Class on Pathology
Author Archives: talukderbd
Writing
স্মৃতি কথা – Memoir
মানুষের গল্প — Human Stories
ছোট গল্প
advicetodoctors
নবীন ডাক্তারদের প্রতি কয়েকটি উপদেশঃ
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
১। চেম্বারে প্রবেশ করার পরপরই রোগী ও সাথের লোককে বসতে বলবে।
২। হাতে অন্য জরুরী কাজ থাকলে বলবে “কাইন্ডলি, একটু অপেক্ষা করুন।”
৩। সাথে আসা লোকটির সাথে রোগীর কি সম্পর্ক জেনে নিবে।
৪। ধৈর্য ধরে রোগীর কথা শুনবে।
৫। চিকিৎসায় ত্রুটি করে থাকলেও রোগী বা তার আগের ডাক্তারকে তিরস্কার করবে না।
৬। মহিলা রোগীর শরীরের প্রাইভেট অংশে পরীক্ষা করতে হলে আরেকজন মহিলা সাথে রাখবে।
৭। পুরুষ রোগীর শরীরের প্রাইভেট অংশে হাত দিয়ে পরীক্ষা করতে হলে রোগীকে বুঝিয়ে বলে নিবে।
৮। তাড়াহুড়া করে রিপোর্ট দেখবে না ।
৯। প্রেস্ক্রিপশন লিখার সময় অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ করবে না।
১০। নিজেই প্রেস্ক্রিপশন পড়ে রোগীকে বুঝিয়ে দিবে।
১১। ক্যান্সার বা খুব খারাপ কোন রোগ হলে খুব সতর্কভাবে প্রকাশ করবে। ঠিকমতো চিকিৎসা করালে ভাল হওয়ার আশ্বাস দিবে। রোগী এতদিন বাচবে এমন কথা কখনো বলবে না।
১২। মেডিকেলের ছাত্র, ডাক্তার, ডাক্তারের মা,বাবা, স্ত্রী ও সন্তানের নিকট থেকে ভিজিট নিবে না।
১৩। তোমার শিক্ষকদের থেকে ভিজিট নিবে না।
১৪। চেম্বারে দাঁড়িয়ে বা রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রেস্কিপশন লিখবে না। বসে বসে লিখবে ।
১৫। রোগীর ছবি ফেইসবুকে দেখাবে না।
১৬। রোগীর গোপন কথা ফাস করবে না।
১৭। অন্য ডাক্তারের নিকট তোমার মা, বাবা, সন্তান-এর জন্য যেমন ব্যবহার আশা করো, তেমন ব্যবহার তুমি তোমার রোগীর সাথে করবে।
১৮। রোগীর সাথে রাগ করে তাকে হয়রানি করবে না। অযথা তাকে, ঢাকা, সিংগাপুর, ইন্ডিয়া বা ইউএসএ পাঠাবে না।
১৯। ঔষধ কোম্পানির প্রলোভনে পরে ফার্মাকোলজি ভুলে যাবে না।
২০। ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের প্রলোভনে পরে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাবে না।
২১। গরীব রোগী থেকে ভিজিট নিবে না।
======================
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
এমন-১৭, এমবিবিএস ১৯৮৫, এম ফিল ১৯৯৫
প্যাথলজি বিষেষজ্ঞ
প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান, প্যাথলজি বিভাগ
ময়মনসংহ মেডিকেল কলেজ।
বর্তমান সিনিয়র কনসালটেন্ট এন্ড হেড হাসপাতাল ক্লিনিকেল প্যাথলজি
কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলজে হাসপাতাল, বাংলাদেশ, ময়মনসংহ।
পরিচালক, তালুকদার প্যাথলজি ল্যাব, চরপাড়া, ময়মনসিংহ ।
Tools
Tools
facebook-profile-picture
ফেইসবুকের প্রোফাইল পিকচার পলিসি বা নিয়ম-কানুন হলো এমন কিছু নির্দেশনা যা নিশ্চিত করে যেন প্রোফাইল ছবি নিরাপদ, সম্মানজনক এবং সঠিকভাবে পরিচয় প্রকাশ করে। নিচে মূল নিয়মগুলো দেওয়া হলো
যা দেয়া যাবে (অনুমোদিত):
• নিজের স্পষ্ট মুখের ছবি – নিজের মুখ পরিষ্কারভাবে দেখা যায় এমন ছবি সবচেয়ে ভালো।
• সাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ডে ছবি – যেমন ঘর, অফিস, বা প্রাকৃতিক পরিবেশ।
• নিজের পেশাগত বা আনুষ্ঠানিক ছবি – যেমন ডাক্তার, শিক্ষক, অফিসার ইত্যাদি পেশায় ব্যবহৃত প্রফেশনাল ছবি।
• শিক্ষামূলক বা সামাজিক উদ্দেশ্যে নিজের ছবি – যেমন আপনি কোনো প্রোগ্রামে অংশ নিচ্ছেন, সেটার ছবি।
যা দেয়া যাবে না (নিষিদ্ধ বা নিরুৎসাহিত):
• অন্যের ছবি বা সেলিব্রিটির ছবি – নিজের পরিবর্তে অন্য কারও মুখ ব্যবহার করা যাবে না।
• পশু, কার্টুন বা অবজেক্টের ছবি – যেমন বিড়াল, কুকুর, ফুল, গাড়ি, লোগো ইত্যাদি।
• মাস্ক পরে বা মুখ ঢেকে রাখা ছবি – মুখ পরিষ্কারভাবে দেখা না গেলে তা প্রোফাইল পিকচার হিসেবে অনুপযুক্ত।
• ধর্ম, রাজনীতি, বা অশালীন বার্তা সম্বলিত ছবি – কোনো বিভেদ, ঘৃণা বা অশালীন বিষয়যুক্ত ছবি দেওয়া যাবে না।
• ফটোশপ বা বিকৃত মুখের ছবি – অতিরিক্ত ফিল্টার বা বিকৃত রূপে নিজের ছবি দেওয়া নিষেধ।
পরামর্শ:
• প্রোফাইল পিকচার আপনার পরিচয়ের প্রতীক, তাই এমন ছবি দিন যা আপনাকে প্রতিনিধিত্ব করে।
• ছবি যেন উজ্জ্বল, পরিষ্কার, এবং মুখের অভিব্যক্তি বন্ধুত্বপূর্ণ হয়।
• ব্যবসায়িক পেইজ হলে, লোগো বা ব্র্যান্ড ইমেজ দেওয়া যায় (ব্যক্তিগত পেইজ নয়)।
(AI aided content, prompted by Dr. Sadequel Islam Talukder)
kofil-haidarer-biye
কফিল হায়দারের বিয়ে
(মিনি গল্প)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
বিয়ে পাস করার পর অনেক চেষ্টা করেও কোন চাকরি যোগার করতে পারেনি কফিল হায়দার। তারা ৪ ভাই ৪ বোন। সবাই তখন পড়ার মধ্যেই ছিল। সংসারে তখন অভাব লেগেই থাকতো। বেশ কিছু টাকা ঋণ করে দালালের মাধ্যমে মিডল ইষ্টে কর্মি হিসাবে চাকরি করতে যায়। সেখানে যা বেতন পায় তা ঋণের টাকার কিস্তি দিতেই শেষ হয়ে যায়। কাজেই প্রথম ৪ বছর সংসার খরচের জন্য তেমন কিছুই দিতে পারেনি। যখন দেয়া শুরু করে তখন ভাই বোন আত্মীয় স্বজনরা কে কত নিতে পারে সেই প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। কফিলের মনে হয় সবাই যেন তার টাকাকেই ভালোবাসে, তাকে নয়। পাচঁ বছরের মাথায় দুই মাসের ছুটি নিয়ে দেশে আসে। সাথে সবার জন্য গিফট নিয়েও আসে। সেই গিফট পেয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে রেসারেসি শুরু হয়। তাদের এই আচরণ ভালো লাগে না। তার ইচ্ছা ছিলো এবারের ছুটিতে এসে একটা বিয়ে করে যাবে। কিন্তু সে কথা উঠাবার সুযোগ হলো না। মনের কষ্ট নিয়ে ফিরে গেলো আবার বিদেশে।
এবার বিদেশ যাওয়ার পর বাড়ির মানুষগুলোকে আগের মতো আর ভালো লাগে না। শুধু নিজের জীবন নিয়ে ভাবে। শুধু মা-বাবার জন্য অল্প কিছু টাকা পাঠায়। ঠান্ডু ঘটক কফিল হায়দারের ঠিকানা সংগ্রহ করে চিঠি লিখে জানায় যে তার হাতে একটা সুন্দরী পাত্রী আছে। খুবই বুদ্ধিমতি। দ্বিতীয় বার বিদেশে আসার পর আবার প্রায় ৫ বছর হয়ে গেছে। বেশ কিছু টাকা ব্যাংকে জমিয়েছে। বেশ কিছু স্বর্নালংকারও কিনেছে হবু বৌয়ের জন্য। এগুলোর খবর পরিবারের কাউকে জানায়নি। এবার টাকা পয়সা সোনাদানা ব্রিফকেসে ভরে দেশে আসে পরিবারের কাউকে না জানিয়ে। শুধু জানে ঘটক। উঠে একটা রিসোর্টে। ঠান্ডু ঘটক তাকে পাত্রী দেখানোর ব্যবস্থা করে। পাত্রী খুবই সৌষ্ঠবের। ঘটা করে বিয়ের তারিখ ঠিক হয়। বিয়ের পর ব্রিফকেসটা গহনা ও টাকাসহ ঘটকের মাধ্যমে মেয়ের বাবার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বাসর ঘর সাজানো হয়েছে। বর কফিল হায়দার সেরোয়ানি পরেছে। কনে কইতরি বেগম বেনারশী শাড়ি পরেছে। বাড়িতে বিয়ে বাড়ির মতো তেমন লোকজন চোখে পড়লো না। রাত তখন গভীর। কনে সাজানো বিছানার মাঝখানে ঘোমটা দিয়ে আনত নয়নে বসেছিলো। কফিল ডান হাত দিয়ে কইতরির ঘুমটা সামান্য একটু ফাক করলো। কনে সাপের মতো ফণা তোলে লাফ দিয়ে টেবিলের উপর গিয়ে দাড়ালো। লম্বা একটা চাকু বের করে ঘোরাতে ঘোরাতে রৌদ্রমূর্তি হয়ে বললো, “সাবধান, আমার গায়ে হাত দিবি না। তোর আগেও এভাবে আমি কম পক্ষে ১০ টা বিয়া করছি। বুঝতে পারছস? জান নিয়ে বাচতে চাইলে এখই এলাকা ছাড়বি। গেলি!”
কফিল হায়দার হাত জোড় করে করুণ দৃষ্টিতে কইতরি বেগমের দিকে ফেল ফেল করে চেয়ে রইল।
২২ অক্টোবর ২০২৫ খ্রি.
বি:দ্র:
এটা একটা কাল্পনিক গল্প।
এই আইকে প্রোমট করে কাল্পনিক ছবি বানিয়েছি।
My Father
আমার বাবা
(স্মৃতি কথা)
ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
আমার বাবার নাম দলিল উদ্দিন তালুকদার। জন্মগ্রহণ করেন কালিহাতির ভিয়াইল গ্রামের দক্ষিণ পাড়ায় তালুকদার বাড়ি। আমার দাদা ছিলেন মোকছেদ আলী তালুকদার। বাবার ডাক নাম ছিল দলু । বাবার শরীরে ইমুনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম ছিল। তাই, ঘনঘন অসুস্থ্য হতেন । অসুস্থ থাকার কারনে বাবা পরিশ্রমের কাজ করতে পারতেন না। একজন কৃষক হয়েও কৃষিকাজ তেমন করতেন না। যার দরুন অনেক জমি জমা থাকলেও তিনি তেমন সচ্ছল ছিলেন না।
বাবা বেশিরভাগ সময়ই ঘুরে বেড়াতেন। লাইলি বুবু ও আকবর ভাইর জন্মের পরই দাদা বাবাকে পাঠিয়ে দেন পাহাড় অঞ্চলের জমি দখল করে আবাদ করার জন্য। বাবা ঢনডনিয়া মোউজার বড়বাইদপাড়া গ্রামে এসে বাড়ি করেন। মা আমাকে গর্ভে করে নিয়ে আসেন আমাদের নতুন বাড়িতে। তাই, আমার জন্ম হয়েছে এই গ্রামে আনুমানিক ১৯৫৮ সনে । তখন এটা কালিহাতি থানার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখন এটা পড়েছে সখিপুর উপজেলার অধীন।
বাবাকে দেখেছি ঘনঘন ভিয়াইল যেতে। জিজ্ঞেস করলে বলতেন “তোমার দাদাগো বাড়ি গেছিলাম। তোমার ফুফুগ বাড়ি গেছিলাম।” অল্প বয়সেই আমার দাদী অন্ধ হয়ে যান। আমার দাদার সভাবও উড়াটে ধরনের ছিলো। আমার বড় ফুফু খুব বুদ্ধিমতি ছিলেন। অল্প বয়সেই ভাই বোনদের দায়িত্ব নিতে হয় তাকে। আমার বাবা চাচার একজন নির্ভরযোগ্য বোন ছিলেন আমার বড় ফুফু। তাই তিনি ফুফুর কাছে চলে যেতেন। ফুফুর বিয়েও হয়েছিল ভিয়াইল গ্রামের উত্তর পাড়ার তালুকদার বাড়ি। মফিজ উদ্দিন তালুকদার ছিলেন আমার ফুফা।
বাবা জমিতে ফসল তেমন ফলাতে পারতেন না। তাই, তালুকের জমি বিক্রি করে বাজার সদায় করে খেতেন। বাবার কাছে আমাদের কিছু চাইতে হয়নি। আমাদের যার যখন যা কিছু লাগতো বাবা জমি বেচা টাকা দিয়ে কিনে আনতেন।
বাবা খুব পাড়া পেড়াতেন। খেয়ে কুলি ফেলতেন নওপাড়া গিয়ে। জিতাস্বরি পাড়ার হাতু কাক্কু, দলু কাক্কু ও বুর্জু কাক্কুর সাথে বাবার খুব খাতির ছিলো। তারাও বাবার মতো অলস ছিলেন। তাদের সাথেই বেশি সময় কাটাতেন। বর্ষাকালের অর্ধেক সময় নৌকায় কাটাতেন। ভিয়াইলের মধ্য পাড়ার তোমজ বেপারির ছেলে হাসান বেপারি সম্পর্কে আমাদের দাদা হতেন। আমাদের কাছে হাছেন দাদা নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি তায়েজ উদ্দিন কাক্কুর বাবা। হাছেন দাদা আমাদের খুব আদর করতেন। আমাদের জন্য জিলাপি নিয়ে আসতেন। কিন্তু আমরা তাকে পছন্দ করতাম না। কারন হলো তিনি বাবাকে আমাদের থেকে নিয়ে যেতেন তার সাথে ব্যবসা করতে। তিনি পাট ও কাঠের ব্যবসা করতেন। তার বিরাট নাও (নৌকা) ছিলো। নাওয়ের সামনের অংশ প্রসস্থ ছিলো। এই অংশে মালামাল বোঝাই করা হতো। পিছনের অংশে ছই ছিল। এই ছইয়ের নিচে বসে হাছেন দাদা, বাবা ও হাছেন দাদার বড় ছেলে কদ্দুস কাক্কু গল্প করতে করতে হুক্কা খেতেন। আমি মাঝে মাঝে এই নায়ে বাবার সাথে ছোট চওনা ঘাট থেকে উঠে ভিয়াইল গিয়েছি। ছোট চওনা ঘাট থেকে গজারি কাঠের গুড়ি অথবা পাট কিনে নায়ে ভরে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে বিক্রি করার উদ্যেশ্যে রওনা দিতেন। চারজন মাল্লায় এই নাও বেয়ে নিতেন। সামনে দুই পাশে দুইজন, পিছনে দুইপাশে দুইজন মাল্লা লগি দিয়ে খোজ দিতেন এক সাথে। ভারী নাও ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতো। বাবা অথবা কদ্দুস কাক্কু পিছনের গলুইয়ে বসে হাল ধরে থাকতেন। আমি বাবার টোনায় বসে বাবার সাথে হাল ধরে মজা পেতাম। খাল ও নদী দিয়ে যাওয়ার সময় মাল্লারা পাড় দিয়ে হেটে হেটে গুন টেনে যেতেন। গুনের কাঠি কাঁধে নিয়ে বাঁকা হয়ে আঁকা বাঁকা শুকনো ও কাঁদা পথে হাটতেন মাল্লারা। তাদের কষ্টের কথা আমি এখনো ভুলতে পারিনি। পথে রাত হয়ে যেতো। হাছেন দাদা মাটির চৌকায় রান্না করতেন। ভাতে বেগুন সিদ্ধ দিয়ে খাস (সরিষা) তেল দিয়ে ভর্তা করতেন। চামারা চাউলের গরম ভাত দিয়ে খেতে কি যে স্বাদ পেতাম! খেয়ে নায়ের গুড়ায় বসে পানিতে প্রশ্রাব করে ছইয়ের নিচে বেতের পাটিতে ঘুমিয়ে পড়তাম। ঘুমের ভিতরেই বাবা আমাকে কোলে নিয়ে নাও থেকে নামিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিতেন।
বাবা যখন নায়ে যেতেন তখন একটানা ১০-১৫ দিন কাটিয়ে আসতেন। ঐসময় আমার মন খারাপ থাকতো। আমি হাছেন দাদার প্রতি বিরক্ত থাকতাম। মাও বিরক্ত হতেন হাছেন দাদাকে দেখে। তিনি বলতেন “অইজে আবার আইছে, তোমার বাবাকে নিয়ে যেতে।” বড় হয়ে আমার হাছেন দাদার প্রতি অভিযোগ ছিল না। আমি বুঝতে পেরেছি আয় রোজগার করতে বাড়ি ছেড়ে থাকতে হয় অনেকদিন। হাছেন দাদাই ছিলেন বাবার সবচেয়ে ভালো বন্ধু।
বাবাকে বিদায় দেয়ার জন্য মা অনেকদূর পিছে পিছে যেতেন। আমিও মার সাথে গিয়েছি। আমার চোখের পানি গাল বেয়ে পড়তো। বাবা গামছা দিয়ে মুছে দিতেন। কোলে নিয়ে আদর করে বলতেন “বাজান, কাইন্দো না, কয়দিন পরই আই পরমু।” মার কোলে আমাকে বসিয়ে দিয়ে বাবা বুইদ্দাচালার সরু পদ দিয়ে আড়াল হয়ে যেতেন। আমি নিশ্চুপ দাড়িয়ে থাকতাম। চারদিক নিরব হয়ে যেতো। সবুজ গাছের আড়াল থেকে থেকে-থেকে ঘুঘু ডেকে উঠতো। আমার মনে হতো বাবা চলে গেলেন বলেই ঘুঘুরা কাঁদছে। অন্যদিন অত ডাক শুনিনি।
আমার কপালের এক পাশে, গাল ও চোখ সহ প্রতিবছর শীতকালে ব্যাথা করতো। তীব্র ব্যাথা। যন্ত্রনায় কান্না করতাম মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে, কপাল দু’হাতে ধরে। এটাকে বলা হতো আধকপালে মাথার বিষ। আমার কষ্টে বাবাও কষ্ট পেতেন। বাবা বড় চওনা ও কচুয়া হাট থেকে বড়ি এনে দিতেন। পানি দিয়ে খেতাম। কোন কাজ হয়নি। একজন বললেন যে ভুয়াইদের এক মান্দাই মহিলা কবিরাজ আধকপালে মাথার বিষের চিকিৎসা জানেন। বাবা আমাকে কাঁধে নিয়ে ভুয়াইদ গেলেন। মহিলা বিধান দিলেন “সকালে উদিয়মান সূর্যের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মাটিতে সেজদা দিতে হবে কিছুক্ষণ করে কয়েকদিন। তাতে কোন কাজ হলো না। ছোট দাদা জয়নাল আবেদীন তালুকদার শুনে বললেন “মুসলমানের পোলা হয়ে হিন্দু কবিরাজের কথায় সূর্যপূজা করতাছ? বাড়ির পাশেই কবিরাজ থাকতে গেছস ভুয়াইদ! আমিই তো আধকপালে বিষের চিকিৎসা জানি।” এই বলে তিনি গাছান্ত বেটে বটিকা বানিয়ে দিলেন। আমি প্রতিদিন সকালে বিষ ওঠার শুরুতেই ঐ বটিকা খেতাম। ওটা এমন ঝাল লাগতো যে বিষের যন্ত্রনার চেয়ে ঝালের তীব্রতাই বেশি ছিল। দাদার ঔষধ বাদ দিলাম। বাবা খবর পেলেন বাঘেরবাড়িতে একজন আধকপালী মাথা বিষের ভালো কবিরাজ আছেন। বাবা আমাকে পর পর তিন দিন কাঁধে করে নিয়ে গেলেন ঝার ফুক দিতে। কোন কাজ হলো না। প্রতিবছর আমার এমন রোগ হতো। আমি কষ্ট পেতাম। কোন চিকিৎসা নেইদনি। মেডিকেল কলেজে ৩য় বর্ষে পড়ার সময় শিখলাম যে ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়াতে এমন কপালের এক পাশে ব্যাথা হয়। এর ঔষধ কি তাও বই পড়ে জেনে নিলাম। আমি নিজের বুদ্ধিতেই ফার্মেসী থেকে ঔষধ কিনে কাউকে না জানিয়ে সকালে খেয়ে নিলাম। শুরু হলো সারা শরীরে তীব্র যন্ত্রণা। বুঝতে পেলাম। ভুল করেছি। ভুল চিকিৎসা করেছি নিজের উপর। অসহ্য যন্ত্রণায় বিছানায় ছটফট করলাম। বিছানা থেকে উঠতে পারলাম না। কাউকে আমার বোকামির কথা বললাম না। মৃত্যুর জন্য প্রস্তত হলাম। কিন্তু আল্লাহ বাচিয়ে দিলেন। এরপর নাক-কান-গলা বিভাগের আউটডোরে মেডিকেল অফিসারকে দেখালাম। তিনি আর এস ডাঃ সিরাজুল আরেফিন স্যারের কাছে রেফার্ড করলেন। তিনি আমার সব ইতিহাস শুনে এবং নাক-কান-গলা দেখে বললেন “তোমার প্রতিবছর শীতকালে সাইনোসাইটিস রোগ হয়। তোমার সাইনোসাইটিস রোগ হয়েছে।” তিনি সাইনোসাইটিস সম্পর্কে বিস্তারিত আমাকে শিখিয়ে দিলেন। তারপর থেকে আমার আর সাইনোসাইটিসের ব্যাথার কষ্ট আর হয়নি। আলহামদুলিল্লাহ।
বাবা আমাকে প্রথম হাট দেখিয়েছেন। বড় চওনা, কচুয়া, ইন্দ্রজানী, বর্গা ও পলাশতলীর হাট বাবাই আমাকে প্রথম দেখিয়েছেন। বাবার সাথেই আমি প্রথম বাসে উঠি। বাবাই আমাকে প্রথম সিনেমা দেখান। বাবার পেটের নাভীর কাছে ব্যথা করতো। তীব্র ব্যাথায় অনেক রাতে পেট ধরে কাঁদতে দেখেছি। হাট থেকে বোতলের ঔষধ এনে খেতেন। কোন কাজ হতো না। একবার, তখন আমি খুব ছোট, আমি মার সাথে রৌহার মামাবাড়ি ছিলাম। বাবা কোথাও যাচ্ছিলেন। আমি বললাম
– বাবা, কুনু যাবাইন?
– তোমার হাছেন দাদার সাথে সয়ার হাটে যামু। তোমার দাদা একটা গরু কিনবেন।
– আমি যামু।
– দুর আছে। মোটরে চইড়া যাইতে অয়।
– ভোঁ মোটর সাইকলে?
– না, মোটর গাড়িতে।
– আমি মোটরে চরমু।
– এখন না। বড় অইলে নিয়া যামুনি।
– না, আইজকাই যামু
বলে কান্না শুরু করে দিলাম। বাধ্য হয়ে বাবা আমাকে সাথে নিতে রাজি হলেন। মা আমার গায়ে একটা হাওই শার্ট পরিয়ে দিলেন। কালিহাতির রাজাফৈরের কাছে গেলে ভোম ভোম রকম শব্দ পেলাম। বাবা বললেন “এইটা মোটরের শব্দ।” চামুরিয়া পাড়ি দিলে ফটিকজানি নদীর উপর ব্রিজ দেখিয়ে বললেন “ঐযে দেখ কত বড় পুল।” পুলের উপর তাকাতেই দেখা গেলো বিরাট এক কাছিমের মতো জিনিস পুলের উপর দিয়ে চলে গেলো। আমি বললাম “ওঠা কি গেলো?” বাবা বললেন “ওঠা, প্রাইভেট কার। বড় লোকেরা ওঠায় চড়ে।” এরপর বড় একটা কিছু যাচ্ছিল। বললেন “এইডা মোটর গাড়ি।” কালিহাতি বাসস্ট্যান্ডে কিছুক্ষণ দাড়ালে ময়মনসিংহ থেকে একটা মোটর গাড়ি এসে থামলো। কাঠবডি বাস। কাঠের জানালা। সীট খালি নেই। আমরা দাড়িয়েই গেলাম। সয়া গিয়ে নেমে পড়লাম। কালিহাতি ও এলেঙ্গার মাঝামাঝি হলো সয়ার হাট। ঘুরে ঘুরে গরু কিনতে রাত হয়ে গেলো। রাতে আমরা চলে গেলাম বাগুনডালি গ্রামে। সেই গ্রামে একজন কবিরাজ ছিলেন। সেই বাড়ি গিয়ে রাত কাটালাম। কবিরাজ বাবার পেটের ব্যাথার ঔষধ দিলেন। ঔষধ দেখতে লোহার করাতের গুড়ার মতো। খেলে ব্যাথা ভালো হয়। পরেরদিন সকালে ঐ বাড়িতে নাসতা করে আমরা পা পথে গরু নিয়ে ভিয়াইল চলে আসি। সেই ঔষধ খেয়ে বাবা ভালো থাকতেন। এরপরও কয়েকবার বাবা সেই ঔষধ এনে সেবন করেছেন। কিন্তু ঔষধের দাম খুব বেশি ছিল। আমি এখন মনে করি ওগুলো আসলেই করাতের গুড়া। করাতে থাকে এলুমিনিয়াম। এই এলুমিনিয়াম পাকস্থলির হাইড্রোক্লোরিক এসিডের সাথে বিক্রিয়া করে এসিডকে নিউট্রাল করে দিয়ে পেট ব্যাথা তথা পেপ্টিক আলসার ভালো করে। বাবা এরপর খোজ পান খাওয়ার সোডা বেকিং পাউডার। বাবা বেকিং পাউডার খেয়ে পেপ্টিক আলসারের ব্যাথা থেকে উপসম হতেন। আমি ডাক্তার হবার পর আর বাবাকে বেকিং পাউডার খেতে হয়নি।
বাবা আমাকে কোনদিন কোন কাজ করতে বলেননি। বাবা না বললেও আমি সংসারের অনেক কাজ করেছি। বাবা আমাকে কোনদিন পড়তে বলেননি। কারন, তিনি জানতেন সাদেককে পড়তে বলতে হবেনা। আল্লাহ সাদেককে ও গুণটি দিয়েই তৈরি করেছেন। আমি যখন দোয়াত জ্বালিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত পড়তাম বাবা আমার পাশেই শুয়ে শুয়ে মশা মেরে দিতেন এবং বিচুন দিয়ে বাতাস দিতেন। পিঠে হাত বুলিয়ে দিতেন। প্রাইমারির পড়া বুঝিয়ে দিতেন। বাবার অনেক বিষয়ে ভালো সাধারণ জ্ঞান ছিলো। তিনি কোন নিতিকথা শিখাননি। কারন, তার বিশ্বাস ছিল সাদেক কোন অনৈতিক কাজ করতে পারেনা।
১৯৭৯ সনে যখন মা মারা যান তখন বাবার বয়স হয়তো ৫৫ বছর। ঘটকরা চেষ্টা করেছিলেন বাবাকে পুনরায় বিয়ে করিয়ে দিতে। আমি তখন এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। আমরা বিয়ের ব্যাপারে হা না কিছু বলিনি। বাবা বিবেচনা করে দেখেছেন যে সংসারের আমাদের নতুন মা এলে আমাদের শান্তি বিগ্নিত হতে পারে। তাই তিনি ধৈর্য ধরেন।
আমি ডাক্তার হবার পর বাবাকে সতর্ক করে দেই যে এখন থেকে তিনি জমি বিক্রি করে খেতে পারবেন না। আমি সংসারের জন্য যতটুকু পাড়ি করে যাবো। তারপর থেকে তিনি আর জমি বিক্রি করেননি। তিনি ঘনঘন জ্বরে আক্রান্ত হতেন। আমি তখন আমার এম ফিল কোর্সের পড়া নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। বাবার জন্য সময় দিতে পারিনি। এম ফিল শেষ করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে যোগদান করে বাবাকে আমার বাসায় রাখলাম। কিন্তু আমার মনে হয়েছে বাবাকে জেল খানায় বন্দী করে রেখেছি। বাবার সাথে সময় দেয়ার কেউ ছিল না। বাবা ঘনঘন বাড়ি চলে যেতেন। আমি বুঝতে পারি বাবা এখন গ্রামময় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বন্ধুদের সাথে গুপ ছেড়ে হেসে হেসে গল্প করছেন। তাই আমি শহরে এসে থাকতে বাবাকে পিড়াপিড়ি করিনি।
২০০১ সনের দিকে বাবা খুব বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দেখানো হয়। পরীক্ষা করে দেখা যায় বাবার প্যানসাইটোপেনিয়া আছে। অর্থাৎ সব রক্তকণিকা কম আছে। এজন্যই ঘনঘন ইনফেকশন হয়। ইনফেকশনের জন্যই জ্বর হয়। বাবাকে অনেকদিন হাসপাতালে ভর্তি রাখতে হয়। ভাতিজা আব্দুল মান্নান তালুকদার তখন কলেজে পড়তো। ওর পড়াশোনা ক্ষতি করে বাবার সাথে থাকে অনেক দিন। এরপর ধরা পড়লো বাবার লিভারে সিরোসিস হয়েছে। এ রোগ ভালো হবার নয়। ৭৫ বছর বয়সে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করাও ঠিক হবে না মনে করলাম। যতটুকু সম্ভব সাধারণভাবে চিকিৎসা করে যেতে লাগলাম। বাবার ইচ্ছে অনুযায়ী বাড়িতে রাখলাম। সুবিধা ছিল, ভাই, ভাবী, মান্নান ও আফ্রোজা বাবার ঠিকমতো যত্ন নিতে পারবেন নিজ বাড়িতে। তখন ছিল অক্টোবর মাস। আবহাওয়া ছিল দুর্যোগপূর্ণ। বাড়ির চারিদিকে ছিল কাদা আর কাদা। এমন একটি দিনে ২০০১ সনের ২০ অক্টোবর বাবার ইন্তেকালের সংবাদ পেলাম। কার নিয়ে ছুটে গেলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। দুই কিলোমিটার দুরে পাকা রাস্তায় নেমে কর্দমাক্ত রাস্তা দিয়ে হেটে গিয়ে বাবার মৃতদেহের কাছে উপস্থিত হলাম। দেখলাম আমার নিস্পাপ বড় ভাই আকবর হোসেন তালুকদার বাবার কাছে বসে বাবার মুখের দিকে ফেলফেল করে তাকিয়ে আছেন। আনুমানিক ৭৫ বছর বয়সে বাবা চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। বাবাকে ছেড়ে মা চলে গিয়েছেন পরপারে ২০ বছর আগে। আল্লাহ আমার ধৈর্যশীল বাবার জন্য বেহেস্ত নসীব করুন।
১৫/৪/২০২০ খ্রি.
ssc
আমার এস এস সি রেজাল্ট
আমি ভালুকা উপজেলার বাটাজোর বি এম হাই স্কুল থেকে ১৯৭৭ সনে এস এস সি পাস করেছি । এই পরীক্ষার রেজাল্ট সংগ্রহ নিয়ে যে কাহিনী হয়েছিল তা আজ আমি লিখব। এস এস সি রেজাল্ট বের হবার ঘোষনা রেডিওতে দিয়েছে তিন দিন হয়। ডাকযোগে স্কুলে রেজাল্ট পৌছতে সময় লাগার কথা দুই দিন । কিন্তু তিন দিন হয়ে গেল কিছুই জানতে পারলাম না। চিন্তায় পরে গেলাম। চতুর্থ দিন বাড়ী থেকে বের হলাম। বলে গেলাম কচুয়া যাচ্ছি। কচুয়া বাজারে একটি খোলা খালি ঘরে বেঞ্চে আমি, ফজলু, দেলোয়ার ও কিসমত বসে কিভাবে এস এস সি পরীক্ষার ফল পাওয়া যেতে পারে তা নিয়ে আলাপ করলাম। কেউ একজন বলল যে করটিয়া একটি ক্লাব ঘরে পাচ টাকা করে নিয়ে রেজাল্ট দিচ্ছে। আমরা চারজন রওনা দিলাম করটিয়ার উদ্দেশ্যে।
একটু এদেরকে পরিচয় করিয়ে দেই। ফজলু এখন নামকরা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, বুয়েট থেকে বি এস সি ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করা। ঢাকায় থাকে। দেলোয়ারও বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে এখন যুব উন্নয়নের ডেপুটি ডাইরেক্টর। ডাকায় থাকে। কিসমত কি যেন পাস করার পর দেশের বাইরে চলে যায়। তার খোজ রাখতে পারিনি। আমরা সবাই স্বাধীনতা যুদ্ধের পর কচুয়া পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হই। ফজলু দেলোয়ারের চাচাত ভাই। কিসমত বয়সে বড়, ওদের চাচা হয়। তাই আমিও চাচা ডাকি। আপনি বলি। সেভেনে উঠার সময় ফজলু ফার্স্ট, আমি সেকেন্ড, লুৎফর থার্ড, মোসলেম ফোর্থ, দেলোয়ার ফিফথ ও কিসমত সিক্সথ হয়, খুব সম্ভব। লুৎফর এখন পি এইচ ডি, জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সসিটির নাটক বিভাগের প্রফেসর। মোসলেম এস এস সি পাস করে দেশের বাইরে চলে গিয়েছিল।
সেভেনে উঠে ভাল ভাল ছাত্ররা এলাকার সবচেয়ে ভাল স্কুল বাটাজোর বি এম হাই স্কুলে চলে যায়। এতে ছিল ফজলু, দেলোয়ার, কিসমত সহ আরও অনেকে। আমি এই কচুয়া স্কুলেই থেকে যাই। প্রতিযোগী ভাল না থাকার জন্য আমি আস্তে আস্তে নিম্ন মানের হতে থাকি। তাছাড়া একমাত্র বিজ্ঞানের শিক্ষক ভীম চন্দ্র স্যার নিরুদ্দেশ হয়ে যান। আমি নিরুপায় হয়ে ১৯৭৫ সনে এপ্রিল মাসে বাটাজোর চলে যাই। এত দিন বিজ্ঞান ক্লাশ করতে না পারায় আমি নবম শ্রেণীর প্রথম সাময়িক পরিক্ষায় ফিজিক্স এ খারাপ করি। আমার মাথায় জ্যাদ চেপে যায়। উন্নতি হতে হতে প্রিটেস্ট পরীক্ষায় ফার্স্ট বয় ফজলু থেকে মাত্র দুই নাম্বার কম পাই। টেস্ট পরীক্ষায় তার থেকে দুই নাম্বার বেশী পেয়ে আমি ফার্স্ট হই। তার মানে, আমিই বাটাজোর স্কুলের শেষে ফার্স্টবয় ছিলাম।
আমরা রেজাল্ট আনার উদ্দেশ্যে কচুয়া থেকে পশ্চিম দিকে পাহাড়ি পথে হাটা শুরু করলাম। খুব সম্ভব জুলাই মাস। ১৯৭৭ সন। শালগ্রামপুর গিয়ে ছইওয়ালা নৌকা ভাড়া করলাম। নৌকায় বসে কার রেজাল্ট কেমন হতে পারে তা নিয়ে কথা বললাম। আমি বললাম যে আমার ফার্স্ট ডিভিশন ছয়টি লেটার থাকতে পারে। ফজলুও তাই বলল। দেলোয়ার বলল যে তার দুই তিনটিতে লেটার থাকতে পারে। কিসমত চাচা বললেন যে তার রেজাল্ট আমার মতই হতে পারে। তিনি আমার পিছনেই সিট পেয়েছিলেন পরীক্ষার হলে।
আকাবাকা খাল, বিস্তির্ন বিল পারি দিয়ে বেলা ডোবার আগ দিয়ে করটিকা পৌছলাম। জমিদার বাড়ীর পশ্চিম পাশে একটি ক্লাব ঘর থেকে কাগজের টুকরায় রুল নাম্বার লিখে বেড়ার ছিদ্র দিয়ে ভিতরে দিলে ভিতর থেকে রেজাল্ট লিখে দেয়া হয়। সময় নেই। বেলা ডোবার পর বন্ধ করে দেয়া হবে।
ফজলু আগে স্লিপ ঢুকালো। রেজাল্ট দেখে কাপতে কাপতে পড়ে গেল। আমরা ধরাধরি করে ইদারা কুয়ার পারে নিয়ে বালতি দিয়ে পানি তুলে তার মাথায় দিতে লাগলাম। আমরা গ্রামে থেকে এভাবেই অজ্ঞান রুগী চিকিৎসা করতাম। আমি পানি তুলি, দেলোয়ার মাথায় পানি ঢালে। কিসমতও রেজাল্ট পেয়ে কাপতে কাপতে হয়ে পরে গেল। একি রেজাল্টএর মড়ক লাগল নাকি! এখন রইলাম আমি আর দেলোয়ার। দুইজনকে দুইজনে পানি ঢালি। ক্লাব ঘর থেকে আওয়াজ আসছে আরো কেউ আছে নাকি, বন্ধ করে দিলাম। দেলোয়ার বলে তুমি যাও আগে, আমি বলি তুমি যাও আগে। দেলোয়ার আগে গেল, কিন্তু অজ্ঞান হল না। আমি রেজাল্ট পেয়ে অজ্ঞান হলাম না। আমি পেয়েছি ফার্স্ট ডিভিশন চার লেটার, দেলোয়ার পেয়েছে ফার্স্ট ডিভিশন দুই লেটার। এবার ফজলুর স্লিপ দেখলাম। সে পেয়েছে ফার্স্ট ডিভিশন দুই লেটার। কিসমত চাচাকে বললাম “চাচা, এত ভেংগে পড়লে চলবে? সবাই কি লেটার পায়? কত মানুষ যে ফেল করে?”
চাচা বললেন “আমি ফেল করেছি গো। হু হু হু “।
আমি ফজলুকে, আর দেলোয়ার কিসমত চাচাকে ধরে নিয়ে মেইন রোডের দিকে হাটলাম। কচুয়ার সিনিয়র ফজলু ভাইর সাথে দেখা হল। তিনি ওখানে সাদত কলেজে অনার্স পড়তেন। কি হয়েছে জানতে চাইলে বিস্তারিত বললাম। আমরা চলে যেতে চাইলাম। তিনি জোড় করে তার হোস্টেলে নিয়ে গিয়ে খাওয়ালেন। ওখানেই থাকলাম। তিনি আমাকে বিশেষ যত্ন নিলেন। এখন তিনি হাই স্কুলের শিক্ষক। ফোনে আমার খোজ খবর নেন। আমিও নেই।
সকালে নাস্তা করে নৌকা ভাড়া করে শাল গ্রামপুর পৌছলাম। মুশলধারায় বৃষ্টি হচ্ছিল। থামার লক্ষণ ছিল না। চারজন বন্ধু ভিজে ভিজে বাড়ীর দিকে রওনা দিলাম। ১০/১২ কিলোমিটার পায়ের পিছলা পথ। দৌড় দিলাম। এক দৌড়ে বাড়ী পৌছলাম। বাড়ী পৌছলে বৃষ্টি আরও জোরে নামল। গতকাল বাড়ীতে জানিয়ে যাইনি। মা খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন।
-কই গেছিলি বাজান? কইয়া জাস নাই কেন?
– রেজাল্ট আনতে গেছিলাম।
– আনছ?
– আনছি। ফার্স্ট ডিভিশন চারটি লেটার পাইছি।
– কই? দেও।
– পরে দিব। শুক্না জামা পরে নেই।
মা আঁচল দিয়ে আমার শরীর মুছে দিলেন।
মহা খুশীতে রওনা দিলাম বাটাজোর গিয়ে সব স্যারের সাথে দেখা করতে। রাস্তায় যাকে দেখি তাকেই সালাম দেই। সালাম দিলেই জিগায় ” সাদেক, কি খবর?” আমি বলি “ফার্স্ট ডিভিশন চারটা লেটার।”
স্যারগণ আমাকে দেখে মহা খুশী। কোন এক স্যার বললেন “বেটা, আমাদের স্কুলে রেকর্ড ভেংগেছিস।” আমি টেস্টিমোনিয়াল হাতে পেয়ে বললাম “স্যার, মুল সার্টিফিকেট কবে পাব?”
– ওটা বোর্ড থেকে এক দেড় বছর পর স্কুলে পাঠাবে। এসে নিয়ে যাবে।
– যদি এর আগে দরকার পড়ে?
– তখন দরখাস্ত করে উঠান যাবে।
পাস করলাম আজ। সার্টিফিকেট দিবে দেড় বছর পর!
বাড়ী এসে একটা সাদা কাগজে দরখাস্ত লিখলাম ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বরাবরে যে বিশেষ কারনে আমার এস এস সি সার্টিফিকেট জরুরী প্রয়োজন। দুই আনা দিয়ে খাম কিনে ডাকে দরখাস্ত পাঠালাম।
সাতদিন পর ডাকে একটি চিঠি আসল। লিখা “আপনার মুল সার্টিফিকেট ডাক যোগে স্কুল বরাবরে পাঠানো হয়েছে। আপনি উহা সংগ্রহ করুন – পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক “
আমি চলে গেলাম স্কুলে। সব স্যার একটি চিঠি দেখছেন। লিখা আছে “সাদেকুল ইসলাম তালুকদারের মুল সার্টিফিকেট পাঠানো হল। উহা জরুরীভাবে সরবরাহ করুন – পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক “।
সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি বিস্তারিত জানালাম।
– তুমি এমন করেছে কেন?
– আমার ইচ্ছা হল, স্যার।
দেখলাম সার্টিফিকেটটা একটা শক্ত খামে অতি যত্নসহকারে ভরা হয়েছে। ভাজ হয়নি। আমি ওটা নিয়ে বাড়ি এসে মাকে দেখালাম। বললাম “এই যে আমার সার্টিফিকেট ।”
এর দুই বছর পর মা ইন্তেকাল করেন। সাভাবিক নিয়মে সার্টিফিকেট আসলে কি মা দেখে যেতে পারতেন?
১৭/৬/২০১৭ ইং
#স্মৃতিকথা #স্মৃতিচারণ #Memory #SSC #sadequel
kirtonkhola
কীর্তনখোলা নদীতে বোটিং, ১৯৯৯ সন
পুরনো হার্ড এলবাম থেকে।
১৯৯৯ সনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজে এক্সটার্নাল এক্সামিনার হিসাবে পরীক্ষা নিতে গিয়ে এই নদীতে বোটিং করি।
বরিশালের কীর্তনখোলা নদী:
কীর্তনখোলা নদী বাংলাদেশের বরিশাল বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী। এটি বরিশাল শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে এবং স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবহন ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। নদীটি আড়িয়াল খাঁ নদীর একটি শাখা এবং দক্ষিণে পায়রা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
এই নদী বরিশালের প্রধান নৌপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যার উপর দিয়ে প্রতিদিন শতাধিক লঞ্চ, ট্রলার ও কার্গো চলাচল করে। বর্ষাকালে নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনন্য হয়ে ওঠে। নদী তীরবর্তী এলাকা শহরের বাসিন্দাদের কাছে বিনোদনের জায়গা হিসেবেও জনপ্রিয়।
সংক্ষিপ্ত তথ্য:
অবস্থান: বরিশাল শহর
দৈর্ঘ্য: প্রায় ২০ কিলোমিটার
ব্যবহার: নৌপরিবহন, মাছ ধরা, পর্যটন
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য: তীরবর্তী সবুজ বন, সূর্যাস্ত দৃশ্য
foys-lake
Fay’s Lake
ফ-এস লেক, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৪।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী হিসাবে শিক্ষা সফরে গিয়েছিলাম কমিউনিটি মেডিসিন বিষয়ের পার্ট হিসাবে। ডা: নজরুল ইসলাম (চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞ) এবং আমার মাঝে যে শিশুকে দেখা যাচ্ছে, ও হচ্ছে আমার ভাতিজা ডা: শহীদুল্লাহ্ হুমায়ুন কবির তালুকদার (অজ্ঞান বিশেষজ্ঞ)। ও তখন প্রাইমারী স্কুলে পড়তো।
(পুরনো হার্ড এলবাম থেকে)
চট্টগ্রামের ফ-এস লেক: এক নজরে
চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রস্থল জিইসি মোড় থেকে মাত্র ১০ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত একটি মনোরম প্রাকৃতিক লেক হলো ফ-এস লেক (Foy’s Lake)। ১৯২৪ সালে ব্রিটিশ আমলে এটি খনন করা হয় শহরের পানির চাহিদা মেটানোর জন্য। পরে এটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। চারপাশে সবুজ পাহাড় আর হ্রদের নীল পানি মিলে তৈরি করেছে অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
এখানে রয়েছে বোট রাইড, এমিউজমেন্ট পার্ক, রিসোর্ট, কেবল কার ও নানা বিনোদনের ব্যবস্থা। ফ্যামিলি পিকনিক, বন্ধুবান্ধবের আড্ডা বা কাপলদের জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান।
প্রবেশের জন্য টিকিট লাগলেও এটি সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যায়। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে।
ফ-এস লেকে একদিন মানেই শহরের কোলাহল ভুলে প্রকৃতির কোলে হারিয়ে যাওয়া
