Alapsinga Goenda
আলাপসিংগা গোয়েন্দা
(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
বিরাট এক রহুস্যের স্মৃতিকথা আজ শেয়ার করবো। ১৯৭৬ সনের কথা। তখন আমি বাটাজোর বি বিম হাই স্কুলে ১০ম শ্রেনীতে পড়তাম। থাকতাম বাংলা ঘরে। ঐ ঘরে চারটি চৌকি ছিলো। পশ্চিম পাশে পাশাপাশি দুইটি চৌকি ছিলো। একটিতে শুইতেন হাফিজ ভাই, আরেকটিতে শুইতাম আমি। আমারটার পাশে ছিলো আমার পড়ার টেবিল। হাফিজ ভাই ইন্টেরমেডিয়েট পাশ করে পড়ালেখা ক্ষান্ত দেন। সংসার দেখাশোনা করতেন আর শুয়ে শুয়ে গোয়েন্দার বই পড়তেন। মাঝে মাঝে সেই ঘটনা আমাকে শুনাতেন। ঘরের অন্য দিকের চৌকিতে আরফান ভাই থাকতেন। তিনি খুব একটা পড়াশুনা করেননি। কিন্তু খুব মার্জিত ছিলেন। সংসারের কাজকর্ম করতেন। তার পাশের চৌকিতে থাকতেন কামলারা। কৃষি শ্রমিকদেরকে গ্রামে কামলা বলা হতো। ময়মনসিংহের আলাপসিং পরগণা থেকে একজন কৃষি শ্রমিক এলেন এই বাড়ির কৃষি কাজ করতে। তিনি দুই সপ্তাহ ছিলেন এই কাছারি ঘরে।
আমি আলাপসিংগা ঐ কামলার চেহারা এবং আচার-আচরণে ভিন্নতা লক্ষ করি। তার থলেতে ছোট আয়না ও চিরুনি থাকতো। শরীরে মাখার তেল থাকতো। কাপড় চোপড় থাকতো পরিস্কার। আমার টেবিল থেকে বই নিয়ে নিরবে পড়তেন। আমি মাঝে মাঝে গুনগুনিয়ে গান গাইলে তিনি সেই গান নিয়ে মন্তব্য করতেন। এভাবে গল্প করতে করতে আমি তাকে একজন রুচিশীল মানুষ হিসাবে পছন্দ করতে থাকি।
এক রাতে তাকে বললাম, “আমাদের সখিপুর এলাকার একজন গানের শিল্পী আছেন খুব ভালো গান গায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। তাঁর নাম আবুল হোসেন তালুকদার। বাটাজোর সোনার বাংলা কলেজে শিক্ষক হয়ে এসেছেন। শুনলাম আজ প্রিন্সিপাল বানিজুর রহমান স্যারের বাসায় রাত ৯ টায় তিনি জলসায় গান গাবেন। তার গান আমার ভালো লাগে।” তিনি বললেন, “চলো যাই।” আমরা দুজনে চলে গেলাম গান শুনতে। গিয়ে দেখি গান শুরু হয়ে গেছে। বেশ কয়েকটা গান শুনলাম মুগ্ধ হয়ে। আবুল স্যার প্রিন্সিপাল স্যারকে বললেন, “স্যার, এতক্ষণ তো কঠিন কঠিন গান গাইলাম। এখন একটু পপ গান গাই।” প্রিন্সিপাল অনুমতি দিলেন। আবুল হোসেন স্যার পপ গুরু আজম খানের গান “ওরে মালেকা, ওরে সালেকা, ওরে ফুলবানু, পারলিনা পারলিনা বাচাতে…..। ” বানিজ স্যার বললেন, “আবুল, ভুলে যেয়ো না যে তুমি এখন কলেজের টিচার!” গানের সময় আবুল স্যারের ঠোটে হাসির ঢেউ খেলে গেলো।
আলাপসিংগা ভাইর একটা আন কমন নাম শুনেছিলাম। সেই নামটা এখন ভুলে গেছি। তিনি আমাকে ফিরে যাওয়ার সংকেত দিলেন। বিশাল পুকুর পাড়েই ছিল বানিজ স্যারের বাড়ি। পুকুর পাড় দিয়ে হেটে হেটে ফিরছিলাম। আকাশে ছিলো পুর্ণিমার চাঁদ। কি যে মিষ্টি ছিলো সেই জ্যোস্না! পানিতে চাঁদের প্রতিবিম্ব পড়ে অপরুপ লাগছিলো। পুকুর পাড়ে বসতে ইচ্ছে হলো। তিনি বললেন, আসো কিছুক্ষণ এখানে বসি। বসে পড়লাম চাঁদ আর পুকুরের পানির দিকে মুখ করে। আলাপসিংগা বললেন, “নজরুল গীতি গাও, আমি বাঁশের বাঁশি বাজাই।” আমি পর পর অনেক গুলো নজরুল গীতি গাইলাম। প্রতিটিতেই তিনি বাঁশী বাজালেন মধুর সুরে।
আলাপসিংগা ভাইর প্রতিভা ও রুচি দেখে আমি মুগ্ধ হলাম। এরপর তার সাথে উচ্চাংগ সুংগীত বাংলা গানের বিভিন্ন ধরণ নিয়ে অনেক আলোচনা করেছি। তিনি এখানে প্রায় দুই সপ্তাহ কৃষি শ্রমিকের কাজ করেছেন। একদিন সকালে দেখি তিনি শার্টের সাথে ফুল প্যান্ট পরেছেন। বললেন, “তোমার সাথে কয়েকদিন কাটিয়ে ভালো লাগলো। তোমার মধ্যে অনেক প্রতিভা আছে। ছাত্র হিসাবে তুমি খুব মেধাবী। তুমি লেখাপড়া চালিয়ে যাবে। অনেক বড় হতে পারবে, দোয়া করি। আমার যাবার সময় হয়ে গেছে। কাজ মোটামুটি শেষ হয়েছে। আসলে আমি কামলা না। আমি গোয়েন্দা বিভাগে চাকরি করি। আমার এখানে কিছুদিনের জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো। দায়িত্ব পালন করা হয়ে গেছে। আসি তাহলে, ভালো থেকো। গোয়েন্দা চলে গেলেন। আমি অবাক হয়ে ফেল ফেল করে তাকিয়ে দেখলাম। চোখের কোনায় পানি এসেছিলো কিনা মনে নেই। প্রায় ৫০ বছর আগের কথা তো।
তার আগে এই এলাকায় বড় বড় কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটে। কুতুবউদ্দিন মাস্টারের খুনের জের ধরে আবদুল হাকিম মন্ডল খুন হন। এর পর আরও খুনের আশংকা থাকে। তাই, এই এলাকায় গোয়েন্দা তৎপরতা চলতে থাকে। তারই অংশ হিসাবে হয়তো আলাপসিংগা গোয়েন্দা এসেছিলেন এখানে।
আমার আজও তাকে মাঝে মাঝে মনে পড়ে। বিশেষ করে যখন পুর্ণিমার চাঁদ চোখে পড়ে। কত মার্জিত ছিলো সেই আলাপসিংগা গোয়েন্দা। সরকারি কাজের অংশ হিসাবে ডিউটি করতে এসে কৃষি শ্রমিক হতে হয়েছে।
২৮/২/২০২৬ খ্রি.
ময়মনসিংহ

