bashdola

বাঁশ ডলা

(ছোট গল্প)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

গতরাতে তছির উদ্দিনের ঘুম হয়নি। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে এসেছে আনন্দ করতে, কিন্তু মনে তার আনন্দ নেই। সে সবসময় ভাবছে কক্সবাজার আসার সময় কমলাপুর রেল স্টেশনে দেখা পাগলটা কি সেই বাবুর্চি? যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে বাবুর্চির এই দুরাবস্থার জন্য তছিরই দায়ি। বাবুর্চির বাঁশ ডলা খাওয়া ও হারিয়ে যাওয়ার জন্য তছিরই দায়ি – এই অনুশোচনায় ভোগছে।

তছির উদ্দিন ১৯৭৮ সনের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। বোর্ডের ফাইনাল পরীক্ষার বিশেষ প্রস্তুতি নেয়ার জন্য দুইমাস হোস্টেলে ছিল। একটা বড় কক্ষে ২০ জন পরীক্ষার্থী থাকত। আরেকটা ছোট কক্ষে থাকত তছির উদ্দিন ও হানিফ সিকদার। এক জ্যোস্না রাতে হোস্টেলের কাছেই স্থানীয় যুবসংঘ নাটক মঞ্চস্থ করেছিল। হোস্টেল তত্বাবধায়ক শিক্ষকদ্বয় রাতে ঘুমিয়ে পড়লে বড় রুমের ২০ জনই দরজা খোলা রেখে নাটক দেখতে চলে যায়। তছির শোবার আগে একটু বড় রুমে যায়। দেখে রুমের দড়জা খোলা, ভিতরে কেউ নেই। এদিকে স্যারেরা ঘুমিয়ে পড়েছেন। তছিরের মাথায় শয়তানি বুদ্ধি চাপলো। রুম লিডারের বালিশ ও কম্বল তোষক দিয়ে মুড়িয়ে সিলিং-এর উপর লুকিয়ে রেখে নিজের রুমে চলে গেল। ভোরে নাটক দেখা শেষ করে সবাই রুমে ফিরে দেখে রুম লিডারের বালিশ ও বিছানা পত্র চুরি হয়ে গেছে। রুমে কোথাও পাওয়া গেলো না। কেউ সিলিং-এর উপর খোজ করেনি। লিডার বলল, “চুপি চুপি কথা বলো। স্যারদের ঘুম ভাংলে বিপদ হবে। বেলা উঠার আগেই চুরি যাওয়া মাল উদ্ধার করতে হবে। চল, আমরা জগলু ভাইর কাছে যাই। তিনি এই ব্যাপারে আমাদের কাজে আসতে পারেন।

জগলু ভাইকে অনুরোধ করে হোস্টেলে আনা হলো। তিনি ঘটনার বিস্তারিত শুনলেন। জিজ্ঞেস করলেন

– রুম ছেড়ে যখন নাটক দেখতে গেলে তখন এখানে কে ছিলো?

– পাশের ঘরে মেসের বাবুর্চি ছিলো।

– একাজ বাবুর্চিই করেছে। তাকে ডেকে আনো।

বাবুর্চিকে ডেকে আনা হলো। সে চোখ ঘষতে ঘষতে এসে সালাম দিলো। জগলু ভাই জিজ্ঞেস করলেন

– এই বাবুর্চি, ওদের বিছানা পত্র কোথায় রেখেছ?

– স্যার, আমি তো কিছুই জানি না।

– তাড়াতাড়ি বল কোথায় রেখেছিস। নাবললে পেটের মধ্যে পাড়া মারবো।

– স্যার, খোদার কসম, কিছুই জানি না।

স্বীকারোক্তি আদায় করার জন্য বিভিন্ন কৌশল করা শুরু হলো। প্রতিটা হাটুতে শক্ত লাঠি দিয়ে সজোরে আঘাত করা শুরু হলো। কোন মতেই চুরি করার কথা স্বীকার করলো না। প্রতিটি নখের নিচ দিয়ে সূঁচ ঢুকানো শুরু হলো। যন্ত্রণায় শুধু কাতরাচ্ছে। তছির দাড়িয়ে দাড়িয়ে অসহায়ভাবে শুধুই দেখে যাচ্ছে। বলার সাহস পাচ্ছে না যে সেই এই কাজ করেছে। বলে দিলে যদি তছিরের উপরই এরুপ নির্যাতন চলে! বাবুর্চির প্রতিটি আঙ্গুলে সূঁচ ঢুকানো হলো একে একে।

সূঁচ ঢুকানোয় কোন কাজ হলো না। জগলু ভাই বললেন, ” বাঁশ ডলা ছাড়া কাজ হবে না। পাশের ক্ষেতের আইলেই ৬ ফুট লম্বা বাঁশের খুটি ছিল। দু’টা তুলে আনা হলো। একটা বাঁশ বাবুর্চির পিঠের নিচে, আরেকটা বাঁশ পেটের উপর রাখা হলো। এক দিকে জগলু ভাই, আরেক দিকে হোস্টেল লিডার এক যোগে পাড়া দিয়ে প্রচন্ড চাপ দিলো। বাবুর্চি হৃদয়বিদারক একটা চিতকার দিয়ে বললো, “আমি নিছি, স্যার।” জগলু ভাই খুশি হয়ে বললেন,

– এই বার কাজ হয়েছে বাঁশ ডলায়। কোথায় রাখছস?

– বাড়িত নিয়া রাখছি।

– তাড়াতাড়ি নিয়া আয়। নইলে জানে মেরে ফেলবো।

এখান থেকে বাবুর্চির বাড়ি প্রায় আধা কিলোমিটার দক্ষিণে। সে উঠে দাড়িয়ে চোখ মুছতে মুছতে দক্ষিণ দিয়ে চলে গেলো চুরি হওয়া মালামাল ফেরত ফিতে। কিছুদূর গেলে সে আকাশের দিকে দু’হাত প্রসারিত করে আকাশের মালিকের কাছে কি জেন বলে বিচার দিল কেউ তা শুনেনি। তারপর সে গাছ গাছড়ার আড়ালে মিলিয়ে গেলো। সেই যে গেলো আর তাকে ফিরে পেলোনা। আজ ৪৮ বছর হয়ে গেছে বাবুর্চি আর ফিরে আসেনি। তবে কি সে মরে গেছে!

এদিকে বিনা অপরাধে বাবুর্চি মার খেলো তছির উদ্দিনের কারনে। এটা জানাজানি হয়ে গেলে তছিরের খবর আছে। তাই টুকরা কাগজে তছির লিখলো, “বাবুর্চি চুরি করেনি। আমি দুষ্টুমি করে বিছানা সিলিং এর উপর লুকিয়ে রেখেছি। মাইরের ভয়ে প্রকাশ করতে পারছি না।” লিখা কাগজগুলো গোপনে হোস্টেলের দরজার সামনে ছিটিয়ে রাখলো।

দরজা দিয়ে বের হতেই কাগজের লিখা রুম লিডারের চোখে পড়লো। কাগজগুলো কেউ দেখার আগেই টোকিয়ে নিয়ে নষ্ট করে ফেললো। সিলিং এ উকি দিয়ে ঠিকই দেখতে পেলো তার চুরি যাওয়া বিছানা পত্র। রুমের সবাইকে জানিয়ে সতর্ক করে দিলো এগুলো যে বাবুর্চি চুরি করেনি এটা যেন কেউ না জানে। নইলে সবারই খবর আছে। সবাইকে বাঁশ ডলা খেতে হবে।

জীবন অনেক পেরিয়ে গেছে। ৪৮ বছরেও বাবুর্চি ফিরে আসেনি। তছির সারাজীবন অনুশোচনায় ভোগেছে। প্রতি বছর শবে কদরের রাতে বিশেষ ভাবে প্রার্থনা করে গুনাহ মাপের জন্য। ইমাম সাব বয়ান করেন, “আল্লাহ বান্দার সব গুনাহ মাফ করতে পারেন। কিন্তু কেউ যদি আল্লাহর কোন বান্দার প্রতি অন্যায় করে, বান্দায় ক্ষমা না করা পর্যন্ত আল্লাহ তাকে সেই অপরাধের গুণা ক্ষমা করেন না।” এখন মৃত্যুর আগে যদি বাবুর্চির কাছ থেকে ক্ষমা নিতে পারে তছিরের মৃত্যুর পর শেষ বিচারের দিন কিভাবে রক্ষা পাবে, এই ভাবনায় তছিরের ঘুম হয়না। সিদ্ধান্ত নিলেন ফেরার পথে ট্রেন থেকে নেমে প্লাটফর্মে দেখা সেই পাগলটা খোজ করবে। পাগলটা যদি সেই বাশ ডলা খাওয়া বাবুর্চি হয়ে থাকে যে কোন কিছুর বিনিময়ে হলেও ক্ষমা করিয়ে নিবেন।

বিকেল হয়েছে। সবাই বীচের দিকে যাচ্ছে সূর্যাস্ত দেখতে।তছিরের তেমন আগ্রহ নেই সৈকতে যেতে। তার স্ত্রী বুঝতে পারছে সে কোন কিছু নিয়ে চিন্তা করে বিমর্শ আছে। বলে কয়ে তছিরকে নিয়ে সৈকতে গেল। সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন, পর্যটকদের কোলাহল এবং গাং চিলের ডাকে সমুদ্র সৈকতে অন্য রকম এক পরিবেশ সৃষ্টি হলো। ডোবার আগে সুর্যটা একটা লাল বলের মতো দেখা যাচ্ছে। অনেকেউ ওটাকে দু’হাতের মাঝে রেখে ছবি নিচ্ছে, ভিডিও করছে, ফেইসবুকে লাইভ করছে। তছির ডুবন্ত সূর্যাটার দিকে ফেল ফেল করে তাকিয়ে আছে। এক সময় সুর্যটা এমনভাবে কালো মেঘের আড়াল হলো যেন সেই কমলাপুর রেল স্টেশনে দেখা সেই পাগলের মুখ, যাকে দেখে মনে হয়েছে সেই বাশ ডলা খাওয়া বাবুর্চি। দেখতে দেখতে যুর্যটা তলিয়ে গেলো। দূর থেকে মাগরিবের আযানের ধবনি ভেসে এলো “হাইয়ালাল ফালাহ, (কল্লাণের জন্য এসো)।

ময়মনসিংহ

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রি.

#ছোট_গল্প