Kamrul
কাম্রুল
কামরুল
(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
ওকে পেলাম ৫৫ বছর পর। তাই সাথে নিয়ে ছবি তুললাম। ওর নাম কামরুজ্জামান। চাচীর ছোট ভাই সোহরাব মামার বড় ছেলে। চাচী ছিলেন বাবার চাচাতো ভাই মরহুম শামসুদ্দিন (শমে ডাক্তার) তালুকদারের স্ত্রী। ওনাদের বাড়িটা হচ্ছে আমাদের বাড়ির উত্তরে বুইদ্দার চালায়। চাচীর বাবার বাড়ি হচ্ছে কালিহাতী উপজেলার আমজানী গ্রামে। বাড়িটা বর্গা-আমজানী-তালতলা-দেওপাড়া রাস্তার সাথেই। ওনাদের বাড়ির উত্তর পাশেই ছিল বলরাম বসু ওরফে বলাই বাবুর বাড়ি। চাচীর ছোট দুই ভাই – খসরু ও সোহরাব। সোহরাব মামুর বয়স আমাদের ডাক্তর কাক্কুর বড় ছেলে মরহুম ইখতিয়ার উদ্দিন বাশার (বাশার মাষ্টার) ভাইর সমান। ছোট বেলায় আমি সিদ্দিক ভাইয়ের সাথে সিদ্দিক ভাইর মানুর বাড়ি গিয়েছি। সিদ্দিক ভাইও ডাক্তর কাক্কুর ছোট ছেলে, আমার থেকে ৪ বছরের বড়। একবার সিদ্দিক ভাইর সাথে ঐ বাড়িতে গিয়ে তিন দিন ছিলাম। ঘটনাটা মুক্তিযুদ্ধের আগের। সোহরাব মামুগ বাড়ির দক্ষিণ দিকে দিগন্ত জুড়ে বিস্তির্ণ শস্যের মাঠ ছিল। তখন মাঠ ভর্তি খেসারি কলাই গাছ ছিল চামাড়া ধানের নাড়া বিছানো খেতে। আমি নাড়ার উপর পরন্ত বিকেলে গড়াগড়ি খাচ্ছিলাম আর কচি কচি ছেই তুলে খাচ্ছিলাম। কথায় কথায় সিদ্দিক ভাইর সাথে কি নিয়ে যেন বিরক্ত হয়ে তাকে বিরক্ত করছিলাম। তিনি বিরক্ত হয়ে আমার মুখে থুতু নিক্ষেপ করলেন। আমি এসেছি সিদ্দিক ভাইর সাথে তার নানা বাড়ি, সেই নাকি আমার মুখে থুতু নিক্ষেপ করেছে, এই ক্ষোভ নিয়ে আমি সোহরাব মামুগ বাড়ি চলে গিয়ে কাপড় চোপড় গুছিয়ে৷ নিয়ে চিতকার করে বললাম, “আমি তগ মামুর বাড়ি থাকমু না। আমার মুখে ছেব দিছস!” তখন সোহরাব মামুর স্ত্রী বাড়ির নতুন বউ। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “আমরা সিদ্দির বিচার করমু। যাইয়ো না, বাবা।” আমি খোভ দেখিয়ে বললাম, “এই বাইত্যে থাকমু না, আমি বুগ বাড়ি গিয়া থাকমু।” জোর করেই চলে গেলাম হাফ কিলোমিটার দূরের আমার বড় আপার শশুর বাড়ি লাইলি বুবুর কাছে। এই হলো মুক্তিযুদ্ধের আগের ছোট বেলার একটা কাহিনি।
১৯৭১ সনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমজানি থেকে প্রায় এক দেড় কিলোমিটার কাছেই দেওপাড়ার পাহাড়ের চুড়ায় বাংকার করে ক্যাম্প তৈরি করে। ওখান থেকে আশে পাশের গ্রামগুলোতে প্রতিদিন তারা সেল নিক্ষেপ করে আতংক তৈরি করতো। যুবুকদেরকে ধরে নিয়ে মেরে ফেলতো। গ্রামে প্রবেশ করে ধান, চাল, গরু, ছাগল, হাস মুরগী সব লুট করে নিয়ে যেতো। বুবু, দুলাভাই, তার দুই সন্তান নিয়ে আমাদের বাড়ি চলে এলেন। মুক্তি যুদ্ধের ৯ মাস তারা আমাদের বাড়িতেই ছিলেন। তখন আমি ক্লাস ফাইভে পড়তাম। সোহরাব মামু তার দুই সন্তান কামরুল ও কামালকে নিয়ে সিদ্দিক ভাইদের বাড়িতে উঠলেন। মরহুম মাওলানা সালাহউদ্দিন ছিলেন সিদ্দিক ভাইর পিঠাপিঠি বড় হেলেনা আপার স্বামী। তিনি এই বাড়ির সাথেই বাড়ি করে থাকতেন। তিনি তার বাংলাঘরে থাকতে দিলেন আমজানী গ্রামের এক হিন্দু শিক্ষক নাম তার মৃত্যুঞ্জয় বাবু। তিনি বর্গা স্কুলের অংকের টিচার ছিলেন। তার দুই ছেলে ছিল। বড়টার নাম ছিল অসীম। ও একটু ঝড়ঝড়া ছিল। ওর ছোটটা ছিলো দুধের বাচ্চা। ওরাও ৯ মাস এখানেই ছিলো।
মুক্তি যুদ্ধ কালীন ৯ মাস আমাদের স্কুল বন্ধ ছিলো। কোন কাজ ছিলো না। স্কুল বন্ধ থাকলে কোন পড়াও থাকে না। কামুরুলকে নিয়ে বেড়াতাম, খেলতাম। কামালকে কোলে নিয়ে বেড়াতাম। অসীমকে আদর করতাম, বিরক্ত করতাম। এমন অনেক স্মৃতি আছে কামরুল, কামাল, অসীম এবং ওর ছোট ভাইকে নিয়ে।
অনেক বছর আগে, ২০০০ সনের পরে সিদ্দিক ভাইর ছোট বোন ছালে (সালমা) আপার কাছে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
– সোহরাব মামুর ছেলেটা কি করে?
– গত বছর মইরা গেছে। অনার্স মাস্টার্স পাশ কইরা কোম্পানিতে একটা ভালা চাকরি করতো। হঠাৎ কইরা জ্বর আইসা ঢাকায়ই ঘরে মরেছিল।
সেই থেকে আমি জানি কামরুল ২০০০ সনে মারা গেছে। কিন্তু গত কাল সিদ্দিক ভাই আমাকে ফোন করে বলেন
– সাদেক, আমগ ছোট মামুর ছেলে কামরুল তার বউকে ডাক্তার দেখাবে। ভালো একজন অর্থোপিডিক্স ডাক্তার দেখিয়ে দিও।
– কামরুল না মারা গেছে শুনছিলাম।
– কামরুল মারা যায় নাই, মারা গেছে তার ছোটটা কামাল। যেটা যুদ্ধের সময় ছেচইর (হামাগুড়ি) পাড়তো উঠানে।
আমি কামরুলকে বউ নিয়ে আসতে বললাম। আমার চেম্বারে আসতে দেড়ি হবে। তাই বলে দিলাম আগেই ডাক্তার দেখাতে। ডাক্তার দেখানো শেষে ওরা আমার কক্ষে প্রবেশ করলো। দেখি পাকা চুল, পাকা দাড়ি ওয়ালা অন্য রকম এক বৃদ্ধ কামরুল। তার বউয়ের প্রেস্ক্রিপশন পড়ে দেখলাম। বয়স লিখেছে ৬০ বছর। বললাম, “ভালো হয়ে যাবে ইনশা আল্লাহ। “
আমি কামরুলের কাছে তাদের বাড়িতে যাওয়া, ফিরে আশা ও মুক্তি যুদ্ধের সময়ের গল্প বললাম। আমি বললাম
-আমি তো জানি তুমি মারা গেছো। তাই আর খোজ নেই নাই। আমার স্মৃতিতে এত দিন সেই ছোট্ট কামরুলই ছিল। আজ থেকে বৃদ্ধ কামরুল হয়ে গেলো। তুমি লেখা পড়া কি পর্যন্ত করেছিলে?
– আমি এইচ এস সি পাস কঅরে মালয়েশিয়া গেছিলাম। সেখান থেকে এসে আবার সৌদি আরব গেছিলাম। সারাজীবন বিদেশে চাকরি করেই কাটিয়েছি।
– তোমার সাথে একটা ছবি তুলে রাখবো, স্মৃতি কথা লিখে ফেইসবুকে দিবো। পড়ে দেখবে। আসো।
ওর বউ বলো, “চুল আচরাও।”
দুইজনই আমাকে ওদের বাড়ি যাবার জন্য দাওয়াত দিলো। আমি যাবো বলে কথা দিলাম। আমাদের বাসায় থাকতে বললাম। বললো, “সি এন জি অটোরিকশা ভাড়া করে এসেছি। ফিরতে হবে।”
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ময়মনসিংহ
