Tag Archives: গল্প

alapsinga-goenda

Alapsinga Goenda

আলাপসিংগা গোয়েন্দা

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বিরাট এক রহুস্যের স্মৃতিকথা আজ শেয়ার করবো। ১৯৭৬ সনের কথা। তখন আমি বাটাজোর বি বিম হাই স্কুলে ১০ম শ্রেনীতে পড়তাম। থাকতাম বাংলা ঘরে। ঐ ঘরে চারটি চৌকি ছিলো। পশ্চিম পাশে পাশাপাশি দুইটি চৌকি ছিলো। একটিতে শুইতেন হাফিজ ভাই, আরেকটিতে শুইতাম আমি। আমারটার পাশে ছিলো আমার পড়ার টেবিল। হাফিজ ভাই ইন্টেরমেডিয়েট পাশ করে পড়ালেখা ক্ষান্ত দেন। সংসার দেখাশোনা করতেন আর শুয়ে শুয়ে গোয়েন্দার বই পড়তেন। মাঝে মাঝে সেই ঘটনা আমাকে শুনাতেন। ঘরের অন্য দিকের চৌকিতে আরফান ভাই থাকতেন। তিনি খুব একটা পড়াশুনা করেননি। কিন্তু খুব মার্জিত ছিলেন। সংসারের কাজকর্ম করতেন। তার পাশের চৌকিতে থাকতেন কামলারা। কৃষি শ্রমিকদেরকে গ্রামে কামলা বলা হতো। ময়মনসিংহের আলাপসিং পরগণা থেকে একজন কৃষি শ্রমিক এলেন এই বাড়ির কৃষি কাজ করতে। তিনি দুই সপ্তাহ ছিলেন এই কাছারি ঘরে।

আমি আলাপসিংগা ঐ কামলার চেহারা এবং আচার-আচরণে ভিন্নতা লক্ষ করি। তার থলেতে ছোট আয়না ও চিরুনি থাকতো। শরীরে মাখার তেল থাকতো। কাপড় চোপড় থাকতো পরিস্কার। আমার টেবিল থেকে বই নিয়ে নিরবে পড়তেন। আমি মাঝে মাঝে গুনগুনিয়ে গান গাইলে তিনি সেই গান নিয়ে মন্তব্য করতেন। এভাবে গল্প করতে করতে আমি তাকে একজন রুচিশীল মানুষ হিসাবে পছন্দ করতে থাকি।

এক রাতে তাকে বললাম, “আমাদের সখিপুর এলাকার একজন গানের শিল্পী আছেন খুব ভালো গান গায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। তাঁর নাম আবুল হোসেন তালুকদার। বাটাজোর সোনার বাংলা কলেজে শিক্ষক হয়ে এসেছেন। শুনলাম আজ প্রিন্সিপাল বানিজুর রহমান স্যারের বাসায় রাত ৯ টায় তিনি জলসায় গান গাবেন। তার গান আমার ভালো লাগে।” তিনি বললেন, “চলো যাই।” আমরা দুজনে চলে গেলাম গান শুনতে। গিয়ে দেখি গান শুরু হয়ে গেছে। বেশ কয়েকটা গান শুনলাম মুগ্ধ হয়ে। আবুল স্যার প্রিন্সিপাল স্যারকে বললেন, “স্যার, এতক্ষণ তো কঠিন কঠিন গান গাইলাম। এখন একটু পপ গান গাই।” প্রিন্সিপাল অনুমতি দিলেন। আবুল হোসেন স্যার পপ গুরু আজম খানের গান “ওরে মালেকা, ওরে সালেকা, ওরে ফুলবানু, পারলিনা পারলিনা বাচাতে…..। ” বানিজ স্যার বললেন, “আবুল, ভুলে যেয়ো না যে তুমি এখন কলেজের টিচার!” গানের সময় আবুল স্যারের ঠোটে হাসির ঢেউ খেলে গেলো।

আলাপসিংগা ভাইর একটা আন কমন নাম শুনেছিলাম। সেই নামটা এখন ভুলে গেছি। তিনি আমাকে ফিরে যাওয়ার সংকেত দিলেন। বিশাল পুকুর পাড়েই ছিল বানিজ স্যারের বাড়ি। পুকুর পাড় দিয়ে হেটে হেটে ফিরছিলাম। আকাশে ছিলো পুর্ণিমার চাঁদ। কি যে মিষ্টি ছিলো সেই জ্যোস্না! পানিতে চাঁদের প্রতিবিম্ব পড়ে অপরুপ লাগছিলো। পুকুর পাড়ে বসতে ইচ্ছে হলো। তিনি বললেন, আসো কিছুক্ষণ এখানে বসি। বসে পড়লাম চাঁদ আর পুকুরের পানির দিকে মুখ করে। আলাপসিংগা বললেন, “নজরুল গীতি গাও, আমি বাঁশের বাঁশি বাজাই।” আমি পর পর অনেক গুলো নজরুল গীতি গাইলাম। প্রতিটিতেই তিনি বাঁশী বাজালেন মধুর সুরে।

আলাপসিংগা ভাইর প্রতিভা ও রুচি দেখে আমি মুগ্ধ হলাম। এরপর তার সাথে উচ্চাংগ সুংগীত বাংলা গানের বিভিন্ন ধরণ নিয়ে অনেক আলোচনা করেছি। তিনি এখানে প্রায় দুই সপ্তাহ কৃষি শ্রমিকের কাজ করেছেন। একদিন সকালে দেখি তিনি শার্টের সাথে ফুল প্যান্ট পরেছেন। বললেন, “তোমার সাথে কয়েকদিন কাটিয়ে ভালো লাগলো। তোমার মধ্যে অনেক প্রতিভা আছে। ছাত্র হিসাবে তুমি খুব মেধাবী। তুমি লেখাপড়া চালিয়ে যাবে। অনেক বড় হতে পারবে, দোয়া করি। আমার যাবার সময় হয়ে গেছে। কাজ মোটামুটি শেষ হয়েছে। আসলে আমি কামলা না। আমি গোয়েন্দা বিভাগে চাকরি করি। আমার এখানে কিছুদিনের জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো। দায়িত্ব পালন করা হয়ে গেছে। আসি তাহলে, ভালো থেকো। গোয়েন্দা চলে গেলেন। আমি অবাক হয়ে ফেল ফেল করে তাকিয়ে দেখলাম। চোখের কোনায় পানি এসেছিলো কিনা মনে নেই। প্রায় ৫০ বছর আগের কথা তো।

তার আগে এই এলাকায় বড় বড় কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটে। কুতুবউদ্দিন মাস্টারের খুনের জের ধরে আবদুল হাকিম মন্ডল খুন হন। এর পর আরও খুনের আশংকা থাকে। তাই, এই এলাকায় গোয়েন্দা তৎপরতা চলতে থাকে। তারই অংশ হিসাবে হয়তো আলাপসিংগা গোয়েন্দা এসেছিলেন এখানে।

আমার আজও তাকে মাঝে মাঝে মনে পড়ে। বিশেষ করে যখন পুর্ণিমার চাঁদ চোখে পড়ে। কত মার্জিত ছিলো সেই আলাপসিংগা গোয়েন্দা। সরকারি কাজের অংশ হিসাবে ডিউটি করতে এসে কৃষি শ্রমিক হতে হয়েছে।

২৮/২/২০২৬ খ্রি.

ময়মনসিংহ

#স্মৃতি #স্মৃতিকথা #গল্প #সাদেকুল

dullakaler-seheri

Dullakaler Seheri

দুল্যাকালের সেহেরি

(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমি দুল্যাকাল থেকেই রোজা রাখতাম। মা আমাদের জন্য গরম ভাত রান্না করতেন সেহরি খাবার জন্য। আমি খেতে বসলে অনেক সময় লাগতো খাওয়া শেষ করতে। দরুন, সেই ১৯৬৫ সনের কথা। আমার বয়স তখন ৭ বছর। পরনে হাফ হাতা আকাশী রঙের শার্ট ও চেক লুংগি। রমজান মাসে ভোর বেলা পাটিতে বসে সেহেরি খাচ্ছি ভাত ও মাছের তরকারি দিয়ে টিনের প্লেটে। সামনে পিতলের পানির গ্লাস। টিনের বাটিতে ডাউল আছে পিতলের চামুচসহ। সামনে গাছার উপর কুপি বাতি মিটি মিটি জ্বলছে। ঘরে মাটির বেড়া। টিনের চাল। সবার সেহেরি খাওয়া শেষ। আমার খাওয়া শেষ হচ্ছে না। ধীরে ধীরে খেয়েই চলেছি। পাতের খাবার শেষ হচ্ছে না। মা বলছেন, “বাজান, তাত্তারি খাও। বেইল উইঠা গেলো গা।” বাবা বলছেন, “তুমি যে পর্যন্ত আমার য়াতের পশম দেহা না যাবো হে পর্যন্ত খাইতে পারবা। আমি উঠানে টুলে বইয়া পশম দেকতে তাহি। তুমি খাও, বাজান।” আমার খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাবার হাতের পশম দেখা যাইত না। আমি খাওয়া শেষ হলে বলতাম, “বাবা, আমার খাওয়া শেষ।” বাবা বলতেন, “বাজান, অহন পশম দেহা যাইতাছে। রোজার নিয়ত কইয়া ফালাও।”
২৫/২/২০২৬ খ্রি.
ময়মনসিংহ
#গল্প #স্মৃতি #স্মৃতিকথা #সাদেকুল

surzaobanur-chheleti

Surzobanur Chheleti

সূর্যবানুর ছেলেটি

(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার


সূর্যবানু ছিল নাহার নার্সিং হোমের আয়া। তখন টাংগাইল শহরে তথা টাংগাইল জেলায় মাত্র একটি প্রাইভেট ক্লিনিক ছিল এই নার্সিং হোম। এটা ছিল আকুরটাকুর পাড়ায় একটা বড় পুকুরের পাড়ে। আশেপাশে বড় বড় আমগাছ ও নারিকেল গাছ ছিল। শহরের প্রাণ কেন্দ্রে হলেও এখানে প্রাকৃতিক পরিবেশ ছিল সুন্দর, মনোরম । ক্লিনিকের মালিক ছিলেন টাঙ্গাইল শহরের পশ্চিম পাশে অবস্থিত কাইয়ামারার নিঃসন্তান মোয়াজ্জেম হোসেন ফারুক ভাই। তিনি তার স্ত্রী নাহারের নামে এই ক্লিনিক করেন পৈত্রিক সুত্রে পাওয়া জমির উপর তিন তলা বিল্ডিং-এ। পাশেই আগে থেকেই পুরাতন আধাপাঁকা একটা ঘর ছিল তাদের । সেই বাড়িটা চিকিৎসকের থাকার কাজে ব্যবহার হতো । আমি ফ্যামিলি নিয়ে সেই বাসায় থাকতাম। বাসা ভাড়া দিতে হতো না। সর্ব সাকুল্যে মাসিক বেতন ছিল আমার ১,৮৫০ টাকা। ১৯৮৮ সনের জুলাই মাসে সরকারি চাকুরি হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি এক বছর এই ক্লিনিকে চাকরি করেছিলাম। আমার কর্তব্যনিষ্ঠা ও দক্ষতায় মুদ্ধ হয়ে ফারুক ভাই ছয় মাসের মাথায়ই আমাকে ক্লিনিকের মেডিকেল ডাইরেক্টর বানিয়ে দেন। তিনি ছিলেন জীবন বীমা কোম্পানির ম্যানেজার। অফিস ছিল ঢাকায়। থাকতেন ঢাকায়। প্রতিদিন তিনি আমাকে ফোন করে ক্লিনিকের খোঁজ খবর নিতেন। প্রথম দিকে ক্লিনিকে লোকশান হতো। আমি লোকশান কাটিয়ে লাভের মুখ দেখিয়েছিলাম। লাভের টাকা তার হাতে তুলে দিলে তিনি টাকা ফেরৎ দিয়ে বললেন “আমার ক্লিনিক থেকে লাভ নেয়ার দরকার নেই। লাভের টাকা দিয়ে ক্লিনিকের উন্নয়ন করতে পারলেই হবে।” আমি সেই টাকা দিয়ে ক্লিনিকের রিপেয়ারিং-এর কাজ করিয়েছিলাম। তিনি খুব খুশী ছিলেন আমার প্রতি। আমার সরকারি চাকরি হলে তিনি আমাকে দ্বিগুণ বেতন অফার করেছিলেন রেখে দেয়ার জন্য। আমি সেই অফার গ্রহণ করিনি।

ফারুখ ভাইর  ছোট ভাই খোকা ভাই ও তার শ্যালক দীপু ভাই ছিলেন প্রথম দিকে ক্লিনিক পরিচালনার দায়িত্বে। কর্মচারীদের বেশীরভাগই ছিল ফারুক ভাইর  প্রতিবেশী ও আত্বীয়। সামসু ও ফজলু ছিল ওয়ার্ডবয় কাম পাহারাদার। এলেঙ্গার মোতালেবকে আমি নিয়োগ দিয়েছিলাম পরে। আমীর হামজা ছিলেন রিসেপসনিষ্ট। এলেঙ্গার মজিদকে ম্যানেজার পদে আমি রিক্রুট করেছিলাম। সূর্যবানু, হ্যাপির মা (নূরজাহান) ও সাহিদা ছিল আয়া। এই তিনজনই ছিলো স্বামী-হারা অসহায় মহিলা। তাই তারা ফারুক ভাইর প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল। হ্যাপির মার হ্যাপিকে অল্প বয়সেই বিয়ে দেয়া হয়। তাকে আমি দেখিনি। হ্যাপির পরই এক ভাই ছিলো। তাকে নিয়ে হ্যাপির মার খুব অশান্তি ছিলো। হ্যাপির আরেকটা ভাই ছিলো ছোট ছয়-সাত বছর বয়সের। হ্যাপির মা সন্তান নিয়ে ক্লিনিকে আসতোনা। সাহিদার কোন সন্তান ছিল না। সূর্যবানুর স্বামী মারা গিয়েছিল। একমাত্র সন্তান ছিল তার ছেলে আল-আমীন। সবাই ডাকতো আলামিন। সূর্যবানু ছেলে আলামিনের কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাকী জীবন বিয়ে করবে না। সূর্যবানু কাজে কর্মে ও রোগীদের প্রতি দরদী ছিলো। আমাদের বাসায় যেতো। আমার স্ত্রী তাকে পছন্দ করতো। আমার স্ত্রীর কাছে সে ছিলো ভালো মানুষ। আমার স্ত্রী ভালো মানুষ চিনতে সাধারণত ভুল করে না। সময় সময় আমার স্ত্রীকে সূর্যবানুর সাথে গল্প করতে দেখেছি।

আলামিনের বয়স ছয় কি সাত বছর ছিলো। চেহারায় মায়া মায়া ভাব ছিলো। আদর করতে ইচ্ছে হতো। কিন্তু প্রকাশ্যে আদর করতাম না। কারন, আমি জানি, শিশুরা আদর করলে মাথায় উঠে। হয়তো দেখা যাবে স্টেথোস্কোপটা আমার গলায় থেকে খুলে নিয়ে তার কানে ঢুকাবে। অথবা আমার অনুপস্থিতিতে আমার চেয়ারে বসে দোল খাবে। অথবা মুল্যবান যন্ত্রপাতি নিয়ে খেলা করবে। অথবা মিষ্টি ঔষধ নিজের মনে করে খেয়ে ফেলবে।  ফারুক ভাইর সামনে আলামিন পড়লে সূর্যবানুকে ধমক দিয়ে বলতেন “এই সূর্যবানু, আমি কতবার বলেছি না, যে বাচ্চা নিয়ে ডিউটিটে আসবি না।” সূর্যবানু মাথা নিচু করে থাকতো। ফারুক ভাই আমার দিকে চেয়ে বলতেন “ডাক্তার সাব, আপনি মানা করেন নাই সূর্যবানুকে বাচ্চা না নিয়ে আসতে?” আমি সূর্যবানুর দিকে চেয়ে চোখ রাঙ্গিয়ে বলতাম “এই সূর্যবানু, আমি কতবার বলেছি তুমি আলামিনকে নিয়ে ডিউটিতে আসবা না। তুমি আমার কথাই শুনছো না।” সূর্যবানু মনে মনে বলতো “আপনি অমন নিষ্ঠুর হতেই পারেন না। বলবেন কি করে?” আসলে বাবা-হারা মাসুম আলামিন কি মাকে ছেড়ে একা বাড়িতে থাকতে পারে? তাই, আমি কোন দিন সূর্যবানুকে মানা করিনি। আলামিন সব সময় মায়ের কাছাকাছি থাকতো। কোন জিনিসে হাত দিত না। কোন জিনিস নষ্ট করতো না। কেউ কেউ তাকে দিয়ে ফুট ফরমায়েস করাতো। আমি করাতাম না। কারন, চাকরি করতো তার মা, সে তো না।

আলামিনের একটা মাত্র শার্ট ছিলো। হাল্কা আকাশী রঙের হাফ হাতা হাওই শার্ট। সে বেশী সময়ই ঠিক ঘরে বোতাম লাগাতে পারতো না। এক ঘরের বোতাম আরেক ঘর পর লাগাতো। তাতে শার্টের নিচের দিকে একপার্ট নিচু আরেক পার্ট উচু থাকতো। আমি বলতাম “আলামিনের শার্ট নিচের দিকে সমান না। ক্যাঁচি দিয়ে কেটে সমান করে নিও।” আলামিন বুঝতে পেড়ে সুন্দর দাঁত বের করে মুচকি হাসতো।

আলামিনকে দিয়ে বেশী ফরমাইস করাতো আজিজ ভাই। আজিজ ভাই ছিলেন প্যাথলজি ল্যাবের টেকনোলজিস্ট। ক্লিনিকের নিচ তলায় ল্যাবরেটরি ছিলো। আলামিন এই ল্যাবে যাতায়াত করতো। একদিন দেখা গেলো ল্যাবের মূল্যবান একটি কাঁচের যন্ত্র ভেঙ্গে মেঝেতে পড়ে আছে। আজিজ ভাই জোড়ে সোড়ে বলছিলেন “আমার দামী নিউবার কাউন্টিং চেম্বারটা ভাংলো কে?” সারা ক্লিনিক জুড়ে তোলপাড় করতে লাগলেন। প্রফেশনাল ঝাড়ুদারের প্রতিই সবার সন্দেহ। কিন্তু সে ভগবানের নামে কসম খেয়ে বলছিলো যে সে ভাংগেনি। একদিন পর্যন্ত সন্দেহের দৃষ্টি ঝাড়ুদারের উপরই ছিল। ঝাড়ুদার বলছিলো “বাবু, হামি গারীব হোতে পারি, হামি মিছা কথা কইতে পারিনেক।” আমি আজিজ ভাইকে মানা করে দিলাম ঝাড়ুদারে প্রতি সন্দেহ না করতে। এবার আজিজ ভাইর সন্দেহ পড়লো আলামিনের প্রতি “আলামিনই ভাংছে। এই জন্যই বাচ্চা নিয়ে হাসপাতালে ডিউটিতে আসা ঠিক না।” আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। এবার ফারুক ভাই শুনলে আলামিনকেসহ সূর্যবানুকে তাড়াবে। আজিজ ভাই ল্যাবে এসেই ক্যাঁচ ক্যাঁচ করতে থাকেন “নিউবার কাউন্টিং চেম্বার ছাড়া আমি রক্ত পরীক্ষা করব কিভাবে? আমি যেনো কালকে থেকে আলামিনকে না দেখি।” আলামিনকে নানা ভাবে জিজ্ঞেস করে বের করার চেষ্টা করা হলো। কিন্তু না সে ভাংগেনি। সেও খুব চিন্তিত ছিল যে এবার থেকে সে তার মায়ের সাথে আসতে পারবে না। সূর্যবানুও চিন্তিত ছিলো। আমি লাঞ্চ করতে বাসায় এসেছিলাম। বাসা আর ক্লিনিক পাশাপাশি ছিল। আজিজ ভাই বারান্দায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন “কেউ স্বীকার করছে না যে সে ভেংগেছে। তাইলে ভাংলো কে? তাইলে কি ভূমিকম্প হয়েছিলো?” আমি জানালা দিয়ে চিৎকার করে উত্তর দিলাম “হ্যা, হ্যা, দুই দিন আগে রাতে ভূমিকম্প হয়েছিলো। সারাদেশ কেঁপে উঠেছিলো। চিটাগাং দুইটা ভবন ধ্বসে গেছে ভূমিকম্পে। আপনার টেবিলে ঝাকুনি খেয়ে কাউন্টিং চেম্বার পড়ে গিয়ে ভেংগে গেছে।” সবাই শুনে দৌড়িয়ে এলো আজিজ ভাইর কাছে। বলাবলি হাসা হাসি হচ্ছিলো। ঝাড়ুদার ও আলামিন অভিযোগ থেকে রক্ষা পেলো। খুশীতে আমি একটু বেশীই খেলাম।

একবার কোন একটা কারনে আমি এবং ফারুক ভাই মিলে একটা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেই। কিন্তু সূর্যবানু বুঝতে না পেড়ে সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে। তাতে ক্লিনিকে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে থাকে। আমি সূর্যবানুর উপর ক্ষেপে গিয়ে উচ্চস্বরে ধমকাতে থাকি। সূর্যবানু নিরবে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলে। আলামিন সাথেই ছিলো। সে তার মায়ের মুখের দিকে চেয়ে ফোঁফাতে থাকে। হটাৎ আমার দিকে আঙুল নির্দেশ করে সিনেমার নায়কের স্টাইলে বলতে থাকে “এই আমার মায়েরে কিছু কবিনা।” শুনে আমি হতভম্ব হয়ে যাই। বুঝতে পারি সন্তানের সামনে মাকে অপমান করা ঠিক হয়নি। শুধু বললাম “যাও।” আলামিন মাকে টেনে নিতে নিতে বললো “নও, মা, এনে চাকরি করবা না।” সূর্যবানুর বিদ্রোহের কথা ফারুক ভাইর কানে গেলে ফারুক ভাই নির্দেশ দিলেন সূর্যবানুকে বরখাস্ত করতে। সবাই সূর্যবানুকে পরামর্শ দিলো তোমার চাকরি থাকতে পারে যদি আমি তাকে ক্ষমা করে দেই। আমারও ইচ্ছা ছিলো তাকে রাখবো। আমি বাসায় ছিলাম বিশ্রামে। সুর্যবানু বাসায় এসে অনেকক্ষণ অনুনয় করে ক্ষমা চাইলেন। আমি কোন কথা বললাম না। আমার স্ত্রী সূর্যবানুকে বললো “যাও, কাজ করোগে। তোমার স্যার তোমাকে মাফ করে দিয়েছে।” সূর্যবানু বুঝতে পারলো যে আপার কথাই স্যারের কথা। পরদিন সব কিছু সাভাবিক নিয়মে চললো। আলামিনকে আশ্বস্ত করার জন্য তার মাথায় হাত বুলালাম। বললাম “তোমার শার্টের উচু নিচু অংশটা ক্যাঁচি দিয়ে কেটে সমান করে নাও।” আলামিন মুচকি হাসলো।

এবার রোজা হবে গ্রীষ্মককালে। ৩০ বছর আগে সেবারও রোজা হয়েছিল গ্রীষ্মকালে। প্রচুর আম ধরেছিলো ক্লিনিকের দক্ষিণ-পূর্ব কোণার আম গাছে। কঁচি কঁচি আম। ঝোকা ঝোকা ঝুলছিলো। ছাদে উঠলে হাতের কাছেই ছিলো। পেড়ে খেতে ইচ্ছে হতো। কিন্তু গাছটা ক্লিনিকের বাইরের সীমানায় ছিলো। তাই, এই আম আমাদের ছিড়তে মানা। আমি ইফতার করার জন্য বাসায় গিয়েছিলাম। সবাই যার যার মতো করে ইফতার করছিলো। সূর্যবানুও দক্ষিণ পাসের দোতলা এক রুমে ইফতার করছিলো। আলামিন ছোট মানুষ। তাই রোজা রাখেনি। আলামিন মায়ের সাথে ছিলোনা। আমি মাত্র আজান দেয়ার সাথে ইফতার মুখে দিয়েছিলাম। ধরাম করে একটা শব্দ হলো ক্লিনিকের দিক থেকে। ‘আলামিন’ বলে সূর্যবানু চিৎকার করে থেমে গেলো। আমি ইফতার রেখে দৌড়িয়ে গেলাম ক্লিনিকের পূর্ব পাশে। দেখি আলামিন উপুর হয়ে পড়ে আছে চার হাত পা ছড়িয়ে কংক্রিটের রাস্তার উপর নিস্তেজ হয়ে। মুষ্ঠিতে আমের ডাল সহ আম। বুঝতে দেরী হলো না যে সবাই যখন ইফতারে ব্যস্ত আলামিন সেই সুযোগে ছাদে গিয়েছিলো আম চুরি করে ছিড়তে। আমের ঝোকা ধরে টান দিলে আমের ডালেও তাকে  বিপরীত দিকে টান দিয়েছিলো। আমের ডাল ছিড়ে আলামিনও পড়ে গিয়েছিল তিন তলা বিল্ডিং-এর ছাদ থেকে। অর্থাৎ চার তলা থেকে। চার তলা থেকে সিমেন্ট-এর পাকা রাস্তায় পড়ে কেউ কি বাঁচার কথা? আলামিনের পালস ও রেস্পাইরেশন পেলাম না। দু’হাত দিয়ে কোলে করে নিয়ে গেলাম দোতলার অপারেশন থিয়েটারে। ওটি টেবিলে শুইয়ে কৃত্তিম শ্বাস প্রশ্বাস দিলাম।  বুকে হার্টের উপর মাসাজ দিলাম। পালস ফিরে এলো। শ্বাস ফিরে এলো আলামিনের। অক্সিজেন চালু করে দিলাম আলামিনের নাকে। আসার সময় দেখেছিলাম সূর্যবানু বারান্দায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। শব্দ শুনে জানালা দিয়ে আলামিনকে পড়ে থাকতে দেখে সূর্যবানু এক চিৎকারে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকে দোতলার বারান্দায়। তাকেও ওটিতে এনে চিকিৎসা দেয়া হলো। অনেক্ষণ পর মা-ছেলের জ্ঞান ফিরে এলো। সারারাত পর্যবেক্ষণে রাখলাম। পরীক্ষা করলাম। বুকের এক্স-রে করা হলো। আল্লাহ্‌র রহমতে কোথাও কোন হাড় ভাংগা পাওয়া গেলো না। উভয়েই সুস্থ হয়ে উঠলো। মহল্লাবাসী ও সাংবাদিকরা যেন না জানতে পারে সে জন্য সবাইকে সতর্ক করে দেয়া হলো। সাংবাদিকরা যদি জানতে পাড়তো তাহলে হয়তো খবর বের হতো “৪ তলা থেকে পড়ে গিয়েও অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছে আলামিন নামে এক ছেলে।” শোকজ খেত ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ ।

কিছুদিন পর থেকে দেখলাম আলামিন তার মায়ের সাথে আসছে না। আলামিনের কী হয়েছে জিজ্ঞেস করলে সূর্যবানু জানালো যে তাকে খোকা ভাইর ভাইয়ের ফাস্ট ফুডের দোকানে নিয়ে গেছে।
– ওখানে কি তাকে চাকরি করতে দিলে?
– না। এতো ছোট ছেলে, চাকরি করবে কেন? তাকে নাকি খোকা ভাইর ভাইয়ের মতো মনে হয় তাই তারা নিয়ে নিয়েছে। কাজ শিখুক। বড় হয়ে তো কাজ করেই খেতে হবে।

যে ছেলে সব সময় মায়ের সাথে থাকতো সে ছেলে এখন ফাস্টফুডের দোকানে ফুট ফরমায়েশ করবে। শুনে আমার কিঞ্চিৎ খারাপ লাগলো।

একদিন পুরান বাস স্ট্যান্ড-এ একটা ফাস্ট ফুডের দোকানে গেলাম কিছু কিনতে। দেখি একটা টুলে আনমনে বসে আছে আলামিন। শরীরটা শুকিয়ে গেছে। সেই জামাটি গায়। কিন্তু সোজা করে বোতাম লাগানো আছে। সেলসম্যান ধমক দিয়ে আলামিনকে বললো “এই ছেরা, ঝিম ধরে বসে আছস ক্যান, পানি দে।” আলামিন বিনম্র ভাবে উঠে গিয়ে কাস্টমারকে পানি দিলো। ঘুরে আমাকে দেখে একটা কাষ্ঠ হাসি দিলো। আমার অন্তরে কোথায় যেনো ব্যাথা অনুভূত হলো।

তারও কিছুদিন পর দেখি ভিক্টোরিয়া রোডে হ্যাপির মার ছোট ছেলে ও আলামিন রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ফেরী করে চা বিক্রি করছে। একটা বড় ফ্লাস্কে রেডিমেড চা নিয়ে কাপে ভরে বিক্রি করছে। হ্যাপির মার ছেলের হাতে ফ্লাস্ক আর আলামিনের হাতে জগ, কাপ, গ্লাস ও টোস্ট বিস্কুট। আমাকে দেখে ইশারা দিয়ে সালাম দিয়ে দুইজনই মিটি মিটি হাসছিলো। আমিও মিটিমিটি হাসছিলাম।
– তোমরা কি করছো?
– আমরা ঘুরে ঘুরে চা বিক্রি করি। মায় টাকা দিছে দোকান করতে। ভালোই লাভ হয়। আমরা দুইজনে ভাগে দোকান করি।
(বুঝলাম তারা স্বাধীন ব্যবসা উপভোগ করছে)
– তোমরা পড়তে যাওনা?
– না। পইড়া কি হইব? স্যার, চা খাইন।
– না। চা খাব না।
– খাইন স্যার, একটা।
তারা দুইজনই আমাকে খুব করে ধরলো চা খেতে। আমি এক কাপ চা খেয়ে বললাম
– খুব ভালো হয়েছে।
– আরেক কাপ দেই, স্যার?
– আরে, না।
তারা দুইজনই খুব খুশী আমাকে চা খাওয়াতে পেরে। আমি পকেটে হাত দিতেই সমস্বরে দুইজন বলে উঠলো “দাম লাগবে না, স্যার। এমনি দিয়েছি।”

আমি কিছুতেই দাম দিতে পারছিলাম না। পরে বললাম যে এটা চায়ের দাম না এটা এমনি দিলাম তোমাদেরকে কিছু খাওয়ার জন্য। কত দিয়েছিলাম তা মনে নেই। তবে তখন আমার পকেটে বেশী টাকা থাকতো না। সারামাসের বেতন ছিলো মাত্র ১,৮৫০ টাকা।
তবে এটাই মনে হয় আলামিনের সাথে আমার শেষ দেখা। সেদিন তার গায়ে সেই শার্ট ছিল অসমানে লাগানো বোতাম। হাফ হাতা হাল্কা আকাশী হাওই শার্ট।

সূর্যবানু আমার মেয়েকে কোলে নিয়ে বেড়াতো। কোন সময় ধাওয়া কান্না শুরু করলে সূর্যবানু এসে কোলে নিতো। তার কোলে সে চুপ হয়ে যেতো। ছোট্ট মেয়েটাকে সে বুড়ি বলে ডাকতো। বেজার হয়ে থাকলে নানান ভঙ্গী করে হাসাতে চেষ্টা করতো। সরকারি চাকরি নিয়ে চলে আসার পর আমার স্ত্রী সুর্যবানুকে নিয়ে কথা বলতো। “আবার টাঙ্গাইল গেলে সূর্যবানুকে দেখে আসব” বলে মন্তব্যও করেছে অনেকবার। মাঝে মাঝে আমরা নাহার নার্সিং হোমে বেড়াতে গিয়ে সূর্যবানুকে দেখে আসতাম। সব সময়ই সুর্যবানু আমার মেয়েরা কেমন আছে কি করছে খোঁজ নিতো। আমি কখনো আলামিনের খোঁজ নেইনি। বহু বছর হয়ে গেছে সূর্যবানুর খোঁজ নেইনি। বেঁচে আছে কিনা তাও জানিনা। বেঁচে থাকলেও বয়সের ভারে তার শরীর ভেংগে যাওয়ার কথা। আলামিনের বয়স তো এখন ৩৬ সের উপরে হবে। সেকি তার মাকে কামাই করে খাওয়াচ্ছে? যে ছেলের জন্য তার জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছে। যদি কোনদিন আলামিনের সাথে দেখা হয় তবে নিশ্চয়ই আমি আগের আলামিনকে পাবো না। পাবো কি সেই মাসুম শিশু, হাল্কা আকাশী রংগের হাফ হাতা হাওই শার্ট গায়ে অসমান বোতাম লাগানো, যেমনটি দেখেছিলাম শেষবারে ভিক্টোরিয়া রোডে আলামিনকে, সূর্যবানুর ছেলেটিকে!

২৪/২/২০১৯ খ্রি.
ময়মনসিংহ- কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ জার্নি #গল্প #স্মৃতিকথা #সাদেকুল

riksaoala-chauler-dor-janena

Riksaoala Chauler dor Janena

রিক্সাওয়ালায় চাউলের দর জানেন না

(জীবনের গল্প)

ডা; সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

রাত ৯ টার পর চেম্বার থেকে বের হলাম। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিলো। রিক্সা খুচ্ছিলাম। খুব কম রিক্সা ছিলো। কেউ যেতে রাজি হলেন না। চিন্তা করলাম এর পর যাকে খালি পাবো তাকে এভাবে প্রস্তাব দেবো “ভাই, মাসকান্দা নুতুন বাজার ৫০ টাকা, যাবেন?” চেম্বার থেকে ওখানকার ভাড়া হলো ২০ টাকা। কিন্তু ২-৩ জনকে ৫০ টাকা প্রস্তাব দিয়েও রাজি করাতে পারলাম না।

এবার একজন খালি পেলাম। বললাম

– ভাই, মাসকান্দা নতুন বাজার যাবেন?

– যাবো, ভাড়া ৩০ টাকা।

– চলুন।

বাসার সামনে নেমে তার হাতে ৫০ টাকা দিয়ে বললাম

– আমি আজকের ভাড়া ৫০ টাকা দেয়ার নিয়ত করেছিলাম। আপনি ৫০ টাকাই নেন।

তিনি নিয়ে নিলেন। এই ৫০ টাকায় কতটুকু চাউল কিনতে পারবেন জানার জন্য জিজ্ঞেস করলাম

– চাউলের কেজি কত টাকা করে?

– কইতে পারতাম না।

– কেন, চাউল কিনতে হয় না?

– আমি তো হোটেলে খাই সবসময়। তাই, জানি না।

– আপনার বাড়ি কোথায়?

– গৌরিপুর।

– ডেইলি গৌরিপুর চলে যান?

– না। ময়মনসিংহ শহরেই থাকি।

– বাসা ভাড়া কত দিতে হয়?

– বাসা ভাড়া লাগেনা। রিক্সার গ্যারেজেই থাকি।

– গ্যারেজওয়ালা ভাড়া নেয় না?

– না, রিক্সা তো তারই। রিক্সা চালক গ্যারেজে থাকতে চাইলে থাকতে দেন।

সালাম দিয়ে রিক্সাওয়ালা বিদায় নিলেন। আমি বাসায় প্রবেশ করতে করতে ভাবলাম “সব কর্মজীবী মানুষ এভাবে কষ্ট করে যাচ্ছে তার স্ত্রী, সন্তান ও নিকট আত্মীয়দের সুখে রাখতে।”

লিখনঃ ১৯/৬/২০২২
পুনঃলিখনঃ ১৩/২/২০২৬

#গল্প #জীবনেরগল্প #সাদেকুল

parcel-nirvor-jibon

Parcel Nirvor Jibon

পার্সেল নির্ভর জীবন

(ছোট গল্প)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

সকাল ঠিক আটটায় সে বাসার গেইট বন্ধ করে। তালার শব্দটা গলির ভেতর একটু বেশিই জোরে শোনা যায়। গলিটা তখনও পুরো জেগে ওঠেনি। একতলা বাসার দেয়ালের সঙ্গে লাগানো ছোট কাঠের বাক্সটার দিকে একবার তাকায় সে। উপরে লেখা—

“Keep Parcel Here”

আজ সেখানে কিছু নেই। কাল রাতে ডিনারের পার্সেলটা নিজেই তুলে নিয়েছে।

সে ত্রিশ বছরের একজন ডাক্তার। অবিবাহিত। এই শব্দটা নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই, গর্বও নেই।

হাসপাতালে গিয়ে সারাদিন রোগী দেখে। কারও বুক ধড়ফড় করে, কারও শ্বাস আটকে আসে, কারও জীবনে অকারণ ভয়। সে মন দিয়ে শোনে, পরীক্ষা করে, প্রেসক্রিপশন লেখে। মানুষের জীবন ঠিক করার কাজে সে ক্লান্ত হয়, কিন্তু বিরক্ত হয় না।

বিরক্ত হয় অন্য জিনিসে।

বাজার করা—ঝামেলা।

কী রান্না হবে ভাবা—ঝামেলা।

রান্না করা—সবচেয়ে বড় ঝামেলা।

হোটেলে গিয়ে খাওয়া—লাইন, শব্দ, মানুষ, অপ্রয়োজনীয় কথা।

ডাইনিং—আরও বেশি ঝামেলা।

তার কাছে খাওয়া মানে শুধু খাওয়া।

ক্ষুধা → খাবার → শেষ।

দুপুরে হাসপাতালের ক্যান্টিন, রাতে পার্সেল।

মাঝে মাঝে একটাই অ্যাপ, আগের অর্ডার হিস্ট্রি থেকে “Repeat Order”।

নতুন কিছু ট্রাই করার মতো মানসিক জায়গা তার নেই।

বিকেলে প্রাইভেট চেম্বার। সেখানে সে আরও শান্ত। মানুষ টাকা দিয়ে আসে, কথা শোনে, বিশ্বাস করে। বিশ্বাস—এই শব্দটা সে শুধু রোগীদের চোখে খোঁজে, নিজের জীবনে নয়।

রাত হলে বাসায় ফিরে। গেইট খুলে ঢোকার আগেই চোখ যায় দেয়ালের দিকে। আজ পার্সেল এসেছে। বাদামি প্যাকেট, নাম লেখা নেই—শুধু তার মোবাইল নম্বর।

সে প্যাকেট তুলে নেয়। মনে পড়ে না কবে শেষবার কেউ তার জন্য কিছু হাতে তুলে দিয়েছে।

খেয়ে নেয়। টেবিলে বসে নয়, বিছানায় শুয়ে।

তারপর মোবাইল।

মেডিকেল আর্টিকেল, শর্ট ভিডিও, সিরিজের আধা-আধা দেখা এপিসোড।

সবই চলতে থাকে আঙুলের একটুখানি নড়াচড়ায়।

বিয়ে?

সে বিষয়টা নিয়ে কখনো গভীরভাবে ভাবেনি।

তার কাছে স্ত্রী মানে অতিরিক্ত সমন্বয়, অতিরিক্ত ব্যাখ্যা, অতিরিক্ত দায়িত্ব।

কারও অপেক্ষা করা, কারও জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া—এসব তার দৈনন্দিন তালিকায় নেই।

তার জীবন খুব পরিষ্কার।

খাওয়া আছে।

কাজ আছে।

ঘুম আছে।

আর আছে পার্সেল।

মাঝে মাঝে রাতে শুয়ে থাকতে থাকতে ভাবে—

যদি কোনোদিন এই “Keep Parcel Here” লেখাটা মুছে যায়,

যদি একদিন পার্সেল না আসে,

তাহলে কি তার জীবনে সত্যিই কিছু বদলাবে?

এই প্রশ্নটার উত্তর সে খোঁজে না।

মোবাইল স্ক্রিনটা আবার জ্বলে ওঠে।

ভিডিও শুরু হয়।

আর তার জীবন, ঠিক পার্সেলের মতোই,

নীরবে দরজার পাশে পড়ে থাকে—

খোলা হবে কি না, সেটা কেউ জানে না।

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

#গল্প #ছোটগল্প #সাদেকুল

Ekaler Kabulioala

Ekaler Kabulioala

একালের কাবুলিওয়ালা

(স্মৃতি কথা)

খুব ছোট বেলাতেই আমি কাবুলি দেখেছি। প্রতিবছর কা্বুলিরা আমাদের গ্রামে আসত। আফগানিস্তানের কাবুল থেকে এরা নানা রকম ব্যবসা করতে আমাদের দেশে আসত। এদের গায়ে ঢিলেঢালা কুরতা ও সালোয়ার থাকত। কুরতাকে আমরা কাবলি শার্ট বলতাম। তাদের পাথায় পাগড়ী থাকত। মোটা মোটা গোফ ছিল। গালভর্তি দাড়ি ছিল। শরীরের সাইজ আমাদের বাপ দাদাদের দেকেও দেড় গুণ বড় ছিল। বাম কাঁধে থাকত একটা বিরাট ঝোলা। এই ঝোলার ভিতর কিসমিস, জাফরান, শক্তি বর্ধক বটিকা,  টাকা পয়সা ইত্যাদি থাকত। ডান হাতে থাকত একটা মোটা লাঠি। তারা খুব সাহসী ছিল। উর্দু, হিন্দি, ইংরেজি ও বাংলা একাত্র করে তারা মোটা ও ঘাঢ় গলায় কথা বলত। কাবুলিকে আমরা কাব্লি উচ্চারণ করতাম । কাবলি আসলে দাদা বাইরবাড়ি গাছতলায় টুলে অথবা পাটিতে বসতে দিতেন। দাদা তাদের সাথে নানারকম গল্প করতেন। আমি কিছু কিছু বুঝতাম। আমি দাদার পিঠ ঘেষে দাঁড়িয়ে কাবলির দিকে চেয়ে চেয়ে তার কথা বলার ভঙ্গি দেখতাম। দাদা শক্তি বর্ধক বটিকা কিনতেন। মুধুর মত ঘ্রাণ ছিল বটিকার। আমার খেতে ইচ্ছা করত। যুবক শ্রেণীর ছেলেরা কাবলিকে একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে গোপনে কি যেন বলতেন। পরে কাবলির কাছ থেকে সেই অনুযায়ী গুড়া ঔষধের পুড়িয়া নিতেন।  কোন কোন কাবলি দাদাদের সাথে চুক্তি করতেন জাহাজে করে বোম্বে হয়ে পবিত্র হজ্জ পালন করিয়ে দিবেন। বোম্বে থেকে করাচি নিয়ে হজ্জের কার্ড সংগ্রহ করিয়ে দিতেন। বিনিময়ে তারা একটা ফি নিতেন। কোন কোন হজ্জ গমনেচ্ছুক কার্ড না পেয়ে বোম্বে থেকেই ফেরৎ আসতেন। তাদেরকে কেউ কেউ ‘বোম্বাইয়া হাজী’ বলতেন। কেউ কেউ হজ্জে যেতে ইচ্ছা করতেন । শুনিয়ে বেড়াতেন হজ্জে যাবেন। কিন্তু কোন উদ্যোগ নিতেন না। অনেকে তাদেরকে তিরস্কার করে বলতেন ‘যামু হাজী’।

কাবলিদের নিয়ে আরও জানতে পারলাম ক্লাস সেভেনে উঠে। বাংলা পাঠ্য বইয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত গল্প ‘কাবুলিওয়ালা’ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইনসান স্যার বাংলা পড়াতেন। এই গল্পে রবীন্দ্রনাথ কাবলিদেরকে কাবুলিওয়ালা বলেছেন। গল্পের কাবুলিওয়ালাদের বর্ণনা পড়ে আমার ছোটবেলার কাবলিদের কথা মনে পড়ত। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর আমি কাবলিদের দেখিনি। খুব সম্ভব বাংলাদেশ সরকার আফগানিস্তানের কাবলিদের প্রবেশ কড়াকড়ি করেছে। যেটা পুর্বপাকিস্তান সরকারের ছিল না। কাবুলিওয়ালা গল্পের ৫ বছর বয়সের মিনি নানান রকমের কথা নিয়ে তার বাবার কাছেই ঘুরঘুর করত। তার পায়ের কাছেই হাটু গেড়ে বসে হাত তালি দিয়ে ‘আগডুম বাগডুম’ ছড়া বলত। মিনির বাবা তাতে বিরক্ত হয়ে ভোলানাথের সাথে খেলতে যেতে বলতেন। এই অংশটুকু পড়ানোর সময় ইনসান স্যার তাঁর বাচ্চাদের সাথে তুলনা করে গল্পের ব্যখ্যা দিতেন। বলতেন “আমার বাচ্চাও আমার কাছে দাঁড়িয়ে আমার পিঠের সাথে ঘষাঘষি করে। সরিয়ে দিলেও আবার এসে পিঠ দিয়ে পিঠ ঘষতে থাকে।” গল্পের মিনি ও ইনসান স্যারের বাচ্চার কথা শুনে আমার ছোট বেলার সাথে মিল খুঁজে পেয়ে উৎফুল্ল হতাম। মনে পড়ত বাবা যখন খালি গায়ে পিড়িতে অথবা টুলে বসে কোন কাজ করতেন তখন তিন চার বছর বয়সের আমার ছোট বোন সোমেলাও খালি গায়ে বাবার পিঠ ও হাত ঘেষে দাঁড়িয়ে ঘষাঘষি করত। আমার হিংসা হত। আমি তাকে সরিয়ে দিয়ে নিজে ঘষাঘষি করতাম। বাবার কাজে বাধা পরত। বাবা বিরক্ত হয়ে হাত দিয়ে আমাদেরকে ঠেলে দিতেন। আমরা আবার আসতাম পিঠে ঘষাঘষি করতে। ক্লাস সেভেনে কাবুলিওয়ালা গল্প পড়ে কাবলিদের সম্পর্কে আমার ধারনা আরেকটু বাড়ল।

আমার চোট মেয়ে ডাঃ দীনার বয়স যখন দুই-তিন বছর ও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বড় মেয়ে মুনার বয়স যখন পাচ-ছয় বছর তখন তারাও আমার গা ঘেষতে কাড়াকাড়ি করত। আমি চেয়ারে বসে ক্লাশ নোট লিখতাম, গবেষণা নিবন্ধ লিখতাম তাতে আমার অসুবিধে হত। সড়িয়ে দিলেও বার বার আসত। মনে মনে ভাল লাগত। কাবুলিওয়ালার মিনির কথা মনে পড়ত। ঐ সময় দেশে টেলিভিশনে ডিস চ্যানেল ছিল না। শুধু বাংলাদেশ টেলিভিশন ও কলকাতা দুরদর্শণ চ্যানেল দেখা যেত ইনডোর এন্টিনা দিয়ে। রাতে দুরদর্শনে একটা সাদাকালো সিনেমা দেখলাম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প অবলম্বনে সিনেমা ‘কাবুলিওয়ালা ‘। সেদিন বাসায় একা ছিলাম। একটানা দেখে শেষ করলাম। ছবি বিশ্বাস কাবুলিওয়ালা ‘রহমতের’ চরিত্রে অভিনয় করছিলেন। তার অভিনয় দেখে মনে হল তিনিই সত্যিকারের ‘রহমত’। রহমত ছোরা দিয়ে এক বদমাসকে ঘা দিয়ে আট বছর জেল খেটেছিল বিদেশের বাড়িতে। পাচ বছর বয়সের তার মেয়েকে রেখে এসেছিল মায়ের কাছে কাবুলে। আসার সময় মেয়ের হাতে ছাই মেখে কাগজে একটা হাতের ছাপ নিয়ে এসেছিল। আট বছর জেল খেটে ছাড়া পাবার পর রহমত কিছু পেস্তাবাদাম ও কিসমিস নিয়ে মিনিকে দেখতে গিয়েছিল। সেদিন মিনির বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল। সে ভেবেছিল মিনি সেই পাঁচ বছর বয়সের মিনির মতই ‘ও কাবলিওয়ালা’ বলে ডাকতে ডাকতে আসবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল সে এক বড় লাজুক নববঁধু। কাবলি ভাবল কাবুলে তার মেয়েটিও এখন বড় হয়ে বিয়ের যোগ্যভয়ে গেছে এই আট বছরে। কুরতার পকেট থেকে সেই ছোট্ট হাতের ছাপটি বের করে টেবিলের উপর মেলে ধরে অশ্রু ফেলল। লেখক তাকে দেশে ফিরে যাবার জন্য হাতে কিছু টাকা গুছে দিল। মিনির বিয়ের ধুমধাম করার খরচ কিছুটা কাটছাঁট করে এই টাকা দেয়া হয়েছিল। ধুমধাম কিছুটা কম হওয়াতে পরিবারের লোকজন একটু মনখুন্ন ছিল। কিন্তু রহমতকে দেশে চলে যাবার ব্যবস্থা করে দিতে পারার জন্য মিনির বাবা প্রফুল্ল ছিলেন।

আট বছর দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে চাকরি করেছি । সন্তানদের পড়াশুনার জন্য ফ্যামিলি ঢাকায় রেখেছিলাম । আমি একাই দিনাজপুর থাকতাম ডরমিটরিতে হাউজে । সেই ডরমিটরি হাউজে আরো ১০-১২ জন শিক্ষক থাকতেন । প্রতিরাতে চেম্বার থেকে ফিরে একসাথে রাতের খাবার খেয়ে ফ্যামিলির সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করতাম। ছোট মেয়ে দীনা, বড় মেয়ে মুনা ও স্ত্রী স্বপ্নার সাথে কথা শেষ করে ঘুমিয়ে পড়তাম। ডাঃ জাকিউল দরজা খোলা রেখে শুয়ে শুয়ে অনেক্ষণ স্কাইপিতে বাচ্চাদের সাথে ভিডিও চ্যাট করতেন। আমার রুমের ওয়ালের উপর ভেন্টিলেটর ছিল। তাদের সবকথাই আমার রুম থেকে শোনা যেতো। তার ছোট মেয়ে তখনো কথা বলতে শিখে নি। শত বার আব্বু আব্বু করতেন মেয়ের মুখে আব্বু বের করার জন্য। একসময় তার মেয়ে কথা বলতে শিখে। বড় হতে থাকে। দুই মেয়ের সাথেই তিনি ভিডিও চ্যাট করতেন। দুই মেয়ে মারামারি বেধে দিলে তিনি আদরের সাথে কথা বলে থামিয়ে দিতেন। সবই হতো স্কাইপিতে। শুধু ছুয়ে দেখতে পারতেন না। তার ফ্যামিলি ঢাকার ধানমন্ডিতে দামী বাড়ি ভাড়া করে থাকত।

ডাঃ জাকিউল আমার গল্প শুনে মজা পেতেন। তিনি যখন সাম্প্রতিক সময়ের কোন চমকপ্রদ ঘটনার বর্ণনা করতেন, বর্ণনার শেষে   আমি এটার মতই এরচেয়েও বেশী একটা চমকপ্রদ পুর্বের ঘটনার বর্ণনা দিতাম। ডাঃ জাকিউল বলতেন “সাদেক ভাই অনেক মজার মজার ঘটনা মনে করে গল্পাকারে সুন্দর করে বলতে পারেন। আপনি এগুলি গল্পাকারে লিখে রাখতে পারেন। পড়ে অনেকে মজা পাবে।” আমি বলতাম “লিখতে বসলে গল্প মনে আসে না। কিন্তু অনুরূপ একটি ঘটনা ঘটলে আগের ঘটনা মনে পড়ে যায়।“

মাঝে মাঝে করিডোরে দাঁড়িয়েও গল্প করতাম। একদিন দেখলাম ডাঃ জাকিউলের টিশার্ট-এ একটা স্কচ ট্যাপের কোণাকাটা টুকরা লেগে আছে। আমি ময়লা মনে করে তুলে ফেলতে হাত দিলাম। আমার হাত চেপে ধরে ডাঃ জাকিউল বললেন “না, না, না, সাদেক ভাই, এটা তুলবেন না।”

-কেন? এটাতো স্কচ ট্যাপের টুকরা মনে হচ্ছে।

-আমি এবার ঢাকা থেকে ফেরার সময় হঠাৎ আমার মেয়েটা তার রুম থেকে স্কচ ট্যাপের এই টুকরাটা কেটে এনে আমার টিশার্ট-এ লাগিয়ে দিয়ে বলে ‘এই ট্যাপটা লাগিয়ে দিলাম। যতদিন এই ট্যাপটা লাগানো থাকবে ততদিন আমাকে তোমার মনে থাকবে। ‘

আমি আবার এই ট্যাপ নিয়েই ঢাকায় ফিরতে চাই।

-আপনার মেয়ে কয়জন?

-দুইজন। এই বড়।

-এর বয়স কত?

-প্রায় ছয় বছর।

-আপনি একালের একজন কাবুলিওয়ালা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাবলিওয়ালা গল্পের রহমতের কথা আমার মনে পড়ল। মনে হল আমার যদি ক্ষমতা থাকতো আমি এই কাবলিওয়ালাকে বদলী করে ঢাকায় তার মেয়ের কাছে নিয়ে যেতাম। কিন্তু আমার সেই ক্ষমতা নেই। আমিও যে একালের আরেক কাবুলিওয়ালা।

২৪/২/২০১৮ খ্রি.

#কাবুলিওয়ালা #স্মৃতি #গল্প #সাদেকুল

কাল্পনিক ছবিটি একেছি জেমিনি এ আই টুল দিয়ে ।

Biggan Melay Amar Krititto

বিজ্ঞান মেলায় আমার কৃতিত্ব

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৭৮ সন। প্রিন্সিপাল এ এফ এম গোলাম কিবরিয়া স্যার কেমিস্ট্রির স্যার আনন্দ মোহন, অংকের স্যার আবুল হোসেন স্যার এবং শরীর চর্চার স্যার অখিল চন্দ্রকে দায়িত্ব দিলেন আমাদের আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ থেকে কিছু সংখ্যক বিজ্ঞান বিভাগে পড়ুয়া ছাত্র নিয়ে টাঙ্গাইলে বিন্দু বাসিনী বয়েস স্কুলে অনুষ্ঠিত ৭ দিন ব্যাপী বিজ্ঞান মেলায় অংশ গ্রহন করতে। স্যারগণ এই টীমে আমাকে, কাজী সাফিউল্লাহ বুলবুল, নজরুল, বেলায়েত, ও কাদেরকে নিয়ে টীম গঠন করলেন মেলায় অংশ গ্রহন করতে। আমরা স্যারদের কাছ থেকে ৭ দিন ৭ রাত্রি হোটেলে থাকা ও খাওয়া এবং আনুসংগিক খরচের টাকা নিয়ে নিলাম। ভিক্টোরিয়া রোডের একটা হোটেলে থাকা ও খাওয়া হতো।মেলায় আমরা একেক জনে একেক প্রদর্শন করতাম।

টাঙ্গাইল জেলার সব স্কুল ও কলেজের যৌথ উদ্যোগে এই মেলার আয়োজন করা হয়েছিল।প্রতিটি স্কুল থেকে দল বেধে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রবেশ করতেন।বিজ্ঞানের নানান খুটিনাটি নিয়ে তারা প্রশ্ন করতেন। আমি দেখাতাম হাতে বানানো পেরিস্কোপ। পেরিস্কোপ সম্পর্কে পড়েছিলাম ক্লাস এলেভেনেই পদার্থ বিজ্ঞান বইয়ে। আয়নার মাধ্যমে আলোর প্রতিফলন এর তত্বকে কাজে লাগিয়ে পেরিস্কোপ বানানোর আইডিয়া আসে বিজ্ঞানীদের। পেরিস্কোপ মুলত: যুদ্ধের সময় ডুবু জাহাজে ব্যবহার করা হয়। ডুবু জাহাজ পানির নিচে ডুব দিয়ে থাকে। সমুদ্রের সারফেসে চলমান জাহাজ দেখার জন্য ব্যবহার করা হয় পেরিস্কোপ দিয়ে।

দর্শনার্থীরা আমার কক্ষে এলে প্রথমে তাদেরকে আমার বানানো পেরিস্কোপ দেখতে দিতাম। তারা দেয়ালের ছিদ্রে বসানো আয়নায় চোখ রাখলে শহরের নিরালার মোরে চলাচল রত পথচারী ও রিক্সা দেখতে পেতো। তার পর আমাকে জিজ্ঞেস করতো এটা কিভাবে সম্ভব হলো।

আমি পেরিস্কোপ সম্পর্কে বিস্তারিত বলতাম।

পেরিস্কোপ হলো একটি অপটিক্যাল যন্ত্র, যার সাহায্যে বাধার আড়াল থেকে কোনো বস্তু দেখা যায়। এটি আলোর প্রতিফলনের নীতির ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। পেরিস্কোপে সাধারণত দুটি আয়না ৪৫ ডিগ্রি কোণে বসানো থাকে, যার মাধ্যমে আলো প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে পৌঁছায়।

পেরিস্কোপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হলো সাবমেরিনে। সমুদ্রের নিচে অবস্থান করেও এর মাধ্যমে ওপরে থাকা জাহাজ বা বস্তু দেখা যায়। এছাড়া সামরিক ক্ষেত্রে শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণে এটি ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞান গবেষণা, শিক্ষা কার্যক্রম এবং পরীক্ষাগারেও পেরিস্কোপ ব্যবহৃত হয়। সবশেষে বলা যায়, পেরিস্কোপ বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার যা আমাদের নিরাপদভাবে দূরের বা আড়ালে থাকা বস্তু দেখতে সাহায্য করে।

– কিন্তু, সেটা তো সমুদ্রের প্যাপার। এখান থেকে নিরালা মোর কিভাবে দেখা যাচ্ছে?

-আমি দুইটা আয়না কিনে এনে এখানে ব্যবহার করেছি। একটা আয়না ৪৫ ডিগ্রি কোণাকুণি করে বসিয়েছি এই বিল্ডিংয়ের ছাদের কিনারে। আরেকটা আয়না বসিয়েছি নিচের বাগানে ৪৫ ডিগ্রি কোনাকোনি করে যাতে উপরেরটার প্রতিবিম্ব নিচের আয়নার উপর এসে পরে। আয়নায় পড়া সেই দৃশ্যই ঘরের ভিতর থেকে ওয়ালের ছিদ্র দিয়ে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন।

– তাজ্জব!

পেরিস্কোপ দেখিয়ে ছাত্র ও শিক্ষকদের আমি বেশ ইম্প্রেসড করেছিলাম। বিচারকরা আমার পারফরম্যান্স দেখে খুবই প্রসংশা করে। আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ পুরস্কার পায়।

আমি যেন এখনো দেখতে পাই পেরিস্কোপ দিয়ে দেখা টাঙ্গাইলের সেই নিরালার মোর। ঐতিহ্য বাহী ঘ্যাগের দালান।

অপ্রয়োজনীয় সার্টিফিকেটের ফাইলে আমার সেই কৃতিত্বের সার্টিফিকেটটি খুজে পেলাম। তাতে লেখা আছে

দ্বিতীয় জাতীয় বিজ্ঞান সপ্তাহ

বিজ্ঞান মেলা ‘৭৮

টাঙ্গাইল

কৃতিত্ব পত্র

টাঙ্গাইলে ২৯ শে সেপ্টেম্বর থেকে ৫ই অক্টোবর ‘৭৮ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বিজ্ঞান সপ্তাহ ও বিজ্ঞান মেলায় আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজের ছাত্র সাদেকুল ইসলাম বিজ্ঞান মেলায় অংশ গ্রহণ করে কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছে।

আশা করবো তার সৃজনশীল প্রতিভা উত্তরোত্তর বিকাশ লাভ করে জাতীয় জীবনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।

চেয়ারম্যান ————– সেক্রেটারি

তারিখ ৫ ই অক্টোবর

১৯৭৮

স্মৃতি কথা লিখার তারিখ ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.

সার্টিফিকেটের ছবি সংযুক্ত করলাম।

মেলার কাল্পনিক ছবি একেছি ChatGPT AI Tool দিয়ে।

#sadequel #science_exhibition #nirala-mor

ar-chhole

আর ছোলে

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আমাদের চাচাদের মধ্যে হাছেন কাক্কু আমার কাছে বেশী বেশী স্মৃতি কথা শোনাতেন, কারণ, আমি স্মৃতি কথা শুনতে চাইতাম। তিনি ছোট দাদাকে নিয়ে একটা স্মৃতি কথা বলেছিলেন। সেইটা আপনাদেরকে শেয়ার করবো। মজাও আছে, শিখারও আছে। ছোট দাদা ছোট দাদীকে বিয়ে করার পর কাজ কাম বাদ দিয়ে চেয়ারে বসে বসে সারাক্ষণ গল্প করে কাটাতেন। দাদা ও দাদী দুই জনই চেহারাবান ছিলেন।

একদিন দক্ষিন দরজা ঘরের বারান্দায় পাশাপাশি দুইটি গর্জিয়াস কাঠের চেয়ারে বসে দাদা-দাদি গল্প করছিলেন। এমন সময় দাদার সমবয়সী দাদার ভাতিজা সোলাইমান তালুকদার, আমাদের বড় কাক্কু কোন সময় যে উঠানে এসে দাড়িয়ে আছেন সেটা টের পাননি। দাদা-দাদি দুজনই ধার্মিক ছিলেন। কাক্কুর ডাক নাম ছিলো ছোলে। ছোলে কাক্কু এসে শোনলেন দাদা দাদীকে বলছেন,”গ্রামের মানুষ যেভাবে চলাফেরা করে, তাতে এরা কেউ বেহেস্তে যেতে পাররে না। গ্রামের আমি আর তুমি ছাড়া কেউ বেহেশতে যেতে পারবে না।” এইটুকু বলে মাথা সোজা করে দেখেন সামনে দাড়ানো ছোলে তালুকদার। দাদা দেরি না করে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলেন, “আর ছোলে।”

হাছেন কাক্কুর কাছে শোনা এই গল্পটা আমার খুব পছন্দ হয়। এই গল্পটা আমি অনেকের কাছেই বলেছি।একদিন আমি ডা: মইনুল ভাইর কাছেও বলেছিলাম। তিনি আমাকে একদিন জানালেন আপনার “আর ছোলে” গল্পটা আমি আমাদের সোসাইটির বার্ষিক ন্যাশনাল কনফারেন্স এ বক্তৃতা দিয়ে গিয়ে বলেছি। সবাই খুব মজা পেয়েছে। বলেছি, আমরা মঞ্চে বসা নেতাদেরকে সামনাসামনি কত প্রসংশা করি। আড়ালে গিয়ে বলি কত খারাপ। শোনে ফেললে আপনারাও বলুন, আর ছোলে।

২৫ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.

#গল্প #স্মৃতিকথা #সাদেকুল

ছবি জেমিনি এ আই টুল দিয়ে তৈরি

ulu-khamu

উলু খামু না, কী খামু?

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আগের দিনে আমাদের বড়বাইদপাড়া গ্রামের ঝোপ ঝারে খেক শিয়াল দেখা যেতো। এগোলো শিয়ালের মতই, কিন্তু সাইজে ছোট। আমাদের গ্রামটা সখিপুরের গড় অঞ্চলে। এখানে দুই রকম জমি আছে। নিচু জমিকে বলা হয় বাইদ। বাইদের দুপাশ দিয়ে টিলাযুক্ত উচু ভুমিকে বলা হয় চালা। এই চালা জমির ডিবির ভিতর উই পোকা বাসা করত। উই পোকার পাখা গজালে সন্ধার সময় ঝাকে ঝাকে আকাশে উড়ে যেতো। বিভিন্ন রকম পাখি এসে উড়ন্ত উই পোকাকে খেয়ে ফেলতো। আমরা উই পোকাকে বলতাম উলু পোকা। উলু পোকায় ঘরেও বাসা করতো। বই খ্যেয়ে ফেলতো। কাঠের ফার্নিচার খেয়ে ফেলতো। আমরা বলতাম উলুয়ে ধরছে। ঝাকে ঝাকে পাখি যখন উরন্ত উলু পোকা খেতো তখন আমরা পোলাপানরা মজা করেদেখতাম। অনেক সময় কৃষকরা খেতের আবর্জনায় আগুন দিলে সন্ধার সময় সেই আগুনে পড়ে উলু পুড়ে যেতো। এই জন্য বলে পিপিলিকার পাথা গজায় মরিবার তরে। উই পোকা পিপড়া জাতীয় পোকা। তাই পীপিলিকা গ্রুপে পড়ে।

সন্ধার সময় উই পোকা বাসা থেকে বের হলেই ঝোপ ঝার থেকে খেক শিয়াল এসে উই পোকা খেতো মজা করে। উই পোকা খেলে খেক শিয়ালের পায়খানা শক্ত হতো, মানে কোস্ট কাঠিন্য হতো। আমরা বলতাম কষা হতো। এই জন্য দেখা যেতো সকাল বেলা ঝোপের ধারে বসে পায়খানা করার জন্য খেক শিয়াল অনেক্ক্ষণ বসে থাকতো। আমার তিন বছরের বড় চাচাতো ভাই সিদ্দিক ভাই বলতেন, “খেক শিয়াল যখন উলু খায় তখন মজা করে পেট ভইরা খায়। উলু খাওয়ার জন্য সকাল বেলায় পায়খানা খুব কষা হয়। কোত পারে আর বলে, ‘আর উলু খামু না। আর উলু খামু না। অনেক চেষ্টা করার পর যখন পায়খানা করে একটু খালাল হয় তখন বলে, ‘উলু খামু না, কী খামু?’

আবার সে উলু খায়, আবার তার পায়খানা কষা হয়।

২০২৯ সনে সারা বিশ্বে করোনা ভাইরাস রোগ মহামারী আকারে দেখা দিলে সবাই গৃহে বন্দী জীবন জাপন করে এবং আল্লাহর নাম জপ করে। আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, আর ঘুষ খামু না। আর ঘুষ খামু না।” এর পর যখন করনার প্রকোপ শেষ হয়ে গেল তখন মানুষ বলতে লাগলো, ঘুষ খামু না। কী খামু?

২৪ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.

#গল্প #স্মৃতিকথা #sadequel

ten-percent-formalin

১০% ফরমালিন তৈরিতে বদনার ব্যবহার


(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৯৩ সনের কথা। তখন আমি এম ফিল কোর্সে ছিলাম আইপইজিএম আর (এখনকার বিএমিউ)-এ। কোর্স মাত্র শুরু হয়েছে। অফিস টাইম ছিল দুপুর আড়াইটা পর্রন্ত। অফিস টাইমের শেষের দিকে বায়োপসি পরীক্ষার সেম্পলগুলির গ্রস এক্সামিনেশন করে টিস্যু সেম্পল ব্লক নিয়ে ১০% ফরমালিনে রেখে দিতে হতো। সকাল আটটা থেকে ক্লাস ও কাজ করতে করতে গ্রস দেয়ার সময় আমি ক্লান্ত ও ক্ষুধার্থ হয়ে পড়তাম।

একদিন দুইটার সময় গ্রস দিতে গিয়ে দেখি ১০% ফরমালিন নাই। ঐসময় ল্যাব এটেন্ডেট যিনি ছিলেন তার নাম এতদিনে আমি ভুলে গেছি। তিনি পাজামা, পাঞ্জাবি ও টুপি পরে থাকতেন। তিনি পাক্কা নামাজি ছিলেন। আমি বললাম, “হুজুর, আজ গ্রস দেয়া গেলো না। চলে যাচ্ছি। “
– কেন?
– ফরমালিন নাই জারে।
– দাড়ান একটু, আমি বানিয়ে দিচ্ছি।

আমি ভাবলাম, হুজুর প্রথমে একটা মিজারিং সিলিন্ডার আনবেন, জার থেকে তেল মাপার মতো করে ফরমালিন নিবেন জারে, তারপর ডিস্টিল্ড ওয়াটার নিবেন সিলিন্ডার দিয়ে মেপে নব্বই গুন পর্যন্ত। এতক্ষনে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়বো।

হুজুর একটা অজুর বদনা হাতে নিয়ে ভিতর দিকে যাচ্ছিলেন। বললাম
– আমার অত সময় নাই। আপনি যাচ্ছেন অজু করতে। আগামীকাল গ্রস দিব। বানিয়ে রাইখেন।
– না, না,, এক্ষুনি বানিয়ে দিচ্ছি।
বলেই দ্রুত বিতরে গিয়ে বদনা ভর্তি করে কি যেন নিয়ে এনে ১০% ফরমালিন লিখা জারে ঢাললেন। বললাম
– এটা কি ঢাললেন?
– ফরমালিন ঢাললাম।

তারপর তিনি পানির ট্যাপ ছেড়ে দিয়ে পরপর ৯ বদনা পানি ঢেলে মিশিয়ে নিলেন।বললাম
– কি হলো?
– ১০% ফরমালিন হলো। হয় নাই?

আমি হিসাব করে দেখলাল ১০ লিটার ফরমালিনের সাথে যদি ৯০ লিটার পানি মেশাতাম থলে ১০% ফরমালিন হতো। অথবা ১ লিটার ফরমালিনের সাথে যদি ৯ লিটার পানি মেশাতাম তহলেও ১০% ফর্মালিন হতো। অথবা ১ গ্লাস ফরমালিনের সাথে যদি ৯ গ্লাস পানি মেশাই তাতেও তো ১০% হয়। তাহলে ১ বদনা ফরমালিনের সাথে ৯ বদনা পানি মেশাই ১০% ফরমস্লিনই তো হবে। হুজুরকে বললা, “হয়েছে।” হুজুর হাতের আংগুল দিয়ে দাড়ি খেলাল করতে করতে চলে গেলেন। আমি গ্রস দিয়ে হোস্টেলে গেলাম।

এর পর ১৯৯৬ সন থেকে এ পর্যন্ত যখনই ১০% ফরমালিন বানাতে শেখাই তখনই বলি ১০% ফর্মালিন বানাতে সিলিন্ডার লাগে না, তোমাদের হাতের কাছে যা আছে তাই দিয়েই মেপে নাও, হোক সেটা পানি খাওয়ার গ্লাস অথবা অজুর পানির বদনা।

২১ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.
#formaline #story #memory #sadequel
কাল্পনিক ছবিটি জেমিনি এ আই টুল তিয়ে তৈরি করেছি।