hatirjhil

হাতিরঝিল

(ইতিহাসের টুকরো)

মোগল সম্রাট আকবরের রাজত্বের প্রথম দিকে তাঁর প্রধান রাজধানী ছিল আগ্রা। তবে তাঁর শাসনামলে রাজধানী একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছিল।

সম্রাট আকবর দীর্ঘদিন নিঃসন্তান ছিলেন। পুত্রসন্তানের আশায় তিনি সিক্রিতে বসবাসকারী সুফি সাধক শেখ সেলিম চিশতির কাছে যান এবং তাঁর কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন। শেখ সেলিম চিশতি তাঁকে পুত্রসন্তানের আশীর্বাদের জন্য দোয়া করেন।

এর কিছুদিন পর আকবরের স্ত্রী মরিয়ম-উজ-জামানি, যাঁকে ইতিহাসে সাধারণভাবে জোধা বাই নামে উল্লেখ করা হয়, গর্ভবতী হন। ১৫৬৯ সালের ৩১ আগস্ট সিক্রিতে তাঁর গর্ভে এক পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। তাঁর নাম রাখা হয় নূরউদ্দিন মুহাম্মদ সেলিম। এই সেলিমই পরবর্তীকালে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর নামে পরিচিত হন।

পুত্রসন্তানের জন্মে অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে সম্রাট আকবর সিক্রিতে শেখ সেলিম চিশতির স্মরণে একটি বৃহৎ স্থাপত্য কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেন। পরবর্তীকালে সেখানে নির্মিত হয় বিখ্যাত ফতেহপুর সিক্রি। শেখ সেলিম চিশতির সমাধিও সেখানে অবস্থিত। সমাধিটি পরবর্তীকালে সাদা মার্বেল পাথরে সুসজ্জিত করা হয়।

আকবর ১৫৭১ সালের দিকে ফতেহপুর সিক্রিকে তাঁর সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন এবং প্রায় ১৫৮৫ সাল পর্যন্ত এটি মোগল সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। এখানেই তিনি তাঁর দরবার বসাতেন এবং তাঁর বিখ্যাত নবরত্নদের নিয়ে সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন।

আজও ফতেহপুর সিক্রিতে গেলে সেই ইতিহাসের অনেক নিদর্শন চোখে পড়ে—সম্রাট আকবরের রাজদরবার, প্রাসাদ, মসজিদ এবং শেখ সেলিম চিশতির সমাধি। শত শত বছর পেরিয়ে গেলেও এসব স্থাপনা যেন মোগল সাম্রাজ্যের সেই গৌরবময় সময়ের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সম্রাট আকবরের পুত্র সেলিম যখন যুবরাজ, তখন ফতেহপুর সিক্রিতেই তাঁর সঙ্গে বেড়ে ওঠেন শেখ সেলিম চিশতির নাতি শেখ আলাউদ্দিন চিশতি। দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে ঘনিষ্ঠ বাল্যবন্ধুত্ব । সিংহাসনে আরোহণের পর সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁর সেই বাল্যবন্ধুকে “ইসলাম খান” উপাধি দেন এবং ৫,০০০ মনসব প্রদান করেন। প্রথমে তাঁকে বিহারের সুবাদার নিযুক্ত করা হয়।

১৬০৮ সালে বাংলার সুবাদার জাহাঙ্গীর কুলি খানের মৃত্যুর পর জাহাঙ্গীর ইসলাম খান চিশতীকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন। তখন বাংলা মোগল সাম্রাজ্যের অধীন হলেও পূর্ব বাংলার ভাটি অঞ্চলে বারো ভূঁইয়া, আফগান নেতা ও স্থানীয় জমিদারদের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। বিশেষ করে মুসা খান, ঈসা খানের পুত্র ও ভাটি অঞ্চলের প্রধান নেতা, মোগল কর্তৃত্বের অন্যতম প্রধান প্রতিপক্ষ ছিলেন।

ইসলাম খান ১৬০৮ সালের শেষদিকে রাজমহল থেকে বিশাল মোগল বাহিনী নিয়ে পূর্ব বাংলার দিকে অগ্রসর হন। তাঁর সঙ্গে ছিল অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্য, কামান, হাতি এবং বিপুলসংখ্যক যুদ্ধনৌকা। পথে বিভিন্ন স্থানীয় শক্তিকে বশে এনে তিনি ধীরে ধীরে পূর্ব বাংলার দিকে অগ্রসর হতে থাকেন।

১৬০৯ সালের জুনে তিনি দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে পৌঁছান। বর্ষাকাল শুরু হওয়ায় সেখানে অবস্থান করে তিনি পরবর্তী ভাটি অভিযানের প্রস্তুতি নেন। ১৫ অক্টোবর ১৬০৯ ঘোড়াঘাট ত্যাগ করে তিনি দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অগ্রসর হন। করতোয়া নদীর পথ ধরে শাহজাদপুর অঞ্চলে পৌঁছে তাঁর নৌবাহিনীর সঙ্গে মূল বাহিনীর সমন্বয় ঘটে।

এরপর তাঁর প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ান মুসা খান ও বারো ভূঁইয়ারা। ব্রহ্মপুত্র, ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা নদীঘেরা দুর্গ ও নৌবাহিনী দিয়ে তাঁরা মোগল বাহিনীকে প্রতিরোধ করেন। ইসলাম খান একে একে যাত্রাপুর ও ডাকছড়া দুর্গ দখল করেন। মুসা খানের প্রতিরোধ ভেঙে গেলে ঢাকার পথ খুলে যায়।

অবশেষে ১৬১০ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইসলাম খান চিশতী ঢাকায় প্রবেশ করেন। তিনি রাজমহল থেকে বাংলার রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করেন এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের নাম অনুসারে ঢাকার নাম দেন জাহাঙ্গীরনগর। রাজমহল থেকে শুরু করে ঘোড়াঘাটের দীর্ঘ অবস্থান, ভাটি অঞ্চলের যুদ্ধ এবং নদীপথের প্রতিরোধ পেরিয়ে ঢাকায় পৌঁছাতে তাঁর অভিযানে প্রায় দেড় বছর সময় লেগেছিল।

ইসলাম খান চিশতী ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় তাঁর সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ভাটি বাংলার শক্তিশালী বারো ভূঁইয়া, বিশেষ করে ঈসা খানের পুত্র মুসা খান। নদী-নালা ও দুর্গম জলাভূমিকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা মোগল বাহিনীকে দীর্ঘদিন প্রতিরোধ করেন। ইসলাম খানও সরাসরি যুদ্ধের পাশাপাশি কৌশল ও নৌ-সামরিক শক্তি ব্যবহার করে একের পর এক তাঁদের ঘাঁটি দখল করতে থাকেন।

শেষ পর্যন্ত ১৬১০ সালের দিকে মুসা খান ও অন্যান্য প্রধান ভূঁইয়ারা মোগল সম্রাটের কর্তৃত্ব স্বীকার করে ইসলাম খানের কাছে বশ্যতা স্বীকার করেন। তাঁরা নিজেদের জমিদারি ও সম্পত্তির অধিকার বজায় রেখে মোগল সম্রাটের অধীনস্থ হিসেবে রাজস্ব প্রদান ও প্রয়োজনমতো সামরিক সহযোগিতা করার ব্যবস্থা মেনে নেন। এভাবেই পূর্ব বাংলায় মোগল কর্তৃত্ব ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়।

তবে সব প্রতিরোধ তখনই শেষ হয়ে যায়নি। খাজা উসমান-এর মতো আফগান নেতারা শেষ পর্যন্ত মোগলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে যান। ফলে ইসলাম খানের বাংলা বিজয় ছিল একদিনের ঘটনা নয়; এটি ছিল কয়েক বছর ধরে চলা সামরিক অভিযান, কূটনীতি ও স্থানীয় শক্তিগুলোকে মোগল প্রশাসনের অধীনে আনার একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া।

মোগল আমলে ঢাকায় রাজকীয় হাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনা ছিল। হাতি রাখা, পোষ মানানো ও প্রশিক্ষণের জন্য যে স্থান ব্যবহৃত হতো, সেটিই ক্রমে পিলখানা নামে পরিচিত হয়। ‘পিল’ ফারসি শব্দ, যার অর্থ হাতি; আর ‘খানা’ অর্থ স্থান বা ঘর—অর্থাৎ পিলখানা মানে হাতি রাখার স্থান বা হাতিশালা। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, মোগল ও পরবর্তী ব্রিটিশ আমলেও ঢাকার পিলখানা হাতি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

পিলখানায় থাকা হাতিগুলোকে নিয়মিত গোসল করানো এবং চারণের জন্য আশপাশের জলাভূমি ও ঝিল এলাকায় নিয়ে যাওয়া হতো। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, পিলখানার হাতিগুলোকে যে ঝিলে গোসল করানো হতো, সেই কারণেই ঝিলটি একসময় “হাতির ঝিল” নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

হাতিগুলোর চলাচলের সঙ্গে ঢাকার আরও কয়েকটি স্থানের নাম জড়িয়ে আছে। পিলখানা থেকে হাতিদের নিয়ে যাওয়া হতো বর্তমান এলিফ্যান্ট রোড হয়ে; পথের একটি পারাপারের স্থান পরবর্তীকালে হাতিরপুল নামে পরিচিত হয়। এসব নাম আজও ঢাকার পুরোনো ইতিহাসের সঙ্গে হাতির সেই দিনের সম্পর্কের স্মৃতি বহন করে চলেছে।

আজকের আধুনিক হাতিরঝিল আর সেই পুরোনো জলাভূমি এক নয়—সময়ের সঙ্গে এর চারপাশে নগরায়ণ হয়েছে এবং পরবর্তীকালে হাতিরঝিলকে আধুনিক বিনোদন ও নগর ব্যবস্থাপনা প্রকল্প হিসেবে উন্নত করা হয়েছে। কিন্তু নামটি যেন তার বহু পুরোনো একটি স্মৃতি ধরে রেখেছে—এই জলাভূমির পানিতে একসময় ঢাকার রাজকীয় হাতিরা গোসল করত।

শত শত বছর আগে যে জলাভূমির সঙ্গে ঢাকার রাজকীয় হাতির স্মৃতি জড়িয়ে ছিল, সেই হাতিরঝিল আজ আধুনিক ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ জলাশয় ও নগর বিনোদনকেন্দ্র। সময়ের সঙ্গে এর চেহারা বদলেছে, কিন্তু জলাধার হিসেবে এর গুরুত্ব রয়ে গেছে।

বর্তমান সরকারও ঢাকার জলাশয়, খাল ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে নগর পরিবেশ উন্নয়নের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা বলছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশনের সমস্যা সমাধানে খাল পুনঃখনন, জলাশয় সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন।

হাতিরঝিলকে ঘিরে গুলশান-বনানী-বারিধারা লেকের সঙ্গে জলপথের সংযোগ এবং সমন্বিত উন্নয়নের পরিকল্পনাও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। এর উদ্দেশ্য শুধু সৌন্দর্যবর্ধন নয়; বরং জলাধার সংরক্ষণ, পানি চলাচল, জলাবদ্ধতা কমানো এবং ঢাকার পরিবেশ ও যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা।

একসময় যেখানে রাজকীয় হাতিরা পানিতে নামত, সেই হাতিরঝিল আজ আধুনিক নগরীর অংশ। ভবিষ্যতে যদি এর জলাধার, পরিবেশ ও স্বাভাবিক পানি প্রবাহ রক্ষা করা যায়, তাহলে হাতিরঝিল শুধু অতীতের একটি নাম নয়—ঢাকার ভবিষ্যৎ নগরজীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে।

ময়মনসিংহ

৩ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.

#হাতিরঝিল#ইতিহাসেরটুকরো#ঢাকারইতিহাস#হাতিরঝিলেরইতিহাস#ঢাকা#জাহাঙ্গীরনগর#ইসলামখানচিশতি#মোগলইতিহাস#বাংলারইতিহাস#পুরানঢাকা#পিলখানা#ইতিহাস#বাংলাদেশেরইতিহাস