একবার বাবার সাথে ইন্দাজানী হাট দেখতে গেলাম। বড়বাইদপাড়া নাপিতের চালা, জিতাশ্বরি পাড়া, ছোট চওনা, ঘাট চওনা, ভুয়াইদ ও ভাতগড়া হয়ে যেতে হতো ইন্দাজানীর হাটে। আমাদের বড়বাইদ পাড়া থেকে ইন্দাজানী উত্তর -পশ্চিম দিকে, এই ৫/৬ কিলোমিটার পথ হবে। পায়ে হেটে যেতে হতো। ছোট চওনার পাহাড়ের পাদদেশে কয়েকটা ছোট ছোট ঝর্না ছিল। স্বচ্ছ পানি প্রবাহিত হতো। ওটা দেখলেই আমার পিপাসা হতো। আমি অঞ্জলি ভরে ঝর্নার পানি পান করতাম। ঝর্নার সাথেই ছিল চোরাবালি। একবার পাড়া দিলে কাঁধ পর্যন্ত ঢুকে আটকা পরতো যে কেউ। এক রাতে কয়েকজন আর্মি আসামী ধরে এই চোরাবালির নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। আসামীরা এই এলাকার হওয়াতে সব জানতেন। এখানে এসেই সব আসামী একযোগে গোলমাল করে চোরাবালি ঘুরে দৌড়িয়ে তেলধারার (তৈল ধারা) বনে পালিয়ে যান। আর্মিরা মসৃন বালি মনে করে সোজা চোরা বালির উপর দিয়ে দৌড় দেন আসামী ধরার জন্য। ফলে তিনজন আর্মি চোরাবালিতে আটকা পড়ে। বাকীরা তাদেরকে উদ্ধার করতে করতেই কর্ম শেষ।

যা বলছিলাম। ইন্দাজানীর রাস্তা একেক যায়গায় একেক রকম ছিল। জংগলের ভিতরকার রাস্তা কর্দমাক্ত ও পিচ্ছিল ছিল। বাইরের রাস্তা শুকনো হলেও বাইটাবাছ্রায় ভরা ছিল। সপ্তাহে মাত্র একদিন লোক যাতায়াত করাতে বাইটা বাছ্রার পরিমান বেড়ে যেতো। বাইটাবাছ্রার নাম যে প্রেমকাটা এটা আমার স্ত্রী স্বপ্নার কাছে শুনেছি। প্রথম যেদিন এসেছিল আমাদের বাড়ী সে শাড়ী থেকে বাইটা বাছ্রা বাছতে বাছতে বলছিল “তোমাদের পাহাড়ের রাস্তা প্রেম কাটায় ভর্তি। শাড়ী ভর্তি প্রেমকাটা। এগুলি বাছতে বাছতেই আমার ঘন্টা কেটে গেলো। ”
– প্রেমকাটা মানে?
– এইযে এইগুলি।
– এইগুলি তো বাইটাবাছ্রা।
– আমরা এগুলিকে প্রেমকাটা বলি।

যেসব মাঠ শুকনো এবং আবাদ করা হয়না সেগুলিতে এক প্রকার ঘাষ গজিয়ে মাঠ সবুজে ভরে যায়। এগুলিতে হাল্কা কাটাযুক্ত দানা হয়। পাড়িয়ে যাওয়ার সময় হাটুর নিচের কাপড়ে আটকে যায় এই কাটা। জার্নি শেষে এই কাটা বাছতে হয়। না বাছলে পায়ে কুটকুটি কামড়ায়। ছোট বেলা বাছ্রা ক্ষেতে শুয়ে থাকতে আমার ভাল লাগতো। বাচ্ছ্রা ক্ষেতের উপর দিয়ে ঢালুর দিকে গড়িয়ে পড়তে বেশ মজা পেতাম। স্কুল মাঠ থেকে আমরা দল বেঁধে মাঝে মাঝে বাইটাবাছ্রা তুলে পরিস্কার করতাম।

প্রথম ইন্দাজানীর হাটে গিয়ে একটু বেশী ভালোলেগেছিল এই কারনে যে এটা বড় চওনা ও কচুয়ার হাট থেকে বেশী জমজমাট ছিল। বাবা প্রথমেই আমাকে একটি রসগোল্লার দোকানে নিয়ে গিয়ে একটি টুলে বসিয়ে দোকানিকে বললেন আমাকে পেট ভরে রসগোল্লা খাওয়াতে। আমি ভাবলাম আজ পেট ভরে ১০/১২ টা রসগোল্লা খাব। দুইটি খাবার পরই পেটের তলার দিকে মোচড় দিয়ে উঠলো। বললাম “আর খেতে পারব না।” তারপর বাবার সাথে পরামর্শ করে একটা কাজ সেরে নিয়ে হাল্কা হলাম। বাবা আমাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ইন্দাজানী হাট দেখালেন। অনেক দোকান কিন্তু কোন গোলাঘর নেই। সব দোকানই অস্থায়ী। তাবু গেড়ে গেড়ে দোকানের স্থান করা হয়েছে। পশ্চিম-দক্ষিন দিকে ভর অঞ্চল থেকে আশা নৌকাগুলি সারিবদ্ধভাবে বাঁধা লগি গেড়ে অথবা নোংগর ফেলে। উত্তর -পুর্ব দিকে পাহাড় অঞ্চল থেকে গরুর গাড়ি, গাড়ীর বলদ, মহিষ ও ঘোড়া বেঁধে রাখা হয়েছে। তারা কেউ কেউ জাবর কাটছে, কেউ কেউ ভুষি ও কুড়া খাচ্ছে। হারমোনিয়ামের সুরে মুগ্ধ হয়ে গোলাকার সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো মানুষের কাতারে দাঁড়ালাম। মনমুগ্ধকর গান শুনলাম। গান শেষে ক্যানভাচার বনাজি ঔষধ বিক্রি করা শুরু করল। আমরা চলে গেলাম হাটের ভিতর। আবার ঘুরে ঘুরে বাকী হাটটুকু দেখলাম। বাবা ফ্রিভাবে কেনাকাটা করার জন্য বাবার পরিচিত একটা দোকানে আমাকে বসিয়ে চলে গেলেন হাটের ভিতর। এটা ছিল জামা কাপড়ের দোকান। দোকানে ঝুলানো শার্টের দিকে আমার চোখ পড়লো। ইতিপূর্বে আমি কোনদিন নিজে দেখে পছন্দ করে জামাকাপড় কিনি নি। বাবা যা কিনে আনতেন তাই পরেছি। তাই পছন্দ হয়েছে। এইবার সুযোগ এসেছে পছন্দ করে কেনার। স্থির করলাম এই আকাশী রঙের শার্টটা আমি কিনবো। বাবা বেগভর্তি বাজার কিনে এসে বললেন “চলো বাজান।” আমি কোন সাড়া দিলাম না। কয়েকবার ডাকলেন। সাড়া দিলাম না। হাতে ধরে টানলেন। মোরচামুর্চি করলাম। কিছু বললাম না। বাবা বললেন “বাজান, কি হয়েছে?” আমি আকাশী রঙের শার্টটি দেখিয়ে বললাম “এটা নিব।” এটা ভালো শার্ট না বাবা আমাকে বুঝানোর চেষ্টা করছিলেন। যতই চেষ্টা করছিনেন ততই নেয়ার জন্য আমার ইচ্ছাশক্তি বাড়ছিল। বর্গা হাট থেকে এর চেয়েও ভালো শার্ট কিনে দিবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দিলেন। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল। এক সময় তিনি আমাকে একটু বস বলে চলে গিয়ে কিছুক্ষণ পরেই ফিরে এলেন। আমি নতুন শার্ট গায়ে দিয়ে পুরাতন শার্ট বেগে ভরে ইন্দাজানী হাট থেকে ফিরলাম। বাবা কেন কিছুক্ষণের জন্য কোথাও গেলেন তা বড় হয়ে আমি বুঝতে পেরেছি। সেই থেকে এই পর্যন্ত যতবার এই কথা মনে করি ততবার আমি কষ্ট পাই এই মনে করে যে না বুঝতে পেরে আমি বাবাকে শার্ট কেনার জন্য কষ্ট দিয়েছি। বাজার করার আগে আমি শার্ট কেনার আবদার করলে সাথে সাথেই তিনি শার্ট কিনে দিতেন। এর চেয়েও বড় কষ্ট আমি বাবাকে দিয়েছি কি না আমার মনে নেই।

এরপর আমি অনেকবার ইন্দাজানি হাটে গিয়েছি। হাট থেকে ফেরার সময় প্রথমেই একটা খাল পাড় হতে হতো গুদারা (খেয়া) দিয়ে। আমি, বাবা ও আমার সুন্দর দুলাভাই ছিলাম গুদারায়। ছোট চওনার সমশের হাজী সাবও ছিলেন সেই গুদারায়। তিনি খুব প্রভাবশালী লোক ছিলেন। তিনি কয়েকবার ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান বা পঞ্চায়েত ছিলেন। তার মেঝো ছেলে শওকত আলী দাদা নাম করা পল্লী ডাক্তার ছিলেন। ময়মনসিংহ লিটন মেডিকেল স্কুল থেকে তিনি এল এম এফ না পাশ করেই চলে গিয়ে এলাকায় ডাক্তারি করেন। ভালো প্রাক্টিস ছিল। তার বড় ভাই হামি (আ: হামিদ) দাদা আলাদা পাকে খেতেন একই বাড়িতে। যাহোক, গুদারা থামিয়ে শওকত ডাক্তার সাব গুদারায় উঠলেন। হাতে বিড়াট একটা ইলিশ মাছ। সমশের হাজী সাব বললেন
– এই মাছটা কত টাকা?
– ‘এত’ টাকা।
– কয়টা মাছ কিনছস?
– একটা।
– কার জন্য?
– আমাদের জন্য।
– হামির জন্য কিনস নাই?
– না।
– ক্যান?
– ভুল হয়ে গেছে।

এরপর হাজী সাব মাছটি নিয়ে গুদারা থেকে ছুড়ে মারলেন প্রবাহমাণ খালের পানিতে। রাগান্নিত হয়ে ছেলের দিকে তাকালেন। উপস্থিত যাত্রীরা হাজী সাবকে বুঝিয়ে শান্ত করলেন।

গুদারা থেকে নেমে চলার পথে বাবার কাছ থেকে এই ঘটনার মাহাত্ব বুঝতে পারলাম। হাজী সাহেব ডাক্তার ছেলের সাথে এক পাকে খেতেন। বড় ছেলে হামিকে রেখে কি করে তিনি ইলিশ মাছটি খাবেন!

আমরা চলতে লাগলাম ভাতগড়ার পিচ্ছিল পথ দিয়ে। সামনে বাবা, মাঝে দুলাভাই, পিছে আমি। বাবা বার বার সতর্ক করে দিচ্ছিলেন যাতে পিছলা না পড়ি। দুলাভাইর গায়ে দবদবে পরিষ্কার সাদা শার্ট ছিল। পরনে টুইস লুঙ্গী। খুব ভালো লাগছিলো আমার। আগামীকাল পালা মোরগটা জবাই হবে। হটাৎ দেখলাম দুলাভাই নাচের ভঙ্গী করে দড়াম করে পিছলা খেয়ে রাস্তায় পাতালি হয়ে পড়ে গেলেন। কাদায় শরীর লেটাপেটা। আমি হাততালি দিয়ে হাসতে লাগলাম। এটা আমাদের এলাকার নিয়ম। কেউ পিছলা খেয়ে পরে গেলে আমরা তাকে উদ্ধার না করে হাততালি দিয়ে হাসতে থাকি। আমার হাসি আর থামে না। বাবা দুলাভাইকে ধরে উঠালেন। আমাকে হাসতে বারন করলেন। আবার হাটা শুরু হলো। থেকে থেকেই আমি হেসে উঠছি। আমার হাসির শব্ধ শুনে বাবারও হাসি পেলো। তিনি মেয়েজামাইর কান্ড নিয়ে হাসতে পারেন না। তাই হাসি চেপে রাখলেন। এক সময় ফেকৎ করে হেসে দিয়ে আমাকে ধমক দিলেন “এই গাবর, হাসিস না।” গাবর কথার অর্থটা আমার জানা নেই। তবে বাবা যখন আদরের সাথে আমাকে ধমক দিতেন তখন বলতেন “গাবর!”

আশির দশকের দিকে গারোবাজার-সখিপুর-হাটুভাংগা-মীর্জাপুর পাকা রাস্তা হওয়ার পর ইন্দাজানীর হাটের কদর কমে যায় আমাদের পাহাড়িয়াদের কাছে। আমিও লেখাপড়া ও চাকুরীরর জন্য সেই থেকে দূরে আছি। ঐ দিকে আর যাওয়া হয় না। ইন্দাজানীর সামসুল হক পান্না মামা চার বার আমাদের কাকরাজান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হয়েছেন। ঐ দিকে নাকি অনেক উন্নতি হয়েছে। ইউনিয়ন অফিস কাকরাজান থেকে ইন্দাজানীর কাছে গড়বাড়ী এনেছেন। ঐ এলাকার অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু আমার গ্রামের বড়বাইদপাড়া সেই আগের মতো পিচ্ছিলই রয়ে গেছে। জনপ্রতিনিধিগনকে দাওয়াত দিলে পিছলা খাওয়ার ভয়ে  আমাদের পাড়ায় আসেন না। কিন্তু আমাদেরকে পিছলা খেতেই যেতে হয়। কারন, ওখানেই আমি জন্মেছি, ওখানেই আমার নাড়ী মাটি চাপা দিয়ে রেখেছেন, ওখানেই আমার বাবা-মা আপনজন শায়িত। ওখানেই আপনজনরা থাকেন। আমাকেও ওখানেই শায়িত হতে হবে। আজ লিখে রাখলাম আমার স্মৃতিবিজড়িত ইন্দাজানীর কিছু স্মৃতি আমার স্মৃতির পাতায়। আপনাদের ইন্দ্রজানী।
তারিখ: ২৫/১১/২০১৮ ইং
স্থান : ময়মনসিংহ -কিশোরগঞ্জ জার্নি।

(লেখাটি আমার বর্নিল অতীত বইয়ে প্রকাশিত হয়েছে)

ek-takar-gan

Ek Takar Gan

এক টাকার জ্ঞান

(স্মৃতিচারণ)

ডাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আনুমানিক ২০০০ সালের ঘটনা । একটু ব্যাংকে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ল। বায়োকেমিস্ট ফারুক সাহেবকে সাথে নিলাম। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে বের হয়ে ক্যাম্পাসে অবস্থিত অগ্রণী ব্যাংকে প্রবেশ করছিলালাম । কলেজের ক্যাসিয়ার ওয়াহেদুজ্জামান সাব ব্যাংক থেকে বের হচ্ছিলেন  । আমাকে সালাম দিয়ে হ্যান্ডসেক করার ছলে ঘুষ দেয়ার মত করে আমার ডান হাতে টাকা গুঁজে দিলেন । আমি অপ্রস্তুত হয়ে কিংকর্তব্যবিমুর বনে গেলাম । বললাম “এটা কি করছেন ?” সে এক চোখ ছোট করে বলল “রেখে দেন, স্যার ।“ সিন ক্রিয়েট যাতে না হয় তার জন্য টাকাটা পেন্টের ডান পকেটে রেখে দিলাম । কেউ দেখলো না। আমার শরীর ঘেমে গেল। ম্যানেজারের রুমে প্রবেশ করলাম । ম্যানেজার রুমে একা ছিলেন । আমি ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করলাম “আপনাকে কি কখনো কেউ ঘুষ সেঁধেছে ?” ম্যানেজার বললেন “গতকালই তো এক লোক আমাকে ঘুষ সেঁধেছিল ।“ ম্যানেজার আমার চোখের দিকে আঙ্গুল তাক করে অভিনয় করে বলতে লাগলেন “আমি তাকে বললাম, বেরিয়ে যান, বেরিয়ে যান আমার রুম থেকে ।“ এমন ভাবে অভিনয় করছিলেন যেন তিনি আমাকেই বেরিয়ে যেতে বলছেন । এমন সময় ম্যানেজারের রুমে একজন প্রফেসর প্রবেশ করলেন । ম্যানেজার তাকে সালাম দিয়ে বসালেন এবং তার সাথে কথা বলা শুরু করলেন । আমার মনে হল প্রফেসর মনে করতে পারেন ম্যানেজার আমাকে বের করে দিচ্ছিলেন । ভুলটা ভাংবার জন্য আমি ম্যানেজারকে প্রশ্ন করলাম
– ভাই, আপনি লোকটিকে বের হতে বললেন। তারপর কি হল?
– লোকটি মাথা নিচু করে চলে গেল। ঘুষ দেয়াও খারাপ কাজ আর নেওয়াও খারাপ কাজ।

আমি আর বায়োকেমিস্ট একসাথে ব্যাংক থেকে বের হলাম । পকেট থেকে বের করে দেখি মাত্র এক টাকা । বায়োকেমিস্টকে প্রশ্ন করলাম “ক্যাসিয়ার আমাকে সালাম দেয়ার পর এভাবে এক টাকা হাতে গুজে দিলেন কেন ?” তিনি বললেন “কোন কোন এলাকার প্রথা আছে সকাল বেলা সম্মানিত ব্যাক্তিকে সালামি দিলে সারাদিন ভাল কাটে । আপনাকে হয়তো সালামি দিয়েছেন ।“ আমি বললাম “আমাদের এলাকায়ও এমন প্রথা আগে ছিল । গত নির্বাচনের আগে যখন করটিয়ার জমিদার  পন্নি সাহেব এলাকায় ভোট চাইতে এলেন তখন এলাকার জনগণ তাকে টাকা দিয়েছেন সালামি হিসাবে। বৃটিশ আমলে করটিয়ার জমিদার পন্নি সাহেবেরা আমাদের এলাকায় আসতেন । তখন প্রথা ছিল জমিদারকে সালামি দেয়া। দশ বিশ টাকা যার যেমন সামর্থ ছিলে তাদের হাতে দিয়ে ধন্য হতেন। তাদের এখন আমাদের এলাকায় আসার প্রয়োজন পড়ে না। শুধু ভোটের জন্য এসেছিলেন একবার। পাবলিককে বিড়ি, সিগারেট, টাকা পয়সা বিলাতে হয় নি। উলটা পাবলিকই তাকে টাকা পয়সা দিয়ে দিয়েছে। তবুও তিনি ভোট পেয়ে এম পি হয়েছিলেন।“ পথে দেখা হল এলাকার এক ছোট খাটো নেতার সাথে । ক্যাসিয়ারের নাম না প্রকাশ করে ঘটনাটা বর্ণনা দিয়ে তাকে জিগালাম “আপনাদের এলাকায় কি এমন প্রথা আছে ?” তিনি বললেন “যিনি করেছেন তিনি হয়তো একজন দান্দাল, বাটপার । এক টাকার বিনিময়ে একদিন হয়ত আপনার ল্যাব থেকে একশ টাকার টেস্ট ফ্রী করায়ে নিবেন ।“ কলেজ লাউঞ্জে আবার দেখা হল ক্যাসিয়ারের সাথে । আমি জিগালাম “আপনি এভাবে আমার হাতে এক টাকা গুঁজে দিলেন কেন ?” তিনি বললেন “স্যার, এক সপ্তাহ আগে আমার এক টাকা রিক্সা ভাড়া কম পরেছিল । আপনি এক টাকা দিয়েছিলেন । সেই টাকা আমি ফেরৎ দিলাম ।“ আমি বললাম “মাথা খারাপ, এক টাকা আমাকে ফেরৎ দিতে হবে ? আমিত এই টাকার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম ।“ তিনি বললেন “হোক, একটাকা। আমি তো ওটা ধার নিয়েছিলাম। ঋণি থাকতে নেই।”

এক টাকা ধার দিয়ে ভালোই জ্ঞান অর্জন করলাম ।
২১/৪/২০১৮ খ্রি.

My Father

আমার বাবা

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমার বাবার নাম দলিল উদ্দিন তালুকদার। জন্মগ্রহণ করেন কালিহাতির ভিয়াইল গ্রামের দক্ষিণ পাড়ায় তালুকদার বাড়ি। আমার দাদা ছিলেন মোকছেদ আলী তালুকদার। বাবার ডাক নাম ছিল দলু ।  বাবার শরীরে ইমুনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম ছিল। তাই, ঘনঘন অসুস্থ্য হতেন । অসুস্থ থাকার কারনে বাবা পরিশ্রমের কাজ করতে পারতেন না। একজন কৃষক হয়েও কৃষিকাজ তেমন করতেন না। যার দরুন অনেক জমি জমা থাকলেও তিনি তেমন সচ্ছল ছিলেন না।

বাবা বেশিরভাগ সময়ই ঘুরে বেড়াতেন। লাইলি বুবু ও আকবর ভাইর জন্মের পরই দাদা বাবাকে পাঠিয়ে দেন পাহাড় অঞ্চলের জমি দখল করে আবাদ করার জন্য। বাবা ঢনডনিয়া মোউজার বড়বাইদপাড়া গ্রামে  এসে বাড়ি করেন। মা আমাকে গর্ভে করে নিয়ে আসেন আমাদের নতুন বাড়িতে। তাই, আমার জন্ম হয়েছে এই গ্রামে আনুমানিক ১৯৫৮ সনে । তখন এটা কালিহাতি থানার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখন এটা পড়েছে সখিপুর উপজেলার অধীন।

বাবাকে দেখেছি ঘনঘন ভিয়াইল যেতে। জিজ্ঞেস করলে বলতেন “তোমার দাদাগো বাড়ি গেছিলাম। তোমার ফুফুগ বাড়ি গেছিলাম।” অল্প বয়সেই আমার দাদী অন্ধ হয়ে যান। আমার দাদার সভাবও উড়াটে ধরনের ছিলো। আমার বড় ফুফু খুব বুদ্ধিমতি ছিলেন। অল্প বয়সেই ভাই বোনদের দায়িত্ব নিতে হয় তাকে। আমার বাবা চাচার একজন নির্ভরযোগ্য বোন ছিলেন আমার বড় ফুফু। তাই তিনি ফুফুর কাছে চলে যেতেন। ফুফুর বিয়েও হয়েছিল ভিয়াইল গ্রামের উত্তর পাড়ার তালুকদার বাড়ি। মফিজ উদ্দিন তালুকদার ছিলেন আমার ফুফা।

বাবা জমিতে ফসল তেমন ফলাতে পারতেন না। তাই, তালুকের জমি বিক্রি করে বাজার সদায় করে খেতেন। বাবার কাছে আমাদের কিছু চাইতে হয়নি। আমাদের যার যখন যা কিছু লাগতো বাবা জমি বেচা টাকা দিয়ে কিনে আনতেন।

বাবা খুব পাড়া পেড়াতেন। খেয়ে কুলি ফেলতেন নওপাড়া গিয়ে। জিতাস্বরি পাড়ার হাতু কাক্কু, দলু কাক্কু ও বুর্জু কাক্কুর সাথে বাবার খুব খাতির ছিলো। তারাও বাবার মতো অলস ছিলেন। তাদের সাথেই বেশি সময় কাটাতেন। বর্ষাকালের অর্ধেক সময় নৌকায় কাটাতেন। ভিয়াইলের মধ্য পাড়ার তোমজ বেপারির ছেলে হাসান বেপারি সম্পর্কে আমাদের দাদা হতেন। আমাদের কাছে হাছেন দাদা নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি তায়েজ উদ্দিন কাক্কুর বাবা। হাছেন দাদা আমাদের খুব আদর করতেন। আমাদের জন্য জিলাপি নিয়ে আসতেন। কিন্তু আমরা তাকে পছন্দ করতাম না। কারন হলো তিনি বাবাকে আমাদের থেকে নিয়ে যেতেন তার সাথে ব্যবসা করতে। তিনি পাট ও কাঠের ব্যবসা করতেন। তার বিরাট নাও (নৌকা) ছিলো। নাওয়ের সামনের অংশ প্রসস্থ ছিলো। এই অংশে মালামাল বোঝাই করা হতো। পিছনের অংশে ছই ছিল। এই ছইয়ের নিচে বসে হাছেন দাদা, বাবা ও হাছেন দাদার বড় ছেলে কদ্দুস কাক্কু গল্প করতে করতে হুক্কা খেতেন। আমি মাঝে মাঝে এই নায়ে বাবার সাথে ছোট চওনা ঘাট থেকে উঠে ভিয়াইল গিয়েছি। ছোট চওনা ঘাট থেকে গজারি কাঠের গুড়ি অথবা পাট কিনে নায়ে ভরে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে বিক্রি করার উদ্যেশ্যে রওনা দিতেন। চারজন মাল্লায় এই নাও বেয়ে নিতেন। সামনে দুই পাশে দুইজন, পিছনে দুইপাশে দুইজন মাল্লা লগি দিয়ে খোজ দিতেন এক সাথে। ভারী নাও ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতো। বাবা অথবা কদ্দুস কাক্কু পিছনের গলুইয়ে বসে হাল ধরে থাকতেন। আমি বাবার টোনায় বসে বাবার সাথে হাল ধরে মজা পেতাম। খাল ও নদী দিয়ে যাওয়ার সময় মাল্লারা পাড় দিয়ে হেটে হেটে গুন টেনে যেতেন। গুনের কাঠি কাঁধে নিয়ে বাঁকা হয়ে আঁকা বাঁকা শুকনো ও কাঁদা পথে হাটতেন মাল্লারা। তাদের কষ্টের কথা আমি এখনো ভুলতে পারিনি। পথে রাত হয়ে যেতো। হাছেন দাদা মাটির চৌকায় রান্না করতেন। ভাতে বেগুন সিদ্ধ দিয়ে খাস (সরিষা) তেল দিয়ে ভর্তা করতেন। চামারা চাউলের গরম ভাত দিয়ে খেতে কি যে স্বাদ পেতাম! খেয়ে নায়ের গুড়ায় বসে পানিতে প্রশ্রাব করে ছইয়ের নিচে বেতের পাটিতে ঘুমিয়ে পড়তাম। ঘুমের ভিতরেই বাবা আমাকে কোলে নিয়ে নাও থেকে নামিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিতেন।

বাবা যখন নায়ে যেতেন তখন একটানা ১০-১৫ দিন কাটিয়ে আসতেন। ঐসময় আমার মন খারাপ থাকতো। আমি হাছেন দাদার প্রতি বিরক্ত থাকতাম। মাও বিরক্ত হতেন হাছেন দাদাকে দেখে। তিনি বলতেন “অইজে আবার আইছে, তোমার বাবাকে নিয়ে যেতে।” বড় হয়ে আমার হাছেন দাদার প্রতি অভিযোগ ছিল না। আমি বুঝতে পেরেছি আয় রোজগার করতে বাড়ি ছেড়ে থাকতে হয় অনেকদিন। হাছেন দাদাই ছিলেন বাবার সবচেয়ে ভালো বন্ধু।

বাবাকে বিদায় দেয়ার জন্য মা অনেকদূর পিছে পিছে যেতেন। আমিও মার সাথে গিয়েছি। আমার চোখের পানি গাল বেয়ে পড়তো। বাবা গামছা দিয়ে মুছে দিতেন। কোলে নিয়ে আদর করে বলতেন “বাজান, কাইন্দো না, কয়দিন পরই আই পরমু।” মার কোলে আমাকে বসিয়ে দিয়ে বাবা বুইদ্দাচালার সরু পদ দিয়ে আড়াল হয়ে যেতেন। আমি নিশ্চুপ দাড়িয়ে থাকতাম। চারদিক নিরব হয়ে যেতো। সবুজ গাছের আড়াল থেকে থেকে-থেকে ঘুঘু ডেকে উঠতো। আমার মনে হতো বাবা চলে গেলেন বলেই ঘুঘুরা কাঁদছে। অন্যদিন অত ডাক শুনিনি।

আমার কপালের এক পাশে, গাল ও চোখ সহ প্রতিবছর শীতকালে ব্যাথা করতো। তীব্র ব্যাথা। যন্ত্রনায় কান্না করতাম মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে, কপাল দু’হাতে ধরে। এটাকে বলা হতো আধকপালে মাথার বিষ। আমার কষ্টে বাবাও কষ্ট পেতেন। বাবা বড় চওনা ও কচুয়া হাট থেকে বড়ি এনে দিতেন। পানি দিয়ে খেতাম। কোন কাজ হয়নি। একজন বললেন যে ভুয়াইদের এক মান্দাই মহিলা কবিরাজ আধকপালে মাথার বিষের চিকিৎসা জানেন। বাবা আমাকে কাঁধে নিয়ে ভুয়াইদ গেলেন। মহিলা বিধান দিলেন “সকালে উদিয়মান সূর্যের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মাটিতে সেজদা দিতে হবে কিছুক্ষণ করে কয়েকদিন। তাতে কোন কাজ হলো না। ছোট দাদা জয়নাল আবেদীন তালুকদার শুনে বললেন “মুসলমানের পোলা হয়ে হিন্দু কবিরাজের কথায় সূর্যপূজা করতাছ? বাড়ির পাশেই কবিরাজ থাকতে গেছস ভুয়াইদ! আমিই তো আধকপালে বিষের চিকিৎসা জানি।” এই বলে তিনি গাছান্ত বেটে বটিকা বানিয়ে দিলেন। আমি প্রতিদিন সকালে বিষ ওঠার শুরুতেই ঐ বটিকা খেতাম। ওটা এমন ঝাল লাগতো যে বিষের যন্ত্রনার চেয়ে ঝালের তীব্রতাই বেশি ছিল। দাদার ঔষধ বাদ দিলাম। বাবা খবর পেলেন বাঘেরবাড়িতে একজন আধকপালী মাথা বিষের ভালো কবিরাজ আছেন। বাবা আমাকে পর পর তিন দিন কাঁধে করে নিয়ে গেলেন ঝার ফুক দিতে। কোন কাজ হলো না। প্রতিবছর আমার এমন রোগ হতো। আমি কষ্ট পেতাম। কোন চিকিৎসা নেইদনি। মেডিকেল কলেজে ৩য় বর্ষে পড়ার সময় শিখলাম যে ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়াতে এমন কপালের এক পাশে ব্যাথা হয়। এর ঔষধ কি তাও বই পড়ে জেনে নিলাম। আমি নিজের বুদ্ধিতেই ফার্মেসী থেকে ঔষধ কিনে কাউকে না জানিয়ে সকালে খেয়ে নিলাম। শুরু হলো সারা শরীরে তীব্র যন্ত্রণা। বুঝতে পেলাম। ভুল করেছি। ভুল চিকিৎসা করেছি নিজের উপর। অসহ্য যন্ত্রণায় বিছানায় ছটফট করলাম। বিছানা থেকে উঠতে পারলাম না। কাউকে আমার বোকামির কথা বললাম না। মৃত্যুর জন্য প্রস্তত হলাম। কিন্তু আল্লাহ বাচিয়ে দিলেন। এরপর নাক-কান-গলা বিভাগের আউটডোরে মেডিকেল অফিসারকে দেখালাম। তিনি আর এস ডাঃ সিরাজুল আরেফিন স্যারের কাছে রেফার্ড করলেন। তিনি আমার সব ইতিহাস শুনে এবং নাক-কান-গলা দেখে বললেন “তোমার প্রতিবছর শীতকালে সাইনোসাইটিস রোগ হয়। তোমার সাইনোসাইটিস রোগ হয়েছে।” তিনি সাইনোসাইটিস সম্পর্কে বিস্তারিত আমাকে শিখিয়ে দিলেন। তারপর থেকে আমার আর সাইনোসাইটিসের ব্যাথার কষ্ট আর হয়নি। আলহামদুলিল্লাহ।

বাবা আমাকে প্রথম হাট দেখিয়েছেন। বড় চওনা, কচুয়া, ইন্দ্রজানী, বর্গা ও পলাশতলীর হাট বাবাই আমাকে প্রথম দেখিয়েছেন। বাবার সাথেই আমি প্রথম বাসে উঠি। বাবাই আমাকে প্রথম সিনেমা দেখান। বাবার পেটের নাভীর কাছে ব্যথা করতো। তীব্র ব্যাথায় অনেক রাতে পেট ধরে কাঁদতে দেখেছি। হাট থেকে বোতলের ঔষধ এনে খেতেন। কোন কাজ হতো না। একবার, তখন আমি খুব ছোট, আমি মার সাথে রৌহার মামাবাড়ি ছিলাম। বাবা কোথাও যাচ্ছিলেন। আমি বললাম

– বাবা, কুনু যাবাইন?

– তোমার হাছেন দাদার সাথে সয়ার হাটে যামু। তোমার দাদা একটা গরু কিনবেন।

– আমি যামু।

– দুর আছে। মোটরে চইড়া যাইতে অয়।

– ভোঁ মোটর সাইকলে?

– না, মোটর গাড়িতে।

– আমি মোটরে চরমু।

– এখন না। বড় অইলে নিয়া যামুনি।

– না, আইজকাই যামু

বলে কান্না শুরু করে দিলাম। বাধ্য হয়ে বাবা আমাকে সাথে নিতে রাজি হলেন। মা আমার গায়ে একটা হাওই শার্ট পরিয়ে দিলেন। কালিহাতির রাজাফৈরের কাছে গেলে ভোম ভোম রকম শব্দ পেলাম। বাবা বললেন “এইটা মোটরের শব্দ।” চামুরিয়া পাড়ি দিলে ফটিকজানি নদীর উপর ব্রিজ দেখিয়ে বললেন “ঐযে দেখ কত বড় পুল।” পুলের উপর তাকাতেই দেখা গেলো বিরাট এক কাছিমের মতো জিনিস পুলের উপর দিয়ে চলে গেলো। আমি বললাম “ওঠা কি গেলো?” বাবা বললেন “ওঠা, প্রাইভেট কার। বড় লোকেরা ওঠায় চড়ে।” এরপর বড় একটা কিছু যাচ্ছিল। বললেন “এইডা মোটর গাড়ি।” কালিহাতি বাসস্ট্যান্ডে কিছুক্ষণ দাড়ালে ময়মনসিংহ থেকে একটা মোটর গাড়ি এসে থামলো। কাঠবডি বাস। কাঠের জানালা। সীট খালি নেই। আমরা দাড়িয়েই গেলাম। সয়া গিয়ে নেমে পড়লাম। কালিহাতি ও এলেঙ্গার মাঝামাঝি হলো সয়ার হাট। ঘুরে ঘুরে গরু কিনতে রাত হয়ে গেলো। রাতে আমরা চলে গেলাম বাগুনডালি গ্রামে। সেই গ্রামে একজন কবিরাজ ছিলেন। সেই বাড়ি গিয়ে রাত কাটালাম। কবিরাজ বাবার পেটের ব্যাথার ঔষধ দিলেন। ঔষধ দেখতে লোহার করাতের গুড়ার মতো। খেলে ব্যাথা ভালো হয়। পরেরদিন সকালে ঐ বাড়িতে নাসতা করে আমরা পা পথে গরু নিয়ে ভিয়াইল চলে আসি। সেই ঔষধ খেয়ে বাবা ভালো থাকতেন। এরপরও কয়েকবার বাবা সেই ঔষধ এনে সেবন করেছেন। কিন্তু ঔষধের দাম খুব বেশি ছিল। আমি এখন মনে করি ওগুলো আসলেই করাতের গুড়া। করাতে থাকে এলুমিনিয়াম। এই এলুমিনিয়াম পাকস্থলির হাইড্রোক্লোরিক এসিডের সাথে বিক্রিয়া করে এসিডকে নিউট্রাল করে দিয়ে পেট ব্যাথা তথা পেপ্টিক আলসার ভালো করে। বাবা এরপর খোজ পান খাওয়ার সোডা বেকিং পাউডার। বাবা বেকিং পাউডার খেয়ে পেপ্টিক আলসারের ব্যাথা থেকে উপসম হতেন। আমি ডাক্তার হবার পর আর বাবাকে বেকিং পাউডার খেতে হয়নি।

বাবা আমাকে কোনদিন কোন কাজ করতে বলেননি। বাবা না বললেও আমি সংসারের অনেক কাজ করেছি। বাবা আমাকে কোনদিন পড়তে বলেননি। কারন, তিনি জানতেন সাদেককে পড়তে বলতে হবেনা। আল্লাহ সাদেককে ও গুণটি দিয়েই তৈরি করেছেন। আমি যখন দোয়াত জ্বালিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত পড়তাম বাবা আমার পাশেই শুয়ে শুয়ে মশা মেরে দিতেন এবং বিচুন দিয়ে বাতাস দিতেন। পিঠে হাত বুলিয়ে দিতেন। প্রাইমারির পড়া বুঝিয়ে দিতেন। বাবার অনেক বিষয়ে ভালো সাধারণ জ্ঞান ছিলো। তিনি কোন নিতিকথা শিখাননি। কারন, তার বিশ্বাস ছিল সাদেক কোন অনৈতিক কাজ করতে পারেনা।

১৯৭৯ সনে যখন মা মারা যান তখন বাবার বয়স হয়তো ৫৫ বছর। ঘটকরা চেষ্টা করেছিলেন বাবাকে পুনরায় বিয়ে করিয়ে দিতে। আমি তখন এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। আমরা বিয়ের ব্যাপারে হা না কিছু বলিনি। বাবা বিবেচনা করে দেখেছেন যে সংসারের আমাদের নতুন মা এলে আমাদের শান্তি বিগ্নিত হতে পারে। তাই তিনি ধৈর্য ধরেন।

আমি ডাক্তার হবার পর বাবাকে সতর্ক করে দেই যে এখন থেকে তিনি জমি বিক্রি করে খেতে পারবেন না। আমি সংসারের জন্য যতটুকু পাড়ি করে যাবো। তারপর থেকে তিনি আর জমি বিক্রি করেননি। তিনি ঘনঘন জ্বরে আক্রান্ত হতেন। আমি তখন আমার এম ফিল কোর্সের পড়া নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। বাবার জন্য সময় দিতে পারিনি। এম ফিল শেষ করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে যোগদান করে বাবাকে আমার বাসায় রাখলাম। কিন্তু আমার মনে হয়েছে বাবাকে জেল খানায় বন্দী করে রেখেছি। বাবার সাথে সময় দেয়ার কেউ ছিল না। বাবা ঘনঘন বাড়ি চলে যেতেন। আমি বুঝতে পারি বাবা এখন গ্রামময় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বন্ধুদের সাথে গুপ ছেড়ে হেসে হেসে গল্প করছেন। তাই আমি শহরে এসে থাকতে বাবাকে পিড়াপিড়ি করিনি।

২০০১ সনের দিকে বাবা খুব বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দেখানো হয়। পরীক্ষা করে দেখা যায় বাবার প্যানসাইটোপেনিয়া আছে। অর্থাৎ সব রক্তকণিকা কম আছে। এজন্যই ঘনঘন ইনফেকশন হয়। ইনফেকশনের জন্যই জ্বর হয়। বাবাকে অনেকদিন হাসপাতালে ভর্তি রাখতে হয়। ভাতিজা আব্দুল মান্নান তালুকদার তখন কলেজে পড়তো। ওর পড়াশোনা ক্ষতি করে বাবার সাথে থাকে অনেক দিন। এরপর ধরা পড়লো বাবার লিভারে সিরোসিস হয়েছে। এ রোগ ভালো হবার নয়। ৭৫ বছর বয়সে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করাও ঠিক হবে না মনে করলাম। যতটুকু সম্ভব সাধারণভাবে চিকিৎসা করে যেতে লাগলাম। বাবার ইচ্ছে অনুযায়ী বাড়িতে রাখলাম। সুবিধা ছিল, ভাই, ভাবী, মান্নান ও আফ্রোজা বাবার ঠিকমতো যত্ন নিতে পারবেন নিজ বাড়িতে। তখন ছিল অক্টোবর মাস। আবহাওয়া ছিল দুর্যোগপূর্ণ। বাড়ির চারিদিকে ছিল কাদা আর কাদা। এমন একটি দিনে ২০০১ সনের ২০ অক্টোবর বাবার ইন্তেকালের সংবাদ পেলাম। কার নিয়ে ছুটে গেলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। দুই কিলোমিটার দুরে পাকা রাস্তায় নেমে কর্দমাক্ত রাস্তা দিয়ে হেটে গিয়ে বাবার মৃতদেহের কাছে উপস্থিত হলাম। দেখলাম আমার নিস্পাপ বড় ভাই আকবর হোসেন তালুকদার বাবার কাছে বসে বাবার মুখের দিকে ফেলফেল করে তাকিয়ে আছেন। আনুমানিক ৭৫ বছর বয়সে বাবা চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। বাবাকে ছেড়ে মা চলে গিয়েছেন পরপারে ২০ বছর আগে। আল্লাহ আমার ধৈর্যশীল বাবার জন্য বেহেস্ত নসীব করুন।

১৫/৪/২০২০ খ্রি.

prothom-chakri

বরিশালের গ্রামে প্রথম চাকরির স্মৃতিকথা

বন্ধু বিচ্ছিন্ন

ডাঃ নজরুল ইসলাম। বর্তমানে টাংগাইলের নামকরা চক্ষু বিশেষজ্ঞ এফসিপিএস সার্জন। তার সাথে আমার পরিচয় ও বন্ধুত্ব শুরু হয় ১৯৭৭ সনে কালিহাতির আউলিয়াবাদে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজে ভর্তি হবার পর থেকেই। হোস্টেলে পাশাপাশি রুমে থাকতাম। একসাথে বেড়াতাম, মন খুলে গল্প করতাম। পালাকরে গান গাইতাম। ওদের বাড়ীতেও গিয়েছি। খালাম্মার হাতে রান্নাও খেয়েছি।

বন্ধুত্ব আরও ঘনিষ্ঠ হল যখন আমরা দুইজনই ১৯৮০ সনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে চাঞ্চ পেলাম। থাকা শুরু হল একই রুমে। এক সাথে খেতাম, পড়তাম, ঘুরতাম, সিনেমা দেখতাম, ঘুমথেকে উঠতাম, ক্লাশে যেতাম, ছুটিতে বাড়ী যেতাম। একই রকম জামা পরতাম। ক্লাশমেটরা বলত দুই ভাই। একই রকম রেজাল্ট করতাম। রিক্সা ভাড়া শেয়ার করতাম। তাই, হাত খরচ কম লাগত। এই রকম প্রায় সব কিছুতেই আমাদের দারুণ মিল ছিল।

১৯৮৫ সনে দুইজনই এমবিবিএস পাস করে দুইজনই সার্জারিতে বিশেষ ইন্টার্নশীপ ট্রেইনিং নিলাম ভবিষ্যতে সার্জারি বিশেষজ্ঞ হবার আশায়। কিন্তু বাস্তবে সে আজ চক্ষু বিশেষজ্ঞ আর আমি প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ।

ইন্টার্ন ট্রেইনিং শেষ করে দুই জনই বেকার হয়ে গেলাম। দুই জনই মেডিকেল অফিসার হিসাবে টাংগাইলের একমাত্র প্রাইভেট হাসপাতাল নাহার নার্সিং হোমে কাজ শুরু করলাম।

১৯৮৮ সনে শুনলাম আমাদের মেডিকেল অফিসার হিসাবে সবারই সরকারি চাকরির অর্ডার হয়েছে। আমাদের দুইজনকেই খুলনা বিভাগে ন্যাস্ত করা হয়েছে। জুলাইর ১ তারিখে আমরা এক সাথে খুলনা গেলাম। রাত ১১ টায় খুলনা পৌছলাম। সকাল ১০ টায় স্বাস্থ্য বিভাগের ডিভিশনাল ডাইরেক্টর অফিসে গেলাম। দেখলাম পোস্টিং অর্ডার সাইন হয়ে গেছে। আমাকে দিয়েছে বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়ন সাব সেন্টারে। নজরুলকে দিয়েছে খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার কোন এক সাব সেন্টারে। অর্ডার হাতে পেয়ে দুই বন্ধু বিমর্ষ ভাবে তাকিয়ে রইলাম। কেউ একজন বললেন “দেরী না করে তাড়াতাড়ি যোগদান করে ফেলুন। প্রথম সরকারী চাকরি, একই দিনে সবাই যোগদান না করলে সিনিয়র জুনিয়র সমস্যা হবে। বিকেল বেলায় আমরা দুইজন দুইদিকে রওনা দিলাম। আমি পুর্ব দিকে গেলাম, নজরুল পশ্চিম দিকে গেল। এই যে দুই বন্ধু বিচ্ছিন্ন হলাম এখন পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন

অবস্থায় আছি। কথা হয়, দেখা হয়, মোবাইল হয়, ফেইসবুক হয়, চেট হয়।


তারিখঃ ১২/৬/২০১৭ ইং
ময়মনসিংহ – কিশোরগঞ্জ – ময়মনসিংহ জার্নি

প্রথম কর্মস্থলে যোগদান


সময়টা ১৯৮৮ সালের ২ জুলাই।  পোস্টিং অর্ডার হাতে পেয়ে কর্মস্থলে যাওয়ার পথ কী হবে তার খোঁজ নেয়া শুরু করলাম। এ ব্যাপারে সুলতান নামে আমার এক আত্মীয় তার সহকর্মীদের সাথে আলাপ করে একটা রোড ম্যাপ করে দিল। সে ওখানে চাকরি করত। 

বাসে করে সাতক্ষীরায় তার বাসায় গেলাম। রাতের খাবার খেয়ে সেখান থেকে হুলার হাট গেলাম। একা জার্নি, খুব খারাপ লাখছিল। হুলার হাটে সস্তা একটা হোটেলে রাত্রি যাপন করলাম। 

বাথরুমের অবস্থা ভাল না থাকায় পায়খানার কাজে ওটা ব্যাবহার করলাম না। পায়খানার বেগ নিয়েই ভোর ৫ টায় রিক্সা নিয়ে লঞ্চ ঘাটের দিকে রওনা দিলাম। 

ছিনতাই হবার ভয়ে ভীত ছিলাম। ঘাটে গিয়ে বসলাম। একজন দুইজন করে যাত্রী এসে বসতে লাগল। 

আমি জীবনে তখনো লঞ্চ দেখিনি। আজ  প্রথম লঞ্চ দেখার অভিজ্ঞতা হবে। বাসের মত কি আগে টিকিট করতে হবে? না উঠে টিকিট করতে হবে? এনিয়ে ছিল নানা দুশ্চিন্তা। 

স্থির করলাম আমার মত প্যান্ট-শার্ট পরা ভদ্র যাত্রীরা যা করবে আমিও তাই করব। দেখলাম দক্ষিণ দিক থেকে একটা বড় নৌযান আসছে। উপরে লিখা “এম ভি বাপ্পী”। বুঝতে পারলাম এটাই লঞ্চ। ঘাটে ভিড়ল। দেখলাম দোতলা-নিচ তলা আছে। আমি ভদ্র লোকদের দেখাদেখি দোতলায় গিয়ে বসলাম। 

বোকার মত এদিক সেদিক তাকালাম। বেঞ্চে হেলান দিয়ে বসলাম। লঞ্চ পূর্ব দিকে চলছিলো। পানি আর পানি। সীমাহীন পানি। জীবনে এত পানি দেখিনি। একটা লোক বেঞ্চে পা তুলে বেয়াদবের মত শুয়েছিলো। আমি তার প্রতি বেশ বিরক্ত বোধ করছিলাম। এক লোক ব্রিফকেসে সুই দিয়ে খোদাই করে নাম লিখে দিচ্ছিল। আমিও পাঁচ টাকা দিয়ে নাম লিখালাম ‘সাদেক’। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। 

পানি দেখে খুব ভাল লাগছিল। পানিতে অনেক মহিষ দেখতে পেলাম। মহিষ মাথা ডুবিয়ে ডুবিয়ে কী যেন খাচ্ছিল। 

আমি জানতাম, মহিষ মাঠে ঘাস খায়। কিন্তু পানির নিচ থেকে কী খাচ্ছে সেটা বুঝতে পারছিলাম না। আমার পাশে দাঁড়ানো এক জনকে জিজ্ঞাসা করলাম “মহিষ পানির নিচ থেকে কি খাচ্ছে?”। লোকটি আমাকে অস্বাভাবিক মানুষ ভেবে উত্তর না দিয়ে সটকে পড়ল।  বিপরীত দিকের বারান্দায় গিয়ে আরেকজনকে জিজ্ঞাসা করলাম। সেও তাই করল। 

আমার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। ভেতরে এসে একজনকে বিষয়টি বলার পর সে বলল ”কেন? ঘাস খায়।“

আগের দুইজন তখন মনযোগ দিল। আমি জানতে চাইলাম

-পানির নিচে ঘাস জন্মায় কেমনে?
– এটাতো মাঠ। মাঠে ঘাস খাচ্ছে।
– আমি তো দেখছি সাগরের মত।
– আপনার বাড়ি কই?
 (আমি ভরকিয়ে গেলাম)

– টাঙ্গাইল জেলায় সখিপুরে, পাহাড় অঞ্চলে।
পাশ থেকে একটু শিক্ষিত একজন বললেন
-আপনি বুঝি জোয়ারভাটা দেখেননি। এখন জোয়ার। ভাটার সময় মহিষ ঘাস খাওয়া শুরু করেছিলো, জোয়ারের পানিতে মাঠ ভরে গেছে, এখনো মহিষ মাথা ডুবিয়ে ডুবিয়ে ঘাস খাচ্ছে।
– এখন বুঝতে পেরেছি। বইয়ে পড়েছি।
-আপনি কী করেন? কোথায় যাচ্ছেন?
– আমি ডাক্তার। সরকারি চাকরি হয়েছে। যোগদান করতে যাচ্ছি।
-এমবিবিএস ডাক্তার?
– জ্বী।

সবাই নড়েচড়ে বসে আমার দিকে মনযোগী হল। আমিও সাচ্ছন্দ্যবোধ করা শুরু করলাম। একে একে অনেকেই টুকটাক অসুখের কথা জানাল। আমি সমাধান দিলাম। আমি ওখানকার মধ্যমণি হয়ে গেলাম। যে লোকটি পা তুলে শুয়ে ছিল সেও পা নামিয়ে বসল। বলল “ডাক্তার সাব, আমার সারাক্ষণ পায়ের তলা জ্বালাপোড়া করে। কেন এমন হয়?” এতক্ষণে আমি বুঝতে পারলাম কেন সে বেয়াদবের মত পা তুলে শুয়েছিল।

এভাবে সবার সাথে গল্প করতে করতে সকাল ১০টার দিকে বরিশাল এসে পৌঁছলাম। 

সিভিল সার্জন অফিস থেকে কমিউনিকেশন লেটার নিয়ে বাসে চড়ে বাকেরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলে গেলাম। ইউএইচএফ পিওর নিকট পরিচয় দিলাম। পাশে একজন পাজামা পাঞ্জাবি পরিহিত ৫৪/৫৫ বছর বয়স্ক লোককে বললেন, ‘এই যে আপনার মেডিকেল অফিসার এসে গেছেন। আর চিন্তা নাই।’

আমি যোগদানপত্রে সই করে অফিস ত্যাগ করলাম। ওই লোকটি ছিল আমার সেন্টারের মেডিকেল এসিস্টেন্ট। আমরা চরামদ্দি সাব সেন্টারের উদ্দেশ্যে বাসে রওনা দিলাম। বরিশাল গিয়ে রাত্রিযাপন করে ছোট লঞ্চে করে পরদিন চরামদ্দি যেতে হবে। বাসে যেতে যেতে আলাপ হলো। ওখানে স্টাফদের কথা  জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, ‘ওখানে আছে একজন পাগলা ফার্মাসিস্ট। কোথায় থাকে, কী খায়, কী পরে তার ঠিক নাই। দেখলেই বুঝবেন। আরেকজন পিওন আছে। তাকে দিয়ে কিচ্ছু করাতে পারবেন না। কিছু বললে উল্টা আপনাকেই ভয় দেখায়ে দেবে। আপনি তো অনেক দূরের মানুষ। আপনি সামলাতে পারবেন কিনা। আপনার তো আবার নতুন চাকরি। অসুবিধা হবে না, আমি আছি না?’ শুনে আমার শরীর শিরশির করে উঠল।

সন্ধ্যার সময় আমাকে একটি কমদামি বোর্ডিংয়ে নিয়ে উঠালেন। চলে গিয়ে আবার ফিরে এলেন দুইজন চোখে সুরমা দেয়া যুবক নিয়ে। বললেন, ‘পরিচয় করে দিচ্ছি, ইনি আমার বন্ধু ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার…..!’

আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম! ভাবলাম এই ‘বন্ধুকে’ আমি নিয়ন্ত্রণ করব কীভাবে।

তাদের সাথে আলাপ হল। অনেক কথার পর তারা একটা কথা বলল, ‘আপনি চিন্তা করবেন না। আমরা আছি না? অমুককে একটু ট্যাঁক্টফুলি ম্যানেজ করতে হবে।’ 

তারা চলে গেলে আমি একটু বারান্দায় বেরুলাম। দেখলাম তারা পাশের রুমে দুইটি মেয়ের সাথে কেমন কেমন যেন কথা বলছে। আমি লুঙ্গী পরে বাথরুমে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি এমন সময় বাইরে থেকে দরজার করা নাড়ল।
– কে?
– আমি বোর্ডিংয়ের লোক। কিছু লাগবে, স্যার? আমি সব কিছুর ব্যবস্থা করে দিতে পারি।
– আমার কিছু লাগবে না। আমি এখন ঘুমাব। ডিস্টার্ব করবেন না। 
আমার বুঝতে দেরি হল না পাশের রুমের বোর্ডারদের কারবার। 

মেডিকেল এসিস্টেন্ট আমাকে রেখে তার ভাইয়ের বাসায় থাকতে গিয়েছে। আমি ভয়ে জড়সড় হয়ে গেলাম। পায়খানার বেগ থেমে গেল। বের হবার সাহস পেলাম না। গত রাতেও পায়খানা করতে পারিনি। অমনি শুয়ে পরলাম। কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

সকাল সাড়ে পাঁচটায় মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টের ডাক শোনে ঘুম থেকে উঠলাম। 

ছয়টায় বরিশাল থেকে ছোট লঞ্চে উঠলাম। নয়টার দিকে কাটাদিয়া ঘাটে নামলাম। ওখান থেকে ডিঙি নৌকায় উঠলাম। দুই কিলোমিটার যেতে হল নৌকায়। খালের ধারের মানুষ আমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলো “সাহেব কে?” 
– সাহেব আমাদের চরামদ্দির নতুন ডাক্তার। এমবিবিএস। এর আগে কেউ এমবিবিএস ছিলেন না। 
– আমাদের সরকারি ডাক্তার?
– জ্বী।
-খুব ভাল।

দশটার দিকে নৌকা থেকে নামলাম। তিনি দেখিয়ে বললেন ‘এটাই আপনার হাসপাতাল।’
দেখলাম ডোয়াপাকা একটি পুরাতন টিনের ঘর। সামনে বারান্দা। হাসপাতালের সামনে প্রায় একশত জন লোক। একজন উস্কো খুসকো লোক কানে একটা বিড়ি আটকানো, গায়ে রান্নাকরার ছাই লাগানো শার্ট, মাঝে মাঝে বিড়ির আগুনে গোল গোল করে ছিদ্র করে পোড়া, পেছনে লুঙ্গীর কোছে বিড়ির প্যাকেট, আমার দিকে ইঙ্গিত করে জানতে চাইল ‘সাহেব কে?’
মেডিকেল এসিস্টেন্ট বললেন, ‘ইনি আমাদের নতুন অফিসার, ময়মনসিংহ বাড়ী।’
তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন

-আপনি এমবিবিএস?
– জ্বী।

লোকটি লাফ দিয়ে দুই ফুট উঁচু জায়গায় উঠে দাঁড়ালেন। মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট বললেন,‘ইনিই আপনার ফার্মাসিস্ট’।
ফার্মাসিস্ট নেতার ভঙ্গিতে জনগণের উদ্দেশে  ভাষণ দিতে লাগলেন-
– ভাইসব, আপনারা শান্ত হউন। আমাদের এখানে জয়েন করতে এসেছেন যিনি তিনি এমবিবিএস, যা লন্ডন থেকে পাস করতে হয়!
তিনি আগামীকাল থেকে আপনাদের দেখবেন। আজ তিনি বিশ্রাম নিবেন।
এরপর সবাই শান্ত হলেন। তিনি সবাইকে বিদায় করে আমার কাছে আসলেন।
আমি জানতে চাইলাম
– আপনাদের লেট্রিন কোথায়?
– আমাদের তো লেট্রিন নাই!
-তাহলে আপনি কী ব্যবহার করেন?
– আমি কলার পাতা দিয়ে একটু ঘেরাও করে বানিয়ে নিয়েছি।
– এটা কী?
– এটা ফ্যামিলি প্লানিং ভিজিটরের অফিস।
– এখানে লেট্রিন নেই?
– আছে। পাকা সেনিটারি লেট্রিন। 

শোনে আমার তিন দিনের জমানো পায়খানার বেগ ফারাক্কা বাধের উজানের শক্তি নিয়ে নিচের দিকে ধেয়ে আসা শুরু করল।
– লেট্রিনের চাবি দিন।
– ওটা পিওনের কাছে।
– পিওন কই?
-বাজারে গিয়ে আড্ডা দিচ্ছে।
– ডাকেন তাকে।

তিনি দৌঁড়ে বাজারের দিকে চলে গেলেন। অনেকক্ষণ পর ফিরে এসে বললেন-
-পেলাম না।
– ঠিক আছে, আপনারটাই ব্যবহার করব। এক বদনা পানি আনেন।

তিনি পানি আনতে চলে গেলেন। আশার আলো দেখে আমার ওইটার বেগ আরও তীব্র আকার ধারণ করল। তিনি খাবার পানির এক জগ পানি নিয়ে এলেন। আমি বললাম
– আমি তো পানি খাব না, পায়খানায় ব্যবহার করব, বদনায় পানি আনেন।
– স্যার, আমার এই জগ ছাড়া আর কিছু নাই। এইটা দিয়েই পানি খাই, এইটা নিয়েই পায়খানায় যাই।

আমার রাগে, দুঃখে  বেগ নিস্তেজ হয়ে পরল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলাম। মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট মিটিমিটি হাসছিলো। আমি মেডিকেল এসিস্টেন্টকে বললাম “আমার ক্ষুধা পেয়েছে। খাব কই?”
ফার্মাসিস্টকে বললাম,‘যান, আমার সামনে থেকে’।
তিনি ইডিয়টের মত হেসে চলে গেলেন। 

পরে মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট আমাকে বাজারে নিয়ে গিয়ে খাওয়ালেন। আমি বললাম,

-আমি এখানে থাকতে পারব না। 
– চলেন আমাদের বাড়ী। এখান থেকে ৩ কিলো দূরে হবে।

– চলুন তাই হউক। 

বিকালে মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্টের বাড়ি গেলাম। তার গ্রামের নামটা এখন মনে করতে পারছি না। গিয়েই লেট্রিনের খোঁজ নিলাম। তিনি তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করে দিলেন। পাকা লেট্রিন। তিন দিনের জমা রাখা জিনিসগুলি ত্যাগ করতে পেরে গোপাল ভাঁড়ের মত প্রশান্তি পেলাম। 

তিনদিন গোসল করিনি। অত্যন্ত গরম আবহাওয়া ছিল। গোসল করতে চাইলাম। তিনি আমাকে তার বাড়ির দক্ষিণ পাশে নিয়ে গেলেন। বিস্তীর্ণ এলাকা। পানি আর পানি। দখিনা মিষ্টি বাতাস আসছিল। আমি শার্ট গেঞ্জি খুলে কিছুক্ষণ গায়ে হাওয়া লাগালাম। অমন মিষ্টি হাওয়া আর কোথাও পাইনি। 

বিকালে ঘুম দিলাম। রাতে তার ভাইয়ের সাথে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গল্প হল। আবার ঘুমালাম রাতে।

দুপুরের খাবার পোলাও মাংস খেয়ে বরিশাল রওনা দিলাম। বিকেল ছয়টায় ঢাকার লঞ্চে উঠলাম। ঢাকা থেকে বাসে ফিরতে হবে বাসে। হিসাব করে দেখলাম টাকা প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। তাই কেবিনে টিকিট না করে ৩০ টাকায় ডেকের টিকিট করলাম। ব্রিফকেস থেকে লুঙ্গী বের করে বিছিয়ে শুয়ে পড়লাম। কেউ যাতে চিনতে না পারে সেজন্য ব্রিফকেসের ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার লিখা কার্ডটা উল্টিয়ে লাগালাম। ব্রিফকেস মাথায় দিয়ে ঘুমাতে চেষ্টা করলাম। 

চারদিনের জার্নির ঘটনাগুলি মনে করতে করতে এক সময় কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।


তারিখঃ ১৪/৬/২০১৭ ইং
ময়মনসিংহ – কিশোরগঞ্জ – ময়মনসিংহ জার্নি

প্রথম কর্মস্থলের ভয়াবহ দিনগুলি


১৯৮৮ সনে ৩ জুলাই বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে মেডিকেল অফিসার পদে যোগদান করে প্রস্তুতিমুলক ছুটি নিয়ে টাংগাইল এসেছিলাম। দুই একদিন কাটিয়ে বেডিংপত্র, একটি হারিকেন, একটি ছোট রেডিও ও এক সেট পাতিল নিয়ে কর্মস্থলে থাকার উদ্দেশ্যে দুপুরের দিকে টাংগাইল থেকে রওনা দিলাম। পরেরদিন সকাল ১০ টায় চরামদ্দি পৌছলাম। কাটাদিয়া বাজার থেকে একটা রেইনট্রি গাছের চৌকি কিনলাম ১০০ টাকা দিয়ে। হাসপাতালের পিছনেই মেডিকেল অফিসার থাকার বাড়ী। ডোয়াপাকা তিনটি টিনের ঘর। একটি থাকার ঘর, একটি রান্নাঘর ও একটি বৈঠকখানা কাম চেম্বার। বাজারের ভাতের দোকানে কন্ট্রাক্ট করলাম তিনবেলা খাবার দিয়ে যেতে। একটু দুরেই পুরাতন জমিদার বাড়ী। সেই জমিদাররা কেউ থাকে না। তাদের রায়তরা থাকে।

বাড়ির সাথেই বিরাট পুকুর। শুক্না কলার পাতা বাশের উপর ভাজ করে পুকুর ঘাটে বেড়া দিলাম। হেলথ ভিজিটরের লেট্রিনের চাবি নিয়ে নিলাম। শোবার, খাবার, লেট্রিনের এবং গোসলের ব্যবস্থা হয়ে গেল। এক মাস্তান যুবক ৫/৬ জন সাংগ নিয়ে হাজির হল। বললো
– আমার নাম অমুক। আপনার কোন অসুবিধা হলে আমাকে জানাবেন। কোন হালার পো আপনাকে ডিস্টার্ব করতে পারবে না। ডাক্তার সাব, আমাকে কিন্তু আগের ডাক্তার সাব তিন মাস অন্তর একটি করে রগে দেয়ার সেলাইন দিতেন হাসপাতাল স্টোর থেকে। আমি ওটা মদের সাথে মিশিয়ে খাই। তাতে তিন মাস চাংগা থাকি। দিবেন কিন্তু।

মেডিকেল এসিস্টেন্ট চোখ ইশারা দিয়ে রাজি হতে বললেন। আমি রাজি হলাম। চলে গেলো সে।
কিছুক্ষণ পর একজন এলেন। পরিচয় দিলেন তিনি পাশের বাড়ীর মকবুল দফাদার।
– আমি মকবুল দফাদার। সব সময় আমাকে কাছে পাবেন। আপনার আগের অফিসারের সাথে আমি প্রায় সব সময় থাকতাম।

শুনে আমি তেমন কিছু বললাম না।

রাত হলো। বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব ছিল। চার দিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার ছিল। আমি একা একটা পুরাতন ঘরে। এই বাড়ি বৃটিশ আমলের। হাসপাতাল বৃটিশ আমলের। মনে হলো এখানে ভুত পেত্নি থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না। হারিকেন নিভিয়ে শুইয়ে পরেছিলাম। ঘুম আসছিল না। চারদিক নিরব ছিল। ভুত এসে মাথার উপর সিলিং দিয়ে হাটা শুরু করল। আমার বুক কাপা শুরু করল। পা ঠান্ডা হয়ে গেল। সাইন্স জ্ঞান কোন কাজে আসল না। কাপড় দিয়ে চোখ ঢেকে ফেললাম। ভুতের হাটা থামছিলো না। এক সময় সাহস করে উঠে বসলাম। মনে হলো যেন আমার মাথার উপর তিনি পা রাখবেন। থরথরি কাপছিলাম। হারিকেন ধরালাম। উপর দিকে ভয়ে ভয়ে তাকালাম। দেখলাম তিনি জ্বল জ্বল করে আমার দিকে বড় বড় করে তাকিয়ে আছেন। সারা শরীর কাল, শুধু চোখ দেখা যায়। চিনতে চেষ্টা করলাম। তিনি বললেন “মিয়াও”। স্বস্থি পেলাম। একজন সংগি পেলাম।

পরেরদিন সকাল নয়টায় প্রথম অফিস করতে গেলাম। মেডিকেল এসিস্টেন্ট থেকে ঔষধের চার্জ হ্যান্ড ওভার লিস্ট নিলাম। এই হ্যান্ডওভার লিস্টটা আমার পুর্বের অফিসার দিয়ে গেছেন মেডিকেল এসিস্টেন্টের নিকট। মার্মাসিস্টের নিকট থেকে চাবি নিয়ে স্টোর খুললাম। ঔষধ গুনে লিস্টের সাথে মিলালাম। চেয়ারে গিয়ে বসলাম। বৃটিশ আমলের শক্ত কাঠের হাতল-ভাংগা চেয়ার। ভারি মোটা কাঠের টেবিল। মেডিকেল এসিস্টেন্ট পরামর্শ দিলেন
– আপনি তো আমাদের অফিসার। পুরুষ রুগী গুলি বেশী গুরুত্বপূর্ণ। ওগুলি আপনি দেখুন। পাশের রুমে বসে আমি মহিলা রুগী দেখব।
– পুরুষ মহিলা সবার জন্য আমাকে পোস্টিং দেয়া হয়েছে। সবাইকে দেখতে হবে।
– আপনি একা এত ঝামেলায় জড়াবেন না।

মনে পরল ইউএইচএফপিও সাহেব বলে দিয়েছেন “মেডিকেল এসিস্টেন্ট এলাকার অভিজ্ঞ লোক, তার পরামর্শ নিয়ে কাজ করলে সমস্যা হবে না। ” আমি রাজি হলাম। অনেক রুগী আসে। আমি পুরুষ রোগী দেখি, তিনি দেখেন মহিলা রুগী। তিনি পিয়নকে দায়িত্ব দিলেন স্লিপ দেখে ঔষধ বিতরণ করতে। আমি অফিস শেষে পিয়নকে বললাম “স্লিপগুলি নিয়ে আস।” সে নিয়ে আসল। আমি রেখে দিতে বললাম। সে ওগুলি পুকুরে ফেলে দিল।

বিকেলে হাটতে গিয়ে একটি ঔষধের দোকানে গিয়ে বসলাম। ওখানে এলাকার অনেকের সাথে পরিচয় হল। পরেরদিন এক মুদির দোকানের সামনে বসা সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার, গ্রামীণ ব্যাংকের ম্যানেজার ও হাই স্কুলের হেড মাস্টারের সাথে আড্ডা হল। এই ভাবে প্রতিদিন বিকেলে তাদের সাথে গল্প করে কাটালাম। বাসায় সকাল বিকাল প্রাইভেট প্রেক্টিস করলাম। বেশ রুগী হয়। ঘনঘন মারামারির রুগী আসত। সাথে মাস্তানরা আসত ইনজুরি সার্টিফিকেটের জন্য তদবির করতে। আমি সার্টিফিকেটের ধারাগুলি বুঝতাম না। দফাদার আমাকে বুঝিয়ে দিতেন।

একদিন মুদির দোকানের সামনে চেয়ার ফেলে বসে আমরা গল্প করছিলাম। গল্প বলার মধ্যমণি ছিলাম আমি। আমি মজার মজার গল্প বলতাম আর সবাই মনযোগ গিয়ে শুনতেন। মুদির দোকানদার হা করে শুনছিল। হটাৎ সে বলে বসল “স্যার, আপনার কাছে ভালো মানুষ যায় না।” আমি শুনেও না শুনার ভান করে গল্প বলা চালিয়ে গেলাম। কিন্তু ভিতরে ভিতরে লজ্জা পেলাম। ভাবলাম মারামারির কেসের দালাল ও মাস্তানরা যেহেতু আমার চেম্বারে ঘুরাফেরা করে লোকটি হয়ত তাদের মিন করে বলছে ভাল মানুষ আমার কাছে যায় না। কিছুক্ষণ পর লোকটি আবারো ঐ কথা বলে বসলো। তখন আর ধৈর্য ধরতে পাড়লাম না। বললাম “ঐ মিয়া, ফাইজলামি কথা বলবেন না। ভালো মানুষ কি শুধু আপনার কাছে আসে?”
– স্যার, রাগ করছেন, ক্যা? আমি অনেকবার আপনার বাসায় গিয়েছি একটু খোজ খবর নিতে। সব সময় দেখেছি রুগী আর রুগী, একজনও ভাল মানুষ না।
– ও তাই বলুন।

একদিন বিকেলে বাজারে এক ঔষধের দোকানে বসে গল্প করছিলাম। একজন যুবক ১০/১২ জন সাংগ নিয়ে আসল। দোকানদার তার পরিচয় ও ক্ষমতা বর্ননা করে আমার পাশে বসাল। কথাবার্তায় বেশ ভদ্র। শিক্ষিত যুবক। বললেন
– কেমন চলছে আপনার হাসপাতাল?

 আমি আমার হাসপাতালের ভালদিকগুলি তার কাছে তুলে ধরলাম।

– আপনার মেডিকেল এসিস্টেন্ট পাবলিকের হাতে মাইর খাবে।
– কেন? কি করেছে?
– খুব খারাপ? আপনি পুরুষ রুগী আর উনি মহিলা রুগী দেখছেন কেন?
– এমনি, ভাগ করে নিয়েছি, সুবিধার জন্য।
– মহিলা রুগী আপনার সেবা পাওয়ার অধিকার আছে না? বুদ্ধিটা তো আপনার মেডিকেল এসিস্টেন্টের। ও বেটা মহিলাদের থেকে টাকা পয়সা, ডিম সব্জি ইত্যাদি নিয়ে বেশী করে ঔষধ দেয়। সেদিন আমার ভাবীর কাছ থেকে ১২ টাকা নিয়েছে। নিজে যা বুঝবেন তাই করবেন। ও বেটার বুদ্ধিতে চলবেন না।
– আচ্ছা আমি দেখব। আপনারা কিছু কইরেন না।

পরদিন হাসপাতালে রুগী দেখছিলাম। এগারটা বেজে গেল। মেডিকেল এসিস্টেন্ট এলেন  না। মহিলা রুগীগুলি গেঞ্জাম শুরু করে দিল। কেউ একজন এসে আমাকে বলল “বাসায় যান, সমস্যা আছে”।

আমি বাসায় দিয়ে দেখি উঠুনে মেডিকেল এসিস্টেন্ট খালি গায়ে শুয়ে গোংরাচ্ছে। সারা শরীরে ফাটা ফাটা মাইরের দাগ। আমি বললাম
– কে মেরেছে, কি দিয়ে মেরেছে?
– দুইটি স্কুল পড়ুয়া ছেলে রাস্তা দিয়ে আসার সময় আচমকা কাউল্ফা গাছের ডাল দিয়ে বেদম পিটিয়েছে। আমি ব্যাথা সহ্য করতে পারছি না।

আমি নিজেই তার সারা শরীরে ব্যাথানাশক মলম লাগিয়ে দিলাম। আমি আবারো কিংকর্তব্য বিমুড় হলাম। আমি জিগালাম
– উপরের লেভেলে কাউকে জানাব?
– না স্যার, এরা এলাকার ছেলে, আরো ঝামেলা বাড়তে পারে।

পিওনকে দিয়ে তাকে বাড়ীতে পাঠিয়ে দিলাম। সব রুগী বিদায় করে দিলাম।

দুপুরের খাবার খেয়ে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে রইলাম। দুইটার সময় এক অপরিচিত লোক এলেন। আমাকে বললেন “ইনি এলাকার লোক, এলাকার ছেলেরা মেরেছে, আমরাই এর মিমাংসা করে দিতে পারব। আপনি উপরে কাউকে জানাইয়েন না।” এক ঘন্টা পর আরেকজন এসে একই কথা বলে গেলেন। আমি অপরিচিত লোকদের সাথে কি কথা বলে কোন বিপদে পড়ি ভেবে লুকিয়ে থাকার পরিকল্পনা করলাম। থাকার ঘরে দুইটি দরজা ছিল। এক দরজা দিয়ে বেড় হয়ে তালা লাগালাম। আরেক দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে কপাট লাগিয়ে দিলাম। বুঝালাম ডাক্তার তালা লাগিয়ে চলে গিয়েছে। চৌকিতে শুয়ে রইলাম। জুলাই মাস প্রচন্ড গরম পড়েছিল। বাইরে কয়েকজন লোকের আওয়াজ পেলাম। বলাবলি করছিল
-ডাক্তার মনে হয় ভয়ে পালিয়েছে।
-মনে হয় ভিতরেই আছে।
-ডাক্তার সাব, আমি অমুক উপজেলার একাউন্ট অফিসার, এলাকায়ই বাড়ী। ভিতরে থাকলে দরজা খুলুন।
এই বাচ্চা বেড়ার নিচ দিয়ে দেখো তো ভিতরে কোন মানুষ দেখা যায় কিনা।

আমি কাথা দিয়ে সমস্ত শরীর ঢেকে লম্বা হয়ে মরা লাশের মত নিথর পড়ে রইলাম।

-মনে হয় একটা মানুষ কাথা মুরু দিয়ে ঘুমিয়ে আছে।
-এই, এত ঘরমের মধ্যে কেউ কাথা গায় দেয়?

তারা বিফল হয়ে চলে গেলেন। সন্ধ্যা হল, রাত্রি হল, হারিকেন লাগালাম। ফার্মাসিস্টকে কোন দায়িত্ব না দেওয়াতে সে ফ্রি স্টাইলে ঘুরে বেড়াত। আমার কাছ দিয়েও আসত না। আমি একদম একা। আমি হারিকেনের সামনে ঝিম মেরে বসে আমার পরিনতি কি হতে পারে তার বিভিন্ন রকম কল্পনা জল্পনা করছিলাম।

রাত প্রায় ১২ টা। বাইরে ঘুট ঘুটে অন্ধকার। আশে পাশে কেউ নেই। আমি অসহায় একজন একাকি একটি ভুতুরে বাড়ীতে বসে আছি। হটাৎ উত্তর পাশের জানালা দিয়ে নিচু স্বরে একটি শব্দ আসল “ঘুম আসে না, স্যার?” আমি চমকে গেলাম। তাকিয়ে দেখি জানালা খোলা।
– কেক, কেক, কে ওখানে?
লোকটি ফস করে মেচ দিয়ে কুপি বাতি ধরিয়ে মুখের পাশে ধরে এক ঝাকা দাত বেড় করে বললেন
– আমি আপনার ফার্মাসিস্ট, স্যার।
– আপনি এখানে কি করছেন? জানালা দিয়ে উকি মারছেন কেন? চলে যান।
– আপনাকে একা রেখে কি চলে যাওয়া যায়?
-আপনি একটা আস্তা পাগল।
– পাগল আমি না, স্যার, পাগল আপনার মেডিকেল এসিস্টেন্ট । সে তো মাইর খাইছে ওর পিওন বেটাও মাইর খাবে। আপনি দানবীরের মত এক মাসের ঔষধ দুই তিন দিনে বিতরন করে শেষ করে ফেলেছেন। আগামীকাল ঔষধ দিতে না পাড়লে পাবলিক আপনার উপরও চড়াও হবে। আপনার আগের অফিসার ঔষধের লিস্ট দিয়ে গেছেন মেডিকেল এসিস্টেন্টের কাছে, আর ঔষধের স্টোরের চাবি দিয়েছেন আমাকে। এখন বুঝুন কে পাগল। বাচতে চাইলে ঔষধের চাহিদা দিন। আমি আগামীকালই নিয়ে আসি।
– মেডিকেল এসিস্টেন্ট বলেছে ঔষধ আনতে ৪০০ টাকা ঘুষ দিতে হবে। এই টাকা নাকি আমার নিজের পকেট থেকেই দিতে হবে। আমি পারব না।
– নাউজুবিল্লাহ, ও বেটা একটা বেআক্কেল। কেউ কি অফিসার থেকে ঘুষ নেয় নাকি। অফিসারকেই ঘুষ দিয়ে চলতে হয়। ঘুষ দিতে হলে আমিই আমার পকেট থেকে দিব। আপনে জানবেন কেন?
– আপনি নাকি আগের স্টেশনে এলাকার লোকদেরকে পিটায়েছিলেন?
– ওখানে ওরা আমার অফিসারকে তাপ্পর মেরেছিল। স্যার আমার সামনে কাঁদছিলেন। আমার মাথায় রক্ত উঠে গিয়েছিল। আমি তাদেরকে আন্দাগুন্দা পিটিয়ে পালিয়ে এসেছিলাম। ওখান থেকে এখানে আমাকে বদলি করা হয়েছে। অফিসারের জন্য প্রয়োজনে জীবন দিব। স্যার, আমি কি ভিতরে আসতে পারি?

আমি দরজা খুলে তাকে ভিতরে এনে বসালাম। তিনি তার জীবনের অনেক কাহিনী শুনালেন। তিনি আমাকে অনেক নিয়ম কানুন শিখালেন। আমি তার ভিতর মেধা খুজে পেলাম। তার উপর ভরসা আসল। তিনি ঔষধের চাহিদা প্রস্তুত করে আমার সই নিলেন। তিনি আমাকে পরামর্শ দিলেন আমি যেন এলাকার গণ্যমান্য ব্যাক্তিদের নিয়ে উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ে পরের দিন একটি মতবিনিময় সভা করি। আমি ঘুমিয়ে পরলাম। ভোরে তিনি ঔষধের জন্য বরিশাল সিভিল সার্জন অফিস চলে গেলেন এবং সন্ধায় চাহিদার ঔষধ নিয়ে ফিরে এলেন। কোন রকম ঘুষ ছাড়াই। আমি একটা সাদা কাগজে নোটিশ লিখে পিওন দিয়ে হেড, মাস্টার, ব্যাংক ম্যানেজার, দফাদার এবং আরো কয়েকজন লোক নিয়ে হাসপাতালে মিটিং করলাম। মিটিং-এ এক যুবক হটাৎ হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল “ডাক্তার সাব, আমার ব্লাড প্রেসারটা একটু মেপে দেন না।” আমার ভিতরে রাগ উঠে গেল। কিন্তু তা প্রকাশ হতে দিলাম না। সামনের দাতের অর্ধেক বের করে হাসির ভান করে বললাম “এখন তো মিটিং চলছে, মিটিং শেষে মেপে দিব।” মিটিং-এ মেডিকেল এসিস্টেন্টের বড়ভাই উপস্থিত ছিলেন। সিদ্ধান্ত হল এক দিন পর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার উপস্থিতিতে স্কুল ভবনে এর বিচার হবে।

বিচার বসল। হেডমাস্টার ভুমিকা ভাষণ দেয়ার সাথে সাথে যেই যুবকের ইংগিতে মাইর দেয়া হয়েছে সেই যুবক বলে উঠলেন “আমার ভাগ্না অন্যায় করেছে তার বিচার আমিই করছি।” বলেই একটা পাতলা বেত দিয়ে হাল্কা করে একটা আঘাত করলেন তার দশম শ্রেণীতে পড়ুয়া ভাগ্নাটাকে। সাথে সাথে হেডমাস্টার তাকে উদ্ধার করে সরিয়ে ফেললেন। বললেন “বাচ্চা, মানুষ অন্যায় করে ফেলেছে, তাকে তো মেরে ফেলা যায় না।” সবাই তাতে রায় দিলেন। বিচার শেষ হল।

একদিন পর মেডিকেল এসিস্টেন্ট আমাকে নিয়ে উপজেলায় গেলেন। উপজেলা কর্মকর্তাসহ আমরা জেলা সিভিল সার্জন অফিসে গিয়ে সিভিল সার্জন ও ডেপুটি সিভিল সার্জনের সামনে ঘটনা তুলে ধরলাম। এক সময় অফিস কক্ষে একা ডাকলেন। বসা ছিলেন সিভিল সার্জন (সি এস) ও ডেপুটি সিভিল সার্জন(ডিসিএস)। সিএস আমার সংক্ষিপ্ত বায়োডাটা জেনে নিলেন। বললেন
– তুমি যেখানে আছো, তার ছয় কিলো মিটার চতুরদিকে কোন এম বি বি এস ডাক্তার নেই। ওখানে তুমি অবস্থান করে প্রাইভেট প্রাক্টিস করবে। অনেক রুগী পাবে। এলাকার লোকজন ভাল। ভাল ডাক্তারের সাথে তারা ভাল আচরণ করবে। তোমার চিন্তা নাই। তোমার মেডিকেল এসিস্টেন্টকে বদলি করে ওএসডি করে রাখব। তোমার সাথে অন্য কোন মেডিকেল এসিস্টেন্ট দিব না। তোমার বর্তমান পিওন বদলি করে ভাল একজন দিব।
– স্যার, আমি অফিস টাইমের বাইরে প্রাইভেট রুগী দেখি।
– অফিস টাইমেও সরকারি ফ্রি রুগী দেখার ফাকে ফাকে প্রাইভেট রুগী দেখবে। তারা অনেক দূর থেকে নৌকা নিয়ে তোমার কাছে আসবে, বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করালে বিরক্ত হবে। ওরা ধনি মানুষ। ওদের সাথে গরীবরা রাগ করবে না। তোমার প্রতি গরীবরা রাগ করবে না। ঝামেলায় ফেললে ধনিরাই ফেলবে। হাসপাতালের ঔষধ গরীব-ধনি সবার জন্য। কাজেই, প্রাইভেট রুগীর প্রেস্ক্রিপশনের ঔষধ যদি হাসপাতালে থাকে তবে তাদের দিবে। হিসাবের খাতায় ঔষধের খরচ লিখে রাখবে। ঐ খাতা বাসায় নিয়ে যাবে। বাসায় ঔষধ রাখবে। ওখান থেকেও ঔষধি দিয়ে খাতায় লিখে রাখবে। তুমি তো এটা বেচে দিচ্ছ না। ফার্মাসিস্ট পাগল হলেও ভাল মানুষ। তার কাছেও কম দামের কিছু ঔষধ রাখবে। সেও অল্প স্বল্প প্রাক্টিস করে।

ডিসিএস বলনেন
– আমার বাড়ীও ওখানে। সিএস স্যার যা বলেছেন, ঠিক বলেছেন। আপনি যখনি চাহিদা পাঠাবেন আমি এক কার্টুন ঔষধ বেশী দিব।

আমি নির্বাক হয়ে শুনছিলাম। ভাবলাম আবার যে কোন বিপদ আমার জন্য অপেক্ষা করছে।

দুই একদিন পর নতুন এক অত্যন্ত ভাল পিওন এসে গেল। পাড়ার একজন প্রাক্তন পিওন এসে তার ছেলেকে আমার খেদমতে দিয়ে গেলেন। দফাদার আমার সিকিউরিটি বন্ধু। সিএস ও ডিসিএস স্যারগনের পরামর্শ মত সব ঠিক ঠাক মত চলল। পাগলা ফার্মাসিস্ট-এর সাথে কত যে মজার মজার আলাপ হয়েছে! তার কাছ থেকেই বেশির ভাগ অফিসিয়াল নিয়মকানুন আমার শেখা। জানি না সে এখন বেচে আছে কিনা।

তারিখঃ ১৬/৬/২০১৭ ইং
ময়মনসিংহ – কিশোরগঞ্জ – ময়মনসিংহ জার্নি