Author Archives: talukderbd

tetul

ছাদবাগানে থাই মিষ্টি তেতুল চাষ

ছাদবাগানে থাই মিষ্টি তেতুল চাষ – ৫০ সেকেন্ডে তথ্য

১. প্রজাতি পরিচিতি: থাই মিষ্টি তেতুল (Sweet Tamarind) দেখতে বড়, রসে ভরা ও কম টক।

২. চারা রোপণ: ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে বড় টবে বা ড্রামে চারা রোপণ উপযোগী।

৩. মাটি: বালুকাময় ও জৈবসারে সমৃদ্ধ মাটি সবচেয়ে ভালো। পানি নিষ্কাশন ভালো থাকতে হবে।

৪. সার ব্যবস্থাপনা: গোবর, ভার্মি কম্পোস্ট ও অল্প পরিমাণ টিএসপি ও এমপি ব্যবহার করুন।

৫. পানি: সপ্তাহে ২ বার নিয়মিত পানি দিন। অতিরিক্ত পানি জমতে দেবেন না।

৬. ছাঁটাই: গাছের আকৃতি ঠিক রাখতে ছাঁটাই করুন, এতে ফলন বাড়ে।

৭. ফলন: গাছ লাগানোর ২-৩ বছরের মধ্যে ফল দেয়।

৮. রোদ: গাছটি পূর্ণ রোদ পছন্দ করে, ছাদ বাগানের জন্য উপযুক্ত।

৯. রোগবালাই: সাধারণত রোগ কম হয়, তবে প্রয়োজন হলে জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করুন।

১০. ব্যবহার: তাজা খাওয়া যায়, আচার, জ্যাম ও রস বানানো যায়।

ইচ্ছাশক্তি আর যত্ন থাকলে ছাদেই মিলবে বিদেশি মিষ্টি তেতুলের স্বাদ!

kakrol

ছাদবাগানে কাকরোল চাষ

ছাদবাগানে কাকরোল চাষ – ৫০ সেকেন্ডে তথ্য

১. পরিচিতি: কাকরোল পুষ্টিকর সবজি, ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য উপকারী।

২. চারা রোপণ: মার্চ-এপ্রিল বা জুন-জুলাই মাসে রোপণ উপযুক্ত। বীজ বা কন্দ থেকে চাষ করা যায়।

৩. মাটি: জৈবসারে সমৃদ্ধ দোআঁশ মাটি উপযোগী। টব বা ড্রাম ব্যবহার করুন।

৪. মাচা তৈরি: কাকরোল লতাজাতীয় উদ্ভিদ, তাই শক্ত ও ছায়ামুক্ত মাচা তৈরি করা প্রয়োজন।

৫. সার ব্যবস্থাপনা: গোবর, কম্পোস্ট, টিএসপি ও এমপি প্রয়োগ করতে হবে।

৬. পানি: সপ্তাহে ২-৩ বার পানি দিন, তবে জলাবদ্ধতা এড়াতে হবে।

৭. পরাগায়ন: অধিক ফলনের জন্য পুরুষ ফুল থেকে স্ত্রী ফুলে হাতে পরাগায়ন করা যেতে পারে।

৮. রোগবালাই: পোকামাকড় ও ছত্রাক প্রতিরোধে জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করুন।

৯. ফসল সংগ্রহ: চারা রোপণের ৩-৪ মাস পর থেকে ফল সংগ্রহ করা যায়।

১০. উৎপাদন: নিয়মিত পরিচর্যায় একটি গাছ থেকেই বহু ফল পাওয়া যায়।

ছাদে মাচা আর যত্ন থাকলেই ঘরেই মিলবে টাটকা কাকরোল!

dhundol

ছাদবাগানে ধুন্দল চাষ (১ মিনিটে পড়া যায়):

ধুন্দল (sponge gourd) একটি সহজলভ্য সবজি, যা ছাদবাগানে সহজেই চাষ করা যায়।

বীজ বপন:

মার্চ থেকে আগস্ট মাস ধুন্দল চাষের উপযুক্ত সময়। টবে বা ড্রামে ভালোভাবে পঁচানো গোবর, দোআঁশ মাটি ও একটু বালু মিশিয়ে বীজ বপন করুন।

টব ও মাটি:

১৬-১৮ ইঞ্চি গভীর টব বা ড্রাম ব্যবহার করুন। মাটি হতে হবে ঝরঝরে ও পুষ্টিকর।

মাচা তৈরি:

ধুন্দল লতানো গাছ, তাই বীজ গজানোর ১০-১৫ দিনের মধ্যে মাচা বা বাঁশের খুঁটি দিয়ে উঠার ব্যবস্থা করতে হবে।

সার ও পানি:

প্রতি ১৫ দিন পরপর তরল জৈব সার বা কম্পোস্ট দিন। নিয়মিত হালকা পানি দিন, তবে পানি যেন জমে না থাকে।

রোগবালাই:

পোকা বা ছত্রাক হলে নিমতেল বা সাবান পানি স্প্রে করতে পারেন।

ফলন:

বপনের ৫০-৬০ দিনের মধ্যে ফল ধরা শুরু করে। ছোট ও নরম অবস্থায় ফল তুলুন।

ধুন্দল দ্রুত বাড়ে, সহজ পরিচর্যায় ছাদ থেকেই পরিবারের জন্য তাজা সবজি পাওয়া যায়।

myiazaki

মিয়াজাকি

ছাদবাগানে মিয়াজাকি আম চাষ (১ মিনিটে পড়া যায়):

মিয়াজাকি আম, জাপানি এক্সোটিক জাতের লালচে-বেগুনি রঙের দামী আম, এখন ছাদবাগানেও চাষ করা সম্ভব।

চারা নির্বাচন:
বিশ্বস্ত নার্সারি থেকে গ্রাফটেড (কলম করা) মিয়াজাকি আমের চারা সংগ্রহ করুন।

টব ও মাটি:
১৮-২০ ইঞ্চি গভীর টব বা ড্রাম ব্যবহার করুন। দোঁআশ মাটি, গোবর সার, হাড়গুঁড়ো ও ভার্মি কম্পোস্ট মিশিয়ে প্রস্তুত করুন।

রোপণ ও আলো:
রোপণের পর গাছকে ৬-৮ ঘণ্টা রোদ দিতে হবে। ছাদের এমন জায়গায় রাখুন, যেখানে পানি না জমে।

সার ও পানি:
প্রতি মাসে জৈব সার দিন। বাড়ন্ত অবস্থায় নাইট্রোজেন ও ফল আসার আগে পটাশযুক্ত সার দিন। নিয়মিত পানি দিন, তবে জলাবদ্ধতা নয়।

মাচা বা বাঁশ:
গাছ বড় হলে হালকা বাঁশ বা খুঁটি দিয়ে সাপোর্ট দিন।

ফলন ও যত্ন:
সাধারণত ২-৩ বছরে ফল ধরে। ফুল আসার সময় পরাগায়নে সাহায্য করুন। পাখি ও পোকা থেকে বাঁচাতে ফল ব্যাগে ঢেকে দিন।

বিশেষ যত্ন:
গাছটি সৌন্দর্যময় এবং ফলটি দামী হওয়ায় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি।

সঠিক পরিচর্যায় ছাদেই উৎপাদন সম্ভব এই ‘লাল হীরা’খ্যাত মিয়াজাকি আম।

amra

আমড়া

ছাদবাগানে থাই মিষ্টি আমড়া – (এক মিনিটে পড়া যায়)

থাই জাতের মিষ্টি আমড়া ছাদবাগানের জন্য এক অসাধারণ ফলদ বৃক্ষ। এটি দেখতে সাধারণ আমড়ার মতো হলেও স্বাদে মিষ্টি ও কম টক। গাছটি সাধারণত খাটো হয়, টবে চাষযোগ্য এবং বছরে একাধিকবার ফল দেয়।

সঠিক রোদ, পানি ও সুষম জৈবসার ব্যবহার করলে ছাদে সহজেই ফলন হয়। ফলগুলো মাঝারি আকৃতির, খোসাসহ খাওয়া যায়, আর কচি অবস্থায় খেতেও দারুণ। রোগবালাই কম, রক্ষণাবেক্ষণ সহজ—তাই নগরবাসীর জন্য একটি চমৎকার পছন্দ।

ছাদবাগানে নতুন কিছু চাইলে এই মিষ্টি থাই আমড়া হতে পারে লাভজনক ও সুস্বাদু একটি সংযোজন।

pairabond

বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র, পায়রাবন্দ, রংপুর, ১৯ জুন ২০০৪ খ্রি

(পুরনো হার্ড এলবাম থেকে)

রংপুর মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস প্যাথলজি এক্সটার্নাল এক্সামিনার হিসাবে পরীক্ষা নিতে গিয়ে বিকেলে বেড়াতে গিয়েছিলাম।

বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র :

বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে অবস্থিত, যা নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার জন্মস্থান। কেন্দ্রটি তার স্মৃতিকে সম্মান জানাতে নির্মিত হয়েছে।

এখানে একটি ছোট জাদুঘর, পাঠাগার, সভাকক্ষ ও প্রদর্শনী এলাকা রয়েছে, যেখানে বেগম রোকেয়ার জীবন, সাহিত্যকর্ম ও নারীর অধিকার নিয়ে তার আন্দোলনের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত আছে।

শিক্ষার্থী, গবেষক ও ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান। নারীশিক্ষা ও সমাজ সংস্কারে বেগম রোকেয়ার অবদান জানতে এটি এক অনন্য কেন্দ্র।

ma

আমার মা

(স্মৃতিকথা)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমার মায়ের নাম ফাতেমা বেগম। নানা-নানী ডাকতেন ফতে বলে। আমার মার বড় ভাই ছিলেন তিনজন। বোনের মধ্যে মা-ই বড়। মামাদের নাম হোসেন আলী, সিবা উদ্দিন ও রিয়াজ উদ্দিন। আমার একমাত্র খালার নাম লাল বানু। নানার নাম আমির উদ্দিন। নানা বাড়ি কালিহাতির পূর্বে রৌহা গ্রামে। নানা ছিলেন কাজেম উদ্দিন মাস্টার নানার বড় ভাই। সব কথা আমি মা-র কাছে শুনেছি। ব্যবসার জন্য বাবা দীর্ঘদিন বাহিরে থাকতেন। মা আমাদের নিয়ে বাড়িতে থাকতেন। মাঝে মাঝে নানা এসে মাকে দেখে যেতেন। আসার সময় নানা মার জন্য অনেক কিছু আনতেন। লাঠির আগায় পোটলা ঝুলিয়ে কাঁধে নিয়ে আসতেন। সেই পোটলায় থাকতো ছেই (আস্ত কাঁচা খেসারী কলাই), খেশারীর ডাল অথবা বিভিন্ন রকমের মসলা। এসবই নানারা চাষ করতেন। এগুলো আমাদের কিনতে হতো না। নানা শুয়ে শুয়ে আমাকে গল্প শুনাতেন। গল্প ও ছড়াকে আমরা বলতাম হাস্তর। নানা অনেক শিক্ষামূলক হাস্তর বলতেন। তাতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ), তার মেয়ে ফাতেমা (রাঃ) ও মেয়ে-জামাই হজরত আলী (রাঃ)-এর কাহিনী থাকতো।

সন্ধার পরই রাতের খাবার খেয়ে কেরাইস তেলের দোয়াত নিভিয়ে আমরা শুয়ে পরতাম। ঘুমানোর আগে যখন আমরা ঝামেলা করতাম তখন মা আমাদেরকে শান্ত করার জন্য হাস্তর বলতেন। নানা যেভাবে হাস্তর বলতেন মাও সেভাবে হাস্তর বলতেন। ধর্মীয় হাস্তর ছাড়াও মা কিছু কিছু রসিকতার হাস্তর বলতেন। সেগুলো নাকি মা আমার ছোট ফুফুর কাছে শুনেছিলেন। আমি মার ছোট বেলার কথাও জানতে চাইতাম। মা ছোট কালের কথাও বলতেন। মার নাম কে রেখেছে, খালার নাম কে রেখেছে, এমন প্রশ্ন করতাম। মা বলতেন

– তোমার নানা আর তোমার নানার ভায়েরা মিলে কিতাব (পুঁথি) পড়তেন সুর করে। জংগে কারবালা, লাল বানু-শাহ জামাল নামে দুইটা কিতাব ছিল। জংগে কারবালা কিতাবে হযরত ইমাম হোসেনের (রাঃ) মা এবং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর মেয়ে হযরত ফাতেমা (রাঃ)-এর নামের সাথে মিলিয়ে আমার নাম রেখেছেন। লালবানু শাহ জামাল কিতাবে লালবানুর নাম থেকে তোমার খালার নাম রেখেছেন। তোমার খালার শশুর আমাদের খালু হয়। নালের (লালবানুর) শাশুড়ি আমাদের খালা হয়।

– অ, এই জন্যই ত খালার শাশুড়ির চেহারা আর আমাদের নানীর চেহারায় হুবহু মিল আছে।

– তোমার খালার প্রথম বিয়ে খুব ধনী বাড়িতে হয়েছিল। বাড়ির কাছেই। তিন বাড়ি পরেই। ছোট্টুনি থাকতেই তারা নিছিল। গেন্দা বউ দিয়ে তারা কাজ করাতো। একদিন তোমার খালা একাই রান্না ঘরে রান্না করছিল নাড়া (খর) দিয়ে জ্বাল দিয়ে। নাড়ার আগুন বেড়া বেয়ে ঘরের চালে উঠে যায়। দেখে চমকে গিয়ে নালে এক দৌড়ে আমাদের বাড়ি এসে পড়ে। বাড়ি পুড়ে সাব হয়ে যায়। এরপর তারা অপবাদ দেয় যে নতুন বউয়ে বাড়িতে আগুন দিয়ে পালিয়ে গেছে। এইজন্য সেই বিয়ে টিকে নাই। পরে মাইজবাড়ি আমাদের খালাতো ভাইয়ের কাছে বিয়ে হয়েছে।

আমার মায়ের চেহারা খুব সুন্দর ছিল। লম্বাও ও ফর্সা ছিলেন বাবার চেয়ে অনেক বেশি। বাবাকে মার সাথে মানাতো না। আমার মনে প্রশ্ন ছিলো কি করে নানা এখানে মাকে বিয়ে দিলেন। আমি মাকে প্রশ্ন করেছি

– আপনার বিয়েও কি খালার মতো ছুট্টুনি কালে হয়েছিল?

– না, আমি একটু বড়ই ছিলাম। তবে তোমার বাবার চেয়েও ১০ বছরের ছোট ছিলাম। ছেলে দেখে আমাকে বিয়ে দেয় নাই। বাজানে দেখছে বংশ। তালুকদার বংশ। তাছাড়া তোমার দাদা আমাকে অনেক পণ দেয়। আমি শশুর বাড়ি গিয়ে খুব মুস্কিলে পড়ে যাই। তোমার দাদী ছিল অন্ধ। তোমার দাদা ছিল উড়াইটা ধরনের। সকালের খাওয়া খাইত দুপুরে, দুপুরের খাওয়া খাইত বিকালে। পাড়ার বেটিরা এসে ধান চাউল ঝেরে দিতো। যাওয়ার সময় আঁচলে করে অনেক কিছু নিয়ে যেতো। প্রতিবাদ করলে তোমার দাদা আমার উপর রাগ করতেন। অল্প রাগ করেই অনেক জিনিস নষ্ট করতেন। রাগ করে ঘরের চাউল, মুড়ি উঠানে হাঁসের পায়খানার উপর ফেলে দিতেন। তোমার ফয়েজ চাচা ও বেলাল উদ্দিন চাচারও খুব রাগ ছিল। তারাও রাগ করে গরম ভাত উঠানে মেইল্লা মারতো। এই ভাবে সবাই সংসারটাকে ফতুর করতেছিল। আমাকে মুখ বুজে সহ্য করতে হতো। পাহাড়ে এসে বেচে গেছি।

– আপনি কোনো সময় রাগ করে বাপেবাড়ি চলে আসেন নি?

– একবার একটা ঘটনা ঘটেছিল। তোমার বড় মামী আর ছোট মামীর মা যিনি, তোমরা নানী ডাকো, উনি আমাদের ফুফু, তোমার নানার বোন। তোমার দুই মামী সহোদর বোন। অর্থাৎ দুই ভাইয়ে দুই ফুফাতো বোন বিয়ে করেছেন। ফুফুর শশুর বাড়ি রৌহার পশ্চিম পাড়ায়। ওখানে এক খন্ড জমির জন্য তোমার দাদারা দাবী করতেন তাদের জমি বলে আবার ফুফুর শশুরবাড়িরাও দাবী করতেন তাদের জমি বলে। এনিয়ে একটা বিরাট কয়চান (ঝগড়া) বেঁধে যায়। দুইপক্ষ লাইঠাল এনে মারামারিও করে। ঐসময়ে আমি ছিলাম আমার বাপের বাড়ি। এটার জের ধরে তোমার নানা আমাকে আটকে দেন। কয়চান শেষ না হলে আমাকে শশুড় বাড়ি যেতে দিবেন না। তোমার দাদাও আমার খোজ নিতে আসতেন না। আসা নিষেধ ছিল তালুকদার বাড়ির পক্ষ থেকে। কিন্তু তোমার বাবা যুত করে যুত করে (চুপিচুপি) রাতে আমাকে দেখতে আসতেন। একদিন রাতের অন্ধকারে তোমার বাবার সাথে যুত করে তোমার দাদার বাড়ি চলে যাই। এই রাগে তোমার নানা আমাকে অনেকদিন আনতে যান নি। নোকাইল বিলে পানি ছিল। তোমার বাবা আমাকে কাঁধে নিয়ে নোকাইল পার করেন। কয়চান শেষ হলে আমি বাপের বাড়ি আসি।

মা রাতে আমাদের করুন একটা ঘটনা প্রায়ই শুনাতেন। তিনি বলতেন দক্ষিণ দেশের এক বৃদ্ধলোক নানাদের বাড়ি ভিক্ষা করতে আসতেন। তিনি নাকি আগে ধনী লোক ছিলেন। দরিয়ায় (সমুদ্রে) সব বিলীন হয়ে এখন ভিক্ষুক হয়েছেন। তিনি ভিক্ষা চাইতে এসে সুর করে গীত গাইতেন। সেই গীত মা সুন্দর সুরে গেয়ে আমাদের শুনাতেন। সেই গীতে এমন একটা পংতি ছিল-

দখিণা দরিয়ার মধ্যে রে

নায় মারিবে পাক রে

অরে মাঝি খবরদার।।

এগুলি গাইতে গাইতে মার গলায় কান্না এসে যেতো। চোখ মুছতেন। ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাদতেন। আমি মনে করতাম মা নানার কথা অথবা নানীর কথা মনে করে কাঁদছেন। আমরা মার কান্নার কারণ কোনদিন জানতে চাই নি।

মা কানে খুব কম শুনতেন। আমাদেরকে মার সাথে উচ্চস্বরে কথা বলতে হতো। কম শুনাতে মা সামাজিক ভাবে একটু হেহ হতেন। অনেকে বিরক্ত হয়ে বলে বসতেন “আর কালা। কিচ্ছু শুনে না।” এই কথাটা শুনলে আমি খুব কষ্ট পেতাম। মার মাথা ফাটার পর কানে কম শুনতেন। আমরা মার চুল সরিয়ে দেখেছি কপাল থেকে শুরু করে এক কানের উপর দিয়ে একটা ফাটা চিহ্ন। আমি জানতে চেয়েছি

– আপনার মাথা ফাটলো কিভাবে?

– সেটা সরমের কথা। তোমার বেলাল উদ্দিন কাক্কু বিয়ে করে নতুন বউ এনেছেন। বাসর রাত ছিল। নতুন বউ ভোরে উঠে জানালো যে তার গোসল করতে হবে। ভাবি হিসাবে আমার দায়িত্ব দেবরের নতুন বউকে পানি তুলে দেয়া। আমাদের পাটকুয়া ছিল (ইঁদারা কুয়া)। তখনও অন্ধকার ছিলো। ফজরের আজান হয়তো দিয়েছে। নতুন বউ কুয়ার পাড়ে দাড়িয়েছিল। আমি ঠিলার (মাটির কলসি) গলায় রশি দিয়ে কুয়ায় নামালাম। ঠিলা পানিতে ভরে যেই রশিরে টান দিয়েছি অমনি পা ফসকে কুয়ায় পড়ে গেলাম। অনেক গভীর ছিল সেই কুয়া। পড়তে পড়তে কুয়ার পাটের বারি খেয়ে মাথা ফেটে গলগলি রক্ত ছোটলো। তোমার চাচী “কুয়ায় পড়ছে গো, কুয়ায় পড়ছে গো” বলে চিল্লাতে থাকলো। সবাই তখন ঘুমিয়ে ছিল। তোমার কোরবান কাক্কু পুকুরের ওপারে ঘাট উদ্ধারে (পায়খানায়) বসেছিলেন। চিল্লাচিল্লি শুনে দৌড়ে এসে কুয়ায় নেমে আমাকে তুলে আনেন। গামছা দিয়ে বেধে রক্ত পড়া বন্ধ করেন। মাথার খুলির এক দিকে ফেটে যায়। সেকারনে কানের ক্ষতি হয়েছে।

আমি শুনেছি, সব মা সব সন্তানদের সমান চোখে দেখেন। কিন্তু আমার মায়ের বেলায় মনে হয় সেটা ঠিক না। আমার মনে হয়েছে, মা আমাকে একটু বেশী চোখেই দেখেছেন। আমার খাওয়া নিয়ে সব সময় উদ্বিগ্ন থাকতেন। যখন যেটা খেতে পছন্দ করতাম সেটা রান্না করার চেষ্টা করতেন। সবার মায়ের রান্না থেকে আমার মায়ের রান্না আমার কাছে ভালো লাগতো। মার রান্না আর খালার রান্নার স্বাদ প্রায় কাছাকাছি ছিল। লাইলি বুর রান্না প্রায় মার রান্নার মতো স্বাদের। বড় মেয়ে মুনাও মার মতো রান্না করতে পারে। মুনার চেহারা প্রায়ই মার মতো হয়েছে। ও কিন্তু মার মতোই আমার খোজ খবর নেয়। সপ্তাহে একদিন হাট থেকে বাবা খাসির গোস্তো আনতেন। খাসির গোস্ত আমার খুব পছন্দের ছিল। বাবা হাট থেকে অনেক রাতে ফিরতেন। মা খাসির গোস্ত রান্না শেষ করতে করতে আমি ঘুমিয়ে পড়তাম। মা আমার কাঁচা ঘুম ভাঙ্গিয়ে তুলে জোড় করে সেই গোস্তের মজানি (কসানি) দিয়ে ভাত মেখে খাইয়ে দিতেন।

বড় হতে থাকি আর মা থেকে দূরে যেতে থাকি। মাকে নানান অসুখে পেয়ে বসে। এলাকায় তেমন ভালো ডাক্তার ছিলো না। বাবা হাট থেকে যেসব ঔষধ এনে দিতেন সেসব ঔষধে কোন কাজ করতো না। মা খুব কষ্ট পেতেন। বাবা মার চিকিৎসায় অনেক টাকা অপচয় করেন। মা শুকিয়ে কংকালের মতো হয়ে যান। বাচবেন বলে মনে হলো না। আমি হোস্টেলে ব্যবহারের জন্য একটা মশারী কিনেছিলাম। দেখে মা বললেন “মশারীটা বেশ সুন্দর। আমি মরার পর এই মশারী বেঁধে আমার লাশ ধোয়াইও।” আমি এইচএসসি পড়া নিয়ে মহা ব্যস্ত ছিলাম। আমার জমানো বৃত্তির টাকা বাবাকে দিয়ে বললাম মাকে টাঙ্গাইল নিয়ে গিয়ে ডা. এইচ আর খানকে দিয়ে চিকিৎসা করাতে। অনেক টাকা খরচ করে ডা. এইচ আর খানকে দেখায়ে চিকিৎসা করা হলো ১৯৭৮ সনে। মা সুস্থ হয়ে স্বাস্থ্যবান হলেন। আমার খুব ভালো লাগলো।

কিন্তু পড়ের বছর আবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এসময় বাবাও অসুস্থ ছিলেন। সামনে এইচএসসি পরীক্ষা থাকাতে আমিও অনেকদিন বাড়ি আসিনি। পরীক্ষার ঠিক কয়েকদিন আগে পরীক্ষার দোয়া নিতে বাড়ি এলাম। দেখি মা মৃতপ্রায়। জ্ঞান নেই তেমন। আমার মন ভেঙ্গে গেলো। মা শুয়েছিলেন নিশ্চুপ নিস্তেজ হয়ে। আমি পায়ে ছুয়ে বললাম “মা আমি পরীক্ষা দিব এবার। আমার জন্য দোয়া করবেন। মা শুনতে পেলেন বলে মনে হলো না। আমি পা থেকে হাত আমার বুকে নিয়ে সেলাম করা শেষ করে চোখ মুছে রওয়ানা দিলাম। নওপাড়া পর্যন্ত গেলে পেছন থেকে কে যেনো ডেকে বলল “যাইও না। তোমার মা বলতাছে ‘সাদেক আলী কি গেছে গা?’

আমি বাড়ি ফিরলাম। মা বলে ডাক দিলাম। মা চোখ তুলে তাকালেন। আবার চোখ বুজলেন। আমি সারারাস্তা কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলাম। মামাবাড়ি, দাদাবাড়ি ও ফুফুবাড়ি ঘুরে পরীক্ষার জন্য দোয়া করতে বললাম। এও জানালাম যে পরীক্ষা পর্যন্ত মা বেচে থাকবেন কি না, আল্লাহ জানেন।

১৯৭৯ সনে আমাদের আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজে প্রথম পরীক্ষার সেন্টার হল আমাদের এইচএসসি পরীক্ষার মাধ্যমে। ২৯ শে মে বৃ্হস্পতিবার বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষা দিলাম। ৩১ মে শনিবার বাংলা দ্বিতীয় পত্র হল। ২ জুন সোমবার ইংলিশ প্রথম পত্র পরীক্ষা দিয়ে খেয়ে হোস্টেলে ঘুমালাম। পায়ের আওয়াজে ঘুম ভেংগে গেল। চোখ মেলে দেখি আমার এক বছরের বড় আমার চাচাত ভাই পাশের বাড়ির জিন্না ভাই। দেখেই বুঝে ফেললাম জিন্না ভাই খুব একটা সাংঘাতিক খারাপ সংবাদ নিয়ে এসেছেন।  হয়ত মা আজ নেই। জিন্না ভাই বললেন “তোমাকে বাড়ি যেতে হবে এখনি। কাক্কি হয়ত বাচবে না। সাথে তোমার মশারিটা নিয়ে যেতে বলেছেন।”

আমি যখন হোস্টেলে উঠার জন্য নতুন মশারি কিনি মশারিটি দেখে আমার অসুস্থ মা বলেছিলেন “আমি এবার হয়ত আর বাচব না। আমি মরে গেলে এই মশারি বেধে ধোয়াইও।” এই কথা লাইলি বুবু ও ভাবী শুনেছিলেন। আমার আর বুঝতে দেরী হল না যে মা নেই।

আমি প্রিন্সিপাল কিবরিয়া স্যারের কাছে গিয়ে বললাম
-স্যার, মা মারা গেছেন। আমি বাড়ি যাচ্ছি।
– কে বলেছে?
– আমার চাচাত ভাই এসেছেন।
– অখিল বাবু, ওর ভাইকে এখানে নিয়ে আসুনত।

জিন্না ভাই এলে আমাকে রুমে যেতে বললেন। আমি রুমে গিয়ে রেডি হয়ে গেলাম। স্যার অখিল চন্দ্র নাথ স্যারকে নিয়ে আমার কাছে এলেন। অখিল স্যার ছিলেন আমাদের ফিজিক্যাল ইন্সট্রাকটর। কিবরিয়া স্যার আমাকে বললেন “মা বাবা সবার বেচে থাকে না। হয়ত তোমার মা বেচে নেই। মন ভাংবে না। অখিল বাবু তোমাকে বাইসাইকেলে ডাব্লিং করে বাড়ি নিয়ে যাবেন। যদি তোমার মা ইন্তেকাল করেই থাকেন তবে তাকে দাফন করে অখিল বাবুর সাথেই এসে পরবে। আগামীকাল পরীক্ষায় বসবে। মা মরে গেলে মা আর পাবে না। পরীক্ষা বাদ দিলে জীবনে অনেক বড় ক্ষতি হতে পারে।”

আমি নিরবে সাইকেলে অখিল স্যারের সামনে বসলাম। আমি তখন হাল্কা পাতলা হলেও ওজন আমার ৫৬ কেজির কম ছিল না। এই আমাকে নিয়ে অখিল স্যার সাইকেল চালিয়ে পাহাড়ের দুর্গম রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাদছিলাম। ভন্ডেশ্বর, খালুয়া বাড়ি, আওলাতৈল, মরিচা, বাঘেরবাড়ি, দেবলচালা, সিরিরচালা, ঢনডনিয়া, জিতাশ্বরি, নওপাড়া সুদীর্ঘ ১২/১৩ কিলোমিটার পথ পারি দিয়ে রাত ১০ টার দিকে বাড়ি পৌছলাম। সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছিল জানাজার জন্য। আমি অজু করে জানাজায় শরীক হলাম। দাফন হল। এক সময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।

সকালে ফজরের নামাজ পড়ার পর অখিল স্যার বললেন “কিবরিয়া স্যার তোমাকে পরীক্ষা শুরুর আগেই ফিরিয়ে নিতে বলেছেন।”
আমি বললাম “চলেন, স্যার।”

কাক্কি (হাসেন কাক্কুর স্ত্রী) বললেন “ও এবার জ্যৈষ্ঠ মাসে আম দুধ-খায় নাই। একটু দাড়ান সামান্য আম-দুধ খাক।” আমি আম দুধ খেয়ে সাইকেলে বসলাম। পরীক্ষা শুরুর আধ ঘন্টা আগে গিয়ে পৌঁছলাম। মুখ ধুলাম। আবুল হোসেন স্যার এগিয়ে এলেন। বললেন “কিবরিয়া স্যার তোমাকে পরীক্ষার হলে যেতে বলেছেন।” আমি নিরবে হলে গিয়ে বসলাম। হাতে খাতা ও প্রশ্নপত্র দেয়া হল। দোয়া পড়ে লিখা শুরু করলাম। বেশ কিছুক্ষণ লিখার পর মায়ের স্মৃতি ভাসা শুরু হয়ে গেল। চোখ দিয়ে পানি ঝরা শুরু হল। কোন এক স্যার মাথায় হাত বুলালেন। আমি আবার লিখলাম। লিখে শেষ করলাম। রুমে ফিরলাম। সবাই পড়া নিয়ে ব্যস্ত। আমাকে শান্তনা দেবার মত সময় সবার হাতে কম। আমিও বুঝলাম। ভাগ্যের নির্মম অধ্যায় অতিক্রান্ত করছিলাম।

ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম কাজটি আমি করতে পারলাম। নিষ্ঠুর হয়ে বাকী সব পরীক্ষা দিয়ে দুই বিষয়ে লেটারমার্ক সহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে পাস করে ডাক্তার হলাম। এমন নিষ্ঠুর হলাম যে পৃথিবীর আর কোন দুঃখ ও হতাসায় আমাকে এখন কাবু করতে পারে না।

মার সমবয়স্কা আমার চাচী মজিবর ভাইর মা মার খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি আমাদের সবচেয়ে বেশি খোজ নেন। আমি বাড়ি গিয়ে কাক্কির কাছে বসে থাকি। মনে হয়, আরেকবার ডাক্তার দেখাতে পারলে হয়তো মা বেচে যেতেন। পরবর্তী চিকিৎসাগুলো হয়তো আমি করতে পারতাম। এখন হয়তো এই কাক্কির মতোই বৃদ্ধ হয়ে যেতেন। খাবার দিলে কাক্কির মতোই বলতেন “কিচ্ছু ভাল্লাগে না, কিচ্ছু খাপ্পাই না গো।” তাতেও আমার ভালো লাগতো। আমি কাক্কির চামড়া ভাজ করা মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলি!

১৬/৪/২০২০ খ্রি.

Kajol Da

কাজল দা

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

(স্মৃতি কথা)

কাজল দার পূর্ণ নাম প্রফেসর ডাঃ কাজল কান্তি চৌধুরী। সবাই বলে কাজল দা। আমিও বলি কাজল দা। কিন্তু সম্বোধন করি স্যার বলে। তবে আমাদের ব্যাচের অনেকেই দাদা বলে সম্বোধন করে। যদিও তিনি আমাদের থেকে ৭ বছরের বড় এবং একাডেমিক শিক্ষক। তবে শিক্ষককে যেমন সবাই ভয় পায়, কাজল দার ছাত্ররা তেমন ভয় পায় না। তবে সবাই কাজল দাকে ভালোবাসে এবং শ্রদ্ধা করে। আমি এমবিবিএস পড়েছি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ সন পর্যন্ত। কাজল দা এম-১০ ব্যাচ এবং আমি এম-১৭ ব্যাচ। শিক্ষক হিসেবে দাদাকে পাই ১৯৮৩ সনে থার্ড ইয়ারে উঠে। তিনি সার্জারি বিভাগের রেজিস্ট্রার ছিলেন।

ক্লিনিক্যাল সাবজেক্টে রেজিস্ট্রার হলো শিক্ষকের প্রথম ধাপ। কাজল দাকে আমি শুধু রেজিস্ট্রার হিসাবেই পেয়েছি। তিনি খুব সম্ভব সরকারি কর্মকর্তা হিসাবে কনসালটেন্ট অথবা এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পর্যন্ত প্রোমোশন পেয়েছিলেন। তিনি এত ভালো টিচার হলেও তাকে নাকি বেখাপ্পা দূরে দূরে বদলী করা হতো। ডা: রিক্তা দি তার স্ত্রী । তিনি ছিলেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এনাস্থেসিওলজিস্ট বা অজ্ঞানের ডাক্তার। তিনি সবসময় ময়মনসিংহেই ছিলেন। সরকারের প্রতি বিরক্ত হয়ে কাজল দা সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে স্বাধীন হয়ে যান। স্বাধীনভাবে ময়মনসিংহ শহরে প্রাইভেট হাসপাতালে সার্জিক্যাল কেইসগুলো নিখুত হাতে ম্যানেজ করতে থাকেন। এক সময় এমন একজন মেধাবী শিক্ষককে জোড় করে কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ এসোসিয়েট প্রফেসর হিসাবে নিয়োগ দেন এবং পরবর্তীতে তিনি ফুল প্রফেসর হন সার্জারী বিভাগের।

এই কাজল দার ক্লাশ পাই আমি ১৯৮৩ সনে সার্জারী ওয়ার্ডে। শিক্ষক হিসাবে তিনি তেমন স্মার্ট ছিলেন না। কথা বার্তায়ও তেমন স্মার্ট ছিলেন না। কিন্তু তার মধ্যে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞান এবং দক্ষতা ছিলো অগাধ। পড়ানোর সময় ছাত্রদেরকে “আপনি” বলে সম্বোধন করতেন। হাসি হাসি মুখ থাকতো। কোন দিন থাকে বিরক্ত হতে দেখিনি। কাউকে ধমক দিতে দেখিনি। তার মুখ থেকে হাজার বার “ঠিক আছে” শব্দটি শুনেছি। রোগীর পিঠে হাত দিয়ে দরদের সাথে কথা বলতেন। আমি শুনেছি, তিনি শুধু পড়াশোনা ও চাকরি নিয়ে পড়ে থাকতেন। রিক্তা দিকে নিয়েও বাইরে বের হতেন না। প্যান্ট বা শার্ট অতি পুরাতন বা ছিড়ে গেলে নতুন আরেকটা বানানোর জন্য দর্জির দোকান পর্যন্ত যাওয়ার তার সময় ছিলো না। তিনি তার পুরাতন প্যান্ট বা শার্ট রিক্তা দির কাছে দিয়ে দিতেন। রিক্তা দি শহরে গিয়ে ফেব্রিকস কিনে পুরাতনটার মাপে বানিয়ে আনতেন। এগুলো আমার শুনা কথা। রিক্তা দির ছোট বোন শিপ্রা আমার ক্লাসমেট ছিলো। সে খুব চঞ্চল ছিলো। তিরিং বিরিং করে চলাফেরা করতো। খালি পড়া নিয়ে থাকতো। অন্যরা বলতো, এটা রিক্তা দির বোন, কাজল দার শ্যালিকা। সে আমেরিকা প্রবাসী। তার মেধা এবং সার্ভিস বাংলাদেশীদের ভাগ্যে বেশীদিন জোটেনি।

আমি এমবিবিএস পাস করি ১৯৮৫ সনের সেপ্টেম্বরের রেগুলার ফাইনাল পরীক্ষায়। রেজাল্ট হয় নভেম্বর মাসে। ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং শুরু করি নভেম্বরের ২১ তারিখে। এই ট্রেইনিংটা সরকারি চাকরি হিসাবে গণ্য হতো। এখন এর নাম দিয়েছে ইন্টার্নশিপ। এটা চাকরি হিসাবে গণ্য হয় না। ইনসার্ভিসের এক বছরের ৬ মাস মেডিসিন, সার্জারী অথবা গাইনি এর যেকোনো একটিতে বিষয়ভাবে ট্রেইনিং নিতে হতো। বাকী ৭ মাস অন্যান্য বিষয়ে ট্রেইনিং করতে হতো। আমি বিশেষ ট্রেইনিং নিয়েছিলাম সার্জারিতে। সার্জারির তিনটি ইউনিট ছিলো ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ইউনিট ১ এর প্রধান ছিলেন সার্জারি বিভাগের হেড প্রফেসর ডাঃ এয়ায়েত কবীর স্যার, ইউনিট ২ এর প্রধান ছিলেন প্রফেসর ডাঃ আব্দুস শাকুর স্যার এবং ইউনিট ৩ প্রধান ছিলেন প্রফেসর ডাঃ সেলিম ভুইয়া স্যার। ইউনিট ৩ এই ছিলেন কাজল দা। তাই আমি ইউনিট ৩ পছন্দ করে ৬ মাস কাজল দার অধীনে সার্জারিতে বিশেষ ট্রেইনিং নেই। দাদার সাথে থেকে আমি তার অসাধারণ গুণাবলীর সন্ধান পাই। রোগীর প্রতি ছিল অনেক দয়া, মায়া এবং ভালোবাসা। তিনি ঢিলেঢালা পোশাক পরতেন। শার্ট ইন করে পড়তেন না। চুলে বাম পাশে তেরা সিথি করতেন। শিনা টান করে হাটতেন না। আর বসার কক্ষে বেশীক্ষণ বসতেন না। সময়মতো ওয়ার্ডে রাউন্ড দিতেন। আমরা দলবদ্ধ হয়ে তার সাথে হাটতাম। কেউ রাউন্ডে ফাকি দিতাম না। রাউন্ড দেয়া শুরু করতেন ওয়ার্ড থেকে, শেষ করতেন কেবিন দিয়ে। সব সময় গরীব রোগীদের প্রায়োরিটি দিতেন। ওয়ার্ডে ২৪ টা করে বিছানা ছিলো। এক নং বেডের রোগী আগে দেখতেন। বেডের পাশে গিয়ে রোগীর কাদে হাত রেখে জিজ্ঞেস করতেন “এখন কেমন লাগছে?” তিনি ছাত্র-শিক্ষক, রোগী, ছোট-বড় সবাইকে “আপনি” বলতেন, “তুমি” বলতেন না। অপারেশন করা রোগীকে এভাবে জিজ্ঞেস করতেন “চাচামিয়া, পায়হানা অইছে?” যেসব রোগীর পায়খানা হয়নি তাদের পেটে মাসাস করে করে পায়খানা মলদার পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে বলতেন “এহন পায়হানায় যান, পায়হানা য়বো।” তিনি রোগীর মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতেন। রোগীর সাথে আসা লোকের প্রতি তেমন মনোযোগ দিতেন না। তার হাতে অপারেশন করা রোগী দুই তিন বছর পর এলেও তিনি চিনে ফেলতেন এবং আগের ঘটনাগুলোর প্রসংগ টেনে কথা বলতেন। তার মাথায় মেমোরিতে ছিলো শুধু রোগী এবং রোগীর রোগ। পৃথিবীর সুস্থ্য মানুষগুলো তার কাছে কিছুই ছিলো না। তেলবাজি তিনি পছন্দ করতেন না। তিনি প্রত্যেক রোগী নিজ হাতে পরীক্ষা করতেন, রোগের ব্যাখ্যা দিতেন এবং আমাদেরকে হাতে কলমে শিখাতেন। পুরুষ ও নারী ওয়ার্ডের প্রতিটি রোগী এভাবে দেখে শেষ করে কেবিনের রোগী দেখতে যেতেন। কেবিনের রোগীগুলো দেখা শেষ হলে তিনি আমাদের দিকে ঘুরে মুসকি হেসে হলতেন “ঠিক আছে যান।” সবাই ক্লান্ত অবস্থায় চলে যেতো ডক্টরস ক্লাবে। সেখানে গিয়ে চা, কফি, সিংগাড়া, সমুচা ইত্যাদি খেয়ে রিলাক্স হয়ে ওয়ার্ডে ডিউটিরত ডক্টরস রুমে ফিরে এসে কাজলদার নির্দেশনার স্লিপ দেখে দেখে রোগীর ফাইলে লেখা লেখি করতো। কিন্তু আমি সাধারণত তা করতাম না। কাজল দার পিছে পিছে হাটতাম। দাদা পিছন ফিরে বলতেন, ” ঠিক আছে যান। আমি অমুক ওয়ার্ডে একটা রোগী দেখতে যাবো।” আমি দাদার পিছে পিছে সেই ওয়ার্ডেই যেতাম। আমাদের হাসপাতালে তখন ২২ টা ওয়ার্ড ছিলো। প্রায় সব বিভাগের প্রফেসরগণ জটিল জটিল রোগী পরামর্শের জন্য কাজল দাকে ফোন করে রাখতেন। দাদা নিজের ওয়ার্ডের রাউন্ডের পর ঐসব ওয়ার্ডে ঘুরে ঘুরে রোগী দেখতেন। আমি বিনয়ের সাথে দাদার কাছে ঐসব রোগীর সমস্যা ও তার ব্যাখ্যা জানতে চাইতাম। দাদা আমাকে সুন্দর করে বুঝিয়ে দিতেন। তারপর তিনি চলে যেতেন অপারেশন থিয়েটারে অপারেশন করতে। ইনসার্ভিস ট্রেইনি হিসাবে আমি দাদার সাথে এসিস্ট করতাম। আমি কাজে কর্মে ধীরগতির। অপারেশনে ধীর গতিতে কাজ করা যাবে না। প্রফেসর ডাঃ সেলিম ভুইয়া স্যারের সাথে যখন এসিস্ট করতাম তিনি আমার ধীর গতিতে বিরক্ত হয়ে বলতেন “সাদেক, তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবেনা।” শুনে আমার মন খারাপ হয়ে যেতো। বিরক্ত হয়ে তিনি কয়েকদিন আমাকে কুনুই দিয়ে বুকের পাজরে গুতাও দিয়েছেন। তাই আমি সিদ্ধান্ত নেই ভবিষ্যতে আমি সার্জারিতে ক্যারিয়ার করবো না। আমি ভাবতে থাকি কোন বিষয়ে ক্যারিয়ার করলে আমি ধীরে ধীরে কাজ করতে পারবো। আমি খুজে পাই প্যাথলজি। তাই আমি পরে প্যাথলজি নিষয়ে পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিগ্রি এম ফিল করি ১৯৯৫ সনে তদানিন্তন আইপিজিএম আর, শাহবাগ থেকে। আমি যতই ধীরগতির হই না কেন, কাজল দা আমার প্রতি বিরক্ত হন নাই। ওনার কাছে সব কিছুই “ঠিক আছে।”

অপারেশনের রোগীর সেলাই করার জন্য সিল্ক ও ক্যাটগাট সুতা লাগে। সরকার যা সাপ্লাই দিতো তার দশ গুণ বেশী রোগী হতো। তাই প্রায় সব রোগীকে সূতা কেনার জন্য স্লিপ দিতাম। সবার সূতাই ওটিতে রাখতাম। দশজন রোগীকে সূতা কিনতে বললে পাঁচ জনেই কিনতে পারতো না। কাজল দা বলতেন “আচ্ছা, ঠিক আছে।” কাজল দা খুব মিতব্যয়ী ছিলেন। তিনি ধনী রোগীদের অপারেশন করার সময় বারতি সূতা যত্ন করে রেখে দিতেন। সেই সূতা দিয়ে গরীব রোগীর পেট সেলাই করতেন। এই জন্যই তিনি বলতেন “আচ্ছা ঠিক আছে। ” কাজেই কাজল দার কাছে কোন সমস্যাই সমস্যা না।

১৯৮৬ সনের নভেম্বরের শেষে আমি ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং শেষ করে ময়মনসিংহ থেকে চলে যাই। টাঙ্গাইল শহরের একমাত্র প্রাইভেট হাসপাতাল “নাহার নার্সিং হোমে” চাকরি নেই। প্রথম ৬ মাস মেডিকেল অফিসার হিসাবে এবং শেষের ৬ মাস মেডিকেল ডাইরেক্টর হিসাবে ওখানে সার্ভিস দেই। কাজল দার থেকে শেখা সার্জিক্যাল স্কিল সেখানে আমার কাজে লাগে। ১৯৮৮ সনের জুলাই মাসে সরকারি চাকরি পেয়ে প্রথম এক বছর বরিশালের বাকেরগঞ্জে এবং তারপর ১৯৯২ সন পর্যন্ত শেরপুরের নকলা উপজেলায় চাকরি করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে প্যাথলজি বিভাগের প্রভাষক হিসাবে যোগদান করি। আমার সভাবের মিল পেয়ে এই বিষয়য়ের উপরই ক্যারিয়ার করি এবং ১৯৯৫ সনে পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিগ্রি এম ফিল পাস করে ময়মনসিংহেই শিক্ষকতা করতে থাকি।

ইতিমধ্যে কাজল দা সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে ময়মনসিংহের কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজের সার্জারি বিভাগে যোগদান করেছেন। তিনি প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের শিক্ষকতার পাশাপাশি ময়মনসিংহ শহরের প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে অপারেশন করতেন। আমিও তখন নিজে প্রাইভেট প্যাথলজি ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রাইভেট প্যাথলজি প্রাকটিস করতাম। তিনি তার অপারেশন করা রোগীদের বায়োপসি পরীক্ষা করার জন্য আমার কাছে পাঠাতেন। পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে প্রায়ই তার সাথে আমার মোবাইলে কথা হতো। “আচ্ছা ঠিক আছে” বলে তিনি কথা শেষ করতেন। ডাক্তারদের সরকারি চাকরি করতে হলে ভালো ভালো পজিশন ও পোস্টিং প্লেসের জন্য লবিং করতে হতো। এই গুণটি দাদার মধ্যে ছিলো না। আমার মধ্যেও নাই। তাই দাদাকে অল্প বয়সেই সরকারি চাকরি ইস্তফা দিতে হয়। আমাকেও ১২ বছর ময়মনসিংহ থেকে অনেক দূরে রাখা হয়। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। একবার প্রাইভেট ক্লিনিকে অপারেশন করা রোগীর মৃত্যু হলে সার্জন ডাঃ কাজল দা, অজ্ঞানকারী ডাঃ তুহীন ভাই ও ক্লিনিকের মালিককে এরেস্ট করে প্রশাসন। ময়মনসিংহের সকল স্তুরের ডাক্তার দাদাকে ছাড়িয়ে আনার জন্য তীব্র আন্দোলন করে ঢাকা ময়মনসিংহ হাই ওয়ে অবরোধ করে রাখে। প্রশাসন বাধ্য হয়ে তিন দিন পর সবাইকে মুক্তি দেয়। এত ভালোবাসতো সবাই কাজল দাকে। প্যাথলজি বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডাঃ মীর্জা হামিদুল হক স্যার দেখতাম খুব খাটাখাটি করছেন দাদাকে বের করে আনার জন্য। তিনি আমার কাছে বলনেন “আমি যখন বৌ-বাচ্চাদেরকে ময়মনসিংহ রেখে ঢাকায় পোস্ট গ্রাজুয়েট এম ফিল কোর্স করি তখন কাজলও পিজিতে সার্জারিতে এফসিপিএস কোর্স করে। ময়মনসিংহ এলে সব সময় আমার বাচ্চাদের খোজ-খবর নিয়ে যেতো। ওর মতো এত ভালো মানুষ আর হয় না। কাজল দা মীর্জা স্যারের থেকে এক ব্যাচ জুনিয়র। দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডাঃ হারুন ভাই গতকাল বললেন “কাজল দা কিন্তু কোন সময় ঔষধ কোম্পানির দেয়া কোন ট্রায়ালের ঔষধ প্রেসক্রিপশন করতেন না।” এমন হাজারো গুণের গুনান্নিত ছিলো কাজল দার জীবন।

গত তিন চার বছর আগে কে যেন ফেইসবুকে কাজল দার ছবি তুলে পোস্ট দিয়েছিল যেখানে দেখা যাচ্ছে কাজল দা বাঁশের আগায় কাঠি বেধে শহরের ময়লা ড্রেইন পরিস্কার করছেন নিজ হাতে। আমরা কয়েকজন ডাক্তার একটা মাইক্রোবাসে করে কলেজে যাচ্ছিলাম। কেউ একজন বলছেন “কাজল স্যার এমন বড় মাপের একজন ডাক্তার হয়ে এভাবে নিজ হাতে ড্রেইন পরিস্কার করা ঠিক হয় নাই।” সবাই তার কথায় সায় দিল। তারা সবাই জুনিয়র ডাক্তার ছিলো। কাজল দার এমন কাজ করা তাদের পছন্দ হয়নি। আমি তেমন কোন মন্তব্য করলাম না।

২০১৯ সনে আমাদের ব্যাচের এমবিবিএস ভর্তির ৪০ বছর পুর্তি উপলক্ষে দেশে বিদেশে অবস্থানরত ১৪৫ জনের মধ্যে ১২০ জনই উপস্থিত হয় রিইউনিয়ন অনুষ্ঠানে। আমি তখন প্যাথলজি বিভাগের হেড ছিলাম। ময়মনসিংহ শহরে অবস্থানরত আমাদের শিক্ষকদেরকে দাওয়াত দেয়ার দ্বায়িত্ব পড়ে আমার উপরে। সেই সুবাদে আমি দাওয়াত কার্ড নিয়ে শহরে অবস্থানরত সব স্যারদের বাসায় যাই। কাজল দার বাসা ময়মনসিংহ পলিটেকনিক মোড়ের কাছাকাছি। আমি বাসার কাছে গিয়ে ফোন দেই। দাদা নিচে নেমে এসে কার্ড হাতে নিয়ে কুশলাদি জিজ্ঞেস করে বলেন “আচ্ছা ঠিক আছে। “

রিইউনিয়নের দিন আগেই এসে কাজল স্যার ক্যাম্পাস দিয়ে বেড়াতে থাকেন। আমি তার সাথে হেটে হেটে কিছু সময় দেই। তিনি আমার জীবনের পরাজয়ের কাহিনীগুলি শুনে বলেন “আপনি একটু লবিং করে চলতে পারলেন না! আচ্ছা ঠিক আছে।”

জুলাই ২৪ বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী এমএমসি-ডে পালিত হয় অন্যরকম আনন্দ উল্লাসে। আমি ও কাজল দা সকাল-বিকাল উভয় অনুষ্ঠানেই উপস্থিত হয়ে আনন্দ উপভোগ করি। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্রাকন ছাত্র এবং শিক্ষক হিসাবে উভয়েই বক্তব্য রাখি। সাংস্কৃতিক সন্ধায় কাজল দার ডান পাশেই আমি বসেছিলাম। অনুষ্ঠানের ফাকে ফাকে কাজল দা টুকটাক কিছু কথা বলেন আমার সাথে। রাত গভীর হলে সিনিয়ররা সবাই চলে গেলেও কজল দা সামনের সারিতেই বসে থাকেন। আমি সাধারণত রাত ১১ টার পর বাইরে থাকি না। সেদিন কাজল দার সৌজন্যে রাত সাড়ে বারোটা পর্যন্ত অবস্থান করেছিলাম। সবশেষ ইভেন্ট ছিলো র‍্যাফেল ড্র। বিশটি পুরস্কার ছিল র‍্যাফেল ড্রতে। শুরু হয় বিশতম পুরস্কার দিয়ে, শেষ হয় প্রথম পুরস্কার দিয়ে। আমি উঠাই দ্বিতীয় পুরস্কারের কুপন, কাজল দা উঠান প্রথম পুরস্কারের কুপন। এর মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়। এরপর কাজল দাকে বিদায় সম্ভাসন জানিয়ে চলে আসি। এটাই ছিলো আমার কাজল দার সাথে শেষ সান্নিধ্য সময়।

মৃত্যুর আগে এরপর কাজল দাকে মাত্র একবার দেখেছি। খুব সম্ভব এক মাস আগে দেখিছি। আমি যাচ্ছিলাম আমার ল্যাবের চেম্বারের দিকে, দাদা ফিরছিলেন দাদার বাসার দিকে। উভয়েই রিক্সায় যাচ্ছিলাম। ভিরের মধ্যে আমাদের রিক্সা ক্রস করছিলো। আমি ডান হাত উঠিয়ে ইশারায় আদাব দিলাম। দাদাও ডান হাত উঠিয়ে মৃদু হেসে আদাব প্রহন করলেন। দাদার হাসিটা অনেক মিস্টি ছিল। চোখের কোনা সামান্য চেপে ঠোঁটের কোনা কিছুটা প্রসারিত করে মধুর একটা হাসি দিতেন। এটাই ছিলো আমার সাথে দাদার শেষ বিদায়ের হাসি।

৯ এপ্রিল ২০২৫ খ্রি. সকালে ফেইসবুকের মাধ্যমে খবর পেলাম কাজল দা আর নেই। তিনি ভোরে ঢাকায় স্কোয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হ্রদ রোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেছেন। আমি কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্যাথলজি বিভাগে চাকরি করি। কাজে খুব ব্যস্ত ছিলাম। এমএলএসএস জানালেন যে কাজল স্যারের লাস নিয়ে এসেছে দেখার জন্য। হঠাৎ মনে পড়লো কাজল দার শেষ হাসিটা। সিদ্ধান্ত নিলাম দাদার শেষ হাসিটাই আমার শেষ স্মৃতি হয়ে থাক।

সন্ধার সময় ব্যস্ততা একটু কমলে একটা ছবি দিয়ে মৃত্যু সংবাদ দিলাম আমার ফেইসবুক পেইজে। কোন রকম বুস্ট করা ছাড়াই তিন চার দিনে সেটা প্রায় আশি হাজার ভিউ হয়। মানুষ এত ভালোবাসতো কাজল দাকে। আমিও কাজল দার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নিদর্শন হিসাবে আমার এই স্মৃতি কথা আপনাদের কাছে শেয়ার করলাম।

১৮ এপ্রিল ২০২৫ খ্রি.

(ময়মনসিংহ থেকে এনায়েতপুর জার্নি করার সময় অভ্র সফটওয়্যার দিয়ে মোবাইলে টাইপ করে লেখা)

#স্মৃতিকথা #kajol #memory

Patients

মাটি ও বালি খায়

তিন বছর বয়সের এক বাচ্চা ছেলের রক্ত পরীক্ষা করার জন্য আমার কাছে এসেছিলো।

মাকে জিজ্ঞেস করলাম – আপনার বাচ্চার সমস্যা কী?

মা বললেন – সমস্যা নাই। খালি মাটি ও বালি খায়।

আমি রক্ত পরীক্ষা করে দেখলাম শরীরের রক্তে আয়রন এর ঘটতি আছে, যেটাকে বলা হয় আয়রন ডেফিসিয়েন্সি এনিমিয়া।

বাচ্চারা বিভিন্ন কারণে মাটি খেতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে:

• কৌতূহল : অল্পবয়সী শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহলী এবং প্রায়শই স্বাদের মাধ্যমে তাদের পরিবেশ অন্বেষণ করে। মাটি তাদের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে কারণ এটি নতুন এবং ভিন্ন কিছু।

• পিকা : এটি এমন একটি অবস্থা যা অ-খাদ্য জিনিস যেমন মাটি, চক বা কাগজ খাওয়ার দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। পিকা পুষ্টির ঘাটতি (যেমন আয়রন বা জিঙ্ক) সংক্রান্ত সমস্যাগুলির সাথে সম্পর্কিত হতে পারে। পিকা গর্ভবতী মায়েদের মধ্যেও দেখা যায়। তারা সাধারণত মাটির হাড়ি ভাঙ্গা চেরা কুটকুট করে চিবায়। তাদেরও আয়রন ডেফিসিয়েন্সি এনিমিয়া হতে পারে।

• অনুকরণ : শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের বা অন্য শিশুদের আচরণ অনুকরণ করতে পারে যাদের মাটি খাবার বদভ্যাস আছে।

যদিও মাঝে মাঝে অল্প পরিমাণে মাটি খাওয়া ক্ষতিকর নয়, তবে এটি ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী বা রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসার মতো ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

যদি একটি শিশু ঘন ঘন মাটি খায়, তাহলে একজন ডাক্তারের সাথে পরামর্শ নিতে হবে।

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

২০ নভেম্বর ২০২৪ খ্রি.

#পিকা#স্বাস্থ্য

smritikotha

Contents

(স্মৃতি কথা)

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

প্রফেসর ডা. আব্দুল হক স্যার বই ছুড়ে মারলেন

[প্রফেসর ডা. আব্দুল হক স্যার ছিলেন একজন সৎ ও আদর্শবান মানুষ। তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ছিলেন। তিনি উক্ত কলেজের প্রিন্সিপাল এবং ময়মনসিংহ বিএমএ-র প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। আমি উক্ত বিভাগে দুইবার বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছি। ভয়ে ভয়ে স্যারের চেয়ারটিতে বসেছি। স্যারকে নিয়ে আমার অল্প কিছু স্মৃতি কথা আছে। তারই কিছু ধারাবাহিকভাবে লিখে যেতে চেষ্টা করছি]

১৯৮৩ সন। ফার্স্ট প্রফেসনাল পরীক্ষা পাস করে এমবিবিএস তৃতীয় বর্ষে ওঠলাম। বড়ভাইদের পরামর্শ নিয়ে কিছু নতুন বই কেনলাম ঢাকার নিউমার্কেট থেকে। ফার্স্ট প্রফেসনাল পরীক্ষা হলো এমবিবিএস কোর্সের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। এনাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হাই ফকির স্যার থাকাতে আরও কঠিন হয়ে পড়েছিলো এই পরীক্ষা। এই পরীক্ষা এক চাঞ্চেই ভালো নম্বর পেয়ে পাস করাতে আমার মনের মধ্যে ফুরফুরে ভাব ছিলো। জিন্সের পেন্ট বানালাম। একটু স্টাইল করে হাটার চেষ্টা করলাম। কিন্তু স্টাইলে হাটা হচ্ছিলো না। আগে থেকে অভ্যাস না থাকলে কি করে স্টাইল আসবে? থার্ড ইয়ারের সব ক্লাস ঠিকমতো হচ্ছিলো না। বন্ধুরা মিলে ট্যাং ট্যাং করে ঘুরে বেড়াতাম। একসাথে ঘুরে বেড়ানোর বন্ধুদের মধ্যে ছিলো নজরুল, সদর, মোহাম্মদ আলী খান, সেবাব্রত, সফি, নাসিম, মাহবুব, খোরশেদ, সাধারণত এরাই। এনাটমির ডিসেকশন হলের সামনে, এখন যেখানে অডিটোরিয়াম আছে, এখানে বসে আড্ডা দিতাম। একবার আড্ডার সময় দেখলাম হঠাৎ আমাদের মাঝে নাসিম নেই। কিভাবে উধাও হয়ে গেলো আমরা বুঝলাম না। আসলে ওর একটু বেশী শয়তানি বুদ্ধি ছিলো। আমাদেরকে চমকিয়ে দেয়ার জন্য পেছন থেকে স্যানিটারি পাইপ বেয়ে নিচে নেমে গিয়েছিলো।

ডিসেকশন হলের উপর তলায় বিল্ডিং ছিলো না। এখন ওটার উপরে গেলারি ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ হয়েছে। তখন প্যাথলজি ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ মিলে একটা বিভাগ ছিলো। মাইক্রোবায়োলজি প্যাথলজির একটা সাবজেক্ট ছিলো। পড়াতেন প্রফেসর ডাঃ আবু আহমমেদ স্যার। স্যার খুব মজা করে পড়াতেন। মুখে হাসি লেগেই থাকতো। স্যারের সব চুল পাকা ছিলো। মাথায় ধব ধবে সাদা চুল ছিলো। তাই আমরা আড়ালে পাকু স্যার বলতাম।

প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ছিলেন প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হক স্যার। আসলে আমি স্যারকে তখনও ভালো ভাবে চিনিনি। বিভাগীয় প্রধানের রুমের সামনের করিডোর দিয়ে আমি ও নজরুল পশিম দিকে হেটে যাচ্ছিলাম খুব সম্ভব ছাত্রসংসদ রুমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। আমার ডান হাতে দু’টি নতুন বই ছিল। বই দু’টির কভারের রঙ ছিলো লাল। বইয়ের অথর ছিলেন প্রফেসর ডাঃ এম এ খালেক স্যার। বলা হতো এম এ খালেকের প্যাথলজি বই। প্রাক্টিকেল পার্টসহ আরেকটা প্যাথলজি বই ছিলো নিল রঙের কভারের। ওটার অথর ছিলেন প্রফেসর ডাঃ কাজী খালেক স্যার। বলা হতো কাজী খালেকের বই। ছাত্র জীবনের এই খালেক স্যারদের ওজন মাপার মতো অতোটুকু জ্ঞান আমার ছিলো না। স্যারদের পরিচয় পেয়েছি ডাক্তার হবার পর এম ফিল কোর্স করার সময় আমার স্যারদের মুখে তাদের ইতিহাস শুনে। যাহোক, যখন বিভাগীয় প্রধানের রুমের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন প্রফেসর ডাঃ আব্দুল হক স্যার বের হলেন। আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন “এই দাড়াও।” দাড়ালাম। “দেখি কী বই এগুলো” বলে আমার হাত থেকে লাল রঙের বই দু’টি নিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করলেন। আমি খুব খুশী খুশী ছিলাম এই ভেবে যে আমি থার্ড ইয়ারে উঠেই নতুন চক চকে বই কিনে ফেলেছি। দেখে স্যার খুব খুশী হবেন। কিন্তু একি! স্যার রাগে চোখ বড় বড় করছেন। এদিক সেদিক তাকাছেন। ঠোঁট বির বির করে কি যেনো বকছেন। এক পর্যায়ে স্যারের রুমের বিপরীত দিকের দু’রুমের চিপা দিয়ে একটি কাঁচের জানালা ছিলো। সেই জানালার একটি পাল্লা খোলা ছিলো। বই দু’টি ছুড়ে মারলেন সেই জানালা দিয়ে। জানালার গ্রিলের সাথে বারি খেয়ে ফ্লোরে পড়ে গেলো। দেখলাম মাঝখানের সেলাই ফেটে গেছে। স্যার রুমের ভেতরে চলে গেলেন। আমি হত বিহবল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কীসের থেকে কী হলো কিছুই বুঝলাম না। দেখি নজরুল ভেগে পড়েছে। আমি বই দু’টি কুড়িয়ে তুলে ধুলা ঝেরে আবার হাতে তুলে নিলাম। চলে এলাম। কিন্তু কিসে থেকে কী হলো কিছুই বুঝলাম না।

কয়েকদিন পর প্যাথলজি প্রথম লেকচার ক্লাস করলাম আব্দুল হক স্যারের। তিনি প্রথম ক্লাসে অনেক নীতিকথা শুনালেন। তিনি ইংল্যান্ড থেকে এমআরসিপ্যাথ পাস করেছেন। সেখানকার জ্ঞান গড়িমার কিছু বক্তব্য তুলে ধরলেন। বুঝলাম প্যাথলজি বিষয়ে তিনি অগাধ জ্ঞান রাখেন। দেশী লেখকদের পাঠ্য বই পড়া যাবে না। লাল খালেক, নীল খালেক পড়ে পরীক্ষা দিতে এলে ফেল করিয়ে দেবেন। পড়তে হবে বিদেশি লেখক মুইসের প্যাথলজি বই। আমি আবার নিউমার্কেট গিয়ে মুইসের প্যাথলজি বই কিনে নিয়ে এলাম। তবে, পাস করার জন্য কাজী খালেক স্যারের বইটিই বেশী কাজে লেগেছে। আমি যখন শিক্ষকতা করি তখন পড়িয়েছি রবিন্সের প্যাথলজি বই। সাথে কাজী খালেক। কিন্তু ছাত্ররা আমার মেধাবী ছাত্র জহিরের বই না পড়ে পরীক্ষা দিতে আসছে না মনে হচ্ছে।

৫/১২/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ

মাছেরে

(টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক মাতৃভাষায় লেখা স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

গ্রামে আমরা কেউ ঘাস কাটতে গেলে তারে কইতাম ঘাসেরে গেছে। আর কেউ মাছ ধরতে গেলে কইতাম মাছেরে গেছে। চেংরাকালে আমি মাছেরে গেতাম। আংগ বাড়ি সখিপুরের পাহার অঞ্চলে। উনা মাসে পাহারে পানি থাকত না। তাই মাছও পাও যাইত না। ভর অঞ্চলে হারা বোছরই পানি থাকত। মাছও মারন গেত হারা বোছর। উনা মাসে পাহাইরারা য়াটে তিগা মাছ কিন্যা আইন্যা খাইত। ১৫/২০ মাইল দূরে তনে মাঝিরা মাছ কান্দে কইরা নিয়া আইত পাহারে য়াটের দিন অইলে। এতদুর আনতে আনতে মাছ কুইয়া বকবকা অইয়া গোন্দ উইঠা যাইত। হেইন্যা ফালাই দিয়ন নাগত। তাই উনা মাসে জিওল মাছ, মাগুর মাছ, কই মাছ, ছাইতান মাছ, টেংরা, বাতাসি, গুইটা বাজাইল ছাড়া আর কিছু পাও গেত না। পাহাইরা মাইনষে জিওল মাছ, মাগুর মাছ, কই মাছ, ছাইতান মাছ বুরকা- পাইল্যায় পানি দিয়া জিয়াইয়া য়াকত। কয়দিন ভইরা য়াইন্দা খাইত। পঁচা মাছ গুলাইনের পাতা দিয়া য়াইন্দা খাইলে গোন্দ করতো না। ইন্যা খাইয়া পেট ভাটভুট করলে গোন্দবাদাইলের পাতা দিয়া হাক য়াইন্দা খাইত। বাইস্যা মাসে পাহারের ধাইরা দিয়া য়াট বইত। হেনু ভৌরারা নানান জাতের মাছ নিয়াইত বেচপার নিগা। বেশিরভাগই ছিল নোরাফেকা মাছ। পদ্মা নদীর ইলসা মাছও এই সব য়াটে নিয়াইত নাইয়ারা।

আমি যেবা কইরা মাছ মারতাম হেইন্যা হুইন্যা আন্নের মোনয়ব আমি বোধকরি বালা ছাত্র আছিলাম না। আমি খুব বালা ছাত্র আছিলাম। হেসুমকার দিনে বাটাজোর বি এম হাই স্কুল অত্র অঞ্চলের মদ্যে সব তিগা বালা স্কুল আছাল। হেই স্কুল তিগা এস এস সি পাস করছি য়েকর্ড ভাইঙ্গা, মানে আগে যারা পাস করছাল তাগ চাইতে বেশি নম্বর পাইছিলাম, জামাল স্যার কইছেন। এহন পর্যায়ের নিহি কেউ আমার নাগালা বালা এজাল্ট করপায় নাই।

আমি স্কুল তিগা আইয়া চাইরডা খাইয়া মাছেরে গেতাম। পুশ মাস তিগা জৈস্টি মাস পর্যন্ত পাহারে পানি থাকত না। তাই মাছেরে যামু কুনু? পাহারে পানি আইলে পানির নগে মাছ আইত। মাছ আইলে মাছেরে গেতাম। জৈস্টি মাসের হেষের দিকে যেদিন বেশি বিস্টি অইত হেদিন চালার বেবাক পানি ঘোনা ঘুনিতে নাইমা বাইদ ভইরা গেত। বাইদের পানিতে জোরা ভইরা গেত। জোরা অইল বাইদের মইদ দিয়া চিকন খালের নাগালা। জোরার পানি গিয়া নামত চাপরাবিলে। চাপরা বিল পানি দিয়া ভইরা গেত। চাপরা বিল উনা মাসেও হুকাইত না। হেনুকার মাছ বেশি পানি পাইয়া উজাইতে উজাইতে আংগ বাইদে আইয়া পড়ত আন্ডা পারনের নিগা। চলাচলা পুটি, হেলাম পুটি, টেংরা, গোলসা, নোন্দা, হৈল, বোয়াল, পাত্যা, ছাইতান, আগ্যা, ইচা, নোন্দা, বাইং, এবা নানান জাতের মাছ পেট ভর্তি আন্ডা নই আইত পাহাইরা হোতের মইদ্যে আন্ডা পারনের নিগা। আমরা বিস্টিত ভিজা, ছাতি মাথায় দিয়া, কলাপাতা পাথায় দিয়া, নয় মাতইল মাথায় দিয়া মাছেরে গেতাম। ক্ষেতের বাতর যেনু পানি যাওনের নিগা কাইটা দিত হেডা কইত জোর। আমরা জোরের হোতের পানিতে জালি পাইত্যা খারই থাকতাম। পানির নিচে জালির নগে ঠ্যাং ঠেহাই য়াকতাম। জালিতে মাছ ঢুইকা যেসুম ঠ্যাংগের মদ্যে গুতা মারত হেসুম জালি উচা করতাম। জালি তিগা মাছ ধইরা খালুইর মদে য়াকতাম। খালুই ভইরা যাইত মাছে। হেই মাছের পেট বোজাই আন্ডা থাকত। হেই জোরের মইদ্যে য়াইতে ঠুই পাইত্যা য়াকতাম। সক্কালে বেলা ওঠনের সোম গিয়া ঠুই চাইতাম। ঠুইয়ের আগায় হেই মাছগুনা বাইজা থাকত। ক্ষেতের বাতরে ঠুই উল্টাইয়া মাছ বাইর করতাম। খালুই ভইরা যাইত। মাছের নগে চেকমেকা, কাকরা, কুইচ্যা, টেপা, হামুক, ইন্যাও বাজত। ইন্যা বাইচ্যা পানিত ঢেইল মাইরা ফালাই দিতাম। জৈস্টি মাসে জাংলাভর্তি জিংগা, পোড়ল অইত। বাড়ির পালানে ডাংগা অইত নশনশা। মা হেইন্যা দিয়া মাছ য়ান্না করতেন। ঢলের মাছ নতুন তরিতরকারি দিয়া এবা মজাই যে নাগ ত গো, খাইয়া পেট ডিগ ডিগ করত।

আষাঢ়, শাওন, ভাদ্দর মাসে খালি বিস্টি অইত। বাইদ বোজাই পানি থাকত। পাহারের পাগার, পুস্কুনি, কুয়া, জোরা পানিতে ভইরা থাকত। এইসুম মাছগুনা বাইদে ছড়াই ছিটাই থাকত। আর মাছের পোনা গুনা বড় অইতে থাকত। হেসুম খালি ঠুই পাইত্যা মাছ ধরতাম। ভাদ্দর মাসের হেষের দিকে যখন বিস্টি কইমা যাইত হেসুম বাইদের জমিতে আমন ধানের গোছা নাগাইত। আর আগে এই জমিগুনাতে ছিল আউশ ধান। বেশি ভাগই ছিল ভাতুরি ধান। ভাতুরি ধান কাটার পর ক্ষেতে য়াল বাইয়া কেঁদা বানাইহালত। ধানের গোছা দেওনের আগে মই দিয়া ক্ষেত হোমান করন নাগত। কেঁদা ক্ষেতে মই দেওনের সূম চংগের পাছের পানি হইরা গিয়া মাছ বাইরইয়া দাফ্রাইতে থাকত। এইন্যা ধইরা ধইরা আমরা খালই বোজাই করতাম। কোমরের পিছনে খালই ঝুলাইয়া বাইন্ধা নিতাম। দুই য়াত দিয়া ধরতাম, আর খালই মইদ্যে য়াকতাম। কই মাছ গুনা কেঁদার উপর কাতাইতে থাকত। কি মজাই যে নাগত! আমি, মজি ভাই, জিন্না ভাই, সিদ্দি ভাই, এবা অনেকেই দল ধইরা হেইন্যা ধরতাম। মজি ভাই মইরা গেছে গাড়ি এক্সিডেন্ট কইরা। পাহাইরা বাইদের মাটি খুব সারিল মাটি। কয়দিনেই ধানের গোছা মোটা য়ই গেত। ক্ষেতে হেসুম টলটলা পানি থাকত। হেই পানি দিয়া নানান জাতের মাছ দৌড়াদৌড়ি করত। দেহা গেত। আমরা ক্ষেতের বাতর কাইটা জোর বানাইয়া হেনু বাইনাতি পাইত্যা য়াকতাম। বাইনাতি বাঁশের বেতি দিয়া বুনাইয়া বানান নাগত। বাইনাতির সামন দিয়া ভাটার মাছ ঢোকার পথ আছে, আবার পিছন দিক দিয়া উজাইন্যা মাছ ঢোকার পথ আছে। মাছ ঢোকপার পায়, বাইরবার পায় না। দিনাপত্তি সকালে বাইনাতি চাওয়া য়ইত। বাইনাতি পাতার সুম মুখ কাঠের, নইলে বাঁশের কচি দিয়া বন্ধ কইরা দেও য়ইত। হেইডা খুইলা মাছ খালইর মদ্যে ঢাইল্যা দেও য়ইত। বেশি ভাগ বাইনাতিত গুত্তুম আর দারকিনা মাছ বাজত। ইন্যা পিয়াজ কাঁচা, মইচ, হৌষার তেল দিয়া ভাজা ভাজা কইরা খাইলে কিবা মজাই যে নাগত গ! যেনুকার বাতর মোটা আছাল, হেনুকার বাতর ভাঙ্গাও বড় বড় আছাল। হেনু বাইনাতি না পাইত্যা বড় বড় দোয়ারি পাতন নাগত। দোয়ারি বাইনাতির নাগালা দুইমুরা চোক্কা না। দোয়ারি অইল বাসকর মোত। ইন্যাও বাঁশের হলা দিয়া বুনাইয়া বানায়।

আশ্বিন মাসে বেশি বিস্টি অইত না। ধানের গোছাগুনাও মোটা মোটা অইত। হেইন্যার ভিতর দিয়া মাছ কপ কপ করত। য়ইদের তাপে ক্ষেতের পানি ততা অই গেত। মাছগুনা যেম্মুরা গাছের ছেওয়া পড়ত হেম্মুরা আই পড়ত। আমরা স্কুল তিগা আইয়া বশ্যি নিয়া মাছেরে গেতাম। বশ্যির আধার গাত্তাম খই, কুত্তাডেউয়ার আন্ডা, নয় চেরা দিয়া। চেরাগুনারে জির কিরমিরমির নাগালা দেহা গেত। উন্যারে গাছতলের ভিজা মাটি তিগা কোদাল দিয়া কোবাইয়া বাইর কইরা ছেনি দিয়া টুকরা টুকরা কইরা কাইট্যা নিতাম। বড় বড় পিপড়াগুনারে আমরা ডেউয়া কইতাম। কুত্তার মোত অইলদা য়োংগের ডেউয়ারে কইতাম কুত্তাডেউয়া। গজারি গাছের আগায় পাতা পেঁচাইয়া কুত্তাডেউয়ায় বাহা বানাইয়া আন্ডা পারত। হেই আন্ডা দিয়া বশ্যি হালাইলে বেশি মাছ ধরত। তরুই বাঁশ দিয়া বশ্যির ছিপ বানাইতাম। না পাইলে বৌরাবাঁশের কুইঞ্চা দিয়া ছিপ বানাইতাম। খালই বুনাইতাম তল্যা বাসের বেতি দিয়া। গোছা ক্ষেতে বশ্যি ফালাইলে বড় বড় আগ্যা মাছ ধরত। পানির মদ্যে বশ্যি নাচাইলে আগ্যা মাছ ফালাই ফালাই আইয়া বশ্যির আইংটায় বাইজা পড়ত। খোট্টা দিয়া টানে তুইল্যা হালাইতাম। কোন কোনডা ছুইট্টা গিয়া আড়া জোংগলে গিয়া পইরা হাটি পারতে থাকত। পাতা খুচখুচানির শব্দ হুইন্যা আগ্যা মাছের ঘারে ধইরা খালইর মইধ্যে ভইরা ফালাইতাম। মাছ যাতে তাজাতুজা থাহে হেইজন্য জগের মইদ্যে নয় বদনার মইদ্যে পানি দিয়া জিয়াই য়াকতাম। আগ্যা মাছ জাইরা আছে৷ বদনায় য়াকলে আগ্যা মাছ হাটি মাইরা বাইরই গেত দেইখা হিসার জগে য়াকতাম। শিক্ষিত মাইন্সে আগ্যা মাছরে রাগা মাছ কইত ফ্যারাংগি দেহাইয়া। ভৌরা মাইনষে আগ্যা মাছ খাইত না। তারা গুত্তুম মাছও খাইত না। বংশি-মান্দাইরা চুইচ্চা খাইত। তারা কাছিমও খাইত। কাছিম জোংগলেও থাকত। ইন্যা খুব বড় বড় ছিল। ইন্যারে কইত দুরা।

বাইদের পানির টান পরলে মাছগুনা পাগার, জোরায় গিয়া জরা অইত। আমরা হেইন্যারে খুইয়া, জালি, জাহি জাল, নয় ছিপজাল দিয়া মাইরা খাইতাম। বিষগোটা ছেইচ্ছা পাগারে ছিটাই দিলে মাছ গাবাই উঠতো। গাবাইন্যা মাছ ধইরা আরাম পায়ন গেত। পাগারের মাছ, জোরার মাছ ইন্যা পালা মাছ আছাল না। তাই যে কেউ ইন্যা মারতে পারত। আমরা চন্দের জোরা, আলম ঠাকুরের জোরা, ওহা বেপারির জোরা, খাজাগ জোরা, নাটুগ পাগার, কলুমুদ্দি তাওইগ পাগার তিগা ভরা মাছ মারছি। ঘাট চওনার জোরায় তনে ভরা ইচা মাছ মারছি খুইয়া দিয়া দোয়াইয়া। এনুকার পানি কইমা গেলে কেঁদার নিচে বাইং মাছ বই থাকত। কেঁদা পারাইলে পায়ের নিচে পিচলা নাগত বাইং মাছ। পায়ের নিচ দিয়া য়াত দিয়া কেঁদা হুইদ্যা বাইং মাছ টানে মেইল্যা মারতাম। য়াত দিয়া ধরতে গেলে বাইং মাছ পিচিল্যা যায় গা। একবার করছিলাম কি, এবা কইরা এডা মাছ কেদাসুদ্যা মেইল্যা মারছি, হেডা গিয়া পড়ল এডা ঝোপের ভিত্তরে। আমি ঝোপের ভিতর ফুস্কি দিয়া দেহি মেলা মাইনষের কংকাল, এহেবারে ঠেংগি দিয়া য়াকছে। ডরের চোটে তাত্তারি মাছ মারন বাদ দিয়া বাইত আই পরছি। য়াইতে হুইয়া হুইয়া বাবার নগে হেই কতা কইছি। বাবা কইল যে বংশি – মান্দাইরা কলেরা-বসন্ত হইয়া বেশি মানুষ মইরা গেলে চিতায় না পুইরা এবা ঝোপের মইদ্যে পালা দিয়া য়াকত। হেইন্যা মোনয় হুকাইয়া কংকাল অইছে।

কাতিমাসে বেশি মাছ মারন গেত। বাইদের ছোট ছোট গাতায় ভরা মাছ থাকত। টিনের থালি দিয়া হেই পানি হিচ্চা মাছ ধরতাম। এলকা পানি হিস্তে কষ্ট অইত। হেইজন্যে হাজা ধইরা হিচা মাছেরে গেতাম। পানি হিচা যে যেডি ধরাহারি হেডি ধইরা নিয়াইতাম। শাজাহান ঠিকমোত চোহে দেকত না। কেঁদার মইদ্যে খালি আতাপাতা করত। এই জন্যে যদি কইতাম “শাজাহান, হিচা মাছেরে যাবি নিহি?” শাজাহান কইত “ভাগে নিলে যামু।” আমি যে বোছর সেভেনে পড়ি, হেই ১৯৭৩ সোনে, হে ট্রাক্টরের চাকার নিচে পইরা মইরা গেছে। অহনো তার নিগা আমার পরণ পোড়ে। কেঁদার মইদ্যে মাছ ধরতে গেলে শইলে কেদা নাগত। যতই বালা কইরা গোসল করতাম কানের নতির পাছে কেদা নাইগাই থাকত ধলা অইয়া। খাবার বইলে পড়ে মা হেই কেঁদা আচল দিয়া মুইছা দিত।

কাতিমাসে পাহারের পানি হুকাই গেলে সব মাছ গিয়া চাপরাবিলে জরা অইত। মাছে বিল কপকপ করত। হুনিবার মোংগলবারে চাপরাবিলে মাছ মারনের নিগা মানুষ পিল্টা পরত। হেইডারে কইত বাওয়ার মাছ। বেশি মানুষ একবারে পানিত নামলে মাছ গাবাই উঠতো। তাই ধরাও পড়ত বেশি বেশি। এই জন্য সবাই বিলে মাছেরে যাওনের নিগা ডাহাডাহি পারত। অনেকে পরভাইত তিগাই শিংগা ফুয়াইত। শিংগার ফু হুইন্যা পাহাইরা মানুষ গুনা যার কাছে যেডা আছে হেডা নিয়া ভাইংগা চুইরা আইত চাপরা বিলে। এক নগে জাহইর দিয়া বিলে নামত নানান ধরনের জিনিস নিয়া। হেন্যা অইল মোন করুন চাবি, পলো, টেপারি, ফস্কা, কোচ, খুইয়া, জালি, ছিপজাল, ঝাকিজাল, চাকজাল আরও কত কী! ইলশা মাছ ছাড়া আর যত ধরনের মাছ আছে সব পাও গেত এই বিলে। খালইর চাইরমুরা পাটখরির মোঠা বাইন্দা দিত যাতে খালই পানিত ভাইসা থাহে। বড় বড় খালই ভইরা মাছ আইন্যা উঠানে ঢাইল্যা দিত। মেওপোলা মাইনষে হেইন্যা দাও বটি দিয়া কুইটা পাট খরিতে গাইতা দড়ি দিয়া ঝুলাইয়া অইদে হুকাইয়া হুটকি কইরা য়াকত নাইন্দার মইদ্যে। খাইত কয় মাস ধইরা। চাপরা বিলের আশে পাশের পাহাইরা গ্রামের মানুষ তিগা নিয়া হেম্মুরা হেই আংগারগাড়া পর্যন্ত মানুষ চাপরা বিলের মাছ মারতে আইত। হেই গেরামের নামগুনা আমি কইতাছি হুনুন – গবরচাহা, বৈলারপুর, য়ামুদপুর, বাঘেরবাড়ি, বেড়িখোলা, আন্দি, হুরিরচালা, চেল ধারা, নাইন্দা ভাংগা, গড়বাড়ি, বুড়িচালা, ইন্দাজানি, কাজিরামপুর, আদানি, ভাতগড়া,, ভুয়াইদ, পোড়াবাহা, ছিরিপুর, খুইংগারচালা, চটানপাড়া, ছোট চওনা, বড় চওনা, ঢনডইনা, হারাইসা, বাহার চালা, কাইলা, কৌচা, আড়াই পাড়া, ধলি, জামাল আটখুরা, দাইমা, ডাকাইতা, আরও ভরা গেরাম যেগ্নার কতা অহন মোনাইতাছে না। আমি হুনছি ভৌরারা চাপরা বিলে মাছেরে আইত না। আব ক্যা, তাগ কি মাছের অভাব আছে?

আংগ খালাগ বাড়ি মাইজ বাড়ি, আর বুগ বাড়ি অইল আমজানি। দুইডাই গাংগের পারে। বংশি নদীডারে আমরা গাং কই। আপারে আমরা বু ডাকতাম। জৈস্টি মাসের হেষের দিকে গাং পানিতে ভইরা যাইত। আমি বুগ বাইত গেলে, খালাগ বাইত গেলে বশ্যি নইয়া গাংগে মাছেরে গেতাম। আমজানির এবাদত ভাই, য়শি ভাই, হায়দার ভাই, আর মাইজ বাড়ির ইয়াছিন, ইসমাইল ভাইর নগে বশ্যি বাইতাম। ইয়াসিন ক্যান্সার অইয়া মইরা গেছে। তার নিগাও পরণ পোড়ে। আমার খালাত ভাই। বড় বড় নাইয়া বাইং, গুজা মাছ, হেলাম পুটি, বাইলা মাছ ধরত বশ্যিতে। ধরার আগে মাছে আধার ঠোকরাইত। হেসুম পাতাকাটি পানিতে নাচন পারত। তা দেইখা মোনের মইদ্যেও নাচন আইত। পাতাকাটি তল অইলে খোট্টা দিয়া মাছ তুইল্যা ফালাইতাম। বশ্যির মইদ্যে আটকাইয়া মাছ দাফরাইতে থাকত। কান্তা তিগা বশ্যি খুইলা মাছ খালইর মইদ্যে য়াকতাম। বুগ পাট ক্ষেতে চলাচলা পুটি মাছ দৌড় পাড়ত। হেইন্যা য়াত দিয়াই ধইরা ফালাইতাম। খালুই ভইরা যাইত পুটি মাছে। একটা আগ্যা মাছ ধরছিলাম দেইক্যা য়শি ভাই কয় “শালার পাহাইরায় আগ্যা মাছ ধরছে। আগ্যা মাছ মাইনষে খায়?” অশি ভাই দুলাভাইর চাচত ভাই। হেও মইরা গেছেগা। আগন পুষ মাসে গাংগের পানি কুইমা যাইত। কয়জনে মিল্যা গাংগে ঝার ফালাইত। হেই ঝারে বড় বড় বোয়াল মাছ, আইর মাছ, চিতল মাছ জরা অইত। ডল্যা জাল, নয় ঝাকি জাল, নয় চাক ঝাল দিয়া হেইন্যা ধরত। দুলাভাইরা কয়জনে ভাগে গাংগে ঝার ফালাইছাল। হেই ঝার তনে একটা মস্ত বড় পাংকাশ মাছ

ধরছাল। হেইডা কাইটা ভাগ কইরা নিছাল দুলাভাইরা। হেসুম বু আংগ বাইত্যে আছাল। দুলাভাই হেন তিগা এক ভাগা আংগ বাইত্যে নিয়াইছাল। আমি হেসুম দুল্যা আছিলাম। পাংকাশ মাছের নাম হেদিন হুনলাম। হায়রে মজা নাগছাল হেইডা!

আংগ নানিগ বাড়ি অইল ভরে, য়ৌয়া গেরামে। শিক্ষিত মাইনষে কয় রৌহা। হেনু গিয়াও মাছেরে গেছি। য়াইত কইরা আন্ধাইরের মইদ্যে বোরো ধান ক্ষেতের বাতর দিয়া আইটা যাওনের সোম হলক ধরাই যাইতাম। হলকের আলো দেইখা হৈল মাছ আইগাই আইত। কাছে আইয়া চাই থাকত। হেসুম ফস্কা দিয়া ঘাও মাইরা ধইরহালতাম। যাগ ফস্কা না থাকত তারা পাট কাটনের বাগি দিয়া কোপ মাইরা হৈলের ঘার কাইটাহালত। হৈল মাছ, সাইতান মাছ এক ঝাক পোনা নিয়া ঘুরাঘুরি করত। হেই পোনা খুইয়া দিয়া খেও দিয়া মারতাম। পোনামাছ ভাজি খুব বাসনা করত। এহন বুঝি উগ্না মারন ঠিক অয় নাই।

বাইস্যা মাসে আমি, ফজু ভাই, কাদে ভাই, নজু ডিংগি নাও নিয়া হুক্নি বিলের মইদ্যে গিয়া বশ্যি ফালাইতাম। বড় বড় ফইল্যা মাছ ধরত। নজু আমার তিগা এক বোছইরা ছোট আছাল। হে ছোট বালাই য়ক্ত আমাশা অইয়া মইরা গেছে। আশিন মাসে পানি নিটাল অইয়া গেত। চামারা ধান ক্ষেতের ভিতর হল্কা মাছ খাওয়া খাইত। হেসুম পানিত ছোট ছোট ঢেউ উঠত। আমি আর ভুলু ভাই ডিংগি নাও নিয়া যাইতাম মাছেরে। আমি পাছের গলুইয়ে বইয়া নগি দিয়া নাও খোজ দিতাম। ভুলু ভাই সামনের গলুইয়ে কোচ নইয়া টায় খারই থাকত। বিলাইর নাগালা ছপ্পন ধইরা। মাছে যেই য়া কইরা কান্তা নড়াইত অবাই ভুলু ভাই কোচ দিয়া ঘাও দিয়া ধইরা ফালাইত। আমি পৌকের নাগাল পাছের গলুইয়ে বই থাকতাম। ভিয়াইল আংগ ফুবুগ বাড়ি। হেনু গিয়াও এবা কইরা মাছ মারতাম গিয়াস ভাই, মতি ভাই, সূর্যভাই, সামসু ভাই, জিয়াবুল ভাই, চুন্নু ভাইগ নগে। চুন্নু ভাই, জিয়াবুল ভাই মইরা গেছে। ভিয়াইল আংগ কাক্কুগ বাড়িও। হায়দর ভাইর নগেও এবা কইরা মাছ ধরছি। ভৌরা মাইনষে আশিন মাসে পানির দারার মইদ্যে বড় বড় খরা পাইত্যা নোড়া ফেকা মাছ মারত। ফুবার নগে গিয়া ভরা নোড়া ফেকা মাছ কিন্যা আনছি নায় চইরা। কাতি মাসে তালতলাগ বোগল দিয়া যে বিলগুনা আছাল হেইগ্নার যত মাছ গোলাবাড়ির খাল দিয়া আমজানির গাংগে গিয়া নামত। আংগ গেরামের মাইনষে হেই খালে ছিপ জাল পাইত্যা হেই মাছ ধরত। খালের পাড়ে মাচাং বাইন্দা বইয়া বইয়া ছিপজাল বাইত। এহাকজোনে বাইক কান্দে নইয়া এক মোন দের মোন গোলাবাড়ি তিগা মারা পুটিমাছ আইন্যা উঠানে ঠেংগি দিয়া ঢালত। এত মাছ কিবা কইরা মারে ইডা দেকপার নিগা আমি আর জিন্না ভাই এক নগে গোলাবাড়ি গিয়া য়াইতে মাচাংগে হুইছিলাম। যাওনের সুম দেহি হাইল হিন্দুইরা খালে গুদারা নাই। অহন পাড় অমু কিবায়? ঘাটে কোন মানুষ জোনও আছাল না। জিন্না ভাই কইল “তুই অম্মুহি চা।” আমি চাইছি। ঘুইরা দেহি জিন্না ভাই এক য়াতে কাপর উচা কইরা ধইরা আরেক য়াত দিয়া হাতুর পাইরা খাল পাড় অইতাছে। দিস্ কুল না পাইয়া আমিও কাপড় খুইলা এক য়াতে উচা কইরা ধইরা হাতুর পাইরা পার অই গেলাম। য়াসুইন না জানি। হেসুম পোলাপান মানুষ আছিলাম। কেউ ত আর আংগ দেহে নাই। শরমের কি আছে? গোলাবাড়ি গিয়া দেহি হারা খাল ভর্তি খালি ছিপ জাল। ষাইট সত্তুরডা জাল পাতছে ছোট্ট এডা খালে, ঘোন ঘোন, লাইন দইরা। বেক্কেই য়াইত জাইগা জাল টানে। দিনে বেশি মাছ ওঠে না। য়াইতে নিটাল থাকে দেইখা মাছ খালে নামতে থাহে। দিনে বেক্কেই ঘুমায়। আমি আউস কইরা কয়ডা খেও দিছিলাম। অত বড় জাল আমি তুলবার পাই নাই। তাত্তারি মাচাংগে গুমাই পড়ি। হেষ আইতে ঘুম ভাইংগা যায় জারের চোটে। কাতি মাস অইলে কি অব, য়াইতে জার পড়ত। দেহি য়াত পাও টেল্কায় শান্নিক উইঠা গেছে গা। বিয়ান বেলা কোন মোতে কোকাইতে কোকাইতে বাইত আই পড়লাম। এন্তিগা এবা সর্দি নাগল গ, এক হপ্তা পর্যন্ত সর্দি জ্বর বাইছিল। জ্বর নিয়া কাতি মাসে বিয়ানবেলা য়ইদ তাপাইতে বালাই নাগত। এক নাক ডিবি ধইরা বন্ধ অই থাকত। নজ্জাবতি ফুলের বোটা ছিড়া নাকে হুরহুরি দিলে বাদা আইত। হাইচ্চ দিলে নাক বন্ধ খুইলা গেত। জোড়ে জোড়ে নাক ঝাইরা পরিস্কার করতাম। আমি গোলাবাড়ি একবারই গেছিলাম।

গোলাবাড়ির মাছ মারা নিয়া এডা মজার কতা কই। একবার এডা মেওপোলা য়োগী নিয়া আইল এক বেটা আংগ এলাকা তিগা। কাগজপাতি ঘাইটা দেকলাম সখিপুর আর টাঙ্গাইল তিগা ভরা টেহার পরীক্ষা করছে। খালি টেহাই গেছে। আমি কইলাম “ভরাইত পরীক্ষা করছুইন।” বেটাডায় য়াগ কইরা কই উঠলো “আন্নেরা সখিপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিং য়োগীগ কাছ তিগা টেহা নিয়নের নিগা গোলাবাড়ির খালের মতো জাল ফালাইছুন ক্লিনিক কইরা। গোলাবাড়ির খালে যেবা উজান ভাটি সব জালেই হোমানে মাছ বাজে, হেবা আন্নেগ বেবাক ক্লিনিকেও গেরামের মাইনষের টেহা বাজে। বেটা মাইনষে বিদেশে কষ্ট কইরা টেহা কামাই কইরা দেশে পাঠাইতাছে, আর হেই টেহা আন্নেরা জাল পাইত্যা ছাইব্বা তোলতাছুইন। য়োগী বালা অওনের নাম নাই। খালি টেহা নিতাছুইন। ” আমি কইলাম “য়োগী ডাকতরেরা বালা করবার পাবনা। বেটির জামাইরে দেশে নিয়াই পড়ুন। দেকবাইন এবাই বালা অই যাবো গা। “

জারের দিনে নানিগ বাড়ির চহের পানি হুকাই গেত। পাগারের পানি পানায় ঢাইকা গেত। আমি আর ফজু ভাই হেই পানিত তিগা খুইয়া দিয়া দোয়াইয়া মাছ মারতাম। ফজু ভাই পানার নিচ দিয়া খুইয়া ঠেইল্যা দিত। পানা হুইদ্যা খুইয়া উচা কইরা ধরত। আমি খাবলাইয়া পানা হরাইয়া দিতাম। হেই খুইয়ায় খইলসা মাছ, চাটা মাছ, কই, জিওল, মাগুর মাছ উঠত। চাটা মাছ খইলসা মাছের নাগালা দেখতে, তে একটু ছোট। আমি চাটারে খৈলসা কইছিলাম দেইকা ফজু ভাই কইল “এই শালার পাহাইরা, চাটা মাছ চিনে না!” তিন আংগুল দিয়া মাথা আর ঘার পেইচা ঠাসি মাইরা ধরন গাগত জিওল মাছেরে। কাতা দেয় দেইকা আমি ডরে জিওল মাছ ধরহাইতাম না। একদিন সায়স কইরা ধরবার নিছিলাম। অবাই একটা কাতা খাইলাম। হায়রে বিষান নইল! বিষের চোটে উজা নাফ পারন নইলাম। কানতে কানতে নানিগ বাইত গেলাম। মামানি কাতা দিওন্যা যাগায় চুনা নাগাই দিলে বিষ কিছুডা কমল। তারপর বিষ নামাইন্যা ঝারা দিল এবা কইরা

আউরা জাউরা বিষের নাম,

কোন কোন বিষের নাম।

অ বিষ ভাটি ছাইড়া যাও।

যুদি ভাটি ছাইরা উজান ধাও,

মা পদ্মার মাথা খাও।

অ বিষ ভাটি ছাইরা যাও।

ঝারা দেওনের ভরাক্ষোন পরে বিষ কোমলে ঘুমাই পড়ি। আমি আর কূন্দিন কাতা খাই নাই। কাতা খাইয়া এডা উপুকার অইছে। য়োগিরা যেসুম কয় “য়াত পাও এবা বিষায় জানি জিওল মাছে কাতা দিছে। ” হেসুম আমি বুঝি কিবা বিষায়।

শাওন ভাদ্দর মাসে আমজানি দুলাভাইগ পালানের পাট কাটার পরে কোমর তুরি পানি থাকত। হেই পানিত চেলা, মলা, ঢেলা, বাতাসি, তিতপুটি, এবা ভরা মাছ থাকত। দুলাভাইর নগে মুশুরি টাইনা হেইন্যা ধরতাম হিসার পাইল্যা বোজাই কইরা। হিসার পাইল্যা পানিত ভাইসা থাকত। মাছ ধইরা পাইল্যায় য়াকতাম।

চৈত বৈশাখ মাসে পানি হুকাই যাইত। নানিগ বোরো ক্ষেতে হিচা দিয়া পানি হিচপার নিগা গাড়া কইরা মান্দা বানাইত। হেই মান্দা হিচা মাছ ধরতাম। অইদের তাপিসে কাঠের নাও হুকাইয়া বেহা ধইরা গেত দেইখা ইন্যারে পুস্কুনির পানিতে ডুবাই য়াকত। নায়ের পাটাতনের নিচ দিয়া মাছ পলাই থাকত। আমরা দুই তিন জোনে মিল্যা ঝেংটা টান মাইরা নাও পারে উঠাই ফালাইয়া নাও তিগা মাছ ধরতাম। মামুরা পুস্কুনিতে ডল্যা জাল টাইনা বড় বড় বোয়াল মাছ ধরত। জালে মইদ্যে বাইজ্যা হেগ্নায় হাটিহুটি পারত। মামুগ কান্দের উপুর দিয়া নাফ দিয়া যাইত গা বড় বড় বোয়াল। পুস্কুনির পাড়ে খারইয়া আমরা তামসা দেখতাম।

মাছ মারনের এবা ভরা কতা লেহন যাবো। কিন্তু এত সোময় আমার নাই। আন্নেরা ত জানুইনই আমি একজোন ডাকতর মানুষ। ডাকতরে গ কি অত সোময় আছে? একটা হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের প্রধান আমি। দিনাপত্তি বিয়ানবেলা সারে আটটা তিগা বিকাল আড়াইডা পর্যন্ত হেনু কাম করন নাগে। বৈকাল চাইরডা তিগা য়াইত নয়ডা পর্যন্ত নিজের প্রাইভেট ল্যাবরেটরিতে কাম করি। হেনু গেরামে তিগা মেলা লোক আহে। তাগ নগেও কতা কওন নাগে। শুক্কুরবারে বন্ধ থাহে। হেদিন য়াবিজাবি কাম করি। চাইরডা মেডিকেল জার্নাল সম্পাদনা করন নাগে আমার। বই লেহি। কম্পিউটারের সফটওয়্যার বানাই বিক্রি করি। ছাদবাগান করি। অনলাইনে ক্লাস নেই। জুমে মিটিং করি। ইউটিউব ভিডিও বানাই। মেয়াগ নগে, নাতি নাত্নিগ নগে, বন্ধুগ নগে, শালা সুমুন্দি গ নগে ভিডিও কলে কতা কইতে য়য়। এবা আরবিলের মইদ্যে থাকি। আন্নেগ নগে মাছ মারা নিয়া আর লেহনের সোময় নাই। অহন চেম্বারে যামু, থাইগ্যা। দোয়া করুইন জানি।

১৩/৭/২০২১ খ্রি.

ময়মনসিংহ

নৌকা ভ্রমণ

পনের বিশ বছর আগের কথা। সেবার খুব বন্যা হয়েছিল। বর্ষাকালের শেষে অথবা শরৎ কালে মামার বাড়ি যেতে ইচ্ছে হল। অনেক বছর যাওয়া হয়নি। নদী নালা খাল বিল ভরে গিয়ে মাঠ ঘাট প্লাবিত হয়ে বাড়ির পালান ভর্তি পানি হয়েছে খবর পেলাম। সেই সময় বৃষ্টি থাকে না। চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। ছোট ছোট ঢেউ এসে বাড়ির ভিটায় আঘাত করে। দেখতে মন চায়। পুর্ণিমার রাত দেখে একটা তারিখ  ঠিক করলাম মামা বাড়ি যাবো। ডিঙি নৌকা নিয়ে বিলের মাঝখানে লগি গেড়ে নৌকা বেঁধে পাটাতনের উপর খালি গায়ে চিত হয়ে শুয়ে পুর্ণিমার চাঁদ দেখবো। সমবয়সী মামাতো ভাই ফজলু ভাই ও কাদের ভাইর সাথে শৈশবকালের স্মৃতিচারণ করব। ডাহুক, কোড়া ও কুড়া পাখির ডাক শুনব। দূর থেকে বাউলের গান ভেসে আসবে। বিলের মৃদুমন্দ বাতাসে শরীর জুড়িয়ে যাবে।

একদিন ভোরে ফজরের নামাজ পড়ে ময়মনসিংহ থেকে রওনা দিলাম। বাসে করে কালিহাতি এসে নামলাম। কালিহাতি থেকে একটা লগি দিয়ে খোজ দেয়া ছইওয়ালা নৌকায় উঠলাম। নৌকার দুইজন মাঝি ছিল। খাল দিয়ে নৌকা চালাচ্ছিল। একজন লগি দিয়ে খালের দুইপাড়ে খোজ দিচ্ছিল। আরেকজন পিছনে দাঁড় ধরে বসেছিল। নৌকায় সাত-আট জন যাত্রী ছিল। সবাইকে এলাকার যাত্রী মনে হচ্ছিল। আমাকে তাদের থেকে একটু অন্যরকম মনে হচ্ছিল। প্যান্ট শার্ট পরা । হাতে ব্রিফকেইস। সবাই ছইয়ের বাইরে পাটাতনে বসেছিল। আমিও নৌকার গুড়ায় বসলাম একটু খোলা মেলা হাওয়া খাওয়ার জন্য। মাঝি অনুরোধ করল “স্যার, ছইয়ের ভিতরে গিয়ে বহুন । আপনের গতরে নগির পানির ছিটা নাগতে পারে। আপনে বসা থাকলে আমিও ভাল ভাবে নগি দিয়া খোজ দিতে পারি না। তাছাড়া রৈদে বসলে আপনের জ্বর আইতে পারে।”

আমি ছইয়ের ভিতরে গিয়ে বসলাম। আমার জন্য পাতলা কাথা বিছানো ছিল। আমি মোজা খুলে আসন বিড়ায়ে বসলাম। ভিতরে আরেকজন লোক পেলাম শার্ট ও লুঙ্গী পড়া। ঠেংগের উপর ঠেং তুলে চিত হয়ে বালিশে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে। বেয়াদব বেয়াদব মনে হল। আমি কিছুটা অসস্থি বোধ করছিলাম। কিছুক্ষণ পর রৌদ্রের প্রখরতায় সবাই ছইয়ের ভিতরে এসে বসল । তারা গ্রাম্য সমস্যা নিয়ে কথা বলছিল। আমি ও বেয়াদব লোকটা শুধু শুনছিলাম। একসময় লক্ষ্য করলাম বেয়াদব লোকটার দুই হাতে দুইটি এবং দুই পায়ে দুইটি গোল্ডেন ব্রেসলেট পরা ।

একজন জিজ্ঞেস করলেন

-লোকে ব্রেসলেট পরে  হাতে একটা। আপনি চার হাতপায়ে চারটি পড়েছেন কেন?
-আমি কি এমনি এমনি পরেছি? আমার সমস্যার জন্য এগুলো পরেছি। বাতের জন্য এগুলো সাংঘাতিক উপকার দেয়। আমার ভাতিজা সৌদি আরব থাকে। সে জানতো আমার সারা শরীরে বাতের ব্যাথা। প্রথমে লোক মার্ফৎ আমার জন্য একটা ব্রেস্টলেট পাঠায়। এরপর উপকার পাওয়ার কথা শুনে পরপর আরো তিনটা পাঠায়। তাই চারটি ব্রেস্টলেট চার জায়গায় পরেছি। আমি এখন বাতমুক্ত।”

এরপর বাত রোগ নিয়ে সবাই যার যার মত প্রকাশ করতে লাগলো। নানান রকমের তেলেসমাতি চিকিৎসা পদ্ধতির কথাও শুনলাম নিরবে। একসময় প্রথম প্রশ্নকারী বললেন

-আপনার ভাতিজা তো সৌদি থাকেন। আমার জন্য একটা  ব্রেসলেট আনিয়ে দেবেন? আমি টাকা দিয়ে দেব। আমার শরীরে খুব বাতের ব্যথা।
-আপনার প্রয়োজন থাকলে এটা নিন। আমি ভাতিজাকে ফোন করে আনিয়ে নেব নি।
-দাম কত দিব?
-পাঁচশ টাকা দিন। এগুলোর দাম অনেক। খুব উপকারী ধাতু তো!
-তা হলে আমাকে একটা দিন।
-এই নিন। আপনার হাতে খুব মানিয়েছে। এর উপকার আগামীকাল থেকেই পেয়ে যাবেন।

আমরা সবাই দেখলাম। একটু পর আরেকজন বললেন

-ভাই, আপনাকে তো আনাতেই হবে। আমাকেও একটা দিন না। আপনার ভাতিজাকে দিয়ে আনিয়ে নিবেন।
-এই নিন আপনি।

এইভাবে লোকটি চারজনের কাছে চারটি ব্রেসলেট আমাদের চোখের সামনে দুইহাজার টাকায় বেচে দিলাম। সামনের ঘাটে নৌকা ভিরালে বেয়াদব লোকটি ও প্রথম গ্রাহক নেমে পড়ল। এতক্ষণে আমরা রহস্য বুঝে ফেললাম। সবাই হাসাহাসি করলাম টাউটের টাউটামি বুঝে। আমি নিজেও বুঝতে পারছিলাম না। মাঝি বলল “প্রথম গ্রাহকটা ঐ টাউটেরই লোক। ওকে দিয়ে বিক্রি শুরু করে। এরপর তারা আরেক নৌকায় উঠে এই কাজই করবে।”

আউলিয়াবাদ ঘাটে এসে এই নৌকা জার্নি শেষ হল । নেমে আরেকটি প্রাইভেট ডিঙি নৌকায় উঠলাম রৌহা মামাবাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে। রৌহা কালিহাতি উপজেলায়। পুর্বদিকে বংশী নদীর কাছাকাছি ভর অঞ্চল বা ভাটি অঞ্চল। ছাতা ফুটিয়ে নৌকার গলুইয়ে গিয়ে বসলাম। দূর থেকে দেখা গেল দক্ষিণের পালান পারে মেঝ মামী দল বল নিয়ে আমাকে রিসিভ করার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। নৌকা ঘাটে এসে ভিড়ল। ঘাটে নামলাম। মামী এগিয়ে এসে গায়ে আদর করে বললেন “সাদক আইছ, কত দিন পরে আইলা, বাজান।”

মামাতো ভাই কদ্দুছের বউ এক গ্লাস সরবত এনে দক্ষিণ ভিটার গাছের নিচে চেয়ার দিল বসতে। আমি সরবত খেয়ে শার্টের উপরের বোতাম খুলে দক্ষিণ মুখ করে বসলাম। সবার সাথে কুশল বিনিময় হল। দক্ষিণের বিস্তির্ণ জলরাশি থেকে মৃদুমন্দ বাতাস এসে বুকে লাগছিল। ছোট ছোট ঢেউ পায়ের কাছে এসে ভেংগে যাচ্ছিল। মৃদু মৃদু কুলু কুলু শব্দ হচ্ছিল। দূরে বিলের মাঝ খানে তিন কিশোর ডিঙি নৌকা নিয়ে খেলা করছিল। মুহুর্তে আমি হারিয়ে গেলাম আমার শৈশব কৈশোরে। মনে হলো যেনো আমি, ফজু ভাই ও কাদের ভাই ডিঙি নৌকা নিয়ে খেলা করছি ।
১০/৩/২০১৮ খ্রি. This entry was posted in Story and tagged bil, Journey by boat, kalihati, Rouha, নানা বাড়ি, নৌকা, নৌকা ভ্রমণ, বিল, মামা বাড়ী on . Edit

Go to top

আমীর আলীর শেষ বিদায়

(স্মৃতি কথা)

সাগরদিঘি পর্যন্ত এলেই আমীর আলীর ফোন এলো। কুশল বিনিময় হলো।

– কোথায় তুমি?

– আমি তোমার সাথে দেখা করতে আসতেছি। ঢনঢনিয়া পর্যন্ত এসে গেছি।

– কোন সমস্যা হইছে?

– না, এমনিতেই তোমার সাথে দেখা করতে আসতেছি।

– তা, তুমি আসবে, আমাকে জানিয়ে আসবে না? ১৪/১৫ কিলোমিটার পথ হেটে এসে এখন ফোন করছো? আমি তো চলে যাচ্ছি ময়মনসিংহ। প্রাইভেট কারে যাচ্ছি। সাগরদিঘি পর্যন্ত এসে গেছি। ময়মনসিংহ গিয়ে অফিস ধরতে হবে। পরে একদিন দেখা করবো, ইনশাআল্লাহ। তুমি আমাদের বাড়ি যাও। আমি ভাতিজা মান্নান তালুকদারকে বলে দিচ্ছি তোমাকে আমার লেখা স্মৃতি কথার বইগুলো দিয়ে দিতে।

মান্নান আমীর আলীকে বই প্রদানের ছবি তুলে আমার মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে দেয়।

এর বেশ কিছু দিন পর আমীর আলী ফোন করে। কিন্তু তার কথা ভালো করে বুঝা যাচ্ছিল না। তার ছেলে আমাকে বুঝিয়ে বললো যে, তার বাবার জিহবার এক কিনারায় বিড়াট একটা ঘা হয়েছে, জিহবা নাড়াতে পারেন না। খেতেও পারেন না, কথা বলতেও পারেন না। এরপর যতবার ফোন করেছে আমি আমির আলীর কথা তেমন বুঝতে পারিনি। আমি অনুরোধ করে আমীর আলীকে ময়মনসিংহ আনালাম। দীর্ঘ বছর পর আমার বাল্য বন্ধুর সাথে দেখা হলো। আমি তাকে অনেকক্ষণ বুকে জড়িয়ে ধরে রাখলাম। কেউ কথা বলছিলাম না। একে অপরের শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করছিলাম। ছেড়ে দিয়ে আমীর আলীর জিহবার ঘা দেখলাম। আমার মনে হলো ক্যান্সার হয়েছে। আমি নিজেই তার এফএনএসি পরীক্ষা করলাম। ক্যান্সারই ধরা পরলো। চিঠি লিখে মুখ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডাঃ শমরেস কুন্ডু দাদার কাছে পঠালাম। দাদা বায়োপসি করে আমার কাছে সেম্পল পাঠালেন। আমীর আলী বাড়িতে চলে গেলো। তিন দিন পর পরীক্ষার রেজাল্ট দিলাম, ক্যান্সার।

Continue reading