Author Archives: talukderbd

mal-nai

মাল নাই

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আজকেরটাও আইপিজিএম আর-এ এম ফিল প্যাথলজি পড়াকালীন স্মৃতি কথা লিখলাম । ১৯৯৩-১৯৯৫ আমি ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত পোস্ট গ্রাজুয়েট ইনস্টিটিউট, বর্তমানে যেটা বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি -তে পড়েছি। আমরা হিস্টোপ্যাথলজি স্লাইড পরীক্ষা করা শিখতাম। আমাদের প্রফেসরগণ স্লাইড দেখার আগে আমরা শিক্ষার্থীর স্লাইড পরীক্ষা করে নিজেদের খাতায় ডায়াগনোসিস লিখে রাখতাম। স্যার যখন মাইক্রোস্কোপে চোখ রেখে স্লাইড দেখতেন আমরা তখন স্যারের পেছনে খাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কে কী ডায়াগনোসিস করেছেন স্যার জিজ্ঞেস করতেন। আমরা যার যার করা ডায়াগনোসিস বলতাম। ফাইনাল ডায়াগনোসিস স্যার বলে দিতেন।

যাহোক, একবার দেখা গেলো টেকনোলজিস্ট স্লাইড তৈরি করে দিচ্ছেন না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “স্লাইড দিচ্ছেন না কেন?”

– মাল নাই, তাই স্লাইড তৈরি করতে পারছি না।

– কবে দিবেন?

– মাল আসলেই দিব।

এভাবে পর পর তিন দিন বললেন যে মাল নেই তাই স্লাইড বানাতে পারছেন না।

আমি বললাম

– কী মাল নাই?

– মাল নাই তা আপনি বুঝতে পারছেন না?

– কী মাল নাই আমাকে বলুন আমি আনার ব্যবস্থা করি।

– মাল এনে দেন আমি কাজ করি।

– যে মাল নেই সেটা আমাকে দেখান।

তিনি এলকোহল লেভেল করা খালি বোতল দেখিয়ে বললেন

– এই যে দেখেন, মাল নাই।

– এটা তো এলকোহলের বোতল। এলকোহল নেই, তাই বলুন। বার বার জিজ্ঞেস করছি কী নাই, আপনি বলছেন, মাল নাই।

– এলকোহল মানেই তো মাল, আর মাল মানেই মদ। আপমাদের এলাকায় মদকে মাল বলে না?

– হ্যা, তাইতো। এলকোহলই হলো মদ। মদকে মালও বলে তিরস্কার করে। বলে, বেটায় মাল খায়।

২২ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.

#alcohol#mal#mod#memory#sadequel

ছবি তৈরি করেছি জেমিনি এ আই টুল দিয়ে।

bus-nosto-hole

বাসের ইঞ্জিন নষ্ট হলে

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বাসে উঠে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা যাচ্ছিলাম। সিট নিয়েছিলাম সি লাইনের বাম পাশে করিডোরে। অর্থাৎ সি-২। আমি সবসময় সম্ভব হলে এই সিটের টিকিট করি। না পেলে পরের লাইনে। বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে সাধারণত ড্রাইভারের সামনের অংশে লেগে দোতরিইয়ে ড্রাইভার সহ পেছনের দুই তিন সিটের যাত্রী মারা যায়। বাম দিক সাধরনত কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জানালার সাথের সিট নেই না দুই কারনে। একটি কারন হলো বাস ওভারটেক করার সময় লেগে গেলে জানালার সাথের যাত্রী আঘাত প্রাপ্ত হতে পারে। আরেকটি কারণ হলো সামনের যাত্রী বমি করা শুরু করলে জানালা দিয়ে ছিটা ছিটা আসে। তাই করি ডোরের সাথের সিটে বসি।

যে কাজে যাচ্ছিলাম সে কাজের জন্য দুপুর ১২টার আগে অফিসে উপস্থিত হতে হবে। বাস সাভাবিক গতিতেই চলছিলো । তখন বাসে সামনের দিকের টিভি মনিটরে মিউজিক ভিডিও চলতো। যাত্রিরা ভিডিও দেখতে দেখতে ঢাকায় চলে যেতো। ড্রাইভার কুরুচির চরিত্রের হলে কুরুচিপূর্ণ ভিডিও চালাতো। যেসব যাত্রী ধার্মিক ছিলো তারা মাথা নিচু করে তাজবি জপতে জপতে জার্নি করতো। উঠতি বয়সের পোলাপানরা বেশ মজা করে উপভোগ করতো সেই ভিডিও। বাচ্চা পোলাপানরা ভিডিওর সিনগুলোকে মজার খেলা মনে করে দেখতো। মহিলারা লজ্জা পেয়ে মাথা অবনত করে থাকতেন। এমন অস্বস্তিকর ছিল সেই সময়ের জার্নি। আমি মাঝে মাঝে চোখ উচু করে দেখছিলাম কী দেখাচ্ছে। এক মহিলা যাত্রীকে বলতে শুনেছিলাম “দূর, খাইচ্চুইরা ব্যাডায় কি দেহাইতাছে?” আমার কাছেও মনে হলো ড্রাইভার বেটা একটা খাচ্চর। কন্ট্রাক্টরকে হাত ইশারায় ডেকে কাছে এনে শান্ত গলায় বললাম “এই যে টেলিভিশন মনিটরের পর্দায় তোমার ড্রাইভার যে ভিডিওগুলো দেখাচ্ছেন এগুলো কোন সেন্সর করা সিনেমা নাটকের দৃশ্য না। ফাজিল লোকেরা এগুলো বানিয়েছে। এই ড্রাইভারের মতো কুরুচিপূর্ণ মানুষ এগুলো দেখে। এই বাসের ৯০% যাত্রী এগুলো পছন্দ করেন না। হুজুর ও মহিলারা মাথা নিচু করে বসে আসে। বাচ্চারা খেলা মনে করে দেখছে। তোমার ড্রাইভারকে বলো এগুলো পালটিয়ে ভালো কিছু দেখাতে।” হঠাৎ হার্ড ব্রেক করে বাস থেমে গিয়ে বাম দিকে কাত হলো। অল্পতের জন্য খাদের গিয়ে পড়লো না। পাশের যাত্রী বলে উঠলো “লায়লাহা, লায়লাহা।” আমি শুধরিয়ে দিলাম “লায়লাহা না, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।” তিনি তখন বললেন “লা ইলাহা, লা ইলাহা।” আমি বললাম “আপনি শুধু লা ইলাহা বলছেন, যার অর্থ হচ্ছে ইলা (আল্লাহ) নাই। তার মানে, আপনি বলছেন আল্লাহ নাই। ইল্লাল্লাহ মানে আল্লাহ ছাড়া। আপনাকে পূর্ণ করে বলতে হবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া ইলা (মাবুদ) নাই।” কন্ট্রাক্টর আমার কথাগুলো ড্রাইভারের কাছে গিয়ে বললেন। ড্রাইভার ভিডিও বন্ধ করে ক্যাসেট ট্যাপ বাজানো শুরু করলেন। ফকিরি গান বাজানো শুরু হলো। “এ দেহ পিঞ্জরে বসাইয়া খোদারে, তার তরে করো প্রার্থনা…..।” গানের অর্থ বোধগম্য না হলেও সুরটা আমার ভালো লাগছিলো। এক ইয়াং যাত্রী চিতকার দিয়ে বলে উঠলো “এই ব্যাটা ড্রাইভার, ইগুলা কি হুনাইতাছো? বন্ধ করো।” ড্রাইভার গানের ক্যাসেট বন্ধ করে দিলেন। কিছুক্ষণ পর আবার ছেড়ে দিলেন অন্ধ হুজুরের ওয়াজ। হুজুর কিছুক্ষণ পর পর বাম কান চেপে ধরে চিতকার করে বলে উঠেন “এ্যাই” সেই চিতকারে কোন কোন যাত্রীও কান চেপে ধরে। গাজীপুর গজারি বনে এসে গাড়িটা থেমে গেলো। যাত্রীরা সমস্বরে বলে উঠলো, “কি হলো, ড্রাইভার, থামলা কেন? আমাদের অফিস ধরতে হবে। তাড়াতাড়ি যাও।” ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দেন। ইঞ্জিন “থ্যা ক, থেক, থেক থেক” বলে থেমে যায়। কিছুক্ষণ থ্যাক থ্যাক করে পুরা পুরি চুপ করে রইলো। গাড়ির লোকেরা মেশিন টুলস নিয়ে ইঞ্জিন মেরামত শুরু করলো। যাত্রীরা চিল্লাতে লাগলো –

“এই শালারা ছাড়ার সময় চেক করস নাই?”

“অফিস টাইম শেষ হইয়া যাইবো, অহন কিবা অইবো?”

এক মহিলা তার স্বামীকে ভর্তসনা করে “আমি প্রথমেই তোমাকে বলছিলাম এই গাড়ির টিকিট না করতে।” তার স্বামী উত্তর দেন “কেউ কি জানতো গাজীপুর এসে গাড়ি নষ্ট হবে?

এক যাত্রী ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বললেন ” গাড়ি ছাড়ার আগে ইঞ্জিন চেক করেন নাই?” ড্রাইভার বলেন “ইঞ্জিন তো চেক করেছি। ইঞ্জিন ভালোই ছিলো। ইঞ্জিন নষ্ট হলো এখন। কখন ইঞ্জিন নষ্ট হয় বলা যায় না। আপনারা শান্ত হয়ে বসুন। আমরা ঠান্ডা মাথায় কাজ করি।“ যাত্রিরা অস্থির, চেচামেচি করতেই থাকলো। আমি নির্লিপ্ত বসে ছিলাম। কোন টেনশন করলাম না। আমারও কাজের টাইম শেষ হয়ে যাবে। করার কিছু নেই। আমি টেনশন করলেও যা হবে, না করলেও তাই হবে। বরং টেনশন করলে ব্লাড প্রেসার বেড়ে যাবে। হার্ট ডিজিজ হবে। সর্বদা ঠান্ডা মেজাজে থাকাই ভালো। বরঞ্চ, এই সময়টা এঞ্জয় করা যাক। জানালা দিয়া দেখলাম সুন্দর গজারির বন। বনের পাশেই বাইদের জমিতে ক্ষেত ভর্তি আধাপাকা ধান। আস্তে করে সামনে গিয়ে ড্রাইভারকে বললাম “তাড়াহুড়ো করবেন না। ঠান্ডা মাথায় কাজ করুন। আমি নিচে নামলাম। সি-২ সিটে বসেছি। আমাকে রেখে চলে যাইয়েন না। ইঞ্জিন ঠিক হলে ডাক দিয়েন।”

গজারির বনে কিছুক্ষণ হাটলাম। টেওড়াকাটা গাছে ফুল ফুটেছিল। ভ্রমর বসেছিল তাতে। প্রজাপতিরা নেচে নেচে ফুলে ফুলে উড়াউড়ি করছিলো। নানা জাতের পাখির গানে মুখরিত ছিল সেই বন। বাইদের ধান ক্ষেতের বাতরে এসে দাড়ালাম। ক্ষেতের মাঝখানে একটি কঞ্চি গাড়া ছিলো। সেই কঞ্চিতে বসেছিলো এক ফেইচ্চা (ফিঙ্গে) পাখি। উড়ে গিয়ে ধান ক্ষেত থেকে ফড়িং ধরে এনে কঞ্চিতে বসে খাচ্ছিল। ক্ষেতের বাতরের এক পাশে জোড় কাটা ছিল। সেখানে একটা পানির ঝরা ছিলো। ওখানেও এক কঞ্চি গাড়া ছিলো। সেই কঞ্চিতে বসা ছিলো একটি সুন্দর মাছরাঙা পাখি। নষ্ট গাড়ি থেকে হর্নের আওয়াজ এলো। দ্রুত এসে সিটে বসলাম। যাত্রীরা চিতকার চেচামেচি করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সবার অফিস টাইম ওভার হয়ে গেছে। সবাই তা নিয়ে আফসোস করছে। আমি ব্যাগ থেকে বই বের করে পড়তে পড়তে মহাখালী বাস টার্মিনালে পৌছলাম। অফিসে গিয়ে আমার কাজ হলো না। ফিরে এলাম বাস টার্মিনালে। ফেরিওয়ালা টসটসে পেয়ারা কুঁচি কুঁচি করে কেটে কাসুন্দি ও বিট লবণ মিশিয়ে কৌটার ভেতর ভরে হাতের তালুতে থাপথুপ করে বিক্রি করছিলো। খুব খেতে ইচ্ছে হলো। মেডিকেল কলেজের শিক্ষক হয়ে খোলা খাবার খাওয়া ঠিক না। ছাত্রদেরকে তাই শেখাই। কাজেই না খাওয়াই ভালো। কিন্তু মনে মানছিলো না। কাছে গেলাম। এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখলাম পরিচিত কেই নেই। অর্ডার দিলাম ১০ টাকার। আমার নির্দেশ মতো বোতলের পানি দিয়ে পেয়ারা ধুইয়ে পরিস্কার ছুড়ি দিয়ে কেটে বানিয়ে দিলো। বেঞ্চে বসে টুথ পিক দিয়ে গেথে গেথে মজা করে খেলাম। ফিরতি টিকিট করে ফিরে এলাম ময়মনসিংহ। ফেরার সময় ইঞ্জিন নষ্ট হয়নি। হলে নেমে এঞ্জয় করতাম।

১৪/১০/২০২০ খ্রি.

ময়মনসিংহ – ঢাকা জার্নি

#memory #busjourney #smritikotha #sadequel

কাল্পনিক ছবি তৈরি করেছি chatGPT দিয়ে

ghaura

স্যার, আপনে এইরকম ঘাউড়া ক্যান?

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

১৯৮৮ সনের জুলাই মাসের ৩ তারিখে সরকারি মেডিকেল অফিসার হিসাবে প্রথম যোগদান করি বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। একা একটা পরিত্যক্ত সরকারি টিনের ঘরে হারিকেন জ্বালিয়ে থাকতাম। কেরোসিনের চুলায় সকালে নিজ হাতে রান্না করে তিন বেলা খেতাম। আলু ভর্তা, বেগুন ভর্তা, ডিম ভর্তা, ডিম ভাজি এবং ডাল দিয়ে সাধারণত ভাত খেতাম। মাঝে মাঝে খাসির বা গরুর গোস্তো নিজ হাতে রান্না করে খেতাম। একাকি তাকতাম, তাই নিরবতা কাটানোর জন্য এক ব্যান্ডের ছোট্ট একটা পকেট রেডিও বাজাতাম, বাংলাদেশ বেতার ঢাকা ও আকাশবাণী কলকাতা শুনতাম।

১৯৮৯ সনের মার্চ মাসে ঐ এলাকায় কলেরায় মহামারি আকারে অনেক লোক আক্রান্ত হয়। আমি সকালে হাসপাতালে বসে রোগী দেখছিলাম। হাসপাতালটা ছিল অতি পুরাতন টিনের ঘর। ব্রিটিশ আমলের লোহা কাঠের ভাংগা ভাংগা চেয়ার টেবিল ছিলো। আমার সামনে অন্তত ১০০ জনের মতো রোগী লাইনে দাড়ানো ছিলো। মনোযোগ দিয়ে দ্রুত রোগীর প্রেস্ক্রিপশন লিখে বিদায় দিচ্ছিলাম। একজন ছাত্র লাইনে না দাড়িয়ে খোলা জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে উকি দিয়ে বারবার বলছিলো, ” স্যার আমাকে দুই তিনটা রগে দেয়ার সেলাইন দিন, রোগীর সাংঘাতিক ডাইরিয়া হইছে।” আমি বার বার বলছিলাম লাইনে দাড়াতে। কিন্তু সে লাইনে না এসে জানালা দিয়ে বারবার একই অনুরোধ করছিলো। আমি বিরক্ত হয়ে জানালা দিয়ে তাকে কয়েকটা খাবার সেলাইন সাধলাম। কিন্তু ছেলেটি নাছোড়বান্দা, রগে দেয়ার সেলাইনের ব্যাগই নিবে।আমি বললাম যে রোগী না দেখে রগে দেয়ার সেলাইন দেয়া যাবে না। এভাবে সে প্রায় ঘন্টাখানিক বারবার একই দাবি জানিয়ে আসছিল। আমি সে দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে অন্য রোগীদের সমস্যা শুনে শুনে ঔষধ দিয়ে আসছিলাম।

এক পর্যায়ে ছেলেটা হঠাৎ বলে উঠলো, “স্যার, আপনে এমন ঘাউড়া ক্যান?” মুরুব্বিরা লাইনে থেকে বলে উঠলেন, “এই বে-আদব ছেলে, কাকে কি বলছো? একজন ফার্স্ট ক্লাস গ্যাজেটেট অফিসারের স্যাথে এভাবে আচরন করে?”

আমি হেসে ফেললাম। জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার নাম কী? কোন ক্লাসে পড়ো?”

ছেলেটি বললো যে সে ক্লাস নাইনে পড়ে। আমি বললাম আমি এই রোগীগুলো দেখা শেষ করে তোমার সাথে তোমাদের বাড়ি গিয়ে রোগী দেখে নিজ হাতে সেলাইন পুশ করে আসবো। রোগী না দেখে সেলাইন দিয়ে দেয়ার নিয়ম নাই।” আরও কিছুক্ষণ বাক বিতনণ্ডা করে চুপ রইল। হাস্পাতালের রোগী দেখা শেষ করে তিনটি সেলাইনের ব্যগ সাথে নিয়ে ছালেটির বাড়িতে চলে গেলাম দুই কিলোমিটার হেটে। ঐ বাড়ির বড়রা ছেলের কান্ড দেখে অবাক। বলেন, “আমরা লজ্জিত, আমাদের ছেলেটা আপনার সাথে বেয়াদবি করেছে। আমরা লজ্জিত। আমরা তাকে এভাবে সেলাইন আনতে বলি নাই।” আমি বললাম, “সমস্যা নাই। রোগী দেখান।”

মুরুব্বিরা বললেন, “আপনি বাসায় ফিরেন নাই। দুপুরে খান নাই। একা একা থাকেন। কি খান, না খান আমরা খোজ রাখিনা। আজ আমাদের বাড়িতে খাবেন। পোলাও – মাংস রান্না করা আছে। আপনি আগে খেয়ে লন। তারপর রোগী দেখবেন। আমরা জানি, আপনারা রোগী দেখার পর খান না। কাজেই রোগী দেখার আগেই খেতে হবে।”

আমি অজু করে খেয়ে নিলাম। অনেকদিন পর ভালো খাবার খেলাম। ভালো লাগলো। তারপর রোগী দেখে সেলাইন পুশ করে ফিরে এলাম চরামদ্দি। সাথে ব্যাগ হাতে বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেলো সেই ছেলেটা। যে আমাকে ঘাউড়া বলেছিলো। আমি একটুও মাইন্ড করিনি। এরপর যদিন চরামদ্দি ছিলাম, ছেলেটা আমার কাছে আসতো ভালোবেসে। আমার ভালো লাগতো। চরামদ্দির ঘাউড়া ডাকা ছেলেটিকে।

৫ জানুয়ারি ২০২৬ খৃ.

#story #Memory

(ছবিটা এ আই দিয়ে তৈরি করিয়েছি)

rajnitir-mor

রাজনীতির মোর

(স্মৃতি কথা)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

অনেক বছর আগের কথা। সনটা ভুলে গেছি। গ্রামের বাড়ি সখিপুর এলাকা থেকে একজন রোগী এলেন আমার ময়মনসিংহ তালুকদার প্যাথলজি ল্যাব এর চেম্বারে। আমি নাম জানার পর জিজ্ঞেস করলাম

– আপনার বাড়ি যেন কোথায়?

– বাড়ি তো আপনাদের বাড়ির কাছেই।

– আপনার বাড়ি কি আমাদের বড়বাইদপাড়ায়?

– না, আমাদের বাড়ি হচ্ছে রাজনীতির মোর।

– এটা আবার কোথায়?

– আপনাদের বাড়ির কাছেই। মনে হচ্ছে, নামই শুনেন নাই?

– আমি এই গ্রামের নাম শুনি নাই। গ্রামটা কোথায় পড়েছে?

রোগী লোকেশনটা সুন্দর করে আমাকে বলে দিলেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম

– জায়গাটার নাম রাজনীতির মোর হলো কেমনে?

– কয়েক বছর আগে ঐ রাস্তার মোরটাতে বড় রকম একটা মারামারি হয়েছিলো। তারপর থেকেই ঐ জায়গাটার নাম হয়েছে রাজনীতির মোর।

– তা হলে তো হবে মারামারির মোর, রাজনীতির মোর হলো কেমনে?

লোকটা হেসে দিয়ে বললেন, “রাজনীতি মানেই তো মারামারি।”

২০ ডিসেম্বর ২০২৫ খ্রি.

#villagelife#story#memory

(ছবি: গল্পটা পড়ে এ আই chatGPT এই কাল্পনিক ছবিটি এঁকে দিয়েছে)

chhoto-kakkur-election

Chhoto Kakkur Election

ছোট কাক্কুর ইলেকশন

ডাঃ সাদেকুল ইস্লমা তালুকদার
ছোট কাক্কু, মানে আমার ছোট চাচা, বাবার চাচাতো ভাই, মরহুম আব্দুস সালাম তালুকদার। তিনি কালিয়া ইউনিয়ন কাউন্সিলের সেক্রেটারির চাকরি করতেন। এজন্য সালাম সেক্রেটারি নামে পরিচিত ছিলেন । এটা একটা সরকারি চাকরি। ভালই ছিলো এই চাকরি। বাড়ী থেকেই সাইকেল নিয়ে অফিসে যেতেন। হাটের দিনে কচুয়া ও বড় চওনা হাটে ঔষধ বিক্রি করতেন। যেমন সুন্দর ছিল তার চেহারা তেমনই সুন্দর ছিল তার ব্যবহার। তিনি বেশ ধার্মিক ছিলেন। ঈদের মাঠে ছোট খাটো বয়ান দিতে শুনেছি। তবে খুব ভালো বক্তা ছিলেন না। তাকে আমি রাজনীতি করতে দেখিনি। তবে রাজনৈতিক সচেতন ছিলেন। ১৯৬৫ সনের পাকিস্তান-ভারতের যুদ্ধের সংবাদ রেডিওতে শুনে আমার বাবা চাচাদের সাথে গল্প করতে শুনেছি। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও তিনি রেডিওতে মুক্তিযোদ্ধাদের কোন বিজয়ের কথা শুনলে চাচাদেরকে নিয়ে উল্লসিত হতেন। স্বাধীন হওয়ার পর বড় চওনা মাঠে যখন কাদের সিদ্দিকীকে গণ সম্বর্ধনা দেয়া হয় সেই সমাবেশে তাকে মোনাজাত পরিচালনা করতে দেখেছি। এলাকার কোন সালিশ বিচারে তাকে দেখিনি। চাকরি করতেন, ব্যবসা করতেন, জমি আবাদ করাতেন, সন্তানদেরকে স্কুল কলেজে পড়াতেন এবং শুখে শান্তিতেই থাকতেন গ্রামে। তিনি আমার একজন ভালো অভিভাবক ছিলেন।

১৯৮৩ সনে আমি যখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস থার্ড ইয়ারে পড়ি তখনকার ঘটনা। রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের শাসন আমলে। কালিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন বড় চওনার জামাল হোসেন সাহেব। অর্থাৎ সালাম কাক্কুর অফিসের  চেয়ারম্যান । আমাদের ইউনিয়ন মানে চোট কাক্কুর ইউনিয়ন কাকরাজান। ছোট কাক্কুর মাথায় চাপলো চেয়ারম্যান হবেন। চেয়ারম্যানের অধীন চাকরি করবেন না। তার অধীনেই আরেক সেক্রেটারি সাহেব চাকরি করবেন। কাক্কু কোন দিন ইলেকশন করবেন আমি কল্পনাও করতে পারিনি। কাকরাজান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে লাঙল মার্কায় কাক্কু ইলেকশনে দাঁড়ায়েছেন শুনে আমি স্তম্ভিত হলাম। লাঙল ছিল এরশাদ সাহেবের জাতীয় পার্টির মার্কা। মনে হলো কাক্কু এই সরকারকে ভালোবাসেন অথবা পাবলিক ভালো বাসে বলে লাংগলে ভোট দিবে ভেবে কাক্কু এই কাজ করেছেন। শুনলাম সবাই কাক্কুর জন্য মরিয়া হয়ে ইলেকশনের ক্যাম্পেইন করছে। আমি কি কাক্কুর জন্য কিছু না করে থাকতে পারি? মেডিকেলের প্রচুর পড়ার চাপ উপেক্ষা করে বাড়ী চলে গেলাম কাক্কুর জন্য কিছু করতে।

দেখলাম ইলেকশন করার জন্য কাক্কু বেশ সংগঠিত। মাওলানা সালাউদ্দিন দুলাভাই নির্বাচন পরিচালনা করছেন। খাওয়া দাওয়ার দায়িত্বে হাফিজ দুলাভাই। মিয়া কাক্কুকে দেয়া হয়েছে রান্না বান্না ও বিড়ি বিতরনের দায়িত্বে। আমাকে একটা দায়িত্ব দিতে অনুরোধ করলাম। সালাউদ্দিন দুলাভাই বললেন “তুমি বাড়ীতেই থাকবে। বসে বসে পড়বে। সকাল ও সন্ধায় মেহমানদের বসতে দিবে।”

ঐবছর আরো যারা ইলেকশনে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের মধ্যে কয়েকজনের নাম আমার মনে আছে। ইন্দ্রজানীর সামসুল হক পান্না মামা গরুর গাড়ী মার্কা, সরিষা আটার আবুবকর সিদ্দিক খেজুর গাছ মার্কা, ছোট চওনার শওকত ডাক্তার আনারস মার্কা। সকাল বেলা বিভিন্ন গ্রাম থেকে লোকজন আসতেন ক্যাম্পেইনে যাওয়ার জন্য। আমি বাংলাঘরে পাটি বিছিয়ে বসতে দিতাম। ডিসেম্বর মাস ছিল সেটা। সকাল বেলা গরম ভাতের সাথে মাসের ডাল দিয়ে পেট ভরে ভাত খেতেন কর্মিরা। নয়টা-দশটার দিকে কুয়াশা কেটে মিষ্টি রোদ ওঠে যেতো। কর্মিরা গায়ের চাদর ও সুয়েটার খুলে কোমড়ে বেধে তার নিচে বিড়ির বান্ডিল বেধে চলে যেতো বিভিন্ন গ্রামে। সন্ধার সময় একে একে ফিরে আসতে থাকতো কর্মিরা। আমি পাটি বিছিয়ে বসতে দিতাম কর্মি ভাইদেরকে। একপাশে বোকার মতো বসে কর্মিবাহিনী ভাইদের আলাপ শুনতাম। উপভোগ করার মতো সেই আলাপ। তাদের সংলাপগুলি ছিল এরকমঃ
– আমি গেছিলাম বইলারপুর গ্রামে। সেখানকার সবাই ভোট দিবে লাংগলে। কয়েক বান্ডিল বিড়ি নিয়ে গেছিলাম। মুহুর্তেই শেষ। বিড়ি না দিয়া কি কারো সাথে ভোটের আলাপ করা যায়?
– আমি গেছিলাম গড়বাড়ী। সেখানকার সবাই ভোট দিবে তালুকদার সাবকে। আমারো একই কথা। নিমিষেই বিড়ির সব বান্ডিল শেষ। কি আর করি। নিজের টাকায় আরো ৫ বান্ডিল বিড়ি কিনে ভোটারদের দিয়ে ভোট চেয়েছি। ভোটাররাও খাচ্চর আছে। একটা নিয়ে কানে বাজিয়ে রাখবে আরেকটা ধরিয়ে টানতে টানতে যাবে। তবে তাদের ভাব দেখে মনে হয় সবাই লাংগলেই ভোট দিবে।
– আরে শুনুন, আমি গেছিলাম ভুয়াইদ। সেখানে তো কাক্কুর মামুর বাড়ী। কাক্কুর মামুই ১১ জন। তাদের গুষ্টির সবাই যদি ভোট দেয় কাক্কু তো এমনি উঠে যায়। তবে সেখানে অল্প বিড়ি নিয়ে গিয়ে ভুল করেছি। তারা বলছে যে ভাইগ্নার জন্য আমাদের ভোট চাইতে হয়। আমাদের কাছে কিছু বিড়ি বেশী রাখা দরকার।

কেউ কেউ আমার কানে কানে বলছিলঃ
-যারা এরকম চাপাবাজি করছে তারা আসলে চোর। কাক্কুর বিড়ি নিয়ে গিয়ে অন্য ক্যান্ডিডেটের কর্মীর কাছে সস্তায় বিক্রি করে দিয়ে এসে এখানে গল্প করছে চাচাকে ফুলানোর জন্য।
– ভোট দিবে সবাই ইন্দারজানীর সামসুরে গরুর গাড়ী মার্কায়। তার কথা মুখে কেউ বলে না। কোন রকম মার্কা বা পোষ্টার ছাপায়নি। তার কর্মিও নাই। একাই বিভিন্ন গ্রামে চাদর গায় দিয়ে ঘুরে আর বলে “চাচা, ইলেকশনে খারাইছি। দেশের ভালো চাইলে একটা ভোট দিয়েন। মার্কাটা গরুর গাড়ী। কোছে বিড়ি থাকলে একটা দেন খাই।“

লাংগলসহ অন্যান্য ক্যান্ডিডেট যেখানে বিড়ি ও পোস্টার বিলিয়ে ভোট চাইছে কর্মি বাহিনী দিয়ে সেখানে পান্না মামা খালি হাতে একা ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছেন। নিজে তো বিড়ি দিচ্ছেন না। উলটা তিনি অন্য ক্যান্ডিডেটের দেয়া বিড়ি নিয়ে খাচ্ছেন।

কেউ কেউ আমাকে জানালেন “তালুকদার সাহেব রাজনীতি জানেন না। তার টাকাগুলি খসানোর জন্য তাকে অনেকে কুবুদ্ধি দিয়েছেন। দুনিয়াটা এত সোজা মানুষের জন্য না। চাকরি ত গেলোই টাকা পয়সাগুলিও শেষ করবেন ইলেকশনে খরচ করে। টাউটদের পকেটভারি হচ্ছে।

রাত নয়টার দিকে ঘর ভরে যেতো কর্মি বাহিনীতে। তাদের মন্তব্য শুনতাম বসে বসে। একেকজন একেকভাবে চাপা মারতো। আর আমি একেকবার একেকজনের মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে শুনতাম। হাফিজ দুলাভাই নেতার মতো মাঝখানে দাঁড়িয়ে শুনতেন। তিনি মিটি মিটি হাসতেন সামনের দুই দাতের আগা বের করে গালে টোল ফেলে। কর্মিদের কথা শেষ হলে হাফিজ দুলাভাই বিজ্ঞের মতো আংগুল খারা  করে বলতেন “শুনুন, আপনারা চুপ করুন, আমার কথা শুনুন। তেলধারা গ্রামে এত ভোট। সেখানে পুরুষ ভোট এতো। মহিলাভোট এতো। কাক্কু পাবে এতো ভোট। নাইন্দা ভাংগা গ্রামে এত ভোট। কাক্কু পাবে তার ৯০ ভাগ। অমুক গ্রামে এত ভোটের মধ্যে কাক্কু প্রায় সব ভোট পাবেন। কাজেই সব গ্রামের ভোট হিসাব করে দেখা গেলো যে কাক্কু বিপুল ভোটে বিজয়ী। দেন খাবার।” সবাই সমস্বরে বলে উঠতো “দেন খাবার। দেন খাবার।” আমি প্লেট ভর্তি আমন ধানের ভাত দিতাম। কাপাভর্তি করে মাস কয়ালাইর ডাইল দিতাম। পেট ভর্তি করে খেয়ে ডিগডিগি চলে যেতো কর্মিরা। আবার চলে আসতো সকালে। পেট ভরে খেয়ে বিড়ি নিয়ে চলে যেতো গ্রামে গ্রামে।

তখন ছিল ডিসেম্বর মাস, শীত কাল। আমন ধান কাটা হয়ে গেছে। গ্রামের লোকের কোন কাজ ছিল না তখন। ইলেকশন আসাতে একটা উৎসব উৎসব ভাব সবার মনে। ছাত্রদেরও পরীক্ষা শেষ হয়েছিল। সবাই ইলেকশন নিয়ে মেতে উঠেছিল। একদিন সকালে দেখলাম এক গ্রামের একজন প্রভাবশালী কাক্কুর বাড়ীতে এসেছেন। উঠানে চেয়ার পেতে বসেছিলেন রোদে। দেখলাম ছোট কাক্কু তার হাত ধরে ফুঁফিয়ে কাঁদছেন। আমার কাছে ব্যাপারটা বেখাপ্পা মনে হচ্ছিল। কাকরাজান ইউনিয়নে এমন কোন ব্যাটা নাই যে তার হাতে ধরে তালুকদারদের কাঁদতে হবে। আমি একজনকে জিজ্ঞেস করলাম “ব্যাপারটা কি?” তিনি আমাকে বুঝালেন “ইনি তার এলাকায় প্রভাবশালী। তার কথায় সবাই ভোট দিবেন। অথচ ছোট কাক্কু ইলেকশনে দাঁড়িয়ে তার সাথে দেখাও করেননি, কথাও বলেননি। তিনি বিদ্রোহী হয়ে অন্যজনের জন্য ভোটের ক্যানভাস করছেন। তাই, তার হাত ধরে কাক্কু কান্নার অভিনয় করছেন। ইলেকশনটা শেষ হোক। তারপর দেখা যাবে কে কার হাত ধরে কাঁদেন।” আরেক রাতে অন্য পাড়ার একজন লিডার এলেন সবাইকে নিয়ে। পাড়ার লিডার তালুকদারদের দেখে রাস্তা চেড়ে দিতেন। তাকে দেখে মনে হলো বেশ প্রভাবশালী। কিছু একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে বলে মনে হলো। আমি আগ্রহ নিয়ে বসলাম। মিয়া কাক্কু, ছোট কাক্কুর বড়জন, আবুল কাশেম তালুকদার, মাদবর শুরু করলেন “আমরা এখন একটা বিরাট কাজ হাতে নিয়েছি। আমাদের এই এলাকা থেকে কোন চেয়ারম্যান নির্বাচন না করাতে এলাকার কোন উন্নয়ন হয় নাই। এবার আব্দুস সালাম ইলেকশনে দাঁড়িয়েছে। সবাই সতস্ফুর্তভাবে তারজন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। ইনশাল্লাহ, আমাদের বিজয় হবেই। তোমার মতন” বলার সাথে সাথে পাড়ার লিডার ক্ষেপে গিয়ে বললেন “এই মোতনের মধেই দোষ। আপনাদের এই মোতনের মধেই দোষ। আমাদেরকে আপনারা মানুষই মনে করেন না। কিছু হলেই বলেন তোমার মোতন অমুক। আমরাও মানুষ। আমাদের মানুষ বলে মনে করবেন। আমি এইজন্যই আপনাদের বাড়ী আসতে চাইনি। থাকুন আপনাদের তালুকদারি নিয়ে।” সাথে আশা অনেকে তাকে বুঝিয়ে শান্ত করলেন। বুঝালেন “তালুকদার সাব কি বলতে চেয়েছিলেন আমরা শুনি।” মিয়া কাক্কু বললেন “আমি যা বলতে চেয়েছিলাম তা তুমি না শুনেই রাগ করা শুরু করলা। আমি বলতে চেয়েছিলাম তোমার মতোন অমুক আর আমার মতোন কাশেম যদি এক থাকি তাহলে আমাদের সাথে কেউ পারবে না।” সবাই বললেন “তালুকদার সাব ঠিক কথাটাই কইছে। আমাদের কথা অইল তারা আমাদের যত বিড়ি আর টাকা পয়সা দেইক না কেন আমরা ভোট দিব তালুকদার সাবকেই।” আমি কানে কানে জানতে পারলাম অন্য ক্যান্ডিডেটের দেয়া বিড়ি ও টাকা পেয়ে এই মাদবর লাঙল বাদ দিয়ে অন্য ক্যানভাস করছিলেন। তাই, এই ব্যবস্থা। আসলে মিয়া কাক্কু প্রথমে তাকে তিরস্কার করতেই চেয়েছিলেন। অবস্থা বেগতিক দেখে সুর পালটিয়ে তোমার মোতনের সাথে আমার মোতন লাগিয়ে দিয়েছেন। আমার মোতন সাদেকেরও বুঝতে অসুবিধা হলো না যে ইলেকশনের পর চাচায় যে তারে কি করে!

কাক্কু এবার চেয়ারম্যান হবেন। সবার মধ্যে আনন্দ আনন্দ ভাব ছিল। বাড়িতে অনেক নায়রী এসেছিল। কাক্কুর শশুর বাড়ির সবাই এসেছিল। আসাদুজ্জামান মুকুল তালুকদার ও আনোয়ার হোসেন কায়সার তালুকদার কাক্কুর ছেলে। আরেক ছেলে আক্তার তালুকদার তখন ছোট ছিল। মুকুল ও কায়সার মিছিলে অংশগ্রহণ করতো। আক্তারের খেলার বয়স ছিল । সে ইলেকশন বুঝত না। মুকুলের মামাদের টেলিভিশন এনেছিল এই বাড়ীতে। যাদের কাজ নেই তারা উঠানে পাটিতে বসে টিভি দেখতো সারাক্ষণ । সাদাকালো টিভির যুগ ছিলো তখন। লম্বা বাঁশের আগায় এন্টিনা বেঁধে টিভি দেখা হতো। ঢাকা ও ময়মনসিংহ থেকে টিভি সিগনাল আসতো প্রায় ১০০ কিলো মিটার দূর থেকে। তাই ছবি ঝিরঝির করতো। বাতাসে একটু নড়ে গেলে ছবি চলে যেতো। বাইরে গিয়ে একজনে বাঁশ ঘুরিয়ে বলতো

-ছবি আইছে?
– আইছে। পরিষ্কার না। আরেকটু ঘুরাও। এখন আইছে। এই গেছে গা। এখন আবার আইছে। থাউক। এইভাবেই থাউক। নড়াইও না।

অবশেষে সেই প্রতিক্ষিত ইলেকশনের দিন এলো। সেদিন বাড়ীতে কোন কাজ ছিল না। মাওলানা সালাউদ্দিন দুলাভাই সবাইকে ডিউটি দিয়ে পাঠালেন বিভিন্ন কেন্দ্রে। আমাকে পাঠালেন সবচেয়ে দূরের কেন্দ্র চকপাড়ায়। আমাকে কেন এত দূরে পাঠালেন এনিয়ে আমি অনেক চিন্তা করে একটা কারন খুজে পেয়েছি। আমি ছিলাম তেমন কাজের না, তাই। চকপাড়া কেন্দ্রের ভোট পাওয়ার কথা সরিষা আটার ক্যান্ডিডেট আবুবকর সাহেব, খেজুরগাছ মার্কা। এখানে ইম্পোর্টেন্ট লোক পাঠিয়ে লাভ নেই। কিছু বিড়ির বান্ডিল নিয়ে আমি নাস্তা করে চলে গেলাম চকপাড়া কেন্দ্রে। অনেকদিন হয় শহরে থাকি। হাটা হয় না তেমন। বাড়ী থেকে হেটে চকপাড়া কেন্দ্রে যেতে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। দুলাভাইর প্রতি খুব মনোক্ষুণ্ণ হয়েছিলাম। এতো কষ্ট আমায় দিলেন! যাহোক কেন্দ্রে পৌঁছে একটা বেডশীট বিছিয়ে বসে পড়লাম বিড়ির দোকান্দারের মতো। সবার মুখে শুধু খেজুর গাছ। সবার হাতের কাগজে খেজুরগাছের ছবি । আমার দিকে এসে লাঙল মার্কা দেখে ফিরে যায়। কেউ কেউ বলে “লাঙল মার্কা ক্যান্ডিডেটকে তো কোন দিন দেখলামই না। এইটা সালাম সেক্রেটারির মার্কা। ইনি আবার সেক্রেটারিগিরি বাদ দিয়ে চেয়ারম্যান হতে চায় কেন?”

আমার বিড়ি নিতে কেউ আসে না। নিজেকে অসহায় মনে হলো। অনেকে দূর থেকে তাকায় আমার দিকে। আমি ফিরে যেতে মনস্থির করলাম। কিন্তু এতগুলি বিড়ি কি করবো? এমন সময় জিতেশ্বরির এক কাক্কু এলেন। নাম বললাম না । তিনি কিছুক্ষণ আমার সাথে বসে উঠে গিয়ে একজন উপজাতী ভাইকে নিয়ে এলেন। বললেন “কাক্কু, ওকে কয়েক প্যাকেট বিড়ি দিন। ও লাংগলে ভোট দিবে।” এভাবে একজন একজন করে কয়েকজনকে নিয়ে এসে মাটি হাতে নিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে বিড়ি দিলেন লাংগল মার্কায় ভোট দেয়ার জন্য। আমি বললাম “কাক্কু, মাটি হাতে নিয়ে কিরা করার দরকার নাই। এমনি বিশ্বাস করে দেন। ভোট দিলে দিবে না দিলে না দিবে। গরীব মানুষ এমনি দিয়ে দেন।” কিছুক্ষণ পর সব বিড়ি শেষ হয়ে গেলো। আমিও হাল্কা হয়ে বেঁচে গেলাম। বাড়ীর দিকে পথ ধরলাম। রাস্তা দিয়ে যাই লোকে বলাবলি করে যে যাই বলুক পাশ করবে গরুর গাড়ী। সবারটা খেয়ে ভোট দিবে সামসুরে। আমি উচ্চস্বরে বলি “লাঙল, লাঙল, যাবেই যাবে, লাংগল।” ছোট চওনা কেন্দ্রে গিয়ে দেখি আমাদের বাড়ীর সবাই উৎসবে মেতেছে। অযথা আমাকে পাঠিয়েছেন চকপাড়ায়। দুলাভাইর প্রতি আরেকবার রাগ হলো। মুকুল ও কায়সার এখানেই ছিল। চাচার নির্ঘাত পরাজয় ভেবে কেন্দ্র ত্যাগ করলাম। কিছুক্ষণ পর মুকুলও কেন্দ্র ত্যাগ করলো। ভোট গণনা অর্ধেক হলে কায়সারও কেন্দ্র ত্যাগ করে চলে এলো। জিতেশ্বরি পর্যন্ত এলে একদল কিশোর জিজ্ঞেস করলো “কায়সার ভাই, খবর কি?” কায়সার ফাল দিয়ে বলে উঠলো “উইঠা গেছি।” কিশোরের দল খুশীতে আত্বহারা হয়ে কায়সারকে কাঁধে নিয়ে নাচতে লাগলো আর স্লোগান দিল “উইঠা গেছে, লাংগল। উইঠা গেছে, লাংগল।” অবস্থা বেগতিক দেখে কায়সার বলে দিলো “এই পোলাপান উঠি নাই। মিছা কথা।” শুনে কিশোরের দল থেকনা দিয়ে কায়সারকে কাঁধ থেকে ছেড়ে দিলো।” এই ঘটনাটুকু আমি স্বচক্ষে দেখেনি । কায়সার পরে আমাদেরকে বঘটনার বর্ণনা করেছে । তবে কত জোড়ে থেকনা দিয়েছে তা আমি কল্পনা করতে পারি।

ইলেকশনের পরেরদিন শুনলাম গরুর গাড়ী মার্কা সামসুল হক পান্না মামা বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। ইলেকশনে কোনরূপ কারচুপি হয়নি। জনগণ স্বাধীনভাবে বিড়ি খেয়েছে, স্বাধীনভাবে টাকা খেয়েছে, স্বাধীনভাবে ক্যানভাস করেছে আর স্বাধীনভাবে চুপি চুপি কর্মীবিহীন ও পোস্টারবিহীন সামসুল হক পান্নাকে ভোট দিয়েছে। একেই বলা হয় ফেয়ার ইলেকশন। ছোট কাক্কু যতই ভালো মানুষ হউন না কেনো তাকে চেয়ারম্যান হিসাবে ভোটাররা পছন্দ করেননি। নয়-মামাদের গ্রাম থেকে নয়টি ভোটও পাননি। আমার চকপাড়ার কেন্দ্রে যারা মাটি হাতে কিরা খেয়ে বিড়ি নিয়েছিল তারাও ভোট দেয়নি হিসাব করে দেখেছি। আচ্ছা, আপনিই বলুন, আমি যে এতো ভালো এবং আপনাদের প্রিয় মানুষ, গ্রামের মেম্বার পদে ইলেকশন করলে কি আমাকে কেউ আপনারা ভোট দেবেন? কাজেই, যার জন্য যে কাজ মানায়। ছোট কাক্কুর চেয়ারম্যানে ইলেকশন করা ঠিক হয়নি। তিনি সেক্রেটারি হিসাবেই ভালো ছিলেন। শুধু শুধু সরকারি চাকরিটি হারালেন। এই ইলেকশনে তিনি হারিয়েছিলেন বানিয়াসিটের জমিটি, জিতাশ্বরি বাইদের জমিটি, কয়েকশ মন আমন ধান ও মাস কালাইর ডাইল।

ইলেকশনের পরদিন আমি সকাল ৯টার দিকে ছোট কাক্কুর বাড়ীতে গেলাম। মিয়া কাক্কু বিছানা থেকে ওঠেননি। ছোট কাক্কু উঠানে রান্না ঘরের দিকে মুখ করে মাথায় আলখেল্লা রেখে রোদ পোহাচ্ছিলেন। সাথে কেউ নেই। বিড়ি ও ডাইল খেকোরা কেউ নেই। শিশু কিশোর ও মহিলারা টেলিভিশন দেখার চেষ্টা করছে। ছোট কাক্কুর যে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়ে গেছে টেলিভিশন দর্শনার্থীদের বুঝার কথা না। আমি কাক্কুর কাছে গিয়ে শান্তনা দেয়ার চেষ্টা করলাম “কাক্কু, আপনি মন খারাপ করুন না যে, সব ঠিক হয়ে যাবে।” কাক্কু বললেন “আমরাই জিতেছি। আমি মন খারাপ করি নাই। আমাগো নাতী সামসু চেয়ারম্যান হওয়া মানে আমরাই চেয়ারম্যান হওয়া। আমি আমাদের গ্রামের জন্য যা করতে চেয়েছিলাম সামসুকে বললে তা করবে। তাই, বলি, আমরাই জিতেছি।” এদিকে টেলিভিশনে সিগনাল আসছিল না। কায়সার শত চেষ্টা করে এন্টিনা ঘুরিয়েও সিগনাল আনতে পারলো না। আমি বললাম “পিছনের জ্যাকটা চেক করো। জ্যাক লুজ হয়ে যেতে পারে।” কায়সার একবার জ্যাক লাগায়, একবার খুলে। টেলিভিশনে ছেৎ  ছেৎ  শব্দ করে। ঝিরঝির করে। ছবি আসে না। ছোট কাক্কু বিরক্ত হয়ে বললেন “থো রে। বাদ দে তরা টেলিভিশন দেখা। তোর মামুর টেলিভিশন, আর আমার ইলেকশন, একই রকম।” আমি হাসি চেপে রাখতে না পেরে বাব্বুর কাঠাল গাছের পিছনে গিয়ে দাড়ালাম। গাছে কটা (কাঠ বিড়ালী) লাফালাফি করছিল। দেখতে ভালোই লাগছিল। কিছুক্ষণ একা একা হেসে নিলাম কাঠাল কাছটার পিছনে দাঁড়িয়ে ।

আমি চলে এলাম ময়মনসিংহ। এদিকে ছোট কাক্কু চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েন। যোগ দেন শিক্ষকতায়। তিনি নিজগ্রাম জিতেশ্বরী পাড়ায় প্রতিষ্ঠিত রশিদিয়া দাখিল মাদ্রাসায় আজীবন শিক্ষকতা করেন। ১৯৮৩ সনের সেই ইলেকশন থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৬ টি বছর কেটে গেছে। কতরকম ইলেকশন আসে যায়। ইলেকশন আসলে কাক্কুর ইলেকশনের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে কাক্কুর কালজয়ী উক্তি “থোরে, তর মামুর টেলিভিশন, আর আমার ইলেকশন, একই রকম।” সেই সামসুল হক পান্না মামা এরপর ৪ বার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ১৯৮৩, ১৯৮৮, ১৯৯৫ ও ২০১১ সনের নির্বাচনে। ২ বার ফেল করলেও সেকেন্ড হন। কোন রকম পোষ্টার, লিফলেট ও মিছিল ছাড়াই। যে সময় তিনি চেয়ারম্যান থাকতেন না সেসময় তিনি ময়মনসিংহে মাঝে মাঝে রোগী নিয়ে আসতেন আমার চেম্বারে। না আসতে পারলে চিঠি লিখে রোগী পাঠাতেন আমার কাছে। এলাকায় হেলথ ক্যাম্প করে রোগী সেবা করতেন। শুনেছি তার এলাকায় বেপক উন্নয়ন করেছেন। ওদিকে আমার তেমন যাওয়া হয় না। তিনি আমাদের গ্রামের মাদ্রাসা, ব্রিজ ও কালভার্ট করে দিয়েছেন সরকারি অনুদানে।

সামসু চেয়ারম্যান মামা বেশ সাহসী মানুষ। তিনি একবার রাত ১২ টার পর আমাদের ময়মনসিংহের বাসায় এলেন। সাথে ছিল তার মোটর বাইক চালক। তিনি এসেছিলেন আমার কাছে পরামর্শ নিতে গড়বাড়িতে একটা হেলথ ক্যাম্প করার ব্যাপারে। রাত একটার সময় চলে যেতে চাইলে আমি বাসায় থাকতে বললাম। তিনি রাজী হলেন না। আমি বললাম “এতো রাতে রাস্তায় বেরোনো রিস্ক আছে। আমার জানামতে আপনার অনেক শত্রু আছে।” তিনি বললেন “আমি এখন ময়মনসিংহ থেকে ইন্দ্রজানী যাবো। এমন কোন বাপের ব্যাটা নাই যে আমার সামনে খারাবে।” মামা চলেই গেলেন।

আরেকদিন মামাকে চোখ অপারেশন করানোর জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পেইং বেড ওয়ার্ডে ভর্তি করালাম। কোন কিছু লাগলে বা কোন কিছুর অসুবিধা হলে সিস্টারকে জানানোর জন্য বলে দিলাম। তিনি এক কান্ড করে বসলেন। তার বেডে  উপরের ফ্যানটা ধীরে ধীরে ঘুরতো। তিনি সিস্টারের রুমে গিয়ে বললেন “সিস্টার, আমার বেডের ফ্যানটা এখনি ঠিক করে দেন।” সিস্টার কর্ণপাত না করায় তিনি বললেন “সিস্টার, আমার  ফ্যানটা খুলে এনে আপনার রুমে লাগান। আর আপনারটা খুলে এনে আমার বেডের উপর লাগান।” সিস্টার কর্নপাত না করাতে তিনি ক্ষেপে গিয়ে বলেন “যদি না পারেন, তবে যে পারেন তাকে পাঠান আমার কাছে।” সিস্টার নার্সদের সেক্রেটারিকে ডেকে আনেন বিচার দিতে। সেক্রেটারি এসে বললেন “কি হয়েছে? আপনি আমাদের সিস্টারকে কি বলেছেন?” মামা বললেন

-আপনি কে?
– আমি নার্সেস এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি।
– ভালোই হলো। সেক্রেটারি সাহেব, দয়া করে আমার ফ্যানটি খুলে নিয়ে আপনার নার্সের রুমে লাগান আর নার্সেরটা আমার উপর লাগান।
– আপনি কে?
– আমি রোগী।
– আপনার পরিচয়?
– পরিচয় পরে হবে। আগে ফ্যান লাগান। গরমে আমার মাথা গরম এখন।

নার্সারা কথা না বাড়িয়ে ইলেক্ট্রিশিয়ান ডেকে ফ্যান বদলিয়ে দিলেন। কেউ আর মামার পরিচয় জানার সাহস পেলো না।
আমাদের তালুকদার বাড়ীর অনেকেই এখন শহরে থাকি। নাড়ির টানে বাড়ী যেতে হয়। আমাদের অনেকেরই প্রাইভেট কার আছে। আমাদের গ্রামের রাস্তাঘাট একদম খারাপ। তাই কার নিয়ে যাওয়া খুবই বিপদের। কাক্কুর ইলেকশনের পর আর কেউ আমাদের গ্রাম থেকে ইলেকশন করেনি। আমাদের একজন চেয়ারম্যান থাকলে হয়তো এতো দুর্গতি হতো না। ছোট চওনার হাজী বাড়ীর রফিক ঘন ঘন রোগী নিয়ে আমার চেম্বারে আসতো। আমি বুঝতে পারলাম এটাও নেতা হওয়ার চেষ্টায় আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম
– হাজী বাড়ীর সমসের হাজী ১৫ বছর চেয়ারম্যানি করেছিলেন। তার ছেলে শওকত ডাক্তারও ৫ বছর চেয়ারম্যান ছিলেন। এখন ঐ বাড়ীর নেতা কে?
– ধরতে পারেন, আমিই। আমিই কিছু কিছু জনসেবা করে থাকি।
– খুব ভালো। চেয়ারম্যান হয়ে আমাদের গ্রামের রাস্তাঘাট গুলা পাকা করবা।

খোদার কি কাম। সেই হবু চেয়ারম্যান স্ট্রোক করে প্যারালাইসিস হয়ে গেছে। হুস জ্ঞান তেমন নাই। তালুকদার বাড়ীতে এই লাইনে আর কেউ আসেনি। চাচাতো ভাইয়ের এক ছেলে বিরোধী দল করে বার বার জেলে যাচ্ছে। আরেক চাচাতো ভাইয়ের ছেলে মামুন তালুকদার এখন রাজধানীতে থেকে পড়াশুনা করে ছাত্রনেতা হয়েছে সরকারি দলের। বড় বড় নেতাদের সাথে ঘুরাফিরা করছে। ভবিষ্যৎ ভালো বলে মনে হচ্ছে। দোয়া করি চেয়ারম্যান না, এম পি মন্ত্রী যেনো হয়। বাড়ীতে যেনো ভালো ভাবে যেতে পারি। ছোট কাক্কুর ইচ্ছা পুরন হউক।

১৮/১/২০১৯ খ্রি.
ময়মনসিংহ -ঢাকা -ময়মনসিংহ জার্নি

(এ আই নির্মিত কাল্পনিক ছবি । সহায়তায়ঃ chatGPT)

indrajani

Indrajani

ইন্দ্রজানী
(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ইন্দ্রজানীকে আমরা ইন্দাজানী বলতাম। ইন্দাজানীতে তেমন কিছুই ছিল না। ইন্দাজানীর হাট ছাড়া এটার তেমন গুরুত্ব ছিল না। ছিল না কোন হাই স্কুল, ছিল না কোন গোলাঘর (দোকানঘর)। এখানে বর্ষাকালে অস্থায়ী হাট বসতো প্রতি মঙ্গলবারে। এটা বসতো পাহাড় ও ভরের সংযোগস্থলে। পাহাড়ের পর নিচু সমতলভুমিকে আমরা ভর অঞ্চল বলতাম। ভরের বড় বড় মহাজন বড় বড় নৌকা নিয়ে আসতেন দামী দামী মালামাল নিয়ে। ক্রেতারা আসতেন ছোট ছোট নৌকা নিয়ে সদাই করতে (কেনাকাটা করতে)। পাহাড়ের ব্যবসায়ীরা মাল নিয়ে যেতেন গুরুর গাড়ী করে। পাহাড়ের বাইদে (নিচু ভুমি) প্রচুর পাট চাষ হতো। পাহাড় থেকে রফতানি হতো পাট, কাঠাল, সবজি, লাকড়ি ইত্যাদি। ভৌরা ব্যবসায়ীরা নিয়ে আসতেন সিলভারের পাক পাতিল, নারিকেল, ইলিশ, কাপড়-চোপড় ও অন্যান্য শহর থেকে আনা দামী দামী জিনিষপত্র। নারায়ণগঞ্জ-এর ব্যবসায়ীরা নদী পথে এসে এখান থেকে পাট ও কাঠ নিয়ে যেতেন। ভর অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা বরিশাল অঞ্চল থেকে নারিকেল নিয়ে এসে এই হাটে বিক্রি করতেন। এলেংগার পাইত্তাগণ(পাটির কারিগর) তাদের হাতে বুনুনো পাটি এখানে এনে বিক্রি করতেন। বল্লার ও কালিহাতির তাতী, কুমার ও কামারগণ তাদের হাতের তৈরি কাপড়, মাটির পাতিল ও দা, বটি, কোদাল, খোন্তা এখানে এনে বিক্রি করতেন। ভুয়াপুর ও গোপালপুর থেকে আসতো আখ বা কুশাইর । বর্ষাকাল ছাড়া আমরা ইলিশমাছ পেতাম না। বাবা পাট বিক্রি করে ইয়া বড় বড় ইলিশ মাছ কিনে আনতেন ইন্দাজানী হাট থেকে। আস্ত ইলিশ ও নোনা ইলিশ দুই প্রকারই আনতেন। মা আস্ত ইলিশ  বড় বড় ডাটা দিয়ে রান্না করতেন। নোনা ইলিশ বড় বড় কাচের বৈয়ামে সংরক্ষণ করে রাখতেন। পরে শিবচরন (চিচিংগা) দিয়ে ভাজি করতেন। বাবা আমাদের জন্য মোটা মোটা কুশাইর আনতেন। কুশাইরের দুইদিকে ইলিশ ও সদাই ঝুলিয়ে কাঁধে নিয়ে আসতেন। পদ্মপাতার টোবলায় (পেঁচানো প্যাকেট) টসটসে পেঁচানো জিলাপা (জিলাপি) এনে আমাদের হাতে দিতেন। আমরা সবাই ভাগ করে খেতাম। ইন্দাজানী হাটের জিলাপির স্বাদ আমি আর কোন জিলাপি খেয়ে পাই নি। মা-বাবাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করতাম। কিন্তু খেতেন না। আমি মনে করতাম মা-বাবারও জিলাপি খেতে মন চায়। কিন্তু বড় হয়ে যাওয়াতে খেতে লজ্জা পান। আমি বাবা হবার পর বুঝেছি তা হয়তো হতো না। আমাদের খাওয়াইয়া তারা জিলাপির স্বাদ পেতেন। সবাইকে বেশী দিয়ে আমি কম খেতাম।

কোথাও পাকা রাস্তা ছিল না। সস্তায় নৌকা যোগাযোগের ফলে এখানে প্রতি মঙ্গলবার পাহাড় ও ভরের মানুষদের একটা মিলন মেলা হতো। ভৌরাগণ হাটুরা নৌকায় ইন্দাজানী নেমে পায়ে হেটে পাহাড়ে তাদের আত্বীয়বাড়ী যেতেন। আর পাহাইড়াগণ পায়ে হেটে ইন্দাজানী হাটে গিয়ে হাটুরেদের সাথে নৌকাযোগে তাদের ভরের আত্বীয়স্বজনের বাড়ী যেতেন। সাথে নিয়ে যেতেন স্ব স্ব অঞ্চলের উৎপাদিত বিশেষ বিশেষ স্বস্য ও ইন্দাজানী হাটের জিলাপি। পদ্মপাতার প্যাকেট পেঁচানো হতো ছেতুকা দিয়ে (কলাগাছের খোলের আঁশ)।

এই যে এত স্বাদের জিলাপা ও এত দামী দামী জিনিস যে হাট থেকে আনা হয় একদিন সেই হাটে যাওয়ার বায়না ধরলাম বাবার কাছে। একটা কথা বলে রাখি। আমরা ভাইবোনরা ৫ জন। কখনো আমরা বাবাকে বলিনি যে “বাবা আমার জন্য এটা আনবেন সেটা আনবেন।” বলতে হতো না। না বলতেই তিনি তার স্বাধ্যমত জামাকাপড় ও খাওয়ার জিনিস কিনে আনতেন। বুর (বুবু/আপার) যখন বিয়ে হয় তখন আমি খুব ছোট ছিলাম। আমার নাতী তানভীরের সমান হয়তো ৪/৫ বছর। দুলাভাইর চেহারা ছিল আমাদের এলাকার সব দুলাভাইর চেয়ে সুন্দর। লিক লিকে লম্বা। সব সময় সাদা ফিট ফাট শার্ট পরতেন। দুলাভাইর বাড়ী ভর এলাকায় আমজানী গ্রামে। এই দুলাভাইও ইন্দাজানী হাট হয়ে আমাদের বাড়ী আসতেন আমাদের জন্য জিলাপা ও রসগজা নিয়ে। রস গজাও আমার খুব পছন্দের ছিল। দুলাভাই আসলেই মার নির্দেশে আমাদের পোষা সুন্দর মোরগটি তিন চাইর বাড়ী দৌড়িয়ে হয়রান করিয়ে যখন খেরের (খর) পালার গোড়ায় আশ্রয় নিত তখন ধরে ফেলতাম। আর ওটা উচ্চ স্বরে কঅক কঅঅক করতো তখন মনে মনে বলতাম ”কক কক করিস না, দুলাভাই এসেসে, তারজন্য এতদিন অপেক্ষা করছিলাম, আইজ তরে রান্না করে খামু। সারাবাড়ী বাসনা ( ঘ্রাণ) করবে।”

একবার বাবার সাথে ইন্দাজানী হাট দেখতে গেলাম। বড়বাইদপাড়া নাপিতের চালা, জিতাশ্বরি পাড়া, ছোট চওনা, ঘাট চওনা, ভুয়াইদ ও ভাতগড়া হয়ে যেতে হতো ইন্দাজানীর হাটে। আমাদের বড়বাইদ পাড়া থেকে ইন্দাজানী উত্তর -পশ্চিম দিকে, এই ৫/৬ কিলোমিটার পথ হবে। পায়ে হেটে যেতে হতো। ছোট চওনার পাহাড়ের পাদদেশে কয়েকটা ছোট ছোট ঝর্না ছিল। স্বচ্ছ পানি প্রবাহিত হতো। ওটা দেখলেই আমার পিপাসা হতো। আমি অঞ্জলি ভরে ঝর্নার পানি পান করতাম। ঝর্নার সাথেই ছিল চোরাবালি। একবার পাড়া দিলে কাঁধ পর্যন্ত ঢুকে আটকা পরতো যে কেউ। এক রাতে কয়েকজন আর্মি আসামী ধরে এই চোরাবালির নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। আসামীরা এই এলাকার হওয়াতে সব জানতেন। এখানে এসেই সব আসামী একযোগে গোলমাল করে চোরাবালি ঘুরে দৌড়িয়ে তেলধারার (তৈল ধারা) বনে পালিয়ে যান। আর্মিরা মসৃন বালি মনে করে সোজা চোরা বালির উপর দিয়ে দৌড় দেন আসামী ধরার জন্য। ফলে তিনজন আর্মি চোরাবালিতে আটকা পড়ে। বাকীরা তাদেরকে উদ্ধার করতে করতেই কর্ম শেষ।

যা বলছিলাম। ইন্দাজানীর রাস্তা একেক যায়গায় একেক রকম ছিল। জংগলের ভিতরকার রাস্তা কর্দমাক্ত ও পিচ্ছিল ছিল। বাইরের রাস্তা শুকনো হলেও বাইটাবাছ্রায় ভরা ছিল। সপ্তাহে মাত্র একদিন লোক যাতায়াত করাতে বাইটা বাছ্রার পরিমান বেড়ে যেতো। বাইটাবাছ্রার নাম যে প্রেমকাটা এটা আমার স্ত্রী স্বপ্নার কাছে শুনেছি। প্রথম যেদিন এসেছিল আমাদের বাড়ী সে শাড়ী থেকে বাইটা বাছ্রা বাছতে বাছতে বলছিল “তোমাদের পাহাড়ের রাস্তা প্রেম কাটায় ভর্তি। শাড়ী ভর্তি প্রেমকাটা। এগুলি বাছতে বাছতেই আমার ঘন্টা কেটে গেলো। ”
– প্রেমকাটা মানে?
– এইযে এইগুলি।
– এইগুলি তো বাইটাবাছ্রা।
– আমরা এগুলিকে প্রেমকাটা বলি।

যেসব মাঠ শুকনো এবং আবাদ করা হয়না সেগুলিতে এক প্রকার ঘাষ গজিয়ে মাঠ সবুজে ভরে যায়। এগুলিতে হাল্কা কাটাযুক্ত দানা হয়। পাড়িয়ে যাওয়ার সময় হাটুর নিচের কাপড়ে আটকে যায় এই কাটা। জার্নি শেষে এই কাটা বাছতে হয়। না বাছলে পায়ে কুটকুটি কামড়ায়। ছোট বেলা বাছ্রা ক্ষেতে শুয়ে থাকতে আমার ভাল লাগতো। বাচ্ছ্রা ক্ষেতের উপর দিয়ে ঢালুর দিকে গড়িয়ে পড়তে বেশ মজা পেতাম। স্কুল মাঠ থেকে আমরা দল বেঁধে মাঝে মাঝে বাইটাবাছ্রা তুলে পরিস্কার করতাম।

প্রথম ইন্দাজানীর হাটে গিয়ে একটু বেশী ভালোলেগেছিল এই কারনে যে এটা বড় চওনা ও কচুয়ার হাট থেকে বেশী জমজমাট ছিল। বাবা প্রথমেই আমাকে একটি রসগোল্লার দোকানে নিয়ে গিয়ে একটি টুলে বসিয়ে দোকানিকে বললেন আমাকে পেট ভরে রসগোল্লা খাওয়াতে। আমি ভাবলাম আজ পেট ভরে ১০/১২ টা রসগোল্লা খাব। দুইটি খাবার পরই পেটের তলার দিকে মোচড় দিয়ে উঠলো। বললাম “আর খেতে পারব না।” তারপর বাবার সাথে পরামর্শ করে একটা কাজ সেরে নিয়ে হাল্কা হলাম। বাবা আমাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ইন্দাজানী হাট দেখালেন। অনেক দোকান কিন্তু কোন গোলাঘর নেই। সব দোকানই অস্থায়ী। তাবু গেড়ে গেড়ে দোকানের স্থান করা হয়েছে। পশ্চিম-দক্ষিন দিকে ভর অঞ্চল থেকে আশা নৌকাগুলি সারিবদ্ধভাবে বাঁধা লগি গেড়ে অথবা নোংগর ফেলে। উত্তর -পুর্ব দিকে পাহাড় অঞ্চল থেকে গরুর গাড়ি, গাড়ীর বলদ, মহিষ ও ঘোড়া বেঁধে রাখা হয়েছে। তারা কেউ কেউ জাবর কাটছে, কেউ কেউ ভুষি ও কুড়া খাচ্ছে। হারমোনিয়ামের সুরে মুগ্ধ হয়ে গোলাকার সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো মানুষের কাতারে দাঁড়ালাম। মনমুগ্ধকর গান শুনলাম। গান শেষে ক্যানভাচার বনাজি ঔষধ বিক্রি করা শুরু করল। আমরা চলে গেলাম হাটের ভিতর। আবার ঘুরে ঘুরে বাকী হাটটুকু দেখলাম। বাবা ফ্রিভাবে কেনাকাটা করার জন্য বাবার পরিচিত একটা দোকানে আমাকে বসিয়ে চলে গেলেন হাটের ভিতর। এটা ছিল জামা কাপড়ের দোকান। দোকানে ঝুলানো শার্টের দিকে আমার চোখ পড়লো। ইতিপূর্বে আমি কোনদিন নিজে দেখে পছন্দ করে জামাকাপড় কিনি নি। বাবা যা কিনে আনতেন তাই পরেছি। তাই পছন্দ হয়েছে। এইবার সুযোগ এসেছে পছন্দ করে কেনার। স্থির করলাম এই আকাশী রঙের শার্টটা আমি কিনবো। বাবা বেগভর্তি বাজার কিনে এসে বললেন “চলো বাজান।” আমি কোন সাড়া দিলাম না। কয়েকবার ডাকলেন। সাড়া দিলাম না। হাতে ধরে টানলেন। মোরচামুর্চি করলাম। কিছু বললাম না। বাবা বললেন “বাজান, কি হয়েছে?” আমি আকাশী রঙের শার্টটি দেখিয়ে বললাম “এটা নিব।” এটা ভালো শার্ট না বাবা আমাকে বুঝানোর চেষ্টা করছিলেন। যতই চেষ্টা করছিনেন ততই নেয়ার জন্য আমার ইচ্ছাশক্তি বাড়ছিল। বর্গা হাট থেকে এর চেয়েও ভালো শার্ট কিনে দিবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দিলেন। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল। এক সময় তিনি আমাকে একটু বস বলে চলে গিয়ে কিছুক্ষণ পরেই ফিরে এলেন। আমি নতুন শার্ট গায়ে দিয়ে পুরাতন শার্ট বেগে ভরে ইন্দাজানী হাট থেকে ফিরলাম। বাবা কেন কিছুক্ষণের জন্য কোথাও গেলেন তা বড় হয়ে আমি বুঝতে পেরেছি। সেই থেকে এই পর্যন্ত যতবার এই কথা মনে করি ততবার আমি কষ্ট পাই এই মনে করে যে না বুঝতে পেরে আমি বাবাকে শার্ট কেনার জন্য কষ্ট দিয়েছি। বাজার করার আগে আমি শার্ট কেনার আবদার করলে সাথে সাথেই তিনি শার্ট কিনে দিতেন। এর চেয়েও বড় কষ্ট আমি বাবাকে দিয়েছি কি না আমার মনে নেই।

এরপর আমি অনেকবার ইন্দাজানি হাটে গিয়েছি। হাট থেকে ফেরার সময় প্রথমেই একটা খাল পাড় হতে হতো গুদারা (খেয়া) দিয়ে। আমি, বাবা ও আমার সুন্দর দুলাভাই ছিলাম গুদারায়। ছোট চওনার সমশের হাজী সাবও ছিলেন সেই গুদারায়। তিনি খুব প্রভাবশালী লোক ছিলেন। তিনি কয়েকবার ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান বা পঞ্চায়েত ছিলেন। তার মেঝো ছেলে শওকত আলী দাদা নাম করা পল্লী ডাক্তার ছিলেন। ময়মনসিংহ লিটন মেডিকেল স্কুল থেকে তিনি এল এম এফ না পাশ করেই চলে গিয়ে এলাকায় ডাক্তারি করেন। ভালো প্রাক্টিস ছিল। তার বড় ভাই হামি (আ: হামিদ) দাদা আলাদা পাকে খেতেন একই বাড়িতে। যাহোক, গুদারা থামিয়ে শওকত ডাক্তার সাব গুদারায় উঠলেন। হাতে বিড়াট একটা ইলিশ মাছ। সমশের হাজী সাব বললেন
– এই মাছটা কত টাকা?
– ‘এত’ টাকা।
– কয়টা মাছ কিনছস?
– একটা।
– কার জন্য?
– আমাদের জন্য।
– হামির জন্য কিনস নাই?
– না।
– ক্যান?
– ভুল হয়ে গেছে।

এরপর হাজী সাব মাছটি নিয়ে গুদারা থেকে ছুড়ে মারলেন প্রবাহমাণ খালের পানিতে। রাগান্নিত হয়ে ছেলের দিকে তাকালেন। উপস্থিত যাত্রীরা হাজী সাবকে বুঝিয়ে শান্ত করলেন।

গুদারা থেকে নেমে চলার পথে বাবার কাছ থেকে এই ঘটনার মাহাত্ব বুঝতে পারলাম। হাজী সাহেব ডাক্তার ছেলের সাথে এক পাকে খেতেন। বড় ছেলে হামিকে রেখে কি করে তিনি ইলিশ মাছটি খাবেন!

আমরা চলতে লাগলাম ভাতগড়ার পিচ্ছিল পথ দিয়ে। সামনে বাবা, মাঝে দুলাভাই, পিছে আমি। বাবা বার বার সতর্ক করে দিচ্ছিলেন যাতে পিছলা না পড়ি। দুলাভাইর গায়ে দবদবে পরিষ্কার সাদা শার্ট ছিল। পরনে টুইস লুঙ্গী। খুব ভালো লাগছিলো আমার। আগামীকাল পালা মোরগটা জবাই হবে। হটাৎ দেখলাম দুলাভাই নাচের ভঙ্গী করে দড়াম করে পিছলা খেয়ে রাস্তায় পাতালি হয়ে পড়ে গেলেন। কাদায় শরীর লেটাপেটা। আমি হাততালি দিয়ে হাসতে লাগলাম। এটা আমাদের এলাকার নিয়ম। কেউ পিছলা খেয়ে পরে গেলে আমরা তাকে উদ্ধার না করে হাততালি দিয়ে হাসতে থাকি। আমার হাসি আর থামে না। বাবা দুলাভাইকে ধরে উঠালেন। আমাকে হাসতে বারন করলেন। আবার হাটা শুরু হলো। থেকে থেকেই আমি হেসে উঠছি। আমার হাসির শব্ধ শুনে বাবারও হাসি পেলো। তিনি মেয়েজামাইর কান্ড নিয়ে হাসতে পারেন না। তাই হাসি চেপে রাখলেন। এক সময় ফেকৎ করে হেসে দিয়ে আমাকে ধমক দিলেন “এই গাবর, হাসিস না।” গাবর কথার অর্থটা আমার জানা নেই। তবে বাবা যখন আদরের সাথে আমাকে ধমক দিতেন তখন বলতেন “গাবর!”

আশির দশকের দিকে গারোবাজার-সখিপুর-হাটুভাংগা-মীর্জাপুর পাকা রাস্তা হওয়ার পর ইন্দাজানীর হাটের কদর কমে যায় আমাদের পাহাড়িয়াদের কাছে। আমিও লেখাপড়া ও চাকুরীরর জন্য সেই থেকে দূরে আছি। ঐ দিকে আর যাওয়া হয় না। ইন্দাজানীর সামসুল হক পান্না মামা চার বার আমাদের কাকরাজান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হয়েছেন। ঐ দিকে নাকি অনেক উন্নতি হয়েছে। ইউনিয়ন অফিস কাকরাজান থেকে ইন্দাজানীর কাছে গড়বাড়ী এনেছেন। ঐ এলাকার অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু আমার গ্রামের বড়বাইদপাড়া সেই আগের মতো পিচ্ছিলই রয়ে গেছে। জনপ্রতিনিধিগনকে দাওয়াত দিলে পিছলা খাওয়ার ভয়ে  আমাদের পাড়ায় আসেন না। কিন্তু আমাদেরকে পিছলা খেতেই যেতে হয়। কারন, ওখানেই আমি জন্মেছি, ওখানেই আমার নাড়ী মাটি চাপা দিয়ে রেখেছেন, ওখানেই আমার বাবা-মা আপনজন শায়িত। ওখানেই আপনজনরা থাকেন। আমাকেও ওখানেই শায়িত হতে হবে। আজ লিখে রাখলাম আমার স্মৃতিবিজড়িত ইন্দাজানীর কিছু স্মৃতি আমার স্মৃতির পাতায়। আপনাদের ইন্দ্রজানী।
তারিখ: ২৫/১১/২০১৮ ইং
স্থান : ময়মনসিংহ -কিশোরগঞ্জ জার্নি।

(লেখাটি আমার বর্নিল অতীত বইয়ে প্রকাশিত হয়েছে)

ek-takar-gan

Ek Takar Gan

এক টাকার জ্ঞান

(স্মৃতিচারণ)

ডাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

আনুমানিক ২০০০ সালের ঘটনা । একটু ব্যাংকে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ল। বায়োকেমিস্ট ফারুক সাহেবকে সাথে নিলাম। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে বের হয়ে ক্যাম্পাসে অবস্থিত অগ্রণী ব্যাংকে প্রবেশ করছিলালাম । কলেজের ক্যাসিয়ার ওয়াহেদুজ্জামান সাব ব্যাংক থেকে বের হচ্ছিলেন  । আমাকে সালাম দিয়ে হ্যান্ডসেক করার ছলে ঘুষ দেয়ার মত করে আমার ডান হাতে টাকা গুঁজে দিলেন । আমি অপ্রস্তুত হয়ে কিংকর্তব্যবিমুর বনে গেলাম । বললাম “এটা কি করছেন ?” সে এক চোখ ছোট করে বলল “রেখে দেন, স্যার ।“ সিন ক্রিয়েট যাতে না হয় তার জন্য টাকাটা পেন্টের ডান পকেটে রেখে দিলাম । কেউ দেখলো না। আমার শরীর ঘেমে গেল। ম্যানেজারের রুমে প্রবেশ করলাম । ম্যানেজার রুমে একা ছিলেন । আমি ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করলাম “আপনাকে কি কখনো কেউ ঘুষ সেঁধেছে ?” ম্যানেজার বললেন “গতকালই তো এক লোক আমাকে ঘুষ সেঁধেছিল ।“ ম্যানেজার আমার চোখের দিকে আঙ্গুল তাক করে অভিনয় করে বলতে লাগলেন “আমি তাকে বললাম, বেরিয়ে যান, বেরিয়ে যান আমার রুম থেকে ।“ এমন ভাবে অভিনয় করছিলেন যেন তিনি আমাকেই বেরিয়ে যেতে বলছেন । এমন সময় ম্যানেজারের রুমে একজন প্রফেসর প্রবেশ করলেন । ম্যানেজার তাকে সালাম দিয়ে বসালেন এবং তার সাথে কথা বলা শুরু করলেন । আমার মনে হল প্রফেসর মনে করতে পারেন ম্যানেজার আমাকে বের করে দিচ্ছিলেন । ভুলটা ভাংবার জন্য আমি ম্যানেজারকে প্রশ্ন করলাম
– ভাই, আপনি লোকটিকে বের হতে বললেন। তারপর কি হল?
– লোকটি মাথা নিচু করে চলে গেল। ঘুষ দেয়াও খারাপ কাজ আর নেওয়াও খারাপ কাজ।

আমি আর বায়োকেমিস্ট একসাথে ব্যাংক থেকে বের হলাম । পকেট থেকে বের করে দেখি মাত্র এক টাকা । বায়োকেমিস্টকে প্রশ্ন করলাম “ক্যাসিয়ার আমাকে সালাম দেয়ার পর এভাবে এক টাকা হাতে গুজে দিলেন কেন ?” তিনি বললেন “কোন কোন এলাকার প্রথা আছে সকাল বেলা সম্মানিত ব্যাক্তিকে সালামি দিলে সারাদিন ভাল কাটে । আপনাকে হয়তো সালামি দিয়েছেন ।“ আমি বললাম “আমাদের এলাকায়ও এমন প্রথা আগে ছিল । গত নির্বাচনের আগে যখন করটিয়ার জমিদার  পন্নি সাহেব এলাকায় ভোট চাইতে এলেন তখন এলাকার জনগণ তাকে টাকা দিয়েছেন সালামি হিসাবে। বৃটিশ আমলে করটিয়ার জমিদার পন্নি সাহেবেরা আমাদের এলাকায় আসতেন । তখন প্রথা ছিল জমিদারকে সালামি দেয়া। দশ বিশ টাকা যার যেমন সামর্থ ছিলে তাদের হাতে দিয়ে ধন্য হতেন। তাদের এখন আমাদের এলাকায় আসার প্রয়োজন পড়ে না। শুধু ভোটের জন্য এসেছিলেন একবার। পাবলিককে বিড়ি, সিগারেট, টাকা পয়সা বিলাতে হয় নি। উলটা পাবলিকই তাকে টাকা পয়সা দিয়ে দিয়েছে। তবুও তিনি ভোট পেয়ে এম পি হয়েছিলেন।“ পথে দেখা হল এলাকার এক ছোট খাটো নেতার সাথে । ক্যাসিয়ারের নাম না প্রকাশ করে ঘটনাটা বর্ণনা দিয়ে তাকে জিগালাম “আপনাদের এলাকায় কি এমন প্রথা আছে ?” তিনি বললেন “যিনি করেছেন তিনি হয়তো একজন দান্দাল, বাটপার । এক টাকার বিনিময়ে একদিন হয়ত আপনার ল্যাব থেকে একশ টাকার টেস্ট ফ্রী করায়ে নিবেন ।“ কলেজ লাউঞ্জে আবার দেখা হল ক্যাসিয়ারের সাথে । আমি জিগালাম “আপনি এভাবে আমার হাতে এক টাকা গুঁজে দিলেন কেন ?” তিনি বললেন “স্যার, এক সপ্তাহ আগে আমার এক টাকা রিক্সা ভাড়া কম পরেছিল । আপনি এক টাকা দিয়েছিলেন । সেই টাকা আমি ফেরৎ দিলাম ।“ আমি বললাম “মাথা খারাপ, এক টাকা আমাকে ফেরৎ দিতে হবে ? আমিত এই টাকার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম ।“ তিনি বললেন “হোক, একটাকা। আমি তো ওটা ধার নিয়েছিলাম। ঋণি থাকতে নেই।”

এক টাকা ধার দিয়ে ভালোই জ্ঞান অর্জন করলাম ।
২১/৪/২০১৮ খ্রি.

Chuler-Mullo

চুলের মুল্য

(মানুষের গল্প)

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

লোকটার সাথে দেখা হলো শুক্রবার। জুম্মা নামাজের পর বাসায় ফিরছিলাম। ময়মনসিংহ সিটির মাসকান্দার নতুন বাজারের উত্তর পাশেই ব্রম্মপুত্র আবাসিক এলাকায় আমার বাসা। এই মহল্লায়ই সে আমার সামনে পড়লো। বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর। গায়ে হাফ হাতা শার্ট ও পরনে লুঙ্গি। বাম হাতে একটা বাজারের ব্যাগ। ডান হাতে একটা লাউড স্পিকার। স্পিকার উপরের দিকে ধরে কি যেন বলছে বুঝতে পারছিলাম না। আমি বললাম

– এই, আপনি কি বলছেন?

– আমি পুরাতন নষ্ট মোবাইল সেট এবং চুল কিনি।

– আপনি জুম্মার নামাজের সময় আবাসিক এলাকায় আসেন কেন? সব বেটা মানুষ মসজিদে চলে গেছে, আর আপনি আবাসিক এলাকায় ঘুরাঘুরি করছেন? এই সময় মহল্লায় মাঝে মাঝে চুরি হয়। আপনাকেও সন্দেহ করতে পারে।

– স্যার, চুরি যারা করে তারা হাতে লাউড স্পিকার নিয়ে আসে না। চুপি চুপি চুরি করে চলে যায়। আমার কাছে আইডি কার্ডও আছে।

– আপনাকে আইডি কার্ড কে দিয়েছে?

– আমাদের ময়মনসিংহে হকার সমিতি আছে শম্ভু গঞ্জে নদীর ওপারে অফিস। সেখান থেকে আইডি কার্ড নিয়েছি। দেখতে পারেন।

– না, দেখার দরকার নেই। আমি বিশ্বাস করি আপনি হকার। তা, আপনি কি কি কেনেন?

– আমি দুইটা জিনিস কিনি, একটা হলো পুরাতন মোবাইল ফোন, আরেকটা হলো মেয়েদের চুল।

– মোবাইল কত টাকা করে কেনেন?

– বাটন মোবাইল একদাম ৬০ টাকা। টাচ মোবাইল অবস্থা বুঝে।

– এত কম দাম? চুল পান কোথায়?

– মেয়েরা রেখে দেয়।

– মেয়েরা চুল কেটে কেটে রেখে দেয়?

– না, কাটা চুল বিক্রি হয় না। হলে তো বস্তায় বস্তায় কিনতে পারতাম। মেয়েরা চুল আচরানোর সময় কিছু কিছু চুল চিরুনির সাথে উঠে আসে। সেগুলো দলা পাকিয়ে রেখে দেয় আমাদের জন্য। আমরা মাঝে মাঝে এসে নিচ থেকে লাউড স্পিকারে ডেকে ডেকে কিনে নেই।

কোন কোন অসুখের সময় ডাক্তার যখন বলে দেয় ঔষধের জন্য তার লম্বা চুল ঝরে পড়বে। তখন একজনের কাছ থেকেই অনেক চুল পাওয়া যায়। কোন কোন ফ্যামিলিতে চার/পাচ জন মেয়ের চুল একাত্র করে রেখে দেয়। তখন অনেক চুল পাওয়া যায়।

– চুলের দাম কেমন?

– আমরা ১০ হাজার টাকা কেজি দামে কিনি। বেচি ১২ হাজার টাকা দরে। এগুলো দিয়েই পরচুলা বানায়।

– ও, তাই তো দেখলাম, আমাদের বড়বাইদপাড়া গ্রামের কিশোরী মেয়েরা কয়েক জনে পরচুলা বানাচ্ছে কোম্পানির সাপলাই দেয়া চুল দিয়ে। এখন বুঝলাম কোম্পানি চুল পায় কোথায়। গ্রামের মেয়েরা এমন হাতের কাজ করে বেশ টাকা আয় করছে।

– চুল মাপেন কি দিয়ে?

ফেরিওয়ালা ব্যাগ থেকে ছোট একটা ওয়েট মেশিন বের করে দেখিয়ে বললো,

– এটা দিয়ে। অল্প অল্প চুল কিনি তো এটাতেই হয়ে যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম ১,০০০ টাকা।

– গুড, এখন আমার আর সন্দেহ নেই। চালিয়ে যান।

লোকটা লাউড স্পিকার হাতে নিয়ে বলতে বলতে চলে গেলো “চুল কিনি, পুরাতন মোবাইল কিনি।”

আমি বাসার দিকে ফিরে যেতে যেতে ভাবলাম কাউকে অযথা সন্দেহ করতে নেই। বিচিত্র মানুষের জীবন। বিচিত্র মানুষের জীবীকা। বয়স প্রায় ৬৭ হয়ে গেলো। এখনো মানুষের জীবন পড়তে, শিখতে বাকী আছে। ফেলে দেয়া ছেড়া চুলের মূল্য কতো হতে পারে আজ জানতে পারলাম।

৩০ নভেম্বর ২০২৫ খ্রি.

ময়মনসিংহ

#গল্প #মানুষেরগল্প #সাদেকুল

চ্যাট ডিপিটিকে এই গল্প বলে একটা ছবি একে দিতে বলেছিলাম। ভালোই একেছে।